প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মাঝেমধ্যেই বলেন, যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘খুব ভালো আলোচনা’ চলছে। কিন্তু এ কথা বলার দু-এক দিন পরই তিনি আবার ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের হুমকি দেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ট্রাম্পের এমন দ্বিমুখী আচরণের কারণে প্রশ্ন উঠেছে, তিনি আসলেই ইরান যুদ্ধ বন্ধ করতে চান কি না। যদি চান, তবে কোন শর্তে? আর সেই শর্ত নির্ধারণের প্রকৃত ক্ষমতা তার আছে, নাকি অন্য কারো হাতে?
তাত্ত্বিকভাবে এর উত্তর খুব সহজ। আমেরিকান স্বার্থের ভিত্তিতেই প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধ একটি নতুন রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করে। যারা প্রাথমিক সামরিক অভিযান সমর্থন করেছিল, যেসব মিত্রদেশের লক্ষ্য অনেক ব্যাপক, গণমাধ্যম, রাজনৈতিক অনুদানদাতা এবং প্রভাব বিস্তারের প্রচারণায় যুক্ত গোষ্ঠী—এরা সবাই যুদ্ধে ‘জয়’-এর সংজ্ঞা নির্ধারণে নিজেদের স্বার্থ বা অবস্থান যুক্ত করে ফেলে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে. ডি. ভ্যান্সের সাম্প্রতিক একটি মন্তব্য এই সমস্যাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। ভ্যান্স বলেন, ইসরাইল সরকারের ভেতরের কিছু ব্যক্তি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানে সহায়তা করতে পারে, এমন একটি চুক্তির বিরুদ্ধে আমেরিকান জনমত গঠনের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি স্বীকার করেন, বন্ধুত্বপূর্ণ ও বৈরী—উভয় ধরনের সরকারই নিয়মিত ওয়াশিংটনের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে থাকে। তার মতে, আসল বিপদটি তখনই শুরু হয়, যখন এই চেষ্টাগুলোর কারণে আমেরিকার স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের রাজনৈতিক মূল্য বা ঝুঁকি বেড়ে যায়।
ইরানে হামলা শুরুর সময় রিপাবলিকানদের একটি অংশ আমেরিকান শক্তির এই প্রদর্শনীকে স্বাগত জানিয়েছিল। ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন ঠেকানো, প্রতিরোধক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং ওয়াশিংটনের দৃঢ় সংকল্পের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো—এগুলোকে স্পষ্ট লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসন যখন সংঘাত সীমিত করা এবং কূটনৈতিক আলোচনার পথ আবার খোলার দিকে অগ্রসর হলো, তখন আলোচনার ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেল। হঠাৎ করেই সংযমকে দুর্বলতা, আলোচনাকে নতিস্বীকার এবং সীমিত ফলাফলকে আত্মসমর্পণ হিসেবে আখ্যায়িত করা শুরু হলো।
যুদ্ধ শুরু করা এবং শেষ করার মধ্যকার পার্থক্যটি এখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সামরিক অভিযান শুরুর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও কেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়। প্রেসিডেন্ট আদেশ দেন, সেনাবাহিনী আক্রমণ করে এবং মিত্ররা সেই পদক্ষেপের সমর্থনে এগিয়ে আসে। অন্যদিকে, যুদ্ধ শেষ করার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, মূল লক্ষ্যের কতটা অর্জিত হয়েছে এবং অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে আর কতটা অর্জন করা সম্ভব। ঠিক তখনই সংঘাত দীর্ঘায়িত করতে আগ্রহী পক্ষগুলো ‘জয়’-এর সংজ্ঞাকে আরো বিস্তৃত করে ফেলতে পারে।
যদি মূল লক্ষ্য হয়ে থাকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকানো, তবে তার সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রক্সি শক্তি বা অন্যান্য আঞ্চলিক উদ্বেগের বিষয়গুলোও যুক্ত হতে পারে। সীমিত উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু হওয়া একটি যুদ্ধের সঙ্গে ধীরে ধীরে এমন সব লক্ষ্য যুক্ত হতে পারে, যার সব কটি একসঙ্গে পূরণ করা সম্ভব নয়।
‘ফরেন এজেন্টস রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট’-এর আওতায় জমা দেওয়া সরকারি নথিপত্র থেকে জানা যায়, ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারণার সাবেক ব্যবস্থাপক ব্র্যাড পারস্কেলের নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠান ‘ক্লক টাওয়ার এক্স’ ইসরাইলের হয়ে ‘হাভাস মিডিয়া জার্মানি’র মাধ্যমে কৌশলগত যোগাযোগ ও গণমাধ্যম-সংক্রান্ত সেবা প্রদান করে। এ কাজের অন্তর্ভুক্ত ছিল দর্শক বা শ্রোতাগোষ্ঠী নিয়ে গবেষণা, তরুণ আমেরিকানদের কাছে পৌঁছানো, নির্দিষ্ট বয়ান তৈরি করা, প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র চিহ্নিত করা এবং ব্যাপক প্রভাব ফেলতে সক্ষম ব্যক্তিদের ও প্রচারের মাধ্যমগুলোকে খুঁজে বের করা। পরবর্তী নথিপত্রগুলোতে ডিজিটাল প্রচারণায় লাখ লাখ ডলার ব্যয়ের কথা এবং বিপুলসংখ্যক আমেরিকান দর্শকের কাছে পৌঁছানোর এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রচেষ্টার বিবরণ পাওয়া যায়।
তবে ভ্যান্স যে দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন, তা প্রত্যাখ্যান করে পারস্কেল বলেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা বানচাল করার উদ্দেশ্যে ইসরাইল তাকে নিয়োগ দেয়নি। তবে এতে মূল বিষয়টি আড়াল হয়ে যায় না। আধুনিক রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রক্রিয়া সচরাচর সরাসরি নির্দেশের মাধ্যমে কাজ করে না; এর আসল শক্তি নিহিত থাকে মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকায়।
কোনো দেশের দূতাবাস যখন একটি যুক্তি বা বক্তব্য তুলে ধরে, তখন আমেরিকানরা জানেন যে, তারা আসলে ওই দেশের সরকারের অবস্থানই শুনছেন। কিন্তু একই বক্তব্য বা বয়ান যখন কোনো আমেরিকান রাজনৈতিক পরামর্শক, রক্ষণশীল সম্প্রচারকারী, ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) প্রচারণার মতাদর্শের অনুসারী কোনো ইনফ্লুয়েন্সার কিংবা দেশের কোনো সংগঠনের মাধ্যমে প্রচারিত হয়, তখন তা আমেরিকানদের নিজস্ব মতামতেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে শুধু এটুকু বলাই যথেষ্ট নয় যে, ‘মিত্রদেশগুলোর নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার অধিকার রয়েছে’। ইসরাইলের যেমন নিজস্ব নিরাপত্তাস্বার্থ নির্ধারণের অধিকার আছে, যুক্তরাষ্ট্রেরও তেমনি সেই অধিকার আছে। সমস্যাটি তখনই তৈরি হয়, যখন কোনো মিত্রদেশের পছন্দ বা অগ্রাধিকার আমেরিকান রাজনৈতিক অঙ্গনে এতটাই গভীরভাবে গেঁথে যায়, সেগুলোর বিরোধিতা করতে গেলে আমেরিকান কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মাশুল গুনতে হয়।
ইরানের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ওয়াশিংটন ও জেরুজালেমের স্বার্থ সব পর্যায়ে হুবহু এক নাও হতে পারে। ইসরাইল হয়তো মনে করে, অব্যাহত সামরিক চাপই তাদের নিরাপত্তাঝুঁকি কমানোর সর্বোত্তম উপায়। কিন্তু মার্কিন সরকারকে আরো ব্যাপক বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। যেমন—মার্কিন সেনাদের ঝুঁকি, জ্বালানির দাম, সামরিক প্রস্তুতি, অর্থনৈতিক ব্যয়, বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা এবং নতুন করে হামলা চালালে রাজনৈতিকভাবে আসলে কী অর্জন করা সম্ভব, তা ভাবতে হয়।
মতের অমিল সহ্য করতে না পারলে কোনো জোটের কার্যকারিতা থাকে না। মিত্রদেশের পছন্দসই নীতির চেয়ে ভিন্ন কোনো অবস্থান নিলেই যদি তাকে বিশ্বাসঘাতকতা, দুর্বলতা বা তোষণনীতি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, তবে সেই সম্পর্ক আর দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যকার পারস্পরিক আলোচনার পর্যায়ে থাকে না। তখন একপক্ষ অন্যপক্ষের সিদ্ধান্তের কারণে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মূল্য বা ক্ষতির বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবিত করতে শুরু করে।
ঠিক এখানেই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি প্রকৃত পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। এই স্লোগানের অর্থ যদি শুধু এটাই হয়, একজন প্রেসিডেন্ট স্বাধীনভাবে মার্কিন সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে পারেন, তবে তা জাতীয় স্বাধীনতার এক সংকীর্ণ সংজ্ঞাই তুলে ধরে। প্রেসিডেন্ট যখন বলতে চান, ‘যথেষ্ট হয়েছে’, বা যুদ্ধ থামানোর সিদ্ধান্ত নেন, তখন কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। যুদ্ধ শুরু করার চেয়ে তা শেষ করার জন্য অনেক সময় বেশি রাজনৈতিক সাহসের প্রয়োজন হয়। কারণ, যুদ্ধ থামানোর অর্থ হলো এমন সব পক্ষের মুখোমুখি হওয়া, যারা লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে সবসময়ই নতুন কোনো লক্ষ্য বা কারণ দাঁড় করাতে সক্ষম।
বিদেশি মিত্ররা যদি অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে জনমত গড়ে তোলে এবং একই সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার রাজনৈতিক বা অন্য কোনো মূল্য বাড়িয়ে দেয়, তখন যুক্তরাষ্ট্র আর স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির দাবি করতে পারে না। এর অর্থ অবশ্য জোট ত্যাগ করা বা ইসরাইলের নিরাপত্তা-উদ্বেগকে উপেক্ষা করা নয়। বরং এর অর্থ হলো, মার্কিন কোনো যুদ্ধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্তভাবে ওয়াশিংটনকেই নিতে হবে এবং তা হতে হবে নিজেদের স্বার্থ ও হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে।
এ কারণেই বিদেশি প্রভাব বিস্তারের প্রচারণার ক্ষেত্রে আর্থিক স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ। কোন রাজনৈতিক বার্তাগুলো অভ্যন্তরীণ বিতর্কের ফসল আর কোনগুলো কোনো বিদেশি সরকারের অর্থ ও কৌশলগত পরিকল্পনার মাধ্যমে জোরদার করা হয়েছে, তা জানার অধিকার মার্কিন জনগণের আছে। ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের নতুন করে আলোচনা শুরুর বিষয়টি এ প্রসঙ্গটিকে জরুরি করে তুলেছে। যদি কোনো সমঝোতা সম্ভবও হয়, তবে কট্টরপন্থিরা যুক্তি দেবেন যে, এখনো কিছু অমীমাংসিত হুমকি রয়েছে।
তাদের সেই যুক্তি হয়তো সঠিক। কারণ, কোনো যুদ্ধই এমনভাবে শেষ হয় না, যেখানে সব ধরনের হুমকির সম্পূর্ণ অবসান ঘটে। আসল প্রশ্নটি হলো, অবশিষ্ট হুমকিগুলো দূর করতে যুক্তরাষ্ট্রকে যে মূল্য দিতে হবে, তা সেই হুমকি দূর করার প্রকৃত গুরুত্বের চেয়ে বেশি কি না। একজন প্রেসিডেন্ট যিনি যুদ্ধ শুরু করতে পারেন ঠিকই, কিন্তু তা শেষ করার আগে যদি তাকে বিদেশি সরকার, গণমাধ্যম, রাজনৈতিক অনুদানদাতা এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীকে সন্তুষ্ট করতে হয়, তবে বুঝতে হবে যে, তার পূর্ণ কৌশলগত স্বাধীনতা নেই।
মডার্ন ডিপ্লোমেসি অবলম্বনে মোতালেব জামালী