হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

মুক্তিযুদ্ধোত্তর হতাশা আর বেসামরিক আমলাতন্ত্র

আমীর খসরু

দীর্ঘ ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের পরের যে সরকারটি ক্ষমতাসীন হয়, তাদের সামনে নানা সীমাহীন সংকট অপেক্ষমাণ ছিল। বোধকরি তা তারা উপলব্ধি করতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সশস্ত্র বিপ্লব সম্পর্কে তৎকালীন প্রধান দল আওয়ামী লীগের বিস্তর আপত্তি এবং সঙ্গে সঙ্গে পদ্ধতিগত বা কোন পন্থা অবলম্বন করা হবে, সে সম্পর্কেও কোনো সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না। এমনকি মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবে এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য আক্রমণের অনিবার্য হয়ে ওঠা এবং জনগণের মনস্তাত্ত্বিক আকাঙ্ক্ষা যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পর্যন্ত পৌঁছেছিল, দুর্ভাগ্যক্রমে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা সে বিষয়টি কখনোই ভেবে দেখেছেন বলে মনে হয় না। তখনো তারা ‘স্বায়ত্তশাসন’ না ‘সহিংস পন্থায়’ ক্ষমতা ভাগাভাগি হবে, সে বিষয়ে ব্যস্ত ছিলেন। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধ নামক সশস্ত্র বিপ্লবে নেতৃত্বের তুলনায় জনগণ অগ্রগামী ছিলেন। আর এ সংকটের সূচনা হলো এ কারণেই, ২৬ মার্চ ১৯৭১-এ আক্রমণ যখন করা হলো, তখন অর্থাৎ ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা অর্থাৎ যুদ্ধ কীভাবে চলবে, কারা সহযোগিতা দেবে, এসব নিয়ে দিগভ্রান্ত এবং উদভ্রান্ত ছোটাছুটি ছাড়া কোনো গত্যন্তর ছিল না তৎকালীন প্রধান দলের পক্ষে।

ছাত্র, যুবসমাজসহ জনগণ তৈরি ছিল আগে থেকেইÑঅর্থাৎ সমাজের কৃষক, শ্রমিকসহ যাদের আমরা পাতি বুর্জোয়া বলি, তারা নিম্নমধ্য বিত্তশ্রেণি এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালিরা মিলে যুদ্ধ শুরু করা হয়। এ কথা আগেই বলা হয়েছে, যুদ্ধের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। কোনো কর্মপরিকল্পনা ছিল না। বাস্তবে আওয়ামী লীগের জনবিচ্ছিন্নতার শুরু তখন থেকেই। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এমন এক ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়Ñঅর্থাৎ স্বাধীনতার ঘোষণাটি প্রথম আসে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন পাক আর্মির মেজর জিয়ার কণ্ঠে। যদি রাজনৈতিক নেতৃত্বের দোদুল্যমানতা না থাকত, সুস্পষ্ট কর্মপদ্ধতি এবং কৌশল না থাকত, তাহলে হয়তো স্বাধীনতার ঘোষণাটি বেসামরিক নেতৃত্বের মাধ্যমেই আসতে পারত। এটা হতে পারত ৭ মার্চের ভাষণেই।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয়টি হচ্ছেÑমেজর জিয়ার ঘোষণাটি তেমন মাত্রায় আন্তর্জাতিকীকরণ হয়নি বা বিদেশের দৃষ্টি লাভ করেনি। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে বিচ্ছিন্নতাবাদী কিছু ঘটনা হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচার চালানো হয়। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে গৃহযুদ্ধ বলে প্রচার চালায়। যে দুর্ভাগ্যের কথা বলছিলাম, অর্থাৎ এখানে লক্ষণীয় যে, ১৯৭১-এর ২৭ মার্চ ভারতের লোকসভায় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, তার বক্তব্যে পূর্ব পাকিস্তানে জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে দমন করতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী চরম মাত্রায় ধ্বংসযজ্ঞ সম্পর্কে বক্তব্য দেন। বক্তব্যটি আগেভাগে ভালোভাবে প্রস্তুত বলে প্রতীয়মান হয়। লোকসভার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ইতোমধ্যে ‘বল যে হাতছাড়া হয়ে গেছে’। তা বোঝা খুব দুরূহ নয়।

লোকসভার বক্তব্যে ইন্দিরা গান্ধী অগণতান্ত্রিক পন্থায় ধ্বংসযজ্ঞের জন্য পাকিস্তান সরকারের তীব্র নিন্দা জানায়। ৩১ মার্চ ভারতীয় পার্লামেন্টে গৃহীত এক প্রস্তাবে ‘পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রতি সমবেদনা এবং এই গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সঙ্গে সংহতি ঘোষণা করা হয়। আর এভাবেই আন্তর্জাতিক দুনিয়া জানতে পারে এটা গৃহযুদ্ধ নয়, মুক্তিযুদ্ধ। (তথ্য সূত্র : The Years of Endevour; Publication Division, Indian Govt. 1975; Page-522-525)

মুক্তিযুদ্ধের শুরু এবং শেষেও সংকটের আরো যেসব দিক ছিল, তা হচ্ছেÑএক. অপরাপর বিরোধী দলকে আস্থায় নিতে অনিচ্ছুক ছিল অসীম ক্ষমতাধর আওয়ামী লীগ। দুই. সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রকে আস্থায় নিয়ে কর্মকৌশল ও ভবিষ্যতের করণীয় প্রণয়ন না করা। তিন. অগ্রগামী জনগণকে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন রাখা। চার. পুরো বিষয়টি একক বা একব্যক্তিকেন্দ্রিকতা। মনে রাখা প্রয়োজন, আওয়ামী লীগ যে এক ব্যক্তিনির্ভর স্বৈরাচার হয়ে উঠেছে এবং ভবিষ্যতে উঠবে, তার সূচনাকাল ছিল মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগেই। আর এর লক্ষণগুলো প্রকাশিত হয় খুব স্বল্পকালেই। এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা, পর্যালোচনা জরুরি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের স্বরূপ সন্ধানের জন্য।

এমন পরিস্থিতিতে বেসামরিক প্রশাসনের মধ্যে দোদুল্যমানতা দেখা যায়। এ কারণেই বেসামরিক আমলাতন্ত্রের খুব স্বল্পসংখ্যকই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। অধিকাংশই তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের কর্মচারী হিসেবে চাকরি চালিয়ে যান।

১৯৭০-এর ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বেসামরিক প্রশাসন ছিল ক্লান্ত, আবার মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তারা ছিলেন দিগভ্রান্ত। মুক্তিযুদ্ধের পর পরিস্থিতি দাঁড়ায় আরো কঠিন ও ভয়ংকর। মুক্তিযুদ্ধের পর বেশ কিছু পশ্চিম পাকিস্তানি আমলা পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করে পাকিস্তানে চলে যান। ফলে এক বিশাল প্রশাসনিক দক্ষ জনশক্তির অভাব দেখা দেয়। যারা দেশে ছিলেন পাকিস্তান সরকারের চাকরিরত, তারা হয় রাতারাতি মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি অথবা ভীতসন্ত্রস্ত ছিলেন। আর বাকি অংশ ছিলেন দুর্বল আমলা।

রাতারাতি ভোল পাল্টিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি বনে যাওয়াদের বলা হতো ষোড়শ বা সিক্সটিন ডিভিশন। এদের দাপট ছিল আসনের চেয়েও বেশি।

নয়া বেসামরিক প্রশাসন

আওয়ামী লীগ অবিভক্ত পাকিস্তানের আমলে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যাতে বেসামরিক প্রশাসনের ওপর দক্ষ রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। আর এ লক্ষ্যে বেসামরিক প্রশাসন বা সিভিল প্রশাসনের পুনর্বিন্যাসের কথা সবসময়ই তারা বলেছিলেন। ১৯৭০-এর যে নির্বাচনি ইশতেহার আওয়ামী লীগ দিয়েছিল, তাতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সুপরিয়র সার্ভিস বিলুপ্ত করে নির্ধারিত গণপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে জেলা প্রশাসনের পরিকল্পনা করা এবং চাকরির উচ্চ স্তরের কর্মকর্তা এবং নিম্ন স্তরের কর্মচারীদের মধ্যে বেতনবৈষম্য দূরীকরণের কথা বলা হয় ওই ইশতেহারে। বেসামরিক উচ্চ স্তরের ব্যবস্থার বদলে জনগণকেন্দ্রিক বা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং সে মতে কার্যক্রম গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

আওয়ামী লীগের কথিত সমাজতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন অংশটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার আমলাতন্ত্রের বিষয়ে নেতিবাচক চিন্তাভাবনা করতে থাকে। বিশেষ করে, আওয়ামী লীগের তরুণ নেতৃত্ব এই বিশ্বাসে অতি বিশ্বাসী থাকলেও বাস্তবে এমন অবস্থা বাস্তবায়নের জন্য বিপ্লবী ব্যবস্থা থাকতে হয়, বাস্তবে তা ছিল না। মনস্তাত্ত্বিকভাবে তারা বিপ্লবীও ছিল না। রাজনীতিবিজ্ঞানী রওনক জাহান বলেন, ‘কিন্তু শেখ মুজিবের দেশে প্রত্যাবর্তনের পরে প্রয়োজনীয় যে রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রয়োজনীয় ব্যক্তিবর্গ থাকা দরকার ছিল, তা ছিল অনুপস্থিত।’ রওনক জাহান, Bangladesh in 1972, Asian Survey, Feb-1973)

পরিস্থিতি দাঁড়াল এমন যে, দেশ চালানোর জন্য দক্ষ বেসামরিক কর্মকর্তার অভাব বা প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল। অর্থাৎ নতুন দেশের প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরুই ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

ঠিক তখনই এক বড় ধরনের সংকট ও চ্যালেঞ্জ প্রধানত শেখ মুজিবকে সামাল দিতে হয়। দলের তরুণ নেতৃত্ব, মুক্তিবাহিনী, মুজিববাহিনীসহ আওয়ামী লীগের মধ্য থেকে জোরালোভাবে এই প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, পাকিস্তান আমলের প্রশাসন দিয়েÑঅর্থাৎ যারা ওই সরকারের প্রতি অনুগত ছিল, তাদের পক্ষে নতুন রাষ্ট্রের প্রশাসন চলানো আদৌ যুক্তিসংগত তো নয়ই; বরং হিতে বিপরীত হতে পারে।

শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল ইসলাম খানসহ এক অংশ এমন প্রশ্ন উত্থাপন করল যে, আইয়ুবী প্রশাসন দিয়ে মুজিবের শাসন অথবা আওয়ামী লীগের প্রশাসনিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন সম্ভব কি না?

কিন্তু পাকিস্তান আমলের অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রশাসনের বিভিন্ন পদে ন্যস্ত করা হয়। তখন প্রশ্ন ওঠে এদের পরিচয় সম্পর্কেÑঅর্থাৎ কে সত্যিকার দালাল অথবা দালাল নয়? রওনক জাহান এই পরিস্থিতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে চারটি ভাগে তৎকালীন প্রশাসনকে ভাগ করেন। এক. যারা মনেপ্রাণে পাকিস্তান সরকারকে সহযোগিতা করেছে, অথবা বাধ্য হয়ে চাকরি করেছে। দুই. মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারী। তিন. পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবাসিত অর্থাৎ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরত আসা। চার. দালাল কর্মকর্তারা পরিচয় গোপন করে আওয়ামী লীগের নয়া সমর্থক কর্মকর্তাÑযাদের তখন সিক্সটিন ডিভিশন (১৬তম ডিভিশন) বলে আখ্যায়িত করা হতো। আর ক্ষমতা ও পদপদবি প্রশ্নে তাদের মধ্যে এক প্রবল টানাপোড়েন দেখা দেয়।

এরই মধ্যে দালাল আইন জারি করা হয়, তখন রাষ্ট্রপতির আদেশ নম্বর ৯ জারি করা হয়, যাকে পিও নাইন বলে অভিহিত করা হতো। তাতে কিছু কর্মকর্তাকে দালাল আইনে বরখাস্ত করা হয়। তবে নানা দল, গ্রুপ, গোষ্ঠীতন্ত্র এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মাত্রাতিরিক্ত হস্তক্ষেপের কারণে এক হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বরখাস্ত করার প্রক্রিয়ায় মুক্তিযুদ্ধকালে যুদ্ধ সমর্থন করেছে, এমন কিছু দক্ষ কর্মকর্তাকেও বাদ দেওয়ার অবাঞ্ছিত ঘটনাও ঘটে।

এখানে বলা প্রয়োজন যে, বেসামরিক প্রশাসনের মধ্যে যে বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা প্রশাসনের মধ্যে তো অবশ্যই, জনমনেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

একদিকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বিশাল অংশের তরুণদের মধ্যে যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, অর্থাৎ জাতীয় মিলিশিয়া গঠন করে বহিঃশত্রু আক্রমণ রক্ষা করার বাহিনী গঠন করা হবে। মুজিব প্রশাসনের মিলিশিয়ার এই ধারণাটি খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।

একদিকে ১৯৭২-এর ১৭ জানুয়ারি অস্ত্র সমর্পণ, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক অস্ত্র জমা না দেওয়ার ফলে মুক্তিযোদ্ধাসহ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বাহিনীর মধ্যে শ্রেণিবৈষম্যের ধারণাটি জন্ম নেয়। বিশেষ করে, মুক্তিবাহিনী, মুজিববাহিনী, লালবাহিনী আবার অন্যদিকে বামপন্থি তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে চাকরি এবং সামরিক-বেসামরিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্তির প্রবল দাবি ওঠে।

বেকার লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধা তখন না বেসামরিক প্রশাসন, না সরকারি কোনো বাহিনীতে চাকরি বা সংযুক্তির অভাবে হতাশ হয়ে পড়েন। অসংখ্য যুবক মুক্তিযোদ্ধা, নানা কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।

এরই মধ্যে ১৯৭৩-এর রাষ্ট্রপতির আদেশ নং-১৬ এবং বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ (ইনডেমনিটি আদেশ) জারি করার পরে দালাল এবং স্বাধীনতা যুদ্ধকালে পাকিস্তানিদের সহযোগীদের ইনডেমনিটি দেওয়া হয়। অর্থাৎ সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আর দালাল সবাই এককাতারে আসে। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিশাল এক মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় ঘটে যায়। এর প্রভাব পড়ে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অন্যান্য ক্ষেত্রেও।

মুক্তিযোদ্ধারা যা চাইছিলেন তা পুলিশের শুধু একটি চাকরি মাত্র নয়। শুধু দায়িত্ব পালনের কথা তারা ভাবছিলেন না। তারা ভাবছিলেন নিজেদের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতাকে সীমিত গন্ডির পরিবর্তে বৃহত্তর পরিধিতে ব্যবহার করা, যা হবে উৎপাদনমূলক এবং সৃষ্টিশীল। তারা চাইছিলেন জীবনবাজি রেখে স্বাধীনতা-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার প্রাপ্য মর্যাদা। এর পরিবর্তে কতগুলো ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সামান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদান-সংক্রান্ত প্রশাসনিক কিছু নির্দেশ এবং শেখ মুজিবের বিবৃতিতে উল্লেখ করা খুবই সীমিত চাকরি, প্রশিক্ষণ এবং অন্ন-বস্ত্রের আশ্বাস প্রদান ছাড়া কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। মুক্তিযোদ্ধারা সাকুল্যে যা পেয়েছিলেন, সেগুলো হলো সরকারি এবং আধা সরকারি চাকরিতে একটি সীমিত কোটা, নানা তদবির এবং পন্থায় প্রমোশন আনুষ্ঠানিক সম্মাননা (যেমন : বীর-উত্তম, বীরপ্রতীক ইত্যাদি) এবং একটি মুক্তিযোদ্ধা ফাউন্ডেশন। ক্রমবর্ধমান বেকার সমস্যার মুখে অনেক মুক্তিযোদ্ধা এই ব্যবস্থা বাধ্য হয়ে মেনে নেন এবং শুধু শতসহস্র সাধারণ মানুষের মধ্যে তারা একই সারিতে অবস্থান করে একটি কেরানি, পুলিশ অথবা সেনাবাহিনীর পদ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন বা থাকতে বাধ্য হন।

এভাবে শুধু তাদের পরিচিতিই বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায় না, বরং একটি জাতি গঠনের যে দুর্দমনীয় আকাঙ্ক্ষা ও উৎসাহ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে তারা যুদ্ধে গিয়েছিলেন, দেশে ফেরার পড়ে তাদের সেই আশা-আকাঙ্ক্ষার সমাপ্তি ঘটে।

(বিস্তারিত আলোচনার জন্য মওদুদ আহমদ, বাংলাদেশÑশেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল, অনুবাদক : জগলুল আলম ইউপিএন মার্চ-২০২১)

অথচ মুক্তিযোদ্ধারা একদিকে সম্মান এবং অন্যদিকে তাদের জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত ভিত্তি অনুযায়ী কোনো ব্যবস্থার নিশ্চয়তা চেয়েছিলেন। এ লক্ষ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২-এর জানুয়ারিতে জাতীয় মিলিশিয়া গঠনের ঘোষণা দেন এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধান করে ১১ সদস্যের জাতীয় কমিটি গঠিত হয় এবং মওলানা ভাসানীকেও এর সম্মানিত উপদেষ্টা রাখা হয়। এর কোনো বৈঠক কোনো কার্যক্রম কখনোই হয়নি। পরে জাতীয় পর্যায়ে নানা কথা বলা হলেও বাস্তবে কিছুই করা হয়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল দাবি ছিল সঠিক তালিকা করা হোক, তাও করা হয়নি। খুব সম্ভবত বামপন্থিদের নাম বাদ দেওয়ার জন্য।

মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে বেসামরিক প্রশাসনসহ প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ব্যবস্থাই আর গ্রহণ করা হয়নি। ফলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীরা শুধু অহংকারটুকু নিয়ে বাঁচতে গিয়ে দেখতে পানÑসেখানেও মুজিব বাহিনী, লাল বাহিনী ইত্যাদি। আর এভাবেই হতাশাগ্রস্ত একটি প্রজন্মের বিনাশ ঘটানো হয়।

লেখক : গবেষক

পঞ্চান্নয় পা বাংলাদেশের, নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই

রণাঙ্গনের জিয়া : ‘ফ্রিডম ফাইটারদের ভয় করলে চলে না’

স্বাধীনতা অর্জনে আত্মত্যাগ আর যুদ্ধে অংশগ্রহণ এক প্রশ্নহীন ইতিহাস

অগ্নিঝরা ২৩ মার্চ: পাকিস্তান দিবসে প্রতিরোধ

ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবরা ও ভবিষ্যতের শঙ্কা

নব্যদের পাহারাদারিতে জাতীয়তাবাদী দলের সংস্কৃতি-চেতনা

ঈদের বাঁশির সেই সুর...

রমজানের ট্রিলিয়ন টাকার অর্থনীতি

এবারের বিমর্ষ ঈদ

সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ এবং মিডিয়ার নৈতিক সংকট