হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্গঠন : কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত

অঞ্জন মজুমদার

ছবি: সংগৃহীত

অতীতকাল থেকে বাংলাদেশের বর্তমানের অর্থনীতির প্রকৃত ভিত গড়ে উঠেছে গ্রামীণ জনপদকে কেন্দ্র করে; কৃষি, প্রাণিসম্পদ, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং নারীশক্তিনির্ভর পারিবারিক উৎপাদন—সব মিলিয়ে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা নির্ভর করে এই গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর কিন্তু বাস্তবতা হলো—গ্রামীণ জনপদের বিশাল শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ এখনো ‘লুকায়িত কর্মসংস্থান’-এর মধ্যে আটকা পড়েছে—অর্থাৎ তারা কাজ করছেন কিন্তু উৎপাদনশীলতা কম, আয় সীমিত এবং দক্ষতার ঘাটতির কারণে তাদের শ্রমের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অদক্ষতা শুধু ব্যক্তিগত আয়ের ক্ষেত্রেই বাধা নয়; বরং জাতীয় অর্থনীতির (জিডিপি) গতিকেও শ্লথ করে দিচ্ছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্গঠনে এখন সময়োপযোগী ও টেকসই একটি মডেলের প্রয়োজন—আর সেই জায়গায় সার্কুলার ইকোনমি একটি শক্তিশালী সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ এক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক রূপান্তরের পথে এগোচ্ছে। সরকারের সাম্প্রতিক গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ—গ্রামীণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, কৃষক কার্ড চালু, খাল খনন, প্রাকৃতিক জলাশয়ের পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার, স্থানীয় প্রজাতির মাছ উৎপাদন বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষিব্যবস্থা—গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তিকে নতুনভাবে গড়ে তুলবে। একই সঙ্গে গ্রামে মূল্য সংযোজনভিত্তিক পণ্য উৎপাদন এবং বাজার সংযোগ উন্নয়নের পরিকল্পনাও বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। বর্তমান উদ্যোগগুলো যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে আগামীর বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামই একটি সম্ভাবনাময় উৎপাদন হাবে পরিণত হতে পারে।

গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম বড় সমস্যা হলো অদক্ষ ও অপ্রকাশিত কর্মসংস্থান। অনেক ক্ষেত্রে একই জমিতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শ্রমিক নিয়োজিত থাকেন বা অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় এবং প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ পশুপালন, ক্ষুদ্র খামারি বা কৃষক তেমন ব্যবহার করছেন না, যার ফলে উৎপাদন তেমন বাড়ে না। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও আয় বাড়ে না এবং গ্রামীণ উৎপাদক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। দেশের বাস্তবতায় প্রয়োজন শ্রমশক্তিকে দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বাজারমুখী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা—অর্থাৎ অদৃশ্য বা ‘লুকায়িত শ্রমশক্তি’কে ‘উৎপাদনশীল সম্পদে’ রূপান্তর করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সার্কুলার ইকোনমি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি কার্যকর পথ দেখায়, এই অর্থনৈতিক মডেলে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করা হয় এবং উৎপাদন-ব্যবহার-পুনর্ব্যবহার—এই চক্রের মাধ্যমে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়। বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাত থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জৈববর্জ্য উৎপন্ন হয়। সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই বর্জ্য থেকে বায়ো-সার, জৈব জ্বালানি, এমনকি নতুন পণ্য তৈরি করা সম্ভব। ফলে একদিকে যেমন পরিবেশদূষণ কমে, অন্যদিকে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।

শিক্ষিত তরুণদের জন্য গ্রামীণ স্টার্টআপ এখন একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। পোলট্রি লিটার বা বিষ্ঠা, গরুর গোবর, কৃষিবর্জ্য ও গৃহস্থালির উচ্ছিষ্ট, কাঁচাবাজারের শাকসবজির পরিত্যক্ত অংশ, মাছ বাজার ও কসাইখানার বর্জ্য এবং ফুড ফ্যাক্টরির বায়োডিগ্রেডেবল বর্জ্য ব্যবহার করে জৈবসার উৎপাদন, হাঁস-মুরগি ও গবাদি পশু পালন, ডিম ও দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ, গ্রেডিং-প্যাকেজিং এবং স্থানীয় ব্র্যান্ড তৈরি—এসব উদ্যোগ গ্রামে নতুনভাবে অর্থনৈতিক গতি সঞ্চার করতে পারে। পাশাপাশি ফল ও সবজি সংরক্ষণ, ডিহাইড্রেশন, কোল্ড স্টোরেজ এবং আধুনিক প্যাকেজিং ব্যবস্থা গড়ে তুললে পণ্যের মূল্য সংযোজন বাড়বে এবং উৎপাদক অধিক লাভবান হবেন।

বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন গ্রামীণ অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা। গোবর ও জৈববর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদনের মাধ্যমে গ্রামীণ পরিবারে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি সরবরাহ করা সম্ভব। ক্লাস্টারভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকায় বায়োগ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে গ্রামে শক্তির স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করা যাবে, একই সঙ্গে এটি নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সার্কুলার ইকোনমি ডেভেলপমেন্ট ও গ্রামীণ জনপদের জীবনমানের পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে নারী ও যুবশক্তি। গ্রামীণ নারীরা ইতোমধ্যেই পোলট্রি, প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। অন্যদিকে যুবসমাজ প্রযুক্তি, ই-কমার্স, লজিস্টিকস এবং ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে গ্রামীণ পণ্যকে শহরের বাজারে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সঠিক প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন এবং নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এই দুই শক্তিই গ্রামীণ অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।

গ্রাম-নগর সংযুক্তি এই পুরোব্যবস্থার একটি অপরিহার্য উপাদান। গ্রামে উৎপাদিত পণ্য যদি সহজে এবং দ্রুত শহরের বাজারে পৌঁছাতে পারে, তবে উৎপাদক ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং ভোক্তাও মানসম্মত পণ্য পাবেন। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা (ট্র্যাকিং সিস্টেমযুক্ত), কোল্ড চেইন, লজিস্টিক নেটওয়ার্ক এবং ডিজিটাল মার্কেট প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে একটি কার্যকর সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলা সম্ভব; এতে মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব কমবে এবং উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হবে।

দক্ষ সরবরাহ সংযুক্তি শুধু পণ্য পরিবহনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি জ্ঞান, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের প্রবাহও নিশ্চিত করবে। শহরের প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ গ্রামে পৌঁছাবে, অন্যদিকে গ্রামের উৎপাদন করা পণ্য শহরে প্রবাহিত হবে—এর ফলে সারা দেশে একটি বিস্তৃত ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠবে, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে গ্রাম থেকে শহরে অপ্রয়োজনীয় ও উদ্দেশ্যহীন অনিশ্চিত অভিবাসন কমবে এবং নগর জীবনের ওপর চাপ হ্রাস পাবে।

সরকারের ভিশনারি উদ্যোগের মাধ্যমে সার্কুলার অর্থনীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতের উৎপাদন বাড়বে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ সম্প্রসারিত হবে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং আমদানিনির্ভরতা কমবে। দীর্ঘ মেয়াদে এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিও ত্বরান্বিত করবে এবং দেশের বৈচিত্র্যময় রপ্তানিমুখী অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করবে।

তবে আগামী দিনে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। যেমন—গ্রামীণ স্টার্টআপ ফান্ড গঠন, কৃষক ও খামারিদের জন্য স্মার্টকার্ড চালু, উপজেলাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, কোল্ড স্টোরেজ ও লজিস্টিক হাব নির্মাণ এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতি প্রণয়ন। পাশাপাশি ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস উন্নয়ন, গ্রিন সার্কুলার ইকোনমি ডেভেলপমেন্টের জন্য গবেষণা খাতে বরাদ্দ এবং সহজ অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত প্রয়োজন।

অনাগত ভবিষ্যতে গ্রামীণ বাংলাদেশের লুকায়িত বা অদৃশ্য গ্রামীণ কর্মসংস্থানকে দৃশ্যমান ও উৎপাদনশীল শক্তিতে রূপান্তর করতে হলে সার্কুলার ইকোনমি এবং গ্রাম-নগর সংযুক্তিকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর, স্থানীয় উদ্যোগকে শক্তিশালী করা এবং বাজার সংযোগ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। সবুজ সার্কুলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের গ্রামীণ অর্থনীতি হবে হাজারো জনপদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাময় নতুন দিগন্ত।

লেখক : কৃষিবিদ, গ্রিন সার্কুলার ইকোনমি স্পেশালিস্ট

দলমুক্ত শিক্ষাঙ্গন থেকে জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রের পথে

জনগণের নৈতিক পুনর্গঠন : উত্তরণের রূপরেখা

ইরান যুদ্ধে ডলার-ইউয়ান প্রতিযোগিতা

সংকটে বিশ্ব আর আমাদের প্রস্তুতি

ক্ষমতা বনাম জনগণ : ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

সিফফিনের প্রশ্ন—জুলাইয়ের উত্তর : পথের দ্বন্দ্ব

বিশ্বজুড়ে স্লোগান উঠুক ‘নো কিংস’

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন : সরকারের দায় ও বাস্তবতা

মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ও করণীয়

কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবনভিত্তিক শিক্ষা মডেল