যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল দেশটির সীমানা ছাড়িয়ে বাইরেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায় দুই বছর ধরে কয়েক দশকের মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকে উল্টে দিয়েছেন, যার ফলে দেশটির মিত্র ও প্রতিপক্ষ উভয়ই অস্বস্তিতে পড়েছে। নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর তিনি এখন বিদেশে কী ধরনের পদক্ষেপ নেন, তা দেখার জন্য সবাই তাকিয়ে আছে।
ইরান, ইসরাইল ও ইউক্রেনের ক্ষেত্রে বিষয়টি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে কোনো চুক্তির পথে হাঁটবেন নাকি যুদ্ধের দিকে ঝুঁকবেন, ইসরাইলের প্রতি ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের সমর্থন কতটা দুর্বল হবে এবং রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের শর্ত মেনে নেওয়ার জন্য তিনি ইউক্রেনকে কতটা চাপ দেবেন, তা নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে।
ট্রাম্পকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য ডেমোক্র্যাটদের হাতে এখন নতুন অস্ত্র থাকবে। এই পরিস্থিতিতে তিনি কি ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতার পথে হাঁটবেন, নাকি নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকবেন, তা বড় প্রশ্ন। কিন্তু ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোয় এই নির্বাচনের প্রভাব কীভাবে পড়বে, তা এখনো অস্পষ্ট।
ইরান উল্লসিত, কিন্তু শান্তির নিশ্চয়তা নেই
ফক্স নিউজের সঙ্গে এক ফোনালাপে ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের কিছুটা ভূমিকা আছে। অন্যদিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স আরো স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘ইরান যুদ্ধের কারণেই আমরা হেরেছি।’ মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর ট্রাম্পের এমন স্বীকারোক্তিতে ইরান আনন্দিত, তবে একই সঙ্গে তারা পরবর্তী পরিস্থিতির জন্যও প্রস্তুতি নিচ্ছে; কারণ বড় ধরনের নতুন মার্কিন হামলা শুরু হতে পারে, অথবা নতুন চুক্তির প্রস্তাব আসতে পারে। তবে ইরান ওয়াশিংটনের নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের আশা করছে না। সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, যারা মনে করেন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তন আনবে, তারা ‘মারাত্মক ভুল’ করছেন। এর প্রমাণ হিসেবে মার্কিন বাহিনী এরই মধ্যে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানে।
আমেরিকার ভোটারদের ট্রাম্পের যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর লক্ষ্যে আট মাস ধরে ইরান এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্রগুলোয় আঘাত হেনেছে। এখন রিপাবলিকানদের পরাজয়কে তারা যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনগণের রায় হিসেবে দেখছে। ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, যুদ্ধের কারণে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি নির্বাচনি ফলে ভূমিকা রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের শান্তি আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ তার ‘এক্স’ অ্যাকাউন্টে লিখেছেন—‘যদি মার্কিন সরকার আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষক ও ব্ল্যাকমেইলারদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে নিজেদের জনগণের ইচ্ছার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তবে তারা বড় ভুল করবে।’
তেহরান এরই মধ্যে সতর্ক করে বলেছে, এবার তারা যে প্রতিশোধ নেবে, তার পরিধি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত হবে। গত সপ্তাহে ট্রাম্প কয়েকজন সাংবাদিককে বলেছেন, তিনি ইরানের ওপর বড় ধরনের হামলা চালানোর কথা ভাবছেন; আবার অন্য সাংবাদিকদের বলেছেন, আপাতত সংঘাত বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা তার নেই।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আলী ভায়েজ সিএনএন’কে বলেন, ‘ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য গলার কাঁটার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে তার সামনে দুটি কঠিন পথ খোলা রয়েছে—হয় সম্মানজনক কোনো সমঝোতায় পৌঁছে বিজয় ঘোষণা করা, অথবা সামরিক পদক্ষেপ জোরদার করে আবার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করা। ভয়ের বিষয় হলো, নির্বাচনে দুর্বল হয়ে পড়া কোনো প্রেসিডেন্ট হয়তো যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের ইমেজ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে পারেন।’
অন্যদিকে কূটনীতির পথও খোলা আছে। গ্রীষ্মকালে স্থবির হয়ে পড়া শান্তি আলোচনা গত সপ্তাহে আবার গতি পেয়েছে। ইরান কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের কাছে প্রতিনিধি পাঠিয়েছে, যারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে। নির্বাচনের আগে ইরান প্রস্তাব দিয়েছিল, ট্রাম্প তাদের সাতটি শর্ত মেনে নিলে তারা দুদিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে।
ট্রাম্পের একটি কূটনৈতিক জয়ের প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু তিনি নিজেকে দুর্বল হিসেবে দেখাতে চাইছেন না। অন্যদিকে ট্রাম্পের এই বিপর্যয়কে তেহরান আরো বেশি ছাড় আদায়ের সুযোগ হিসেবে দেখতে পারে। ভাকিলের মতে, সামরিক হুমকির পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতা আরো জোরদার হতে পারে। এ ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালি নিয়ে একটি সামগ্রিক চুক্তির চেয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা হওয়ার বিষয়টি অনেক বেশি বাস্তবসম্মত।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্কে ‘একটি যুগের অবসান’
নির্বাচনের দিন ট্রাম্প ইসরাইলে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ার আকস্মিক যে ঘোষণা দেন, তা ছিল প্রথম বড় চমক। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে, যাকে অনেকে ‘ব্লু সুনামি’ বা ‘নীল সুনামি’ হিসেবে অভিহিত করছেন। নির্বাচনের ফলাফল ও ট্রাম্পের ঘোষণা ইসরাইলের নেতাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলেরই ইসরাইলের প্রতি সমর্থন ক্রমেই কমে আসছিল। গাজায় গণহত্যার ঘটনায় ডেমোক্র্যাটরা ক্ষুব্ধ। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের একটি বড় অংশ মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সহায়তা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরাইলের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল ওরেন সিএনএন’কে বলেন, ‘বর্তমানে একমাত্র যে বিষয়টি নিয়ে উভয় দলের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে, তা হলো ইসরাইলের সমালোচনা করা। এটি ডেমোক্রেটিক পার্টির একটি মূলনীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর রিপাবলিকান পার্টির বড় একটি অংশের মধ্যেও এটি প্রধান নীতি হিসেবে গড়ে উঠছে।’ ওরেনের মতে, মার্কিন সহায়তা বন্ধ হওয়ার বিষয়টি কেবল একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার শুরু মাত্র, যা সবেমাত্র দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।
তার মতে, এমনটা হওয়া সম্ভব যে, যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বন্ধ করে দিতে পারে এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ব্যবস্থা, যেমন ‘আয়রন ডোম’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার যৌথ উন্নয়ন কার্যক্রমও স্থগিত করতে পারে। তিনি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ‘রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক উভয় দলের প্রেসিডেন্টরাই নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো প্রয়োগ করে ইসরাইলকে সুরক্ষা দিয়ে এসেছেন। কিন্তু এখন আমরা একটি যুগের সমাপ্তিলগ্নে এসে পৌঁছেছি।’
জেরুসালেম পোস্টের সাবেক প্রধান সম্পাদক ইয়াকভ কাটজ ‘এক্স’ প্ল্যাটফর্মে সতর্ক করে বলেছেন, ‘আরো অনেক কিছু ঘটতে বাকি। সামরিক সহায়তা নিয়ে ট্রাম্প যা বলেছেন, তা কেবল সম্ভাব্য পরিবর্তনের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। অস্ত্র বিক্রি বন্ধ হতে পারে, নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব আসতে পারে এবং যৌথ অর্থনৈতিক কর্মসূচিগুলোর তহবিল প্রত্যাহার করা হতে পারে।’
ইরান যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলবিরোধী মনোভাব আরো তীব্র হয়েছে। মার্কিন ভোটারদের একটি অংশ মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলা ছিল মূলত নেতানিয়াহুর প্ররোচনায় ট্রাম্পের শুরু করা একটি যুদ্ধ। এমনকি এখনো নেতানিয়াহু ইরানের ওপর আবার হামলা চালানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন। এটি এমন এক যুদ্ধের আগুন আবার জ্বালিয়ে দিতে পারে, যা অতীতে জ্বালানির দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং তা মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেতানিয়াহু নিজেও নির্বাচনে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন।
ট্রাম্প-পরবর্তী বিশ্বের দিকে তাকিয়ে ইউক্রেন
কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটেছে। ট্রাম্প জেলেনস্কিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি তুলেছেন। তিনি রাশিয়ার সুবিধার্থে জ্বালানি চুক্তির দিকে ঝুঁকেছেন এবং প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইউক্রেনের যে নির্ভরশীলতা ছিল, তা রহস্যজনকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ইউক্রেন ট্রাম্প-পরবর্তী বিশ্বের জন্য অপেক্ষা করার নীতি গ্রহণ করেছে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর এই নির্বাচন নিয়ে ইউক্রেন খুব কমই আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেছে।
জেলেনস্কির দপ্তরের একজন প্রতিনিধি সের্গি কিসলিতিসয়া ইউক্রেনের টেলিভিশনে প্রচারিত এক বক্তব্যে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় যারাই থাকুক, ইউক্রেন তাদের সঙ্গে ‘প্রকৃত, স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল সম্পর্ক’ বজায় রাখার চেষ্টা করবে। একই সঙ্গে তারা ‘প্যাট্রিয়ট’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহের চেষ্টা অব্যাহত রাখবে এবং নতুন কংগ্রেসের পাশাপাশি সম্ভাব্য বিভিন্ন নির্বাহী আদেশের জটিল পরিস্থিতির মধ্যে নিজেদের অবস্থান বজায় রাখার কৌশল নেবে।
তবে এটি এখন স্পষ্ট, ট্রাম্পের ক্ষমতার মেয়াদ ফুরিয়ে আসার বিষয়টি ইউক্রেনের অনুকূলে যাচ্ছে। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠা করা খুব সহজ; অথচ তিনি ইউক্রেনকে শাস্তি দিয়েছিলেন, কারণ তারা আক্রমণকারী রাশিয়ার দাবি মেনে নিতে রাজি হয়নি। তিনি জেলেনস্কিকে অপমান ও তিরস্কার করেছেন, আবার কখনো কখনো সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টাও করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ইউক্রেনের এখনো অস্ত্র, অর্থ এবং তাদের পাশে থাকার নিশ্চয়তাসহ অনেক কিছুই পাওয়ার আছে। কিন্তু কয়েক মাস ধরে ট্রাম্পের বৈরী আচরণের পর দেশটি বুঝে গেছে, ওয়াশিংটনের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা সম্ভব নয়।
সিএনএন অবলম্বনে মোতালেব জামালী