হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

কেন উত্থান হচ্ছে ককরোচ জনতা পার্টির

সৌম্যজিৎ ভার

সেদিন খবরের কাগজে চোখ বুলিয়ে বেশ চমকে উঠলাম। মাত্র চার দিনের ব্যবধানে ভারতের বুকে এক অদ্ভুত রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়েছে। এরা নিজেদের নাম দিয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। বাংলায় বললে দাঁড়ায়—তেলাপোকা জনতা পার্টি। অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই চার দিনেই তারা যে পরিমাণ অনুসারী বা ফলোয়ার জুটিয়ে ফেলেছে, প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর সেই জায়গায় পৌঁছাতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিম পেজ, ইনস্টাগ্রাম রিল আর আধা-কৌতুক জড়ানো রাজনৈতিক কথাবার্তা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। চারদিকে এক তুমুল আলোড়ন। অনেকেই এর সঙ্গে বাংলাদেশ ও নেপালের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির তুলনা করতে শুরু করলেন। ওই দেশগুলোয়ও তরুণদের ডিজিটাল মাধ্যমের ক্ষোভ কীভাবে যেন এক হয়ে গিয়েছিল। তারা চিরাচরিত রাজনৈতিক খোলসটাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এখন অনেকেই ভাবছেন, এটাই কি তবে রাজনীতির ভবিষ্যৎ? একটা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া এবং আবেগের বিস্ফোরণ? যেখানে দীর্ঘমেয়াদি কোনো আদর্শ থাকবে না, শুধু থাকবে সাময়িক কিছু প্রতীকী শত্রু আর পুঞ্জীভূত যৌথ ক্ষোভ।

এই উত্তেজনা অবশ্য এমনি এমনি তৈরি হয়নি। এর পেছনে কারণ আছে। আজকের তরুণ প্রজন্ম প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি থেকে নিজেদের বড্ড বিচ্ছিন্ন মনে করে। তাদের প্রতিদিনের জীবনের যে বিশুদ্ধ উদ্বেগ—চাকরি না পাওয়া, ক্যারিয়ারের অনিশ্চয়তা, এক ধরনের গভীর নিরাপত্তাহীনতা আর ক্লান্তি—তার সঙ্গে এই রাজনীতির কোনো যোগসূত্র নেই। সোশ্যাল মিডিয়া এখানে একটা জাদুর মতো কাজ করে। একা একা ঘরে বসে যে তরুণ নিজেকে বড্ড অসহায় আর বিচ্ছিন্ন ভাবত, সে হঠাৎ করেই একটা যৌথ আবেগের জোয়ারে ভেসে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়। একটা ছোট্ট মিম কিংবা একটা স্লোগান মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাকে মনে করিয়ে দেয়—আরে, আমিও তো রাজনীতির অংশ!

যৌথ সামাজিক জীবনের অবক্ষয়

আসল সংকট কিন্তু শুধু প্রতিষ্ঠানের পতন কিংবা রাজনৈতিক আদর্শের ক্লান্তি নয়। সংকট আরো গভীরে। আমাদের যে একটা যৌথ সামাজিক জীবন ছিল, সেটি দিন দিন ক্ষয়ে যাচ্ছে। মানুষের পাবলিক লাইফ বা সামাজিক মেলবন্ধনের জায়গাগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। যে জায়গাগুলোয় মানুষ একসময় দল বেঁধে যেত, নিজেদের একটা বড় পরিবারের অংশ ভাবত, সেগুলো আজ ধ্বংসের মুখে।

একটা সময় ছিল যখন রাজনীতি গড়ে উঠত কলকারখানার শ্রমিক ইউনিয়ন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, পাড়ার ক্লাব কিংবা সাধারণ মানুষের রোজকার আড্ডার মধ্য দিয়ে। সেই কাঠামোগুলোর একটা ধারাবাহিকতা ছিল। মানুষের সেখানে একটা মানসিক বিনিয়োগ ছিল। ফলে রাজনীতি শুধু তাৎক্ষণিক উত্তেজনায় সীমাবদ্ধ থাকত না। অথচ আজকের সমাজ দিন দিন এমন সব মানুষ তৈরি করছে, যারা বড্ড একা। তারা মনে মনে একটা যৌথ ছাদ খোঁজে, একাত্ম হতে চায়, কিন্তু সেই ছাদটা ধরে রাখার মতো সামাজিক পরিবেশ আজ আর বেঁচে নেই।

হয়তো এটা আমাদের আধুনিকতারই একটা বড় স্ববিরোধিতা। ফরাসি বিপ্লবের পর স্বাধীনতার যে বাণী আমরা শুনেছিলাম, তা ছিল শৃঙ্খলমুক্তি আর যৌথ শাসনের গল্প। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানি বা তেলের ওপর ভর করে গড়ে ওঠা এই ভোক্তা সমাজে, স্বাধীনতার অর্থ বদলে গেছে। এখন স্বাধীনতা মানে শুধুই ব্যক্তিগত পছন্দের স্বাধীনতা। আপনি কী কিনবেন, কার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবেন, কীভাবে নিজের আখের গোছাবেন—এটাই স্বাধীনতা। মানুষের ব্যক্তিগত জীবন যত বড় হয়েছে, সামাজিক জীবন তত ছোট হয়ে এসেছে। এমন এক নিঃসঙ্গ সময়ে ডিজিটাল দুনিয়ার এই সুসংগঠিত ভিড় মানুষকে এক ধরনের মানসিক শক্তি দেয়। সাময়িকভাবে হলেও একাকিত্ব ভুলিয়ে দেয়। একটা সাধারণ শত্রু খাড়া করতে পারলে বিচ্ছিন্ন মানুষগুলো আবার নিজেদের একদল মনে করতে শুরু করে।

ঠিক এই জায়গাতেই আমাদের একটা জিনিস পরিষ্কার বোঝা দরকার—ডিজিটাল মাধ্যমে সবার একসঙ্গে গলা মেলানো আর সত্যিকারের পারস্পরিক সংহতি কিন্তু এক জিনিস নয়। আজকের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো কোটি মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলতে ওস্তাদ। একটা সাধারণ ক্ষোভ বা একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লাখ লাখ মানুষের আবেগকে একই বিন্দুতে নিয়ে আসা সম্ভব।

আন্তঃদেশীয় তুলনার ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন

আর এ কারণেই বাংলাদেশ বা নেপালের সঙ্গে এ ঘটনার তুলনা করার সময় আমাদের একটু সাবধানে ভাবা উচিত। অবশ্য ভেতরের মূল পরিস্থিতি কিন্তু খুব একটা আলাদা নয়। দুদেশেই আমরা দেখেছি, শুরুর দিকের সেই তাৎক্ষণিক ক্ষোভের আগুন একসময় গিয়ে কোনো না কোনো সুসংগঠিত রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। এলোমেলোভাবে ছুটে আসা মৌমাছির ঝাঁক কিন্তু চিরকাল এলোমেলো থাকেনি। তারা একসময় নতুন পথ খুঁজে নিয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে অথবা একসময় ক্লান্ত হয়ে থিতিয়ে গেছে। তার মানে দাঁড়ায়, সমস্যাটা শুধু কোনো নির্দিষ্ট দেশের ছাত্ররাজনীতি বা তরুণদের আন্দোলনের নয়। এর পেছনে রয়েছে একটা বড় কাঠামোগত প্রবণতা—মানুষের চরম একাকী হয়ে যাওয়া, সামাজিক জীবনের ভাঙন আর যৌথ প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা। এই রোগটা আজ পুরো বিশ্বজুড়েই কমবেশি দেখা যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি ইরান, ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা নিয়ে কিছু কথা বলা যায়। যেকোনো বিকেন্দ্রীকৃত বা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শক্তির টিকে থাকার ক্ষমতা তখনই তৈরি হয়, যখন তার পেছনে গভীর মানসিক ও বস্তুগত ভিত্তি থাকে। তাৎক্ষণিক সংঘাতের পরও যেন সেই শক্তি বেঁচে থাকতে পারে। শুধু ক্ষোভের ওপর ভর করে কোনো বিচ্ছিন্ন আন্দোলন অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না। কোনো কেন্দ্রীয় নির্দেশ ছাড়া যদি একটা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ব্যবস্থাকে ঠিকঠাক কাজ করতে হয়, তবে সবার সামনে একটা বড় লক্ষ্য থাকতে হবে। থাকতে হবে একটা যৌথ নৈতিক অঙ্গীকার, মানসিক ধারাবাহিকতা, ঐতিহাসিক স্মৃতি কিংবা স্থায়ী কোনো আদর্শের প্রতি টান। এই বিকেন্দ্রীকরণ বা ছড়িয়ে পড়াটা শুধু প্রযুক্তিগত বা সাংগঠনিক বিষয় নয়; এটা একই সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক এবং বাস্তবভিত্তিক।

আজকের ডিজিটাল রাজনীতিতে আমরা কী দেখছি? দেখছি অগাধ মানসিক শক্তি আর আবেগের জোয়ার, কিন্তু সেই আবেগ ধরে রাখার মতো যৌথ কাঠামোটা বড্ড নড়বড়ে। এই পরিস্থিতি দেখে ১৯৬৮ সালের মে মাসে ফ্রান্সে ঘটে যাওয়া ছাত্রবিক্ষোভের সময় ফরাসি দার্শনিক জাক লাকাঁর সেই বিখ্যাত মন্তব্যটি মনে পড়ে যায়। সে সময় বহু বুদ্ধিজীবী ভাবছিলেন, এই আন্দোলন বোধহয় মানুষকে পুরোপুরি মুক্ত করে দেবে। লাকাঁ তখন এক অস্বস্তিকর সত্য উচ্চারণ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘বিপ্লবী হিসেবে আপনারা আসলে যা খুঁজছেন, তা হলো একজন প্রভু এবং আপনারা তাকে পেয়েও যাবেন।’ লাকাঁ কিন্তু কথাটা স্রেফ উপহাস করে বলেননি। একটা পুরোনো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলেই যে কর্তৃত্বের চিরতরে অবসান ঘটে, তা নয়। মানুষের ভেতরের অবদমিত ইচ্ছাগুলো অনেক সময় নতুন কোনো নিশ্চিত আশ্রয় বা নতুন কোনো কর্তৃত্বের চারপাশে গিয়ে আবার জমাট বাঁধে।

যে সমাজে মানুষ চরম একাকী এবং মানসিকভাবে খণ্ডিত, সেখানে এই চিন্তাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যে রাজনীতি স্রেফ ‘বিরোধিতা’র ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকে, তার অস্তিত্ব টিকে থাকে মূলত সেই শত্রুর কারণেই। শত্রুর উপস্থিতিটাই ভিড়ের পরিচয়কে ধরে রাখে এবং সবাইকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে। কিন্তু আন্দোলন যখনই রাষ্ট্র পরিচালনার দিকে যায়, তখনই ভেতরের আসল ফাটলগুলো বের হয়ে পড়ে। নানা রকম আপস করতে হয় আর সেই চেনা সরল সমীকরণগুলো গুলিয়ে যায়। যে জনতা শুধু বিরোধিতার খাতিরে এক হয়েছিল, তারা তখন আবিষ্কার করে—সবাই মিলে একটা নতুন পৃথিবী গড়ে তোলা, ক্ষোভ প্রকাশের চেয়ে কোটি গুণ কঠিন কাজ।

এর পেছনে একটা গভীর বাস্তব ও বস্তুগত স্ববিরোধিতাও আছে। তেলের ওপর ভর করে গড়ে ওঠা এই আধুনিক উন্নয়ন শুধু মানুষকে একাকীই করে না, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণকেও চিরস্থায়ী করে। আমাদের বিদ্যুৎব্যবস্থা, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক, আর্থিক কাঠামো, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, এমনকি মেগাসিটিগুলো—সবকিছুই চলে এক বিশাল কেন্দ্রীয় সমন্বয় ও ক্ষমতার জোরে। মজার ব্যাপার হলো, যে প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করে মানুষ এই বিকেন্দ্রীকরণের স্বপ্ন দেখছে বা ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বলছে, সেই সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো নিজেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কেন্দ্রীয় প্রযুক্তি ব্যবস্থা।

কেন্দ্রীয় বিষয়

এটাই হলো আজকের প্রতিষ্ঠানবিরোধী রাজনীতির মূল স্ববিরোধিতা। মানুষ মন থেকে চাইছে ক্ষমতা ছড়িয়ে পড়ুক, সবাই স্বাধীন হোক। কিন্তু বাস্তবে সে বাস করছে এমন এক ব্যবস্থার মধ্যে, যা টিকে থাকার জন্যই কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। সাধারণ মানুষের ভিড় হয়তো ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে, কিন্তু সেই ক্ষমতাকে নতুন করে সাজাতে গেলে তাকে এমন এক বাস্তব ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয়, যা তাকে আবার সেই নিয়ন্ত্রণ আর বড় আকারের কেন্দ্রীয় কাঠামোর দিকেই ঠেলে দেয়। সমাজ যদি তার ভাঙা মন, নড়বড়ে প্রতিষ্ঠান আর সামাজিক জীবনের ভিত্তিগুলো নতুন করে গড়তে না পারে—যদি আবার পারস্পরিক বিশ্বাস, যৌথ দায়িত্ববোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার ফিরিয়ে আনা না যায়—তবে এই ক্ষণিকের একাত্মতা শুধু ক্ষোভের চক্রই তৈরি করে যাবে। স্থায়ী কোনো পরিবর্তন আসবে না।

আসল প্রশ্নটা এটা নয় যে, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এই জনমানুষের শক্তি হঠাৎ জেগে উঠতে পারে কি না। অবশ্যই পারে, তা আমরা দেখতেই পাচ্ছি। আসল প্রশ্ন হলো, আজকের সমাজের সেই ক্ষমতা আদৌ আছে কি না, যা এই ক্ষণিকের আবেগকে স্থায়ী সংহতিতে রূপ দেবে? যা তাৎক্ষণিক এই আন্দোলনকে এক দীর্ঘমেয়াদি যৌথ রূপ দিতে পারবে? নাকি প্রতিটা ভাঙনের পর ক্ষমতার নতুন নতুন কেন্দ্র তৈরি হবে আর জাক লাকাঁর সেই সতর্কবাণীর মতোই আমাদের সামনে হাজির হবে নতুন কোনো প্রভু?

লেখক: বিএমএল মুনজাল ইউনিভার্সিটির স্কুল অব লিবারেল স্টাডিজের সিনিয়র সহকারী অধ্যাপক।

দ্য হিন্দু অবলম্বনে জুলফিকার হায়দার

ঈদুল আজহার অর্থনীতি

প্রতিশ্রুতি ভাঙার রাজনীতি

বরকতময় আরাফার দিন

সংকটে টেকনাফের সীমান্ত সুরক্ষা

ভারতের গোয়েন্দা উচ্চাকাঙ্ক্ষায় বিপর্যয়

শুধু দোষারোপ নয়, জানতে হবে করণীয়

জুলাইয়ের ব্যর্থতা মানে বাংলাদেশের ব্যর্থতা

ক্ষমতার অন্ধকূপে তারুণ্যের আগুন

ঈদুল আজহার সেকাল ও একাল

হজের অর্থনীতি : হজ তহবিল কেন প্রয়োজন