হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

আমলাতন্ত্র ও জনতার সচিবালয়

এলাহী নেওয়াজ খান

দীর্ঘ ১৯ বছর পর গত ৫ এপ্রিল বাংলাদেশ সচিবালয়ে ঢুকে একটু অবাকই হলাম। মনে হলো অন্য এক সচিবালয় দেখছি। ১৯ বছর আগে এমনটা দেখিনি। হতে পারে এই দীর্ঘ সময়ে জনসংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সেইসঙ্গে সচ্ছল মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে অনেক; কিংবা সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুরই যে পরিবর্তন ঘটে গেছে, তারই নিদর্শন দেখলাম সচিবালয়ে। অথবা রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে এমনই দৃশ্যপট ফুটে ওঠে।

সচিবালয়ে ঢুকতে প্রথম বিস্ময় হলো, ভেতরে শত শত গাড়ির সমাহার। পরিস্থিতিটা এমন যে, একজন কর্মকর্তা গাড়ি নিয়ে বের হয়ে আবার ফিরে এসে দেখেন তার জায়গাটা অন্য একটি গাড়ি দখল করে ফেলেছে। আমি এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার গাড়িতে চড়ে ভেতরে ঢুকছিলাম, সেটার ড্রাইভার ওভাবে কথাটা বলল। এখানে উল্লেখ করতে হয়, এসব গাড়ির মধ্যে দর্শনার্থীদের দু-চারটা ছাড়া বাকি সব গাড়ির মালিক সচিবালয়ের কর্মকর্তারা। ফ্যাসিবাদের ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সরকারের বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এসব গাড়ির মালিক হয়েছেন।

সুতরাং ১৯ বছর আগে যারা সচিবালয় দেখেছেন, তারা আজ সেখানে ঢুকে এত গাড়ি দেখে অবাকই হবেন। কারণ তখন এত গাড়ি ছিল না। তখন ওই ধরনের কর্মকর্তারা একসঙ্গে কয়েকজন মিলে মাইক্রোবাসে করে অফিসে আসতেন। এখন বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত হয়ে ওই কর্মকর্তারাই গাড়ির মালিক হয়েছেন। ফলে গাড়ির এই মহাসমারোহ সচিবালয়ে। দেখে মনে হয়, সচিবালয় যেন রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গাড়ি পার্কিং জোন। এ থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়, কর্তৃত্ববাদী শাসনকালে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ভয়াবহ অবনতি ঘটলেও আমলাতন্ত্রের ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে। তবে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েমের ক্ষেত্রে আমলারা কতটা ভূমিকা রেখেছিলেন, তা নিয়ে এখনো কোনো গবেষণা হয়নি।

কিন্তু ফ্যাসিবাদ ও আমলাতন্ত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে সচরাচর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে থাকেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। যেমন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ফ্যাসিবাদ তার কার্যকারিতার জন্য আমলাতন্ত্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে, যা নৈর্ব্যক্তিক প্রশাসনিক কাঠামোকে সর্বাত্মকবাদী নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি এবং গণহত্যামূলক নৃশংসতার হাতিয়ারে পরিণত করে। আর ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য তো একটি অনমনীয়, অনুগত এবং প্রায়ই জবাবদিহিতাহীন প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়ই।

এ ব্যাপারে জার্মান-আমেরিকান ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক, যাকে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেই হান্না আরেনডট মনে করেন, ফ্যাসিবাদী অপরাধ প্রায়ই কোনো উন্মাদ খলনায়কদের দ্বারা সংঘটিত হয় না; বরং সাধারণ আমলাদের দ্বারা সংঘটিত হয়, যারা গতানুগতিক কাগজপত্রের মাধ্যমে গণহত্যা পরিচালনা করে। বাংলাদেশের বেলায় এ ব্যাপারে একটা ব্যাপকভাবে গবেষণা হওয়া উচিত। কারণ যে দেশের আমলাদের অনেকে ১৯৭১ সালে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও ২৫ মার্চের গণহত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে পাকিস্তান সরকারের পক্ষ ত্যাগ করে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, সে দেশের আমলারা ফ্যাসিবাদ কায়েমে কতটা ভূমিকা রেখেছিলেন, তা নির্ধারণ হওয়া দরকার।

এরপর দ্বিতীয় বিস্ময় হচ্ছে, মন্ত্রীদের কক্ষ ও বাইরের করিডোরে জনতার ঢল। প্রতিদিন অফিস সময়ে সারাক্ষণ গিজগিজ করতে থাকে মানুষ আর মানুষ। বিশেষ করে বিএনপির কেন্দ্রীয় সিনিয়র নেতারা যারা মন্ত্রী হয়েছেন, তাদের কক্ষগুলোতেই নানা সমস্যায় ভোগা মানুষের সমাগম ঘটে বেশি। হতে পারে, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পর একটি গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে রাষ্ট্রের এই প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্রটি যেন প্রাণ খুঁজে পেয়েছে। প্রতিদিন অফিস টাইমে সারা দেশ থেকে হাজার হাজার নানা স্তরের মানুষ আসে এখানে নানা সমস্যার সমাধান পেতে। অর্থাৎ নানা ধরনের তদবির নিয়ে তারা আসে।

সম্প্রতি পত্রিকান্তরে প্রকাশিত একটি খবরে দেখলাম, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সকাল ৯টা থেকে শুরু করে রাত ১২টা পর্যন্ত খালি তদবির। আর সেই তদবিরগুলোর সবই হচ্ছে পোস্টিং। হয়তো তারই প্রতিচ্ছবি দেখলাম ওদিন মন্ত্রীদের রুমে। দলে দলে লোক আসছে, ঢুকে পড়ছে মন্ত্রীর কক্ষে; যেন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। মন্ত্রীর বিশাল টেবিল ঘিরে তারা দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ একজন ঢুকলে তার পক্ষে মন্ত্রীকে দেখা অসম্ভব; কারণ তাকে ঘিরে আছে সবাই।

তবে অবাক হওয়ার বিষয় হচ্ছে, মন্ত্রীদের ধৈর্য। বেপরোয়া এই তদবিরকারকদের সামাল দিতে কাউকে বিরক্ত হতে দেখলাম না। ধৈর্যের সঙ্গে সবার কথা শুনছেন এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন। সেদিন আমি গিয়েছিলাম স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের অফিসে। অনেকক্ষণ বসে বসে দেখলাম মানুষ নিয়ন্ত্রণের এই অসাধারণ কৃতিত্ব। হয়তো বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার মানুষের অভিযোগ কিংবা নানা পরামর্শ শুনতে শুনতে রাজনৈতিক নেতারা এমনভাবে অভ্যস্ত হয়ে যান যে, বিরক্তি তাদের গায়ে সয়ে গেছে।

তবে বিএনপির অনেকে মনে করেন, দলের পুরোনো মন্ত্রী যারা, কিংবা কেন্দ্রীয় নেতা যারা মন্ত্রী হয়েছেন, তাদের অফিসগুলোয়ই নেতা-কর্মীদের এ রকম ভিড় সবচেয়ে বেশি। যারা এ ধরনের নয়, তাদের সঙ্গে তো দলের নেতা-কর্মীদের সম্পর্ক নেই বললেই চলে। বর্তমান ক্যাবিনেটে এ রকম মন্ত্রী অনেক আছেন, যাদের সঙ্গে সারা দেশের নেতা-কর্মীদের সংযোগ নেই। এ রকম উপদেষ্টাও অনেক আছেন। আর এ কারণেই সিনিয়র মন্ত্রীদের কক্ষে ভিড় বেশি।

তাই কথায় কথায় সবার কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় নেতা হিসেবে পরিচিত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বললেন, বিএনপির নেতা-কর্মীরা দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সীমাহীন নির্যাতনের শিকার হয়েছে, জেল-জুলুম খেটেছে; সুতরাং দল ক্ষমতাসীন হওয়ায় তারা কিছু প্রত্যাশা নিয়ে মন্ত্রীদের কাছে আসতেই পারে। তবে বিএনপির আগের সরকারের আমলে এমনটা দেখা যায়নি। অর্থাৎ আমি বলছি সেই ১৯ বছর আগের কথা। তখন মূলত এমপিরা নিজ এলাকার নানা সমস্যা নিয়ে মন্ত্রীদের কাছে আসতেন। হয়তো এখন সময় বদলে গেছে। বিশেষ করে যোগাযোগব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতির ফলে অনেক জেলার মানুষ দিনে দিনে ঢাকায় এসে বাড়ি ফিরে যেতে পারে। আগে এমনটা সম্ভব ছিল না। এ কারণেও প্রত্যেক মন্ত্রীর নির্বাচনি এলাকা থেকে অনেক লোক নানা সমস্যা নিয়ে উপস্থিত হয় প্রতিদিনই—হয় অফিসে, না হয় বাসায়।

তবে ওইদিন সচিবালয় ঘুরে এটা মনে হয়েছে যে, মন্ত্রীরা অফিসে দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ ছাড়াও নেতা-কর্মীদের অভিযোগ যেমন শুনছেন, তেমনি তারা ও সংসদ সদস্যরা পার্লামেন্টে নানা ধরনের আইন পাসে ব্যস্ত আছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন আমলের সীমাহীন দুর্নীতি ও অর্থপাচার নিয়ে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ বা সংসদে আলোচনা করতে দেখা যায়নি। এমনকি সংবাদপত্রেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক সিরিজ প্রতিবেদনও চোখে পড়েনি। যদিও আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের শক্তিশালী অভিযোগ রয়েছে। আমরা জানি না, সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে আমরা আশা করব, সরকার অচিরেই দুর্নীতির ব্যাপারে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করবে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

নতুন সময়সূচি ও অর্থনীতিতে প্রভাব

নাতিশীতোষ্ণতার সন্ধানে

জ্বালানিনির্ভরতা ও জাতীয় নিরাপত্তা সংকট

ইরান যুদ্ধ পেট্রোডলারের জন্যও বড় পরীক্ষা

হজ ব্যবস্থাপনায় সংস্কার

আমেরিকা কি গণতান্ত্রিক নাকি টেকনো-প্লুটোক্রেটিক রাষ্ট্র

দলমুক্ত শিক্ষাঙ্গন থেকে জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রের পথে

গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্গঠন : কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত

জনগণের নৈতিক পুনর্গঠন : উত্তরণের রূপরেখা

ইরান যুদ্ধে ডলার-ইউয়ান প্রতিযোগিতা