হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ডিজিটাল পর্দার ফাঁদে শিশু : সংকট ও করণীয়

শাকুল হাসান

স্মার্টফোন, ট্যাব, টেলিভিশন আর সর্বক্ষণের ইন্টারনেট সংযোগ আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। প্রশ্ন হলো—এই যন্ত্রগুলো কি আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছে, নাকি ধীরে ধীরে গ্রাস করছে?

আসক্তি মানে শুধু কোনো কিছু ‘বেশি’ করা নয়। আসক্তি হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে কোনো অভ্যাসের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা হয়—সেটি ছাড়া স্বাভাবিক থাকা কঠিন হয়ে পড়ে এবং ক্ষতি করছে জেনেও তা থামানো যায় না।

শিশুদের ক্ষেত্রে আসক্তির রূপটা নাটকীয় নয়, কিন্তু লক্ষণগুলো চেনা সহজ। একটি শিশু ডিভাইসে আসক্ত কি না, তা বোঝার অনেক লক্ষণ আছে। যেমন : ডিভাইসটি কেড়ে নিলে সে অস্বাভাবিক আচরণ করে কিংবা কান্নাকাটি করে। পড়াশোনা, খেলা, খাওয়া বা ঘুমের চেয়ে স্ক্রিনকে বেশি গুরুত্ব দেয়। স্ক্রিন ছাড়া সময় কাটাতে পারে না। স্ক্রিনের জন্য মিথ্যা বলা বা লুকিয়ে ব্যবহার করা শুরু করে।

এই লক্ষণগুলো একসঙ্গে দেখা দিলে বুঝতে হবে, অভ্যাসটি আর নিছক বিনোদনের সীমায় নেই—এটি নির্ভরতায় রূপ নিয়েছে।

গবেষণায় বাংলাদেশের চিত্র

আইসিডিডিআর,বি ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার ছয়টি স্কুলের (তিনটি বাংলা ও তিনটি ইংরেজি মাধ্যম) ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সি ৪২০ শিশুর ওপর একটি গবেষণা পরিচালনা করে, যার ফল সম্প্রতি জার্নাল অব মেডিকেল ইন্টারনেট রিসার্চ (জেএমআইআর) হিউম্যান ফ্যাক্টরসে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে যে ফল উঠে এসেছে, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। এতে বলা হয় ঢাকার শিশুরা গড়ে দিনে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা—স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ট্যাব অথবা গেমিং ডিভাইসে কাটায়। প্রতি পাঁচজনের মধ্যে চারজন প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহার করে, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রায় দুই ঘণ্টার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি শিশু চোখের সমস্যায় এবং প্রায় ৮০ শতাংশ শিশু ঘন ঘন মাথাব্যথায় ভুগছে। যারা দিনে দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তারা গড়ে মাত্র ৭ দশমিক ৩ ঘণ্টা ঘুমায়—অথচ এ বয়সে মস্তিষ্কের সুস্থ বিকাশের জন্য দরকার ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুম। প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার শিকার আর অতিরিক্ত ব্যবহারকারীদের মধ্যে এই হার সবচেয়ে বেশি। প্রতি পাঁচজনের মধ্যে প্রায় দুজন শিশু দুশ্চিন্তা, অতি-চঞ্চলতা বা আচরণগত সমস্যার মতো এক বা একাধিক মানসিক স্বাস্থ্য-সমস্যায় ভুগছে।

ডিভাইস আসক্ত শিশুদের স্ক্রিনের আলো ঘুমচক্র ব্যাহত করে। দীর্ঘ বসে থাকায় স্থূলতা, চোখে চাপ, মাথাব্যথা ও দৃষ্টিশক্তি দুর্বল করে। মনোযোগ ও স্মরণশক্তি কমে; পরীক্ষার ফলে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

ঘুমের ঘাটতিতে আবেগ নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হয়; সরাসরি মেলামেশা কমায় সহানুভূতির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, মেজাজ খিটখিটে হয়, অনলাইন বুলিং ও আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা দেয়।

ইউনিসেফের ‘চাইল্ডহুড ইন আ ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড’ প্রতিবেদন অনুযায়ী শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করে অনলাইন যৌন নিপীড়ন ও সাইবার বুলিং । এর ফলে শিশুদের মধ্যে উদ্বেগ, আত্মঘাতী চিন্তা ও নিজেকে আঘাত করার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

বিভিন্ন দেশ থেকে ওয়েবসাইট ভিজিট নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান ‘সেমরাশ’—বাংলাদেশ থেকে দেখা সবচেয়ে বেশি ওয়েবসাইটের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। এই তালিকায় রয়েছে প্রাপ্তবয়স্কদের ও জুয়ার ওয়েবসাইট। এর শিকার হচ্ছে শিশুরাও।

কীভাবে এই আসক্তি কমানো যাবে

প্রযুক্তি পুরোপুরি বন্ধ করা সমাধান নয়—কারণ আজকের পৃথিবী হলো প্রযুক্তির, বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির পৃথিবী; সেখানে প্রযুক্তিকে দূরে সরিয়ে রাখা বাস্তবসম্মতও নয়, কাম্যও নয়।

এই আসক্তি কমাতে আমাদের লক্ষ্য হওয়া দরকার শিশুদের মধ্যে একটি স্বাস্থ্যকর, ভারসাম্যপূর্ণ ও উপযুক্ত ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তোলা। ডিজিটাল আসক্তি কমানো একার কারো কাজ নয়—এটি একটি সমন্বিত উদ্যোগ। পরিবার সীমা টানবে, ছাত্র সচেতন হবে, স্কুল-শিক্ষক বিকল্প ও নিরাপত্তা শেখাবে, প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপদ পরিবেশ গড়বে আর সরকার আইননীতি-অবকাঠামো দিয়ে পুরো কাঠামোটা ধরে রাখবে।

এই পৃথিবীতে কোনো শিশুর আচরণ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার অভিভাবকদের হাতেই থাকে। শিশুরা যা শোনে, তার চেয়ে বেশি অনুসরণ করে, যা তারা সামনে দেখে। তাই তাদের সামনে নিজে আদর্শ হন । নিষেধাজ্ঞা নয়, আলোচনা করুন। ভালোমন্দ বুঝিয়ে বলুন।

ছোট শিশুকে শান্ত করতে ফোন নয়; বরং তার সঙ্গে খেলাধুলা, গল্প করুন, বাইরে ঘুরতে যান।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও ঢেলে সাজাতে হবে শিশু-কিশোরদের ডিভাইস আসক্তি ও তার খারাপ প্রভাব থেকে রক্ষায়। সরকারকে নীতিমালা করতে হবে সারা বিশ্ব থেকে অবাধে আসা ইন্টারন্টে কনটেন্ট প্রতিরোধ বিষয়ে।

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ

তিস্তায় বন্ধুত্বের হাত চীনের

অভ্যন্তরীণ অভিবাসন : সংকটে নগর অবকাঠামো

ড. ইউনূস ‘ভিলেন’ নাকি ‘ক্রান্তিকালীন নায়ক’

গণতন্ত্রের ভূত-ভবিষ্যৎ

ঘোষক বিতর্ক এবং ইন্দিরা গান্ধী

সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন ও জাতীয় নিরাপত্তা

মর্ম্মময় মহররম

প্রেমময় পদ্য বনাম জাতীয় প্রতিরক্ষার গদ্য

ফারাক্কা থেকে ফেনী : নদী আগ্রাসন ও সমাধান

আখতার-উল-আলম : জাতীয় চেতনার অগ্রসেনানী