হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ইরানি বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস ও মার্কিন ক্যাম্পাসে কণ্ঠরোধ

সৈয়দ মুসা রেজা

জনাথন গ্লেজারের অস্কারজয়ী পোলিশ চলচ্চিত্র ‘দ্য জোন অব ইন্টারেস্ট’-এর সবচেয়ে ভয়ংকর দিক সম্ভবত তার নীরবতা। আউশভিৎস কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের দেয়ালের ঠিক পাশেই নাৎসি কর্মকর্তা রুডলফ হেসের পরিবার সুখের সংসার করছে। বাগানে ফুল ফুটছে, শিশুরা খেলছে, স্ত্রী নতুন সাজসজ্জা নিয়ে ব্যস্ত। দূরে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের চিমনি থেকে ধোঁয়া উঠছে। মাঝেমধ্যে ভেসে আসছে গুলির শব্দ, মানুষের আর্তনাদ; কিন্তু বাড়ির ভেতরের মানুষগুলো যেন কিছুই শুনতে পায় না। সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর গণহত্যাগুলোর একটি তাদের পাশেই চলছে; আর তারা নিজেদের স্বাভাবিক জীবন এবং সুখের সংসার সাজাতে ব্যস্ত।

সম্ভবত এ কারণেই ছবিটি এত অস্বস্তিকর। কারণ চলচ্চিত্রটি নিছক নাৎসি জার্মানির গল্প নয়; এক মানবিক অন্ধত্বের গল্প, যেখানে মানুষ ধীরে ধীরে বর্বরতার সঙ্গে সহাবস্থান রপ্ত করে ফেলে।

আজকের পৃথিবীর দিকে তাকালে সেই অস্বস্তি আরো তীব্র হয়ে ওঠে। যখন গাজার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়, যখন তেহরানের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হামলার খবর আসে, যখন মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফিলিস্তিনপন্থি ছাত্রদের মুখ বন্ধ করতে পুলিশ ঢুকে পড়ে, তখন মনে হয় ‘জোন অব ইন্টারেস্ট’ যেন ইতিহাস নয়, বর্তমানেরই প্রতিচ্ছবি।

দ্বিতীয় মহাসমরের সময়ও যুদ্ধের কিছু অলিখিত সীমারেখা ছিল। জার্মান বাহিনী ব্রিটেনে ভয়াবহ বোমাবর্ষণ চালিয়েছে, লন্ডনকে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়কে পরিকল্পিতভাবে নিশ্চিহ্ন করার পথে যায়নি। একইভাবে মিত্রপক্ষও হাইডেলবার্গ, গটিঙ্গেন কিংবা জার্মানির বহু ঐতিহাসিক বিশ্ববিদ্যালয়কে পুরোপুরি ধ্বংস করেনি। কারণ যুদ্ধরত পক্ষগুলো অন্তত বুঝত, বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ইট-পাথরের ভবন নয়; বরং একটি সভ্যতার স্মৃতি, জ্ঞান ও ভবিষ্যৎ।

ইরানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ইসরাইলি বাহিনীর বর্বর হামলা এখন এতটাই নগ্ন রূপ নিয়েছে যে, খোদ ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর মতো পত্রিকাগুলোও তা আর চেপে রাখতে পারছে না। যখন তারা তেহরানের শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির ওপর হামলার খবর ছাপে, তখন বুঝতে হবে ফারসি প্রবাদের মতোই অবস্থা—‘স্যুপে এতই নুন দেওয়া হয়েছে যে খোদ পাচককেও তা স্বীকার করতে হচ্ছে।’

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানি স্টাডিজ এবং তুলনামূলক সাহিত্যের ‘হাগোপ কেভোরকিয়ান’ অধ্যাপক হামিদ দাবাশি ‘মিড্‌ল ইস্ট আই’-এ প্রকাশিত তার আলোচিত নিবন্ধ ‘হোয়াই ইসরাইল বোম্বস ইরানিয়ান ইউনিভার্সিটিজ অ্যান্ড সাইলেন্সেস আমেরিকান ওয়ানস’-এ লিখেছেন, ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন সামরিক ঘটনা নয়, এ হলো সুপরিকল্পিত শিক্ষাবিনাশ। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বোমা ফেলা মানে শুধু ভবন ধ্বংস করা নয়; বরং একটি জাতির জ্ঞানচর্চা, স্মৃতি ও ভবিষ্যতের ওপর আঘাত হানা।

অধ্যাপক দাবাশি তুলনামূলক সাহিত্য, বিশ্ব চলচ্চিত্র এবং উত্তর-উপনিবেশবাদ তত্ত্বের বিষয়ে পাঠদান করেন। তার উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘দ্য ফিউচার অব টু ইলিউশনস: ইসলাম আফটার দ্য ওয়েস্ট’ (২০২২), ‘দ্য লাস্ট মুসলিম ইন্টেলেকচুয়াল: দ্য লাইফ অ্যান্ড লিগ্যাসি অব জালাল আল-ই আহমদ’ (২০২১), ‘রিভার্সিং দ্য কলোনিয়াল গেজ’ (২০২০) ও ‘দ্য এম্পেরর ইজ নেকেড: অন দ্য ইনএভিটেবল ডিমাইজ অব দ্য নেশন-স্টেট’ (২০২০)।

দাবাশি লিখেছেন, ইরানের আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল প্রযুক্তিগত বা বৈজ্ঞানিক গবেষণার কেন্দ্র নয়; এগুলোর পেছনে রয়েছে শত শত বছরের জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্য। পারস্যের ইতিহাসে জ্ঞানচর্চা শুধু শিক্ষার বিষয় ছিল না, এটি ছিল রাষ্ট্র ও সভ্যতার আত্মপরিচয়ের অংশ। গোন্দিশাপুর একাডেমিতে যখন চিকিৎসাবিজ্ঞান, দর্শন ও জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে গবেষণা চলছিল, তখন ইউরোপের বহু অঞ্চল অন্ধকার যুগ পার করছিল। পরে সেই জ্ঞানই আরব বিশ্বের মাধ্যমে ইউরোপে প্রবাহিত হয়।

ফলে ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর আঘাতকে দাবাশি কেবল সমকালীন রাজনীতির ঘটনা হিসেবে দেখেন না; তিনি এটিকে ইতিহাসের দীর্ঘ ধারাবাহিকতা ভাঙার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেন। সাসানীয় যুগের গোন্দিশাপুর একাডেমি থেকে শুরু করে আধুনিক তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ইরানের জ্ঞানচর্চার ইতিহাস এক দীর্ঘ ধারাবাহিকতা বহন করে। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা আসলে একটি সভ্যতার ধারাবাহিকতার ওপর হামলা করা বলে ধরে নিতে হবে। আজকের পৃথিবীতে আমরা এমন এক উন্মাদনা দেখছি, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ই পরিণত হচ্ছে লক্ষ্যবস্তুতে। গবেষকেরা একে বলছেন ‘স্কলাস্টিসাইড’ বা এককথায় ‘মেধানিধন’ বা ‘শিক্ষাবিনাশ’।

গত কয়েক বছরে ইরানের একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় হামলার শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সূত্র। শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, ইসফাহান ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়, শিরাজ বিশ্ববিদ্যালয়—তালিকাটি দীর্ঘ হচ্ছে। কোথাও গবেষণাগার বিধ্বস্ত, কোথাও লাইব্রেরি ক্ষতিগ্রস্ত, কোথাও ছাত্রাবাস ধসে পড়েছে, এমনকি মসজিদও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

শরিফ বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রায়ই পশ্চিম এশিয়ার এমআইটি বলা হয়। এখানকার সাবেক শিক্ষার্থী মরিয়ম মির্জাখানি ছিলেন গণিতের সর্বোচ্চ সম্মান ‘ফিল্ডস মেডেল’ পাওয়া বিশ্বের প্রথম নারী ও প্রথম ইরানি। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা নিছক সামরিক বার্তা নয়, এটি প্রতীকী আক্রমণ। যেন বলা হচ্ছে—‘তোমরা জ্ঞানচর্চা করবে না, প্রযুক্তিতে এগোবে না, নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরা নির্মাণ করবে না।’

বিশ্ববিদ্যালয় কেন এত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছে, তার উত্তর লুকিয়ে আছে আধুনিক রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তির ধারণায়। আজকের পৃথিবীতে শুধু ট্যাংক, যুদ্ধবিমান বা পারমাণবিক অস্ত্র কোনো রাষ্ট্রকে দীর্ঘ মেয়াদে বল জোগায় না। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, জ্বালানি গবেষণা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, মহাকাশ প্রযুক্তি—সবকিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে যে রাষ্ট্র প্রতিপক্ষের ভবিষ্যৎ দুর্বল করতে চায়, সে শুধু সীমান্তে যুদ্ধ করে না; সে আঘাত করে গবেষণাগার, বিজ্ঞানী ও শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। সেনাবাহিনী তাৎক্ষণিক শক্তি দেখাতে পারে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করে দীর্ঘমেয়াদি শক্তি। এখান থেকেই জন্ম নেয় বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, চিন্তাবিদ, সাহিত্যিক, কূটনীতিক ও নীতিনির্ধারক—যে শক্তি একটি জাতিকে কেবল সামরিক নয়, জ্ঞান ও প্রযুক্তিগতভাবেও আত্মনির্ভর করে তোলে।

এ কারণেই ইতিহাসে উপনিবেশবাদীরা শুধু ভূখণ্ড দখল করেনি; তারা জ্ঞানকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে। ব্রিটিশরা ভারত শাসনের সময় শুধু সম্পদ লুট করেনি; তারা এমন শিক্ষাব্যবস্থা দাঁড় করিয়েছিল, যা উপনিবেশকে প্রশাসনিকভাবে চালাতে সাহায্য করবে, কিন্তু স্বাধীন চিন্তার ভিত্তি দুর্বল রাখবে। আলজেরিয়ায় ফরাসিরা স্থানীয় ভাষা ও জ্ঞানচর্চাকে দমন করেছিল। লাতিন আমেরিকায় বহু আদিবাসী জ্ঞানব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছিল। কারণ দখলদার শক্তি খুব ভালো করেই জানত, যে জাতি নিজের ইতিহাস, ভাষা ও জ্ঞান ধরে রাখতে পারে, তাকে পুরোপুরি দাসে পরিণত করা কঠিন।

ইরাক যুদ্ধের সময় বাগদাদের জাদুঘর লুট হয়ে যাওয়ার ঘটনা আজও ইতিহাসে কলঙ্ক হয়ে আছে। হাজার বছরের সভ্যতার নিদর্শন অদৃশ্য হয়ে যায়, প্রাচীন পাণ্ডুলিপি হারিয়ে যায়। অনেক গবেষক তখনই বলেছিলেন, এটি কেবল যুদ্ধের বিশৃঙ্খলা নয়; বরং স্মৃতি মুছে ফেলার রাজনীতি।

একই বাস্তবতা আজ ফিলিস্তিন ও ইরানের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে। আলজেরিয়ায় ফরাসিরা স্থানীয় শিক্ষাকাঠামো ভেঙে দিয়েছিল। ইরাকে যুদ্ধের পর লুট হয়েছিল জাদুঘর ও লাইব্রেরি। ফিলিস্তিনে বছরের পর বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সামরিক অবরোধ, হামলা ও নজরদারির মুখে। গাজার ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, আল-আজহার ইউনিভার্সিটি, আল-ইসরা ইউনিভার্সিটি—একটির পর একটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

হামিদ দাবাশি এই প্রক্রিয়াকে শুধু সামরিক আগ্রাসন হিসেবে দেখেন না। তার মতে, এটি ‘এপিস্টেমিসাইড’—অর্থাৎ জ্ঞানব্যবস্থাকে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করার প্রকল্প। শুধু গণহত্যা নয়; বরং একটি জাতি নিজেদের ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারে—এমন এক মানসিক ও সাংস্কৃতিক অবকাঠামো ধ্বংস করা।

কিন্তু ইরানের ঘটনাকে আরো তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে সমান্তরাল আরেক বাস্তবতা। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে বোমা পড়ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ফিলিস্তিনপন্থি কণ্ঠ দমনে নজিরবিহীন চাপ তৈরি হচ্ছে। কলম্বিয়া, হার্ভার্ড, ইউসিএলএ, ইয়েল—একটির পর একটি ক্যাম্পাসে ছাত্র আন্দোলন দমনে পুলিশি অভিযান হয়েছে। শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, অধ্যাপকদের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে, গবেষণা অনুদান বন্ধের হুমকি এসেছে।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাটি বিশেষভাবে প্রতীকী। কারণ এ বিশ্ববিদ্যালয় বহু দিন ধরেই মুক্তবুদ্ধি ও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। অথচ সেই ক্যাম্পাসেই ফিলিস্তিনপন্থি শিক্ষার্থীদের তাবু উচ্ছেদ করতে পুলিশ ঢুকে পড়ে। দাবাশি লিখেছেন, এটি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং মার্কিন রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে এমন এক ভয়ের প্রতিফলন, যেখানে ফিলিস্তিন প্রশ্নে ভিন্নমতকে ক্রমেই অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই দুই দৃশ্য—মধ্যপ্রাচ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে বোমা পড়া এবং আমেরিকান ক্যাম্পাসে বাকরোধ—আলাদা নয়। এক জায়গায় বোমা ব্যবহার করা হচ্ছে, অন্য জায়গায় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপ। কিন্তু উদ্দেশ্য একই—বিকল্প কণ্ঠকে দুর্বল করা, বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন জায়গায় পরিণত করা যেখানে মানুষ প্রশ্ন করতে ভয় পাবে।

মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই শুধু ছাত্র আন্দোলনের খবর নয়; এগুলো আমেরিকার জ্ঞান-সংক্রান্ত পরিবেশের সংকটেরও লক্ষণ। বহু অধ্যাপক অভিযোগ করেছেন, ফিলিস্তিন প্রশ্নে অবস্থান নিলে চাকরি হারানোর ভয় তৈরি হয়েছে। গবেষণা অনুদান বন্ধের চাপ এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত আক্রমণ হয়েছে। ফলে একধরনের আত্মনিয়ন্ত্রণ বা আত্মনিরোধ তৈরি হচ্ছে, যেখানে মানুষ নিজের নিরাপত্তার জন্যই চুপ থাকতে শুরু করে।

এই পরিস্থিতি ভয়ংকর, কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল শক্তিই হলো প্রশ্ন করার স্বাধীনতা। যে মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয় ভয় পেতে শুরু করে, সে মুহূর্তে পুরো সমাজের চিন্তাশক্তি দুর্বল হতে থাকে। এক জায়গায় জ্ঞানকেন্দ্র ধ্বংস করা হচ্ছে, অন্য জায়গায় জ্ঞানচর্চার জায়গাগুলোকে ভীত ও নীরব রাখা হচ্ছে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় এখনো এমন একটি জায়গা, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রচারণার বাইরে বিকল্প ভাষা জন্ম নিতে পারে।

মার্কিন করপোরেট গণমাধ্যম প্রায়ই এই সংকটকে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কিংবা নিরাপত্তা বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায়। যেন এটি কেবল সরকার বনাম বিরোধী শিবিরের প্রশ্ন। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বোমা পড়া কখনো কেবল রাজনৈতিক বিভাজনের বিষয় নয়। একটি লাইব্রেরি ধ্বংস হওয়া মানে বহু প্রজন্মের স্মৃতি মুছে ফেলা। একটি গবেষণাগার ধ্বংস হওয়া মানে বহু বছরের শ্রম ধ্বংস হয়ে যাওয়া।

দ্বিতীয় মহাসমরের উদাহরণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। হিটলারের জার্মানি ছিল ভয়াবহ বর্বরতার প্রতীক, কিন্তু তবুও সেই যুদ্ধে ইউরোপের বহু বিশ্ববিদ্যালয় শেষ পর্যন্ত টিকে যায়। কারণ যুদ্ধরত পক্ষগুলো অন্তত বুঝত, বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস মানে সভ্যতার ভবিষ্যৎ ধ্বংস করা। আজকের পৃথিবীতে সেই সীমারেখাটিও ভেঙে যাচ্ছে। এখন শুধু মানুষ হত্যা নয়, জ্ঞানকেও হত্যা করা হচ্ছে।

এখানেই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি উঠে আসে। পশ্চিমা বিশ্ব বহু দিন ধরে নিজেকে মানবাধিকার, মুক্তচিন্তা ও সভ্যতার রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু গাজা যুদ্ধ ও ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর হামলার প্রশ্নে সেই নৈতিক অবস্থানের ভেতরের দ্বিচারিতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

যদি কোনো ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করত, পৃথিবীর প্রতিক্রিয়া কি এমনই হতো? যদি অক্সফোর্ডের লাইব্রেরি ধ্বংস হয়ে যেত, কিংবা হার্ভার্ডের গবেষণাগারে আগুন লাগত, বিশ্বমাধ্যম কি একই নির্লিপ্ততা দেখাত? এই প্রশ্নগুলো শুধু আবেগের নয়; এগুলো বৈশ্বিক ক্ষমতার কাঠামো বোঝার প্রশ্ন। কারণ পৃথিবীর কিছু মানুষের জ্ঞানকে বেশি মূল্যবান আর অন্যদের জ্ঞানকে কম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখার প্রবণতা আজও রয়ে গেছে।

এ কারণেই বর্তমান সময়ের অনেক সমালোচক বলছেন, আধুনিক যুদ্ধ শুধু ভূখণ্ড দখলের লড়াই নয়; এটি স্মৃতি, ইতিহাস ও জ্ঞানের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াইও। ইতিহাসে হিটলারকে আমরা সভ্যতার চরম অন্ধকারের প্রতীক হিসেবে দেখি। কিন্তু আজ যদি রাস্তায় হিটলারের সঙ্গে নেতানিয়াহুর দেখা হতো, হয়তো নাৎসি নেতাও বিস্ময়ে-লজ্জায় মুখ লুকাত। কারণ নাৎসি জার্মানি অন্তত যুদ্ধের মধ্যেও ইউরোপের সব বিশ্ববিদ্যালয় নিশ্চিহ্ন করার প্রকল্প নেয়নি। অথচ আজ বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, লাইব্রেরি—সবকিছুই বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।

ইসরাইলের সমালোচকেরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে গভীর নিরাপত্তাহীনতা। একটি আত্মনির্ভর, প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ ও শিক্ষিত মধ্যপ্রাচ্য জায়নবাদী আধিপত্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। ফলে সামরিক শক্তির পাশাপাশি জ্ঞানভিত্তিক শক্তিকেও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

আরো ভয়াবহ বিষয় হলো, এই প্রক্রিয়াকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করে তোলা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার খবর কয়েক দিন আলোচনায় থাকে, তারপর নতুন যুদ্ধসংবাদ সেটিকে ঢেকে দেয়। কিন্তু যে শিক্ষার্থী তার গবেষণা হারাল, যে অধ্যাপক তার ল্যাবরেটরি হারাল, যে পরিবার তাদের সন্তানের বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস হতে দেখল—তাদের জন্য এই ক্ষতি কয়েক দিনের নয়।

মধ্যপ্রাচ্যের বহু মানুষ এখন প্রশ্ন তুলছেন—সভ্যতার নামে যারা সবচেয়ে বেশি কথা বলে, তারা কোথায়? মানবাধিকার, একাডেমিক স্বাধীনতা, মুক্তবুদ্ধি—এসব কি কেবল নির্বাচিত কিছু দেশের জন্য?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ নয়। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট, বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস কখনো কেবল সামরিক কৌশল নয়; এটি সাংস্কৃতিক বার্তা, এটি ভবিষ্যৎকে ভয় দেখানোর ভাষা।

একসময় ইউরোপ নিজেদের অন্ধকার ইতিহাস দেখে শপথ নিয়েছিল—আর কখনো নয় (নেভার এগেইন)। কিন্তু ইতিহাসের নিষ্ঠুরতা হলো, মানুষ প্রায়ই নিজের অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নেয় না। আজ যখন গাজার ধ্বংসস্তূপের পাশে কিংবা তেহরানের ভাঙা ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীরা বই হাতে ছবি তোলে, তখন ‘জোন অব ইন্টারেস্ট’-এর সেই পরিবারের কথাই মনে পড়ে। দেয়ালের ওপারে আগুন জ্বলছে, মানুষ মরছে, কিন্তু ক্ষমতার ভেতরে বসবাসকারীরা নিজেদের স্বাভাবিকতা নিয়েই ব্যস্ত।

হয়তো এ কারণেই আজকের সময় এত অস্বস্তিকর। কারণ এখানে বর্বরতা শুধু ট্যাংক বা বোমার ভেতর নেই; এটি ধীরে ধীরে মানুষের নৈতিক অনুভূতিকেও ভোঁতা করে দিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার খবর মানুষকে আর আগের মতো নাড়া দেয় না, লাইব্রেরি পুড়ে যাওয়া যেন কেবল আরেকটি পরিসংখ্যান।

সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় সম্ভবত এই—মানুষ ধীরে ধীরে ভয়াবহতার সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে, ঠিক যেমন ‘জোন অব ইন্টারেস্ট’-এর পরিবারটি দেয়ালের ওপারের মৃত্যুপুরীর সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিল। তারা প্রতিদিন ধোঁয়া দেখত, শব্দ শুনত, তবু নিজেদের বাগানের ফুল নিয়েই ব্যস্ত থাকত। আজও বিশ্বরাজনীতির বহু ক্ষমতাধর রাষ্ট্র সেই একই স্বাভাবিকতার অভিনয় করছে। তারা মানবাধিকারের ভাষণ দিচ্ছে, আবার একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের ঘটনাকেও নীরবে মেনে নিচ্ছে। কারণ এখানে বর্বরতা শুধু ট্যাংক বা বোমার ভেতর নেই; এটি ধীরে ধীরে মানুষের নৈতিক অনুভূতিকেও ভোঁতা করে দিচ্ছে।

কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সবকিছুর হিসাব রাখে। যে সভ্যতা জ্ঞানের আলো নিভিয়ে দিতে চায়, শেষ পর্যন্ত সে নিজেও অন্ধকারের ভেতর ডুবে যায়। নাৎসি জার্মানি সামরিক শক্তিতে ভয়ংকর ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিকে ছিল বই, গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয় আর মানুষের স্মৃতি। হিটলার আজ ইতিহাসের ঘৃণিত চরিত্র; কিন্তু আইনস্টাইন, হাইজেনবার্গ, হান্না আরেন্ট কিংবা গটিঙ্গেনের গণিতবিদদের নাম এখনো মানবসভ্যতার আলো হয়ে আছে।

আর তাই আজকের এই যুদ্ধেও শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ভূখণ্ডের নয়; প্রশ্নটি হলো—মানুষ কি জ্ঞানের পক্ষে থাকবে, নাকি অন্ধ শক্তির পক্ষে? বিশ্ববিদ্যালয় কি ভবিষ্যৎ নির্মাণের জায়গা থাকবে, নাকি যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠবে?

‘জোন অব ইন্টারেস্ট’-এর শেষ দৃশ্যে ক্যামেরা যেন আমাদের দিকেই তাকিয়ে থাকে। আমরা কি সেই দেয়ালের পাশের মানুষগুলোর মতো হয়ে যাচ্ছি, যারা ধোঁয়া দেখে, আর্তনাদ শোনে; কিন্তু নিজেদের স্বাভাবিক জীবনেই ব্যস্ত থাকে। নাকি এখনো পৃথিবীতে এমন মানুষ আছে, যারা বিশ্বাস করে—‘একটি বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস হওয়া মানে পুরো মানবসভ্যতারই পরাজয়?’

লেখক : সাংবাদিক

শিক্ষাব্যবস্থার বিপর্যয় ও মানহীন বিশ্ববিদ্যালয়

শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে অস্ট্রেলিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা

অর্থনীতির গতি ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি

‘মৌলবাদী অর্থনীতি’ থেকে ইসলামি ব্যাংকিং

ভবদহ জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান

ইরান যুদ্ধ গুঁড়িয়ে দিয়েছে আমিরাতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা

‘কিচেন ক্যাবিনেট’ সংস্কৃতির গতিপ্রকৃতি

শিক্ষাবিদ ও সংস্কারক প্রফেসর মুহাম্মাদ আব্দুল বারী

দেশ আর ৫ আগস্টের আগে ফিরবে না

রামিসা-লামিয়াদের জন্য শোকগাথা