হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

শিক্ষক প্রশিক্ষণ : চাই শ্রেণিকক্ষে বাস্তব পরিবর্তন

ড. মোহাম্মদ আবদুল হালিম চৌধুরী

শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড বলা হয় আর শিক্ষক সেই ব্যবস্থার প্রাণ। কিন্তু একজন শিক্ষক কতটা দক্ষ ও কার্যকর, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার পেশাগত প্রশিক্ষণের ওপর। প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশে চালু থাকা এসব প্রশিক্ষণ কি সত্যিই শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখছে?

বর্তমানে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য PTI, B.Ed, M.Ed এবং HSTTI কোর্স চালু রয়েছে। কাগজে-কলমে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, প্রশিক্ষণ শেষে শিক্ষকরা সনদ অর্জন করলেও শ্রেণিকক্ষে তার প্রত্যাশিত প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়।

এর অন্যতম কারণ হলো প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু ও বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ফাঁক। সিলেবাস প্রণয়ন অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়ভাবে করা হয়, যেখানে তৃণমূল পর্যায়ের শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। ফলে শিক্ষকরা যা শিখছেন, তা বাস্তবে প্রয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে সিলেবাস হালনাগাদ না হওয়াও একটি বড় সমস্যা।

ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। যদিও ব্যবহারিক অংশে নম্বর বরাদ্দ থাকে, বাস্তবে তা অনেক সময় কাগুজে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে। গবেষণাধর্মী কাজ, শ্রেণিকক্ষভিত্তিক সমস্যা সমাধান কিংবা Action Research-এর মতো কার্যক্রম খুব কমই দেখা যায়। ফলে প্রশিক্ষণ শেষে শিক্ষকরা বাস্তব দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে থাকেন।

মূল্যায়ন ব্যবস্থাও প্রশ্নবিদ্ধ। ব্যবহারিক নম্বর অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর প্রকৃত দক্ষতার পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা আনুগত্যের ভিত্তিতে দেওয়া হয়। এতে পুরো প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হয়। একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে নকল প্রবণতা ও নৈতিক শিথিলতাও উদ্বেগজনক।

বিশ্বব্যাপী শিক্ষক প্রশিক্ষণকে শিক্ষা উন্নয়নের অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। UNESCO এবং World Bank-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে কার্যকর শিক্ষক প্রশিক্ষণের গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় এই সম্ভাবনাটি এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো—অনেক শিক্ষক পেশাগত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন মূলত আর্থিক সুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্যে। ফলে প্রশিক্ষণ-পরবর্তী শ্রেণিকক্ষে তেমন কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায় না। অথচ এমন অনেক শিক্ষক আছেন, যাদের কোনো পেশাগত ডিগ্রি না থাকলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীল প্রয়াসে তারা শ্রেণিকক্ষে চমৎকার পারফরম্যান্স দেখাতে সক্ষম হন।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কিছু মৌলিক পরিবর্তন জরুরি।

প্রথমত, সিলেবাস প্রণয়নে তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠান প্রধানদের মতামত অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে তা বাস্তবমুখী ও প্রাসঙ্গিক হয়।

দ্বিতীয়ত, ব্যবহারিক ও গবেষণাভিত্তিক প্রশিক্ষণ জোরদার করতে হবে, যাতে শিক্ষকরা বাস্তব সমস্যার সমাধান শিখতে পারেন।

তৃতীয়ত, মূল্যায়ন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, প্রশিক্ষণ-পরবর্তী শিক্ষাদান কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে।

পঞ্চমত, শিক্ষকদের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে প্রণোদনা দিতে হবে, যাতে তারা অর্জিত জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগে উৎসাহী হন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-পেশাগত প্রশিক্ষণকে সনদ অর্জনের মাধ্যম হিসেবে না দেখে, বরং শিক্ষার মানোন্নয়নের কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা।

আমরা যদি এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে পারি, তবে শ্রেণিকক্ষ সত্যিকার অর্থেই ‘Centre of Excellence’-এ রূপান্তরিত হতে পারে। অন্যথায়, বিদ্যমান প্রশিক্ষণ কাঠামো শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে এবং শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন অধরাই থেকে যাবে।

লেখক : অধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, চট্টগ্রাম

প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম বন্দর কলেজ, চট্টগ্রাম

সাবেক অধ্যক্ষ, ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ময়মনসিংহ

পাঁচ জেনারেল ও বাংলার ট্র্যাজেডি

আমেরিকা কি আরেকটি যুদ্ধে হেরে গেল

বৈশাখী নববর্ষ, লাল ঝুঁটির মোরগ, কী আনন্দ!

ভূমধ্যসাগরের নীল জলে ডুবছে কেন জেনজিরা

৭১ সালের বিজয় ও ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের ঐকতান

সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন ও বিরোধী নেতার দুঃখ

নতুন সময়সূচি ও অর্থনীতিতে প্রভাব

নাতিশীতোষ্ণতার সন্ধানে

জ্বালানিনির্ভরতা ও জাতীয় নিরাপত্তা সংকট

ইরান যুদ্ধ পেট্রোডলারের জন্যও বড় পরীক্ষা