হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

২৩ ফেব্রুয়ারি

কমডোর জসীম উদ্দীন ভূঁইয়া (অব.)

আজ ২৩ ফেব্রুয়ারি। ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে এই দিনটি এক মহাকাব্যিক বিশ্বাসঘাতকতার সাক্ষী। আট দশক আগে, ১৯৪৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি যে বারুদে অগ্নিসংযোগ হয়েছিল, তার চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটেছিল আজকের এই দিনে। ২০ হাজার তরুণ নৌসেনার সেই অমিত তেজ আর বীরত্ব কেন মাত্র পাঁচ দিনেই স্তিমিত হয়ে গেল? কারণটি কোনো সামরিক পরাজয় ছিল না; বরং তা ছিল তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের দেওয়া মিথ্যা আশ্বাস এবং ছলনা। তারা পরাধীন ভারতের প্রকৃত মুক্তি নয়, বরং ক্ষমতার মসনদে বসার তাড়নায় ব্রিটিশদের সঙ্গে মিলে এক অদম্য বিপ্লবের কণ্ঠরোধ করেছিলেন। আজ ২০২৪-এর পরবর্তী বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আমরা যখন সেই ইতিহাস পাঠ করি, তখন ১৯৪৬-এর নৌবিদ্রোহ আর ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান একই সুতোয় গাঁথা এক সতর্কবার্তা হয়ে ধরা দেয়।

বিদ্রোহের কান্ডারি : এমএস খান ও ১১ জন বীর

১৯৪৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বোম্বের সিগন্যাল প্রশিক্ষণ জাহাজ ঘাঁটি তলওয়ার (Talwar) থেকে যে বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়, তার নেতৃত্বে ছিলেন অকুতোভয় সিগন্যালম্যান এমএস খান। এই বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গটি জ্বালিয়েছিলেন বাঙালি নৌসেনা বিসি দত্ত, যিনি জাহাজের গায়ে ভারত ছাড়ো (Quit India) স্লোগান লিখে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। উল্লেখ্য, ১৯৪২ সালের ঐতিহাসিক ভারত ছাড়ো আন্দোলনের এই কালজয়ী স্লোগানটি মহাত্মা গান্ধী জনপ্রিয় করলেও, এর প্রকৃত উদ্ভাবক ছিলেন কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টির নেতা ও বোম্বাইয়ের তৎকালীন মেয়র ইউসুফ মেহের আলি। মেহের আলির সৃষ্টি করা সেই অদম্য স্লোগানটিই বিসি দত্তের সাহসিকতায় রাজকীয় নৌবাহিনীর ভিত নাড়িয়ে দেয়।

এমএস খানের সভাপতিত্বে গঠিত নেভাল সেন্ট্রাল স্ট্রাইক কমিটির (এনসিএসসি) ১১ জন সদস্যের মধ্যে ছিলেন মদন সিং, আরডি. পুরী, সলিল শ্যাম, ওয়াইকে মেনন, এসসি সেনগুপ্ত, স্কুল মাস্টার নেওয়াজ, সিম্যান আশরাফ খান, এবল স্টোকার গোমেজ এবং মোহাম্মদ হোসেন। বিশেষ করে, বাঙালি নাবিকদের ভূমিকা ছিল অনবদ্য। চিফ পেটি অফিসার শেখ শাহাদাত আলি (CPO Sheikh Shadat Ali) বোম্বেতে এই বিদ্রোহের পেছনে যে অসামান্য সাংগঠনিক শক্তি জুগিয়েছিলেন, তা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অমূল্য সম্পদ। বাঙালিরা শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে নয়, সশস্ত্র বিদ্রোহেও ছিল সম্মুখসারিতে। যেখানে বাঙালি বীর সিপিও শেখ শাহাদাত আলির মতো অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নেতৃত্ব এই আন্দোলনকে সংহত করেছিল। তার সুযোগ্য কন্যা (রাজশাহী গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের অধ্যক্ষ সালমা শাহাদাত) কর্তৃক সংরক্ষিত বাবার ডায়েরির পাতাগুলো আজ আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই বীরত্বগাথা। বিদ্রোহের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল নৌঘাঁটি তলওয়ারের ব্রিটিশ কমান্ডিং অফিসার কমান্ডার এফএম কিং-এর চরম অপমানজনক উক্তি। তিনি ভারতীয় নাবিকদের ‘Sons of coolies and bitches’ বা কুলি আর দুশ্চরিত্রার ছেলেরা বলে গালি দিয়েছিলেন, যা নাবিকদের আত্মসম্মানে আঘাত হানে এবং পরিস্থিতির চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটায়।

জনতার শক্তি : যখন সাধারণ মানুষই হয়ে ওঠে ঢাল

১৯৪৬ সালের নৌবিদ্রোহের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় ছিল সাধারণ মানুষের অভূতপূর্ব সমর্থন। যখন গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে ব্রিটিশরা বিদ্রোহী নাবিকদের না খাইয়ে মারতে চায়, তখন বোম্বের সাধারণ মানুষ, ক্ষুদ্র দোকানদার থেকে শুরু করে গৃহিণীরা, বিপ্লবের হাল ধরেন। গেটওয়ে অব ইন্ডিয়াতে হাজার হাজার মানুষ দুধ, রুটি, ফলমূল এবং তৈরি খাবার নিয়ে ভিড় জমায়। দোকানদাররা দোকান খুলে দিয়ে নাবিকদের বলেছিলেন, ‘আপনাদের যা প্রয়োজন বিনামূল্যে নিয়ে যান।’ এই বিদ্রোহের অন্যতম শক্তি ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। বিদ্রোহীরা মুসলিম লীগ, কংগ্রেস এবং কমিউনিস্ট পার্টির পতাকা একসঙ্গে বেঁধে জাহাজের মাস্তুলে উড়িয়ে স্লোগান দিয়েছিলেন, ‘হিন্দু-মুসলিম এক হ্যায়!’

এই অদম্য সংহতির মুখে বিদ্রোহ দমনে ব্রিটিশ অ্যাডমিরাল জেএইচ গডফ্রে একটি চূড়ান্ত ও নিষ্ঠুর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘নৌবাহিনীকে প্রয়োজনে ধ্বংস করে দেওয়া হবে, এমনকি এতে যদি গোটা ভারতীয় নৌবাহিনী নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, তবু আমরা পিছু হটব না।’ ব্রিটিশদের এই নির্দয় অবস্থানের মুখেও সাধারণ মানুষ বুক পেতে দিয়ে নাবিকদের রক্ষা করতে রাজপথে ভিড় জমিয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বোম্বের প্রায় তিন লাখ শ্রমিক সাধারণ ধর্মঘটে যোগ দেন। তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব বারবার কাজে ফেরার আহ্বান জানানো সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ রাজপথ ছাড়েননি। এই একই চিত্র আমরা দেখেছি ২০২৪ সালের বাংলাদেশে; জনতার অদম্য সংহতিই ছিল উভয় বিপ্লবের প্রধান জ্বালানি।

অহিংসার মিথ্যা বয়ান বনাম ঐতিহাসিক বাস্তবতা

১৯৪৬-৪৭ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর তৎকালীন রাজনীতিকরা সাধারণ মানুষের ওপর একটি কাল্পনিক বয়ান চাপিয়ে দিয়েছিলেন, ‘দে দি হামে আজাদি বিনা খড়গ বিনা ঢাল’ (তলোয়ার বা ঢাল ছাড়াই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি)। এটি ছিল একটি সাজানো নাটক। ১৯৫৬ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলি নিজেই স্বীকার করেছিলেন, ভারতের স্বাধীনতায় গান্ধীজির অহিংস আন্দোলনের ভূমিকা ছিল নগণ্য বা minimal। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজের কার্যক্রম এবং ১৯৪৬-এর নৌবিদ্রোহের ফলে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর আনুগত্য নষ্ট হওয়াই ছিল ব্রিটিশদের তড়িঘড়ি করে ভারত ছাড়ার প্রধান কারণ।

রাজনীতিকরা ব্রিটিশদের সঙ্গে মিলে এই বিদ্রোহ দমন করেছিলেন কারণ, তারা ছিলেন ক্ষমতার মূল সুবিধাভোগী। তারা চেয়েছিলেন একটি শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর, যাতে তাদের শাসনব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ থাকে। মূলত তারা ছিলেন ক্লান্ত ও বয়োবৃদ্ধ নেতা, যারা বিপ্লবের বদলে সমঝোতার মাধ্যমে ক্ষমতা পেতে মরিয়া ছিলেন। এ ও হিউমের প্রতিষ্ঠিত দলটির নেতারা বিপ্লবের মাধ্যমে স্বাধীনতার প্রক্রিয়াকে স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন শুধু গদি দখলের জন্য। তারা ক্ষমতা লাভের নেশায় দেশকে খণ্ডিত করতেও দ্বিধা করেননি।

কেন বিদ্রোহ দমনে মরিয়া ছিলেন তৎকালীন রাজনীতিবিদরা

অ্যাডমিরাল গডফ্রের ধ্বংসাত্মক হুমকির চেয়েও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন আমাদের তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা। প্যাটেল, গান্ধী ও জিন্নাহ কেন এই ধর্মঘট বন্ধ করতে চেয়েছিলেন, তার পেছনে ছিল কিছু রূঢ় রাজনৈতিক কারণ : ১. নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার লোভ : রাজনীতিবিদরা চেয়েছিলেন ক্ষমতা যেন একটি শৃঙ্খলিত উপায়ে তাদের হাতে আসে। তারা ভয় পেয়েছিলেন যে, সশস্ত্র ও সচেতন নাবিকরা যদি এই আন্দোলনে জয়ী হয়, তবে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ সাধারণ মানুষের হাতে চলে যাবে। ২. সেনাবাহিনীর ওপর কর্তৃত্ব হারানো : প্যাটেল মনে করতেন, আজ নৌবাহিনী সফল হলে কাল সেনাবাহিনীও বিদ্রোহ করবে। তারা একটি অনুগত সামরিক বাহিনী চেয়েছিলেন, যা তাদের শাসনকে সুরক্ষা দেবে। ৩. বিপ্লবী চেতনা ও ঐক্য : নাবিকদের অসাম্প্রদায়িক ঐক্য নেতাদের দীর্ঘদিনের বিভাজন ও আপসের রাজনীতিকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছিল।

বিশ্বাসঘাতকতার সেই কালো দিন : ১৯৪৬ বনাম ২০২৪

২৩ ফেব্রুয়ারি যখন ব্রিটিশদের সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, তখন সর্দার প্যাটেল ও মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ নাবিকদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান। প্যাটেল স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ‘কোনো প্রতিহিংসা বা ভিকটিমাইজেশন হবে না।’ নাবিকরা তাদের জাতীয় নেতাদের ওপর বিশ্বাস রেখে অস্ত্র নামিয়েছিলেন। তারা তাদের শেষ বিবৃতিতে বলেছিলেন, ‘আমরা ভারতের কাছে আত্মসমর্পণ করছি, ব্রিটিশদের কাছে নয়।’ কিন্তু আত্মসমর্পণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই নেতারা তাদের মুখ ফিরিয়ে নেন। এমএস খান, শেখ শাহাদাত আলি এবং বিসি দত্তদের মতো বীরদের গ্রেপ্তার করা হয়, কোর্ট-মার্শাল করা হয় এবং চিরতরে চাকরিচ্যুত করা হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হলেও এই বীরদের আর কখনো সেনাবাহিনীতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়নি। নেতাদের সেই প্রতিশ্রুতি ছিল শুধু একটি ঐতিহাসিক প্রতারণা।

এই একই ঘটনার প্রতিচ্ছবি আমরা দেখি ২০২৪-এর বাংলাদেশে। ১৯৪৬-এর বিদ্রোহে ৪০০ জনের মৃত্যু আর ২০২৪-এর বিপ্লবে ১৪০০ শহীদের রক্ত একই কথা বলে, তরুণরা যখন দেশের জন্য রক্ত দেয়, রাজনীতিকরা তখন ক্ষমতার হিসাবনিকাশ করেন। ১৯৪৬-এ নেতারা বেঈমানি করেছিলেন, কিন্তু ২০২৪-এর বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমরা আর সেই বেঈমানি দেখতে চাই না।

ইতিহাসের দায়বদ্ধতা ও সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা

রাজনীতির প্রকৃত শক্তি ক্ষমতায় নয়, মানুষের আস্থা অর্জনে। ক্ষমতা পাওয়া সহজ হলেও বিপ্লবোত্তর জনআকাঙ্ক্ষা ও বিশ্বাস ধরে রাখা কঠিন। ২০২৬-এর নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে সেই সত্য প্রমাণের সুযোগ এনে দিয়েছে। ১৯৪৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারিতে প্যাটেল ও জিন্নাহরা নৌসেনাদের সঙ্গে যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন, ২০২৪-এর বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে তার পুনরাবৃত্তি আর সম্ভব নয়; কারণ এ দেশের সচেতন তরুণ সমাজ এখন যেকোনো রাজনৈতিক ধোঁকাবাজির বিরুদ্ধে অতন্দ্র প্রহরী। ক্ষমতা ফিরে পাওয়া সহজ, কিন্তু মানুষের আস্থা ফিরিয়ে রাখা কঠিন, আর যে শক্তি আস্থাকে মর্যাদা দিতে পারে, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তার দিকেই ঝুঁকে পড়ে; এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির সামনে সেই বিরল সুযোগই দাঁড়িয়ে আছে।

১৯৪৬ সালে তলওয়ার বা তলোয়ার যেমন রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষমতার লোভে নামিয়ে ফেলা হয়েছিল, আজ যেন আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব কোনো অপশক্তির কাছে নত না হয়। ১৯৪৬-এর ১১ জন নেতা, বিসি দত্ত ও শেখ শাহাদাত আলিদের আত্মত্যাগ আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, স্বাধীনতা রক্ষার লড়াইয়ে কোনো আপস চলে না। আসুন, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন এক দেশ গড়ি, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব চিরকাল অক্ষুণ্ণ থাকে। অকুতোভয় শহীদের রক্ত আর বীরদের মর্যাদা যেন কখনো রাজনীতির তাসের গুটিতে পরিণত না হয় এবং আমাদের জলপথ যেন আর কখনোই আমাদের দাসত্বের পথ না হয়ে ধরা দেয় এই ২৩ ফেব্রুয়ারি।

লেখক : সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান ও উপ-উপাচার্য বিইউপি

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরুটা কেমন হলো

দরকারি ও অদরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা

পুনরুদ্ধার, উত্থান ও রাজনীতির নতুন মানচিত্র

জামায়াতের উত্থান, নাকি খারাপ ফল

দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

নতুন বাংলাদেশের কাণ্ডারি তারেক রহমান

নতুন সরকার নতুন প্রধানমন্ত্রী

ডিজিটাল ডেটা নিয়ে নীতিমালা প্রয়োজন

বিএনপির ভূমিধস বিজয় ও ‘হলুদ সিগন্যাল’