হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

‘না’ মানে অতীত, ‘হ্যাঁ’ মানে বাংলাদেশ

সরদার ফরিদ আহমদ

সরদার ফরিদ আহমদ

গণভোট একটি সাধারণ প্রশ্ন নয়। এটি কাগজে ছাপা দুটি শব্দের লড়াইও নয়। এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে জনগণের চূড়ান্ত অবস্থান।

এই গণভোটে কেউ কেউ নীরব। নীরবতা এখানে নিরপেক্ষতা নয়। নীরবতা এখানে অবস্থান এবং সেই অবস্থান ‘না’-এর পক্ষে। কারণ সবাই জানেÑএই গণভোটে ‘না’ মানে কী। ‘না’ মানে হাসিনাকে অস্বীকার না করা। ‘না’ মানে ফ্যাসিবাদকে মেনে নেওয়া। ‘না’ মানে আধিপত্যের কাছে মাথা নত করা। ‘না’ মানে জুলাই বিপ্লবের বিরোধিতা। ‘না’ মানে জুলাই সনদকে অস্বীকার করা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্না আরেন্ট বলেছিলেন, ‘স্বৈরতন্ত্র টিকে থাকে জনগণের নীরব সম্মতিতে’। এই নীরবতাই আজ ‘না’।

‘না’ মানে আবু সাঈদকে অস্বীকার করা। স্নিগ্ধকে অস্বীকার করা। ওয়াসিমকে অস্বীকার করা। হাদিকে অস্বীকার করা। যারা রাজপথে প্রাণ দিয়েছে, যারা চোখ হারিয়েছে, যারা পঙ্গু হয়েছে ‘না’ মানে তাদের রক্তকে অস্বীকার করা। এই ‘না’ শুধু একটি শব্দ নয়। এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা। এটি একটি নৈতিক অবস্থান। এটি অকৃতজ্ঞতার ঘোষণা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী চার্লস টিল লিখেছেন, ‘রাষ্ট্র গড়ে ওঠে সংঘর্ষের ভেতর দিয়ে আর ন্যায়বোধ গড়ে ওঠে ত্যাগের স্বীকৃতিতে’। যে রাষ্ট্র তার ত্যাগ স্বীকার করে না, সে রাষ্ট্র নৈতিকভাবে দেউলিয়া। ‘না’ মানে সেই দেউলিয়াত্ব।

‘না’ মানে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন। নতুন নামে। নতুন মুখে। কিন্তু পুরোনো কৌশলে। ‘না’ মানে চাঁদাবাজির ধারাবাহিকতা। দখলবাজির বৈধতা। দলীয় ক্যাডারের অভয়ারণ্য। ‘না’ মানে বিচারহীনতা। ‘না’ মানে ভয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জুয়ান লিন্জ বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের মৃত্যু হঠাৎ হয় না। এটি ঘটে ধীরে। নিয়ম ভেঙে। সংস্কার আটকে দিয়ে। নির্বাচন অর্থহীন করে।’ এই ‘না’ সেই মৃত্যুর পথ।

আর ‘হ্যাঁ’? ‘হ্যাঁ’ মানে নতুন বাংলাদেশ। ‘হ্যাঁ’ মানে পুরোনো ব্যবস্থার মেরামত নয়, নতুন ব্যবস্থার নির্মাণ। ‘হ্যাঁ’ মানে রাষ্ট্রসংস্কার। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। প্রশাসনের জবাবদিহি। ‘হ্যাঁ’ মানে দলীয় গণমাধ্যমের অবসান। মুক্ত সংবাদ। মুক্ত মত। মুক্তচিন্তা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডাল বলেছেন, ‘গণতন্ত্র টিকে থাকে যখন বিরোধী কণ্ঠ ভয় ছাড়া কথা বলতে পারে।’ ‘হ্যাঁ’ মানে সেই সাহস।

‘হ্যাঁ’ মানে বাংলাদেশপন্থা। অন্য কোনো দেশের আধিপত্য নয়। কোনো শক্তির তাঁবেদারি নয়। ‘হ্যাঁ’ মানে নিজের পরিচয়ে দাঁড়ানো। বাংলাদেশি হয়ে ওঠা। কথিত বাঙালি সংস্কৃতির মুখোশ ছিঁড়ে ফেলা। ‘হ্যাঁ’ মানে জুলাই বিপ্লবের স্বপ্ন বাস্তবায়ন। যে স্বপ্নে ছিল ন্যায়। সমতা। মানবিক রাষ্ট্র। ‘হ্যাঁ’ মানে কৃতজ্ঞতা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেফ্রি আলেকজান্ডার বলেন, ‘বিপ্লব তখনই পূর্ণতা পায়, যখন রাষ্ট্র তার নৈতিক দায় স্বীকার করে।’ এই গণভোট সেই দায় স্বীকারের সুযোগ।

‘হ্যাঁ’ মানে জালিমের অবসান। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। ভয়ের রাজনীতির ইতি। ‘হ্যাঁ’ মানে তরুণদের পাশে দাঁড়ানো। তাদের স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়া। তাদের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করা। আজকের তরুণরা নির্বাক নয়। তারা দেখেছে। তারা ভুগেছে। তারা রক্ত দিয়েছে। তাদের কাছে এই গণভোট একটি পরীক্ষা। রাজনৈতিক দলগুলো কি তাদের পাশে দাঁড়াবে? এই প্রশ্নের উত্তর ‘না’ হতে পারে না। কারণ ‘না’ মানে গোলামির জিঞ্জির। আর ‘হ্যাঁ’ মানে মুক্তির প্রথম ধাপ।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে, কোনো সংস্কার উপহার হিসেবে আসে না। এটি আদায় করতে হয়। ভোট দিয়ে। অবস্থানে। এই গণভোট সেই আদায়ের মুহূর্ত। নীরব থাকা মানে পাশে না থাকা। নীরব থাকা মানে অন্যায়ের পক্ষ নেওয়া। নীরব থাকা মানে ইতিহাসের ভুল পাশে দাঁড়ানো। আজ যারা ‘না’ বলছে, তারা হয়তো নিরাপদ থাকতে চায়। কিন্তু ইতিহাস নিরাপদদের মনে রাখে না। ইতিহাস মনে রাখে অবস্থান।

এই গণভোটে অবস্থান পরিষ্কার। কালো আর সাদা। হ্যাঁ আর না। এখানে মাঝামাঝি কিছু নেই। ‘না’ মানে অতীত। ‘হ্যাঁ’ মানে ভবিষ্যৎ। ‘না’ মানে ভয়। ‘হ্যাঁ’ মানে আশা। ‘না’ মানে অবিশ্বাস। ‘হ্যাঁ’ মানে নতুন বাংলাদেশ। পছন্দ এখন জনগণের এবং ইতিহাসের রায়ও।

কারা ‘হ্যাঁ’-এর বিপক্ষে, কেন ‘না’-এর পক্ষে গণভোটের প্রশ্নটি এখন আর জটিল নয়। প্রশ্নটি সোজা। ‘হ্যাঁ’ না ‘না’। তবু কিছু দল ও গোষ্ঠী ‘হ্যাঁ’-এর বিপক্ষে। তারা প্রকাশ্যে না বলে। কেউ নীরবে। কেউ ঘুরিয়ে।

প্রশ্ন হলোÑকেন? তাদের হিসাব কী? তারা কী চায়? এই প্রশ্ন আজ তরুণদের। এই প্রশ্ন আজ দেশের সাধারণ মানুষেরও। কারণ বাংলাদেশে একটি বড় বাস্তবতা আছে। সাড়ে ৪ কোটি তরুণ ভোটার। এই তরুণরা ইতিহাস দেখেছে। ভয় দেখেছে। রক্ত দেখেছে। তারা জানেÑ‘না’ মানে কী। ‘না’ মানে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক। ‘না’ মানে পুরোনো ব্যবস্থার পুনর্বাসন। ‘না’ মানে ক্ষমতার সেই চক্র, যারা রাষ্ট্রকে দল বানিয়েছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্না আরেন্ট বলেছিলেন, ‘স্বৈরতন্ত্র সবচেয়ে বেশি শক্তি পায়, যখন পুরোনো অপরাধীরা নতুন স্বাভাবিকতার মুখোশ পরে।’ এই ‘না’ সেই মুখোশ।

অনেকে মনে করে, ‘না’ বললে ফ্যাসিস্ট শক্তির ভোট পাওয়া যাবে। পালিয়ে যাওয়া ক্ষমতার ছায়া ফিরে আসবে। পুরোনো অর্থনীতি, পুরোনো লুটপাট, পুরোনো দখলÑসব আবার সম্ভব হবে। এটাই কি হিসাব? আরেকটি হিসাব আরো স্পষ্ট। ভারতের আধিপত্য। ‘না’ মানে আবার সেই নির্ভরতা। সেই নতজানু পররাষ্ট্রনীতি। সেই কথিত ‘বন্ধু রাষ্ট্র’ তত্ত্ব, যেখানে বাংলাদেশ নিজের কথা বলতে ভয় পায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিফেন ক্রাসনার বলেছেন, ‘দুর্বল রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব সবচেয়ে আগে ভাঙে যখন তার রাজনৈতিক এলিটরা বাইরের শক্তির সঙ্গে আপস করে।’ এই ‘না’ সেই আপস। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑএটা কি তরুণরা মানবে? তরুণরা কি আবার অধিকারহীন রাষ্ট্র মেনে নেবে? চিন্তার ওপর পাহারা মেনে নেবে? চাঁদাবাজির রাজনীতি মেনে নেবে? উত্তর সোজা। না। কারণ তরুণরা ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে। ‘হ্যাঁ’ মানে সংস্কার। ‘হ্যাঁ’ মানে দলীয় ক্যাডারের শেষ। তরুণরা কোনো দল নয়, তারা একটি বাস্তবতা। একটি জনসংখ্যাগত শক্তি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন বলছেন, ‘যখন সামাজিক পরিবর্তন রাজনৈতিক কাঠামোর চেয়ে দ্রুত হয়, সংঘাত অনিবার্য হয়।’ বাংলাদেশে সেই পরিবর্তনের নাম তরুণসমাজ।

তাহলে যারা ‘না’-এর পক্ষে তারা কেন এই ঝুঁকি নিচ্ছে? এটি কঠিন ও বড় প্রশ্ন এবং বিপজ্জনক। কারণ তারা জানেÑএই ‘না’ জনপ্রিয় নয়। এই ‘না’ নৈতিক নয়। তবু তারা এগোচ্ছে। কারণ ক্ষমতার লোভ বড়। কারণ পুরোনো হিসাব বাঁচাতে হবে। কারণ সংস্কার হলে অনেক মুখোশ খুলে যাবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জুয়ান লিন্‌জ লিখেছেন, ‘সংস্কার সবচেয়ে বেশি ভয় দেখায় তাদের, যারা অতীতে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে।’ এই ভয় থেকেই ‘না’।

তরুণরা এই উত্তর জানে। তারা শুধু জানে নাÑতারা দেখেছে। জুলাই বিপ্লবে তারা দেখেছে, রাষ্ট্র কীভাবে নাগরিকের বিপক্ষে দাঁড়ায়। কীভাবে গুলি চলে। কীভাবে বিচারহীনতা রক্ষা পায়। এই অভিজ্ঞতার পর ‘না’ বলা সহজ নয়। শুধু তরুণরাই জানে না। দেশবাসী সবাই জানে। গ্রাম জানে। শহর জানে। প্রবাস জানে। সবাই জানেÑএই গণভোটে ‘না’ মানে পেছনে ফেরা।

এখানে নিরপেক্ষতা নেই। মাঝামাঝি নেই। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে, গণভোট মানে শুধু মতামত নয়। এটি দায়। রবার্ট ডাল বলেছেন, ‘গণতন্ত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলোÑকে সিদ্ধান্ত নেয় এবং কার স্বার্থে।’ এই গণভোট সেই প্রশ্নের উত্তর। যারা ‘না’-এর পক্ষে, তারা হয়তো ভাবছেÑসময় গেলে সব ভুলে যাবে। কিন্তু তরুণরা ভুলে না। ইতিহাস ভুলে না। এই ‘না’ তাদের কাছে একটি স্পষ্ট সংকেত। কারা রাষ্ট্র চায়। আর কারা ক্ষমতা।

এ কারণেই ‘হ্যাঁ’ এগিয়ে। এ কারণেই ‘না’ পিছিয়ে। নতুন বাংলাদেশ ‘হ্যাঁ’ চায়। আর সেই ‘হ্যাঁ’ আর থামানো যাবে না। থামাতে গেলে প্রতিরোধ হবে। বিপ্লব হবে। আরেকটি জুলাই হবে।

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরুটা কেমন হলো

দরকারি ও অদরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা

পুনরুদ্ধার, উত্থান ও রাজনীতির নতুন মানচিত্র

জামায়াতের উত্থান, নাকি খারাপ ফল

দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ