হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

বিভেদের পাহাড় যেন মূল শত্রুকে আড়াল করে না ফেলে

মিনার রশীদ

মিনার রশীদ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস আমাদের বারবার একটি নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে—যখনই আমরা মূল শত্রুকে ভুলে গিয়ে নিজেদের মধ্যে বিভাজনে লিপ্ত হয়েছি, তখনই ফ্যাসিবাদ নতুন রূপে ফিরে এসেছে। আজ যখন এক দীর্ঘ দমন-পীড়নের অধ্যায় শেষে আমরা তুলনামূলকভাবে মুক্ত পরিসরে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি, তখন সবচেয়ে বড় বিপদটি হলো স্মৃতিভ্রংশ। বিভেদের পাহাড় যেন আবারও সেই মূল শত্রুকে আড়াল করে না ফেলে—এই সতর্কতা আজ সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি।

প্রথমটিকে ভুল বলা যাবে কি না জানি না, নাকি এটা ছিল উদারতার মাশুল? প্রথম বাকশালকে এদেশের গণতান্ত্রিক জনগণ উগলে দিয়েছিল! দেশের মানুষ ও গণতন্ত্রের জন্য ‘রেসকিউয়ার’ হিসেবে আবির্ভূত হলেন মাত্র ৩৯ বছর বয়সি জেনারেল জিয়াউর রহমান। পেশাগত পরিচয় ও চরিত্রে তার হওয়ার কথা ছিল গণতন্ত্রের জন্য যমদূত; কিন্তু তিনি বনে গেলেন গণতন্ত্রের রক্ষাদূত! কিন্তু সেই উদারতার মাশুল তিনি নিজের জীবন দিয়ে আদায় করে গেছেন। নিজে গণতন্ত্রের খাল কেটে যে কুমির আনলেন, সেই কুমির আসার ১৩ দিনের মাথায় তিনি নিহত হলেন। সেই কুমিরটি বোরকা পরে আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে কেন পার হতে চেয়েছিলেন, সেই প্রশ্নটির জবাবও এখনো মেলেনি।

এর পরের ঐতিহাসিক ভুলটি করল জামায়াত। জাতির জীবন থেকে যে ক্যানসার কোষটি নিঃশেষ হয়ে যেত, সেটাকেও এই গণতান্ত্রিক উত্তরণের মহৎ উদ্দেশ্যে আবার নতুন ‘লাইফ লাইন’ দেওয়া হলো! জামায়াতের বদান্যতায় আবার ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে এলো। প্রথম মেয়াদে (১৯৯৬-২০০১) নিজেদের একটু গুছিয়ে নিল। পরের দীর্ঘ মেয়াদে (২০০৯-২০২৪) আসল চেহারায় আবির্ভূত হলো। ক্ষমতায় এসে প্রথমেই ফাঁসিতে ঝুলাল তাদের সঙ্গে জামায়াতের পক্ষ থেকে যে দুজন সমন্বয় করতেন—কাদের মোল্লা আর কামরুজ্জামানকে! ইতিহাস বলে, আওয়ামী লীগকে যারাই উদ্ধার করে তাদেরই ছোবল মারে!

আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দীর্ঘ শাসনামলে সবচেয়ে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছে বিএনপি ও জামায়াত—এই দুটি রাজনৈতিক শক্তি। এটি কোনো দলীয় অভিযোগ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় দমননীতির দলিলভিত্তিক বাস্তবতা। হাজার হাজার নেতা-কর্মী গুম, খুন, কারাবন্দিত্ব ও ভয়াবহ নির্যাতনের মধ্য দিয়ে গেছেন। জামায়াতের ছয়জন শীর্ষ নেতাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো হয়েছে, আর বিএনপির একজন শীর্ষ নেতাকেও একই পরিণতির শিকার হতে হয়েছে। বিচার ছিল নামমাত্র; বাস্তবে এটি ছিল পরিকল্পিত রাজনৈতিক নিধন।

বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া—গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতীক—তাকে জীবনের শেষ গুরুত্বপূর্ণ বছরগুলো কাটাতে হয়েছে একাকী, নিঃসঙ্গভাবে। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায়ও তাকে জেলে বন্দি রাখা হয়েছিল। এটি শুধু একজন নেত্রীর প্রতি নিষ্ঠুরতা নয়; এটি ছিল একটি রাজনৈতিক শক্তিকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলার রাষ্ট্রীয় প্রয়াস।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও এই দমননীতির প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী। এক-এগারোর সময় তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম নির্যাতন করা হয়। এই অধ্যায় ভুলে যাওয়া মানে ইতিহাসকে অস্বীকার করা। কারণ এই এক-এগারো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। মতি-মাহফুজ যেমন দাবি করতেন এক-এগারো তাদের ‘ব্রেইন-চাইল্ড’, তেমনি শেখ হাসিনার দাবি ছিল—এক-এগারো ছিল তাদের আন্দোলনের ফসল। অর্থাৎ একটি অগণতান্ত্রিক হস্তক্ষেপকে তারা রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখেছিলেন। মতি-মাহফুজের সেই ‘ব্রেইন-চাইল্ড’ এবং শেখ হাসিনার সেই ‘আন্দোলনের ফসল’ই তারেক রহমানকে পঙ্গু বানিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল! মতি-মাহফুজের সেই ‘ব্রেইন-চাইল্ড’ এবং শেখ হাসিনার সেই ‘আন্দোলনের ফসল’ই ২০০৮ সালে ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায় বসিয়েছিল। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ একদলীয় শাসন, যেখানে রাষ্ট্র, প্রশাসন, নির্বাচন ব্যবস্থা ও বিচার বিভাগ কার্যত একটি দলের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

২০০৮ সালের নির্বাচন নিয়ে ম্যাডামের একটি মন্তব্য উল্লেখ না করে পারছি না। অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্য এসব অতীত ইতিহাস নিয়ে আত্মসমালোচনা ও পর্যালোচনা খুবই জরুরি! ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময়ে আমি শফি ভাইয়ের সঙ্গে ক্লোজলি কাজ করেছি। শফি ভাই ম্যাডামের অফিসে যেসব কাহিনি ঘটত, তা আমাদের কয়েকজনকে এসে বলতেন। ম্যাডাম তখন সেই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষে ছিলেন না! কিন্তু জামায়াতের তখনকার জেনারেল সেক্রেটারি ম্যাডামের ওপর চাপ দিতে থাকেন। কারণ জামায়াতের কনসার্ন ছিল, বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে দুই-তৃতীয়াংশ সিট নিয়ে আওয়ামী জোট সংবিধান সংশোধন করে ফেলবে! তখন মোজাহিদকে ম্যাডাম জবাব দিয়েছিলেন, ‘এভাবে নির্বাচনে অংশ নিলে আমাদের দেবে ৫০সিট এবং আপনাদের দেবে দুটি সিট। সেদিন ম্যাডামের কথামতো কাজ করলে সম্ভবত মোজাহিদকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হতো না, দেশকেও এত দীর্ঘ সময় ফ্যাসিবাদের কোপানলে পড়তে হতো না।

আমি নিশ্চিত যে জামায়াতের সাবেক জেনারেল সেক্রেটারির এই অবস্থান তার একার ছিল না। এটা ছিল জামায়াতের মজলিসে শুরার সম্মিলিত মতামত। কাজেই যেটা বলতে চাচ্ছি, এদেশের সবচেয়ে সফল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কিংবা জামায়াতের মজলিসে শুরাও ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন! তাদের বিপরীতে একজন নারী, তিনি আবার স্বশিক্ষিত, তার পর্যবেক্ষণও সঠিক হয়ে যেতে পারে।

এই মহীয়সী নারী এমন কিছু কাজ করেছেন, এমন কিছু কথা বলেছেন, যা তাকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে পরিণত করেছে। জীবনের সব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি সতর্ক করে গেছেন—‘সাপকে বিশ্বাস করা যায়, কিন্তু আওয়ামী লীগকে বিশ্বাস করা যায় না। তার এই ‘প্রফেটিক’ কথা অমান্য করলে আমরা আবারও চরম ভুল করব!’

আমাদের উচিত তার এই ইমেজটি ধরে রাখা। তিনি কোনো দলের সম্পদ না। তিনি জাতির সম্পদ। এখন আমাদের সবার ওপর দায়িত্ব বর্তেছে এই মহীয়সী নেত্রীকে এবং তার রেখে যাওয়া লিগ্যাসিকে ধারণ করা, তার স্মৃতিকে জাগরিত রাখা।

এ কারণেই দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরটিকে ‘বেগম খালেদা জিয়া পোর্ট’ রাখার প্রস্তাব করছি।

রাষ্ট্রগঠন ও জাতীয় ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সম্মানে সমুদ্রবন্দরের নামকরণ অনেক দেশেই করা হয়েছে। যেমন ভারতে রয়েছে Jawaharlal Nehru Port, যা ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর নামে; ইরানে রয়েছে Imam Khomeini Port, ইসলামি বিপ্লবের নেতা ইমাম খোমেনির নামে; মিসরের ঐতিহাসিক Port Said-এর নামকরণ হয়েছে শাসক সাঈদ পাশার নামে। করাচির যে আধুনিক বন্দরটির কথা সাধারণত বলা হয়, সেটি হলো Port Qasim, যার নামকরণ করা হয়েছে আরব সেনানায়ক মুহাম্মাদ বিন কাসিমের নামে। তিনি অষ্টম শতকে সিন্ধু বিজয়ের মাধ্যমে উপমহাদেশে ইসলামের সূচনা করেন।

মরিশাসের রাজধানী ও প্রধান সমুদ্রবন্দর Port Louis-এর নামকরণ করা হয়েছে ফ্রান্সের রাজা Louis XV-এর নাম অনুসারে। দক্ষিণ আফ্রিকার Port Elizabeth শহরের নাম রাখা হয়েছিল ব্রিটিশ রাজপরিবারের Princess Elizabeth-এর নামানুসারে। একইভাবে আর্জেন্টিনার Puerto San Martín-এর নামকরণ করা হয়েছে দেশটির স্বাধীনতার নায়ক José de San Martín-এর নাম অনুসারে। এই আন্তর্জাতিক নজিরগুলোর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের নাম ‘বেগম খালেদা জিয়া পোর্ট’ রাখা হলে তা বৈশ্বিক রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, ঐতিহাসিকভাবে যৌক্তিক এবং সর্বোপরি জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে এই মহীয়সী নারীর মর্যাদার যথাযথ ও সঠিক প্রতিফলন হবে।

আওয়ামী লীগ কি আবার ফিরে আসতে পারবে?

এই ভূখণ্ডের মানুষের সম্মুখে দুটি ঝুঁকি রয়েছে। একটি পরিবেশগত ঝুঁকি—যেমন, গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে দেশের নিম্নাঞ্চল পানিতে ডুবে যাওয়া এবং মিঠা পানির সম্ভাব্য সংকট। একইভাবে রাজনৈতিক ঝুঁকিটি হলো, আওয়ামী লীগের আবার ফিরে আসা। মুষ্টিমেয় কতিপয় মানুষ বেখেয়াল বা তাদের সহযোগী হলেও অধিকাংশ মানুষ এটা জীবন দিয়ে প্রতিরোধ করবে—এটাই আমার দৃঢ় বিশ্বাস!

একটি জাহাজে আপৎকালীন মুহূর্তের জন্য ছোট ছোট লাইফবোট থাকে, কিন্তু দায়িত্বশীল নাবিকেরা জাহাজটিকেই লাইফবোট হিসেবে ধরে নিয়ে সর্বোচ্চ যত্নে তা রক্ষণাবেক্ষণ করেন। ঠিক তেমনই গুটিকয়েক ব্যতিক্রম ছাড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে নিজেদের লাইফবোট জ্ঞান করে জীবন দিয়ে আগলে রাখবে। কারণ এটি কেবল একটি রাজনৈতিক অবস্থান নয়, এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন।

বাস্তবতা হলো, আওয়ামী লীগ কখনোই এ দেশের স্বার্থভিত্তিক একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক দল ছিল না; বরং এটি ছিল ভারতীয় স্বার্থ রক্ষায় লালিত একটি মিশনারি কাঠামো। তবে তাদের সাধারণ অনুসারীদের একটি বড় অংশ নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ধীরে ধীরে বিএনপি ও জামায়াতে বিলীন হয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক রাজনৈতিক রূপান্তর। গত নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত উভয়েই এই ভোটব্যাংক নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করেছিল, ফলে দুই দল বা জোটের মধ্যে কিছুটা মনোমালিন্য ও টেনশন তৈরি হয়েছিল। তখন আশঙ্কা ছিল, গুপ্ত আওয়ামী শক্তি নির্বাচনের সময় বড় ধরনের সংঘাত উসকে দেবে; কিন্তু তারা তা করতে পারেনি—ভবিষ্যতেও পারবে না।

কারণ আওয়ামী লীগের এই দমন-নিপীড়ন বারবার আমাদের স্মৃতিতে চলে আসবে, এগুলো কখনোই স্মৃতি থেকে মুছে যাবে না! এই দমননীতির আরেকটি নীরব অথচ ভয়াবহ অধ্যায় ছিল নির্বাসন। বিরোধী দলের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী ঢাকায় কিংবা নিজ এলাকায় থাকতে পারেননি। কেউ রিকশা চালিয়ে কেউ দিনমজুরি করে অন্য এলাকায় জীবন নির্বাহ করেছেন। আবার অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে বিদেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য হন। তাদের একটি বড় অংশ আশ্রয় নিয়েছিলেন মালয়েশিয়ায়।

সিঙ্গাপুর থেকে আমিও প্রায়ই কুয়ালালামপুরে চলে যেতাম অনেকগুলো প্রিয় মুখের সঙ্গে দেখা করতে। সেখানে গিয়ে দেখা হয়েছে আমার দেশ সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান, ড. এহসানুল হক মিলন ভাই, বিএনপি নেতা কায়কোবাদ ভাই, কাইয়ূম ভাই এবং সেই সাহসী বিচারক মোতাহার হোসেনের সঙ্গে, যিনি তারেক রহমানকে বেকসুর খালাস দেওয়ার ‘অপরাধে’ দেশছাড়া হয়েছিলেন।

শুরুর দিকে আমি বিশেষভাবে যেতাম এহসানুল হক মিলন ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে। নির্বাসনের সময়টুকু তিনি অপচয় করেননি; বরং মালয়েশিয়ার স্বনামধন্য ‘International Islamic University Malaysia’-এ পিএইচডি শুরু করেছিলেন। একই কাজ মাহমুদ ভাইও করেছেন! রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মধ্যেও জ্ঞানচর্চা ও আত্মগঠনের এই দৃশ্য ছিল এক ধরনের নীরব প্রতিবাদ। জীবনের শুরুতেই শিক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত হওয়ায় দেশ থেকে নকলের অভিশাপ যিনি দূর করেছিলেন, তার প্রতি অন্য রকম একটা শ্রদ্ধা কাজ করত। কষ্ট পেলাম যখন শুনলাম, এই লোকটিকে তার প্রতিপক্ষ অন্য অনেক মামলার সঙ্গে ঘড়ি চুরির মামলাও দিয়েছে!

একদিন জোর করে মিলন ভাই তার বাসায় নিয়ে যান। ষাটোর্ধ্ব এক ছাত্র, নিজেই রান্না করে খাওয়ালেন এবং ঘুমানোর আগ পর্যন্ত দেশটিকে ঘিরে নানা স্বপ্নের কথা বললেন! ফেরারি হয়ে সাবেক মন্ত্রী আবার ছাত্র সেজেছেন। আমেরিকার সিটিজেনশিপ নিয়মমতো আগেই সারেন্ডার করেছিলেন। সেই মিলন ভাই, সেই কায়কোবাদ ভাই বর্তমান সরকারে জায়গা পেয়েছেন। বিরোধী দলে বসেছেন সেই মঞ্জু ভাই, যার সঙ্গে মাহমুদ ভাই ও আমি বিকালে হাঁটতে বের হতাম। পঞ্চাশের এদিক-ওদিক থাকা মঞ্জু ভাই ও আমি ষাটের শেষ দিকে থাকা মাহমুদ ভাইয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে কষ্ট হতো। সেই মঞ্জু ভাইয়ের বর্তমান দল (এবি পার্টি) এবং আগের দল (জামায়াতে ইসলামী) বিরোধী দলে জায়গা নিয়েছে।

জানি না, আমাদের সবার সুখময়/দুঃখময় সেই স্মৃতিগুলো আমাদের একটা সুতায় বেঁধে রাখতে পারে কি না! প্রিয় জন্মভূমির জন্য এই সুতাটি খুবই দরকার। এই সুতার বাঁধনের মাঝেই আমরা একজন আরেকজনের প্রতিপক্ষ—একজন আরেকজনের শত্রু নই।

আজ সেই দুই দল—বিএনপি ও জামায়াত এক নতুন বাস্তবতায় অবস্থান করছে। একটি দল সরকার গঠন করেছে, অন্যটি বিরোধী দলে। এটি গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে যদি বিভেদ ও তিক্ততা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যা আবারও আওয়ামী লীগের ফিরে আসার পথ তৈরি করে দেয়, তবে সেটি হবে ইতিহাসের প্রতি ভয়াবহ বিশ্বাসঘাতকতা।

আমরা যেমন দায়িত্বশীল সরকার চাই, তেমনি চাই শক্তিশালী ও গঠনমূলক বিরোধী দল। সরকার যদি জবাবদিহিতার বাইরে চলে যায়, তাহলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়। আবার বিরোধী দল যদি দায়িত্বহীন হয়, রাষ্ট্র অস্থিতিশীল হয়। এই ভারসাম্য রক্ষাই আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের নেওয়া সাম্প্রতিক কিছু ইতিবাচক রাজনৈতিক পদক্ষেপ আশাব্যঞ্জক। সংলাপের ভাষা, প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রচিন্তা—এসবই ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বার্তা দেয়।

আজ সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—মূল শত্রুকে ভুলে না যাওয়া। বিভেদের পাহাড় যত উঁচু হবে, ফ্যাসিবাদের ফিরে আসার ছায়াও তত দীর্ঘ হবে। ইতিহাস আমাদের সামনে স্পষ্টভাবে লেখা আছে। সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে আবারও একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হবে; আর তখন মাশুল দিতে হবে পুরো জাতিকে।

বিভেদের পাহাড় নয়, আমাদের দরকার ঐক্যের প্রজ্ঞা, যাতে আর কখনো ফ্যাসিবাদ ফিরে এসে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে গ্রাস করতে না পারে।

লেখক: কলামিস্ট

জোটের রাজনীতিতে ভোটের হিসাব

শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

একটি ভোট ও সিঁড়ির গোড়ায় থমকে যাওয়া গণতন্ত্র

হাদি হত্যায় ভারত এবং গোয়েন্দা স্লিপার সেল

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়

কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বাংলাদেশের বন্ধু

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

সার্ক কি বেঁচে আছে?

সকালে আলোর ঝলক, দিনটাই মেঘমুক্ত হোক