হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

অঞ্জন মজুমদার

বাংলাদেশ আজ বৈশ্বিক ও জাতীয় বাস্তবতায় এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে উন্নয়ন আর টিকে থাকার লড়াই একসঙ্গে এগোচ্ছে। একদিকে কর্মসংস্থানের চাপ, নিরাপদ খাদ্যের সংকট ও গ্রামীণ অর্থনীতির স্থবিরতা; অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, পরিবেশ দূষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের অবক্ষয়। দেশের এমন জটিল বাস্তবতায় কৃষি পর্যটন (Agro-Tourism) হতে পারে আগামীর বাংলাদেশের একটি সমন্বিত উন্নয়ন মডেল, যা একযোগে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, খাদ্য ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ, রপ্তানি সম্ভাবনা বৃদ্ধি ও বহুমুখীকরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু অভিযোজনকে বাস্তব রূপ দিতে পারে।

কৃষি পর্যটন শুধু বিনোদননির্ভর পর্যটন নয়; এটি উৎপাদন, ভোগ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত সংযোগ। খামার, মৎস্যঘের, মাছচাষ, ডেইরি, পোলট্রি, চা-বাগান কিংবা গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক জনপদ, পাহাড়ি অঞ্চল, হাওর, বাঁওড়, বিল, ঝিল, সুন্দরবনের অদূরের নদীকেন্দ্রিক মুক্ত কৃষি অঞ্চল, দেশের সর্বউত্তরের টিলাসমৃদ্ধ সবুজ অঞ্চল, রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল, সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি ও সমতলের সংযোগভূমি এবং দেশের বিশাল সমুদ্র উপকূলীয় তটভূমি-এসব স্থান যখন পর্যটনের গন্তব্যে পরিণত হবে, তখন কৃষক আর শুধু উৎপাদক থাকবেন না; তিনি হয়ে উঠবেন উদ্যোক্তা ও সেবাদাতা।

কৃষি পর্যটন মডেলের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পারে সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ও বিপণনব্যবস্থা। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, খামারি এবং কুটিরশিল্পের উদ্যোক্তারা এককভাবে বাজারে টিকে থাকতে পারেন না। কিন্তু সমবায়ের মাধ্যমে যদি কৃষি পর্যটনকেন্দ্র, হোমস্টে (কৃষি পর্যটনকেন্দ্রের নিকটবর্তী এলাকায় কৃষকের বাড়িতে পর্যটকদের জন্য আলাদা থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা), নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং পর্যটনসেবা পরিচালিত হয়, তাহলে ঝুঁকি কমে এবং লাভের ন্যায্য অংশীদারত্ব নিশ্চিত হয়। ইউরোপের ইতালিতে ‘Agriturismo’ মডেল কিংবা জাপানের গ্রামীণ কৃষি সমবায়গুলো এর বাস্তব উদাহরণ, যেখানে কৃষকরা সমবায়ভিত্তিক পর্যটন ও খাদ্য বিপণনের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছেন।

কৃষি পর্যটনকেন্দ্রগুলো সমবায়ের শক্তির সঙ্গে যুক্ত করতে পারে রপ্তানিমুখী কৃষিপণ্য ও খাদ্যপণ্য। কৃষি পর্যটনের মাধ্যমে যে নিরাপদ, ট্রেসেবল ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তা আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যের পণ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পায়। জৈব খাদ্য, ঐতিহ্যবাহী চাল, মধু, দুগ্ধজাত পণ্য, দেশি মৌসুমি ফল, উচ্চমূল্যের সবজি, শুকনো মাছ কিংবা প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যÑসবই পর্যটনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ‘বাংলাদেশ ব্র্যান্ড’ হিসেবে রপ্তানির সুযোগ তৈরি করতে পারে। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম কৃষি পর্যটনের মাধ্যমে স্থানীয় পণ্যকে বৈশ্বিক বাজারে পরিচিত করেছে, যা বাংলাদেশও অনুসরণ করতে পারে।

কৃষি পর্যটন মডেলের সঙ্গে যুক্ত সমগ্রব্য বস্থাকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন সার্কুলার ইকোনমি ও গ্রিন ইকোনমির বাস্তব প্রয়োগ। কৃষি পর্যটন এলাকায় বর্জ্য আর বর্জ্য থাকে না; তা সম্পদে পরিণত হয়। খামারের গোবর থেকে বায়োগ্যাস ও জৈব সার, কৃষি অবশিষ্টাংশ থেকে কম্পোস্ট এবং পশুখাদ্য, পর্যটন স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ-এসব মিলিয়ে একটি পরিবেশবান্ধব উৎপাদনচক্র গড়ে ওঠে। নেদারল্যান্ডসের গ্রিন ফার্মিং কিংবা ডেনমার্কের সার্কুলার অ্যাগ্রিকালচার মডেল দেখিয়েছে, কীভাবে কৃষি ও পর্যটন একসঙ্গে পরিবেশের ওপর চাপ কমাতে পারে।

বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে কৃষি পর্যটন হতে পারে গ্রামীণ জনপদভিত্তিক স্টার্টআপ উন্নয়নের প্ল্যাটফর্ম বা ইনকিউবেশন হাব। শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তারা কৃষিপ্রযুক্তি, ডিজিটাল বুকিং ও সরবরাহ, স্মার্ট ফার্মিং, স্থানীয় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ইকো-ট্যুর গাইডিং, হস্তশিল্প ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ নিয়ে নতুন ব্যবসা গড়ে তুলতে পারেন। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে গ্রাম থেকেই তৈরি হবে নতুন উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থান। ভারতের কেরালা বা কর্ণাটকে গ্রামীণ অ্যাগ্রো-স্টার্টআপগুলো দেখিয়েছে, কীভাবে পর্যটন ও কৃষিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় যুবসমাজকে গ্রামেই সফল উদ্যোক্তা হিসেবে ধরে রাখা যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কৃষি পর্যটন জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের একটি কার্যকর কৌশল হতে পারে। বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। খরা, বন্যা, লবণাক্ততা ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব মোকাবিলায় বৈচিত্র্যময় আয়ের উৎস জরুরি। কৃষি পর্যটন কৃষকের আয়ের ঝুঁকি কমায়, কারণ এতে শুধু ফসলের ওপর নির্ভরতা থাকে না। হাওর, চর ও উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, মৎস্য ও পর্যটন একত্রে পরিচালিত হলে অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ে। ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের উপকূলীয় কৃষি পর্যটন প্রকল্পগুলো জলবায়ু-সহনশীল জীবিকার সফল উদাহরণ।

এ ছাড়া কৃষি পর্যটন শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির একটি শক্তিশালী মাধ্যম। নগরবাসী ও শিক্ষার্থীরা, বিশেষত স্কুলগামী শিশুরা, যখন সরাসরি খামার দেখে এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতি শেখে, তখন জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার বার্তা ছোটবেলা থেকেই বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তাদের মনোজগতে গেঁথে যায়। কৃষি পর্যটন মডেল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দায়িত্বশীল ভোক্তা ও নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করে।

তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, অর্থের জোগান ও উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি। কৃষি, পর্যটন, সমবায়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, পরিকল্পনা, অর্থ, স্থানীয় সরকার, পরিবেশ ও যুব উন্নয়ন-এই খাতগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি। সহজ ঋণ, সমবায়বান্ধব নীতি, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কৃষি পর্যটন কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাবে না।

বর্তমান কৃষি পর্যটনের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা বলছে, কৃষি পর্যটন বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি নতুন পর্যটন ধারণা নয়; এটি হতে পারে সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যম, রপ্তানি সম্প্রসারণকে বহুমাত্রিক করার হাতিয়ার, সার্কুলার ও গ্রিন ইকোনমি বাস্তবায়নের পথ এবং জলবায়ু অভিযোজনের সমন্বিত উন্নয়ন কৌশল। গ্রাম যদি শক্তিশালী হয়, তবে দেশও শক্তিশালী হবে। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষি পর্যটন আগামীর বাংলাদেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই ও আত্মনির্ভর উন্নয়ন মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

লেখক : পোলট্রি প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন স্পেশালিস্ট

কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বাংলাদেশের বন্ধু

সার্ক কি বেঁচে আছে?

সকালে আলোর ঝলক, দিনটাই মেঘমুক্ত হোক

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও অবরুদ্ধ স্বকীয়তা

‘মুখের ভাষা’ কেড়ে নেওয়ার আধুনিক মানচিত্র

পশ্চিম তীরে ভূমি অধিগ্রহণ জর্ডানের জন্য সরাসরি হুমকি

গোলাপের সৌন্দর্য খুশবুতে শাসকের সৌন্দর্য সুশাসনে

গণতান্ত্রিক যাত্রায় প্রয়োজন ছায়া মন্ত্রিসভা

‘কেনু উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গে ইসলামপন্থিরা ভোট পেল; ছ্যা ছ্যা ছ্যা’

চাই ইনসাফের বাংলাদেশ