গঠনমূলক সমালোচনাও নিতে পারছেন না ক্ষমতাসীন বিএনপির এক শ্রেণির নেতাকর্মী। শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে যারা ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে সরকারকে সঠিক পথে রাখার চেষ্টা করছেন, দিনশেষে যারা সরকারের সাফল্য দেখতে চান, তাদেরও যেনতেনভাবে আক্রমণ করছেন, ট্যাগিং করছেন, নোংরা-অকথ্য ভাষায় আক্রমণ করছেন। তবে আশার দিক হলো-সরকারপ্রধান তারেক রহমান চোখ-কান খোলা রেখেছেন। যতটা জানা গেছে, খুব সকালেই সংবাদপত্র মনোযোগ দিয়ে পড়ছেন তিনি। নেতিবাচক সংবাদকে গুরুত্ব দিয়ে সংশ্লিষ্টদের নজরে এনে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। রাজনীতির গতিবিধি নিয়ে বিশ্লেষকদের মতামতকেও তিনি উপেক্ষা না করে কর্মপন্থা ও কৌশল নির্ধারণে কাজে লাগাচ্ছেন। এমনকি সংসদ অধিবেশনে বসেও প্রধানমন্ত্রী পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ মন্ত্রীদের নজরে এনে প্রতিকারের নির্দেশনা দেন বলে জানা গেছে।
বক্তব্যেও তিনি একই সদিচ্ছার জানান দিয়েছেন। গত বুধবার জাতীয় সংসদে সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেছেন, দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থে বিএনপি যেকোনো পরামর্শ গ্রহণ করবে। এ ঘোষণা দেওয়ার পরদিনই বৃহস্পতিবার তা বাস্তবায়ন করেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার দেশের চলমান জ্বালানি সংকট সমাধানের সুপারিশ করতে সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে ১০ সদস্যের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে সভাপতি করে সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে ১০ সদস্যের কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। তাৎক্ষণিক সরকারি দলের পাঁচ সদস্যের নাম ঘোষণা করে বিরোধী দল থেকেও সমানসংখ্যক নাম আহ্বান করেন তিনি। মূলত এমন সমন্বিত কমিটি গঠন করে জ্বালানি নিয়ে জাতীয় সংকট মোকাবিলার প্রস্তাব করেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তার প্রস্তাব সাদরে গ্রহণ করেন সংসদ নেতা।
সংসদ নেতার আহ্বানের পরপর বিরোধীদলীয় নেতাকে ফ্লোর দেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এ সময় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। আমরা আশা করি, এ সংসদ জাতীয় সব সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু হবে ইনশাআল্লাহ এবং আমরা মনে করি, এ সংসদের জন্য এটি একটি নবযাত্রা। এটাকে আমি সাধুবাদ জানাই এবং আমরা শিগগির নাম দেব।’ একই দিন ঘণ্টাখানেক পর ডা. শফিকুর রহমান বিরোধী দলের পক্ষ থেকে পাঁচজন সদস্যের নাম ঘোষণা করেন। জাতীয় সংসদের ইতিহাসে এটি বিরল ঘটনা। বিরোধীদলীয় নেতার উদার মনোভাবের প্রশংসাও করা হয় স্পিকার চেয়ার ও ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে। সম্ভবত স্পিকার বলেছেন-তার দীর্ঘ সংসদীয় অভিজ্ঞতায় এমন বিরোধী দল তিনি দেখেননি। বিরোধীদলীয় নেতার আরেকটি বক্তব্য বেশ আলোচিত হয়। তিনি বলেছেন-সবাই যেন রংপুরের মরিচের ঝাল পরিহার করে ঠোঁটে সুন্দরবনের মধু মাখেন। এসবই আশাজাগানিয়া।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, জাতীয় সংসদে যখন সরকার ও বিরোধীদলীয় নেতা মধুর আলাপ ও সহৃদয়তার প্রকাশ ঘটাচ্ছিলেন এবং সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তুমুল হর্ষধ্বনি দিয়ে উদযাপন করছিলেন, তখন দুই দলের মাঠপর্যায়ে চলছিল কোপাকুপি। সেদিনই দু-দফা সংঘাতে জড়ায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের দেয়ালে একটি জুলাই গ্রাফিতি ছিল। সেখানে ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি-সংবলিত স্লোগান বিকৃত করে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ লিখে সেটা আবার ভিডিও করে ফেসবুকে ছড়িয়ে উত্তেজনা ছড়ানোর ব্যবস্থা হয়। আর তার জেরে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও প্রধান বিরোধী দলের ছাত্রফ্রন্ট ইসলামী ছাত্রশিবির সহিংস সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংসদ টেলিভিশনে লাইভ দেখে আশাবাদী মানুষ দেখে ধারালো অস্ত্রের ঝনঝনানি। আহত হন ২০ থেকে ৩০ শিক্ষার্থী। ছাত্রশিবিরের এক কর্মীকে কুপিয়ে পায়ের গোড়ালি প্রায় আলাদা করে ফেলা হয়।
চট্টগ্রামে এই নিয়ে দুদিন পরস্পরবিরোধী রাজনীতি উত্তাপ ছড়ায়। তার প্রভাব পড়ে অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। ঢাকায়ও ‘গুপ্ত’ নিয়ে তপ্ত হয় শিক্ষাঙ্গন। পাবনার ইশ্বরদীতে একই ইস্যুতে মারামারি করে ছাত্রদল-শিবির। কুমিল্লার পরিটেকনিক্যালেও শিবিরের ওপর চড়াও হয় ছাত্রদল। আরেক ঘটনা ঘটে রাজধানীর শাহবাগ থানায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার মেয়ে জায়মা রহমানকে নিয়ে ছাত্রলীগের এক কুৎসিত এআই জেনারেটেড ছবি দিয়ে এক শিবির কর্মীর নামে ফেইক ফটোকার্ড ছেড়ে উত্তেজনা ছড়ানো হয়। আর তার জেরে ডাকসুর দুই নেতা যুবায়ের ও মুসাদ্দিককে শাহবাগ থানার আঙিনায় বেদম পেটায় ছাত্রদলের একটি গ্রুপ। ছাত্রদল সভাপতি রাকিব ও ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং হস্তক্ষেপে আর বড় সহিংসতা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
এক দিনের ব্যবধানে শুক্রবার নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলায় জামায়াতের সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তাফার গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর করেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। পত্রিকার খবর অনুযায়ী পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি তেল নিতে গেলে একদল বিএনপি নেতাকর্মী মোটরসাইকেল যোগে সেখানে উপস্থিত হয়ে জামায়াত এমপির গাড়িতে হামলা চালান। এতে গাড়িটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমপি মাসুম মোস্তফাকে বেশ কিছু সময় অবরুদ্ধ করে রেখে নাজেহালের চেষ্টা করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ এসে উদ্ধার করে।
এসব ঘটনায় বুনো উল্লাসে ফেটে পড়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তির দোসররা। সম্ভবত বৃহস্পতিবার রাতটি ঈদের আনন্দে কেটেছে তাদের। কারণ, শাহবাগ থানায় প্রহৃত যুবায়ের ও মুসাদ্দিক জুলাই অভ্যুত্থানে অসম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। টালমাটাল সময়ে তাদের দেখা গেছে খুনি বাহিনীর চোখে চোখ রেখে এক দফার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে।
মুরুব্বিরা যখন পরস্পর হাত ধরাধরি করে চলার অঙ্গীকার করছেন, তখন সন্তানরা কেন এমন সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছেন-এই প্রশ্নটি স্বভাবতই সামনে আসছে। এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র দেখছেন অনেকে। আড়াই মাস বয়সি সরকারের বিরুদ্ধে কে ষড়যন্ত্রের জাল বিছাচ্ছে? প্রধান বিরোধী দলের রাজনৈতিক কৌশল সম্পর্কে যতটা জানা যাচ্ছে-তারা সরকারকে অন্তত দুবছর কাজ করার সময় দিতে চায়। তারপর মূল্যায়ন করে প্রয়োজনে বড় ধরনের আন্দোলনে যেতে চেয়েছিল। নির্বাচন-পরবর্তী তাদের নীতিনির্ধারণী সভায় এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গিয়েছিল। দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থেই এমন কৌশল বলে জানাচ্ছিলেন জামায়াতের কোনো কোনো নেতা। কিন্তু জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ইস্যুতে সরকারের মনোভাব বিরোধী দলকে চাপে ফেলেছে।
বিরোধীদলীয় নেতা বুধবার সংসদে বক্তৃতায় বিভিন্ন ইস্যুতে এখনই কঠোর অবস্থান নেওয়ার জন্য তাদের ওপর ক্রমাগত চাপের কথা বেশ খোলামেলাভাবে বলেও ফেলেছেন। এছাড়া দেশি-বিদেশি নানা শক্তি নিজ নিজ চাওয়া-পাওয়ার হিসাব-নিকাশে দেশকে অস্থিতিশীল করে নিজেরা ‘ত্রাতা’ হিসেবে আবির্ভূত হতে চায়। তারাও নেপথ্য থেকে সংঘাত-সহিংসতায় কলকাঠি নাড়ছেন। সর্বোপরি পতিত শক্তি ফেরার জন্য জুলাই অভ্যুত্থানের শক্তির মধ্যে বিভাজন, এক পক্ষকে দিয়ে আরেক পক্ষকে ঘায়েল-কোণঠাসা ও চরিত্র হননের মিশন বাস্তবায়ন করতে চাইছে। পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গনে পেশাশক্তির মহড়া এবং সরকারের নানা ব্যর্থতা সামনে এনে ১৫ বছরের গ্লানি মোছনের মতো কৌশল বাস্তবায়নে তারা মরিয়া প্রচেষ্টায় আছে বোধগম্য কারণেই। বুঝে না বুঝে অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলো সে ফাঁদে পা দিচ্ছে। নিজেরা সংঘাতে জড়িয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিতদের সুযোগ করে দিচ্ছে।
অথচ বহুমুখী সংকট যখন ঘিরে ধরছে, তখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে পথ চলা। চালকের আসনে থাকার কারণে এর প্রধান দায়িত্বটা সরকার ও সরকারি দলের ওপরই বর্তায়। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতাজুড়ে বহুমাত্রিক সংকটের চিত্র। অস্বীকার করার উপায় নেই, একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়েই বিএনপি সরকারের যাত্রা শুরু। রাজস্ব আদায়ে বিশাল ঘাটতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে স্থবিরতা; সেই সঙ্গে ব্যাংক ও শেয়ারবাজারে ফোকলা। এ অবস্থায় দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক দিনের মধ্যেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের মতো বড় একটি বৈশ্বিক সংকট। এর প্রভাবে বেড়েছে জ্বালানি তেলসহ সব ধরনের আমদানি ব্যয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভরসা ছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার ঋণ। কিন্তু শর্ত পূরণ না হওয়ায় ঋণ দেবে না আইএমএফ। ফলে আইএমএফের শর্তপূরণে বাড়ানো হলো জ্বালানি তেলের দাম। এতে পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতে বিরূপ প্রভাবের পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধাক্কা লেগেছে।
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিশু সরকার যখন হিমশিম, তখন রাজনীতিতেও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে, তা কাম্য ছিল না। কিন্তু হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়া এবং রাষ্ট্রসংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল ইস্যুতে দলান্ধ ছাড়া সবাই অসন্তুষ্ট। বিরোধী দল বলছে-রাজপথে আন্দোলনে তাদের ঠেলে দিচ্ছে সরকার।
এদিকে জনমনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে সরকারি পর্যায়ের কিছু নির্দেশনা। জাতীয় সংসদ ভবনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোয় নিষিদ্ধ একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সমর্থকরা নাশকতার পরিকল্পনা করছে বলে দাবি করে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে রেঞ্জ ডিআইজি, মেট্রোপলিটন কমিশনার, সব জেলা পুলিশ সুপারসহ সব ইউনিটকে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে-সম্ভাব্য যেকোনো নাশকতা প্রতিরোধে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি গ্রেপ্তার উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদের সঙ্গে একটি বাহিনীর চাকরিচ্যুত দুই সদস্যের নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। চক্রটি জাতীয় সংসদ ভবন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্থাপনা ও সদস্য, ধর্মীয় উপাসনালয়, বিনোদনকেন্দ্র, শাহবাগসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় হামলা চালাতে পারে। এছাড়া তারা বিভিন্ন বাহিনীর অস্ত্রাগারে হামলার পরিকল্পনাও করছে বলে গোয়েন্দা তথ্যে ইঙ্গিত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য উচ্চঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের রেড অ্যালার্ট জারি জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করছে। গোয়েন্দা রিপোর্টের সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বাংলাদেশে বরাবরই প্রশ্ন ছিল। উপযুক্ত সময়ে গোয়েন্দা ব্যর্থতা আর বিভিন্ন সময়ে মতলবি সতর্কতা নিয়ে সরকারকে সজাগ থাকতে হবে। আবার নির্বিচারে উপেক্ষাও করা যাবে না। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোয় এখনো শেখ হাসিনার অনুগতদের প্রাধান্য বিদ্যমান। সেটাকে আমলে নেওয়া জরুরি।
সবচেয়ে বেশি জরুরি সরকার দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ। নানা অপকর্মে জড়িয়ে সরকারের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার ঘটনা ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত। মাঠপর্যায়ের দলীয় নেতাকর্মীদের উৎপাত সামলানোতে মনোযোগ দিলে সরকার দেশ পরিচালনার নানামুখী সংকটগুলোর দিকে মনোনিবেশ করবে কীভাবে? দাম বাড়িয়ে জ্বালানি নিয়ে হাহাকার কিছুটা সামলানো গেলেও পরিবহন, বাজারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে, তা দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলার জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা জরুরি। মাঠ নেতাকর্মীরা দায়িত্বশীল ও সংযত আচরণ করেই শুধু সরকারকে এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে পারে।
সরকারের অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির বিপরীতে আয়ের ব্যাপক ঘাটতি ব্যালান্স শিটের ভারসাম্যকে হুমকিতে ফেলেছে। আর সেই চাপ সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে সরকারের । বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) বলছে, পরিস্থিতি সামলাতে সরকার কার্যত নতুন টাকা ছাপিয়ে ব্যয় মেটানো শুরু করেছে । চলতি বছরের মার্চ মাসেই সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা মূলত নতুন টাকা ছেপে। এ ধরনের অর্থায়ন অব্যাহত থাকলে খুব দ্রুতই এর প্রভাব বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দিতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাবে।
আমাদের মতো ক্ষুদ্র মানুষদের পরামর্শ সরকার গ্রাহ্য করবে না বা আমলে নেবে নাÑএটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও পরামর্শ উপেক্ষা করবে কীভাবে? ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি) বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে পরামর্শ দিয়ে বলেছে, অর্থনীতি, সুশাসন ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সংস্কারে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণে সরকারের শুরুর সময়টিকে কাজে লাগানো উচিত বিএনপির। দলটির উচিত হবে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে চলা। ‘বাংলাদেশের নতুন সরকার কাজে নেমে পড়েছে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ কথা বলেছে তারা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দেড় দশকের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনের অধ্যায় শেষ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রচেষ্টায় একটি বড় পদক্ষেপ ছিল নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তর। নতুন সরকারের প্রতি ভোটারদের স্পষ্ট জনরায় থাকলেও তারা সেই জনরায়কে দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তা ও স্থিতিশীলতায় রূপ দিতে পারবে কি না-তা এখনো অনিশ্চিত। আইসিজি মনে করে, অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি, রাজনৈতিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার মতো বিষয়গুলোয় বিএনপিকে কয়েকটি বড় ধরনের পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে।
সবচেয়ে সতর্কতামূলক যে প্রসঙ্গটি আইজিসি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, তা হলো-বাংলাদেশের সরকারবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস ইঙ্গিত দেয়, দৃঢ় পদক্ষেপ ছাড়া বিএনপির পক্ষে তাদের বর্তমান জনসমর্থন ধরে রাখা কঠিন হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী মাসগুলোয় রাজনৈতিক সংস্কার একটি উত্তপ্ত বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
আইসিজি সুদূর বেলজিয়াম থেকে যে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে, দুই মাস ধরে বিভিন্ন লেখায় আমরা সে কথাগুলোই বলে আসছিলাম। সার্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এবং একজন শান্তিপ্রিয় গণতন্ত্রমনা মানুষ হিসেবে বর্তমান সরকারের সাফল্য কামনা করি। সংসদে মধুর আলাপ আর রাজপথে কিরিচের কোপ একসঙ্গে যায় না। ‘গুপ্ত’ কার্ড বেশিদিন ব্যবহার করলে তা ভোঁতা হতে বাধ্য। দীর্ঘ লড়াইয়ে রণকৌশলের অংশ হিসেবে কে কখন গুপ্ত ছিল আর কখন প্রকাশ্যে বীরত্ব দেখিয়েছে, তা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক হতে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে, বিএনপি সরকার ব্যর্থ হওয়া মানে বাংলাদেশ রাষ্ট্র নতুন করে গভীর খাদের কিনারায় উপনীত হওয়া। পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তির পুনরুত্থান ঠেকাতে বর্তমান সরকারের সফল হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। সে জন্য ইতোমধ্যে সামনে আসা দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠা বাঞ্ছনীয়। আদর্শিক দৃঢ়তা অপরিহার্য। সাংস্কৃতিক ভ্রান্তি থেকে দ্রুত বেরিয়ে এসে বাংলাদেশি জাতিসত্তার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ কালজয়ী সংস্কৃতির চর্চা করে দেশপ্রেমিক মানুষের আস্থা অটুট রাখা দরকার। কোটারি স্বার্থবাজ, ধান্ধাবাজ, ফটকাবাজদের মতলববাজি থেকে সতর্ক থেকে দৃপ্ত কদমে এগুনো জরুরি। শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়ার অপরিমেয় দেশপ্রেম, প্রশ্নাতীত সততা ও আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে নিরাপস আদর্শই হোক সরকারের পথচলার পাথেয়।
লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক ও যুগ্ম সম্পাদক, দৈনিক আমার দেশ।