হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

বুয়েটিয়ানরা কেন দেশ ছাড়ে, পেশা ছাড়ে

ড. মাহবুবুর রাজ্জাক

শোনা যায়, আজকাল বুয়েট থেকে পাস করা প্রকৌশলীদের প্রায় ৬০ শতাংশই ভাগ্যান্বেষণে আমেরিকায় পাড়ি জমান। কেউ কেউ ইউরোপ কিংবা অস্ট্রেলিয়ায়ও যান। তাদের ক্ষুদ্র একটা অংশের হয়তো টার্গেটই থাকে স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় যাওয়ার। তবে বাকিরা যান দায়ে ঠেকে। দেশের শ্রমবাজারে একধরনের অদ্ভুত বৈষম্যের শিকার হয়ে। কারণ, কর্মক্ষেত্রে তাদের মেধার যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না। তাদের পেশাগত বিকাশের সুযোগ দেওয়া হয় না। প্রকৌশল পেশায় অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৌশলবিদ্যার চর্চার চেয়ে কেরানিগিরির চর্চা বেশি হয়। এতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে কেউ যদি ভালো কাজের সন্ধানে দেশ ছাড়ে, তাকে দোষ দেওয়া যায় না।

এসব নিয়ে সাধারণত কেউ মাথা ঘামান না। তবে শিক্ষামন্ত্রী মনে হয় ইদানীং মাথা ঘামাচ্ছেন। যারা বিদেশে চলে গিয়েছেন, তিনি তাদের দেশে ফিরে আসতে আহ্বান জানিয়েছেন। যারা বিদেশে গিয়ে কাজকর্মে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এবং ভালো চাকরি করছেন, দেশে তাদের জন্য উপযুক্ত সুযোগ তৈরি না হলে তারা ফিরে আসবেন কোন ভরসায়? এসব নিয়ে মন্ত্রীর কি কোনো চিন্তাভাবনা আছে? থাকলে সেটি প্রকাশ করা উচিত। মন্ত্রীও একসময় আমেরিকায় গিয়েছিলেন। রসায়নবিজ্ঞানী হয়েও তিনি ফিরে এসে পেশা বদলেছেন। রাজনীতিতে যোগ দিয়ে অনেক ত্যাগ ও সংগ্রামের পর মন্ত্রী হয়েছেন। সবার পক্ষে কি এত ঝুঁকি গ্রহণ করা সম্ভব? অথবা সবাই কি এমন সুযোগ পান?

যারা বিদেশে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত আছেন; নাসা, বোয়িং, এনভিডিয়া বা ফোর্ড মোটর কোম্পানির মতো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন, তারা এখনই দেশে ফিরলে বেকার থাকা ছাড়া উপায় নেই। সরকার যদি আন্তরিকভাবেই চায় আমাদের প্রবাসীরা দেশে ফিরে আসুক এবং দেশের কাজে লাগুক, তবে পরিকল্পিতভাবে কর্মসূচি তৈরি করতে হবে। আগে ঠিক করতে হবে কোন সেক্টরে আমাদের দক্ষ জনশক্তি দরকার। তারপর সেই সেক্টরে উন্নয়নের জন্য সঠিক লোকটিকে একেবারে না হোক, কিছুদিনের জন্য হলেও ফিরে আসার আহ্বান জানানো যেতে পারে। ঢালাওভাবে সবাইকে দেশে ফিরে আসার আহ্বান জানানো মোটেও বাস্তবসম্মত হতে পারে না। আগে দেশে যারা আছেন, তাদের সম্মান দিন। এতে বাইরে যারা আছেন, তারা ফিরতে উৎসাহ পাবেন।

আবার ফিরে আসা যাক বুয়েটের কথায়। বুয়েটে কেমন লেখাপড়া হয়, তা নিয়ে বিভিন্ন মত থাকতেই পারে। কিন্তু বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো ভিন্নমত কোনো কালেই ছিল না। ১৮ কোটি জনসংখ্যার একটি দেশ থেকে বেছে বেছে শীর্ষ হাজার-বারোশ ছাত্র এখানে ভর্তি করা হয়। যত নামকরা হোক না কেন, দুনিয়ার আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এত বিপুলসংখ্যক মেধাবী ছাত্র একসঙ্গে ভর্তি হয় বলে আমার জানা নেই। আমরা এই ছাত্রদের থাকার সিট দিতে পারি না, ভালো ক্লাসরুম দিতে পারি না। হাস্যকর হলেও সত্যি, অর্থসংকটের কারণে মাঝেমধ্যে বোর্ড মার্কারের সরবরাহ কমে যায়, কাগজের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, গবেষণার জন্য অর্থ থাকে না। তারপরও আমাদের ছাত্ররা বুয়েটের ডিগ্রি নিয়ে আমেরিকা-ইউরোপে গিয়ে বেশ কদর পায়। সেখানে তাদের পেশাগত উৎকর্ষ প্রদর্শনের সুযোগ হয়।

বাংলাদেশে এদের মেধা কাজে লাগানোর সুযোগ কম। তাই দেশে তাদের চাকরি হয় না। চাকরি হয় তো প্রমোশন হয় না। তারপর আছে ডিপ্লোমা আর স্নাতকের অসুস্থ দ্বন্দ্ব। এসব কারণে বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত চাকরি বিসিএসের প্রশাসন ক্যাডার, কোনো প্রকৌশল সংস্থার চাকরি নয়। তাই দেশে থাকার অভিপ্রায়ে বুয়েট পাস করা প্রকৌশলীদের অতি ছোট সংখ্যার একটি অংশ বিসিএস দিয়ে প্রশাসন ক্যাডারে যায়। সেটি নিয়ে আবার অনেক কথা হয়। বলা হয়, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার হয়ে বিসিএসে এসে জনগণের করের টাকার অপচয় কেন? এমনকি শিক্ষামন্ত্রীও বুয়েটে এসে এই প্রশ্নটি রেখেছেন। অথচ ইতিহাস, ভূগোল কিংবা অর্থনীতি নিয়ে পাস করে কেউ বিসিএসে গেলে করের টাকা অপচয়ের সেই প্রশ্নটি আর করা হয় বলে কখনো শোনা যায় না।

প্রশাসন ক্যাডারে বুয়েটের স্নাতক আর প্রকৌশলীদের প্রবেশ ঠেকিয়ে দেওয়ার জন্য বিসিএস পরীক্ষার ধরন পরিবর্তনের আলোচনাও শোনা যায়। পরিসংখ্যান বলে, বুয়েটে ভালো ফল করা প্রকৌশলীরা প্রশাসন ক্যাডারে সাধারণত যায় না। যারা যায়, তাদের সংখ্যাও কম। এর মানে হলো, প্রকৌশলীদের পেশাকে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া হলে তারা প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন। প্রশাসনে বসে বুঝে না বুঝে ছড়ি ঘোরানোর চেয়ে প্রযুক্তিগত সাফল্য অর্জন করার আনন্দ কোনোভাবেই কম হওয়ার কথা নয়।

আরেকটি অংশ আবার বুয়েট থেকে পাস করার পর ব্যবসায় প্রশাসনে মাস্টার্স বা এমবিএ করেন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় যোগ দেন। প্রকৌশল ব্যাকগ্রাউন্ডের হওয়ার কারণে তারা শিল্পপ্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় বেশ সফলতা দেখিয়ে থাকেন। এগুলো নিয়েও করের টাকা অপচয়ের কথা হয়। তবে প্রশাসন ক্যাডারে প্রকৌশলীদের যাওয়া নিয়ে যতটা বিরোধিতা হয়, সম্ভবত এমবিএ ডিগ্রি থাকার কারণে ততটা এখানে হয় না।

১৯৯৬ সালের দিকে জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে এক মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। সে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করার পরে আইনে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছিল। অবাক হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন সে এমন করছে। জবাবে বলেছিল, সে কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠানের করপোরেট আইনজীবী হতে চায়। সে নিজে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার কারণে আশা করছে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে সে অন্য আইনজীবীদের চেয়ে এগিয়ে থাকবে। তেমনি আরেকজনের সঙ্গে পরিচয় আছে, যে ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করার পরে ডাক্তারি পড়েছে এবং একটি মেডিকেল রিসার্চ গ্রুপে কাজ করছে। তাই পেশা পরিবর্তন খারাপ চোখে দেখার কিছু নয়। চূড়ান্তভাবে কেউ যে পেশায়ই যাক না কেন, ছাত্রজীবনে সে যা কিছু শিখেছে, তা কোনো না কোনোভাবে তার পেশাগত কাজে সে ব্যবহার করতে পারবেই। করের টাকা অপচয়ের ছুতা যে বস্তুত পেশাগত ঈর্ষা থেকেই উদ্ভূত হয়েছে, সে ব্যাপারে কোনোই সন্দেহ নেই।

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট

বাংলাদেশে এআইনির্ভর অর্থনীতি

ভারতে ‘জেনজি’র লক্ষ্য গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার

সুন্দর শরতে অসহ্য ডেঙ্গু

বিমানবন্দর, জবাবদিহিতা ও রাষ্ট্রের নৈতিকতা

ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি: স্থানীয় পর্যায়ে দায়িত্ব আছে, সম্পদ নেই

প্রধানমন্ত্রীর অ্যাকশন ও বিমানবন্দর ইস্যুতে গ্রেপ্তার

বাংলাদেশপন্থা: একটি নতুন রাষ্ট্রদর্শন

দেশ কি আরেক এক-এগারোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে

কুষ্টিয়ায় আওয়ামী পান্ডাদের অনুসরণ করছে ক্ষমতাসীনরা

আমাদের কিশোর সমাজ ও শিক্ষা কার্যক্রম