হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

প্রতিবেশীর দায়িত্ব ও সীমান্ত হত্যা

ড. শরিফুল আলম

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া ছাড়া নয়াদিল্লির সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না। তিনি একে প্রতিবেশীর দায়িত্ব বলে ব্যাখ্যা করেছেন। কথাটি শুনতে সহজ। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের কাছে প্রশ্নটি সেখানে থেমে থাকে না। প্রতিবেশীর দায়িত্ব যদি শুধু ক্ষমতাচ্যুত এক শাসককে নিরাপদ অবতরণের সুযোগ দেওয়ায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেই দায়িত্ব অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

৩ অক্টোবর ২০২৬, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ আয়োজিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর এক অধিবেশনে ত্রিবেদী বলেন, শেখ হাসিনার বিমানকে অবতরণের অনুমতি না দিলে ‘সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি’ তৈরি হতো। তার ভাষায়, ভারত প্রস্তুত ছিল না; শেখ হাসিনা তখনো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন; ভারতীয় বিমানবাহিনী বা সেনাবাহিনী তাকে নিয়ে আসেনি; তিনি বাংলাদেশি সামরিক বিমানে যান; এবং বাস্তবতা মেনে নেওয়া ছাড়া ভারতের সামনে ‘খুব কম বিকল্প’ ছিল। একই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, প্রত্যর্পণের অনুরোধ একটি কাঠামোবদ্ধ আইনি প্রক্রিয়ায় পরীক্ষাধীন এবং কেউ এর সময়সীমা দিতে পারে না। তিনি সেই সময়কে ‘tragic circumstances’ বলেছেন এবং বলেছেন, নিরপরাধ মানুষ যেন আর কোথাও এভাবে নিহত না হন। বক্তব্যটি একটি জরুরি প্রশ্নকে সুকৌশলে অনুচ্চারিত রাখে। শুধু আশ্রয়ের সিদ্ধান্ত নয়—গত এক দশকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা নিয়ে নয়াদিল্লি কখনো আত্মসমালোচনা করবে কি না।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের দমন-পীড়নের চিত্র এখন আর শুধু স্মৃতি বা বিতর্ক নয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়; নিহতদের প্রায় ১২ থেকে ১৩ শতাংশ শিশু।

ত্রিবেদীর ‘tragic circumstances’ তাই শূন্যে দাঁড়ানো শব্দ নয়। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রশ্ন অন্য জায়গায়। সেই শাসনব্যবস্থার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, নির্বাচনি বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ সত্ত্বেও রাজনৈতিক সমর্থন এবং ক্ষমতার পতনের পর আশ্রয়—এই ধারাবাহিকতাকে নয়াদিল্লি কীভাবে ব্যাখ্যা করে। প্রতিবেশীর দায়িত্ব যদি শুধু ক্ষমতাচ্যুত শাসককে অবতরণের সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে প্রতিবেশী দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা, মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি দায়িত্ব কোথায় থাকে? আশ্রয় একটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত হতে পারে। কিন্তু যে শাসনের পতনের প্রেক্ষাপট জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ‘Systematic’ দমন হিসেবে উঠে এসেছে, সেই শাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে ‘প্রতিবেশীর দায়’ বলে আড়াল করা যায় না।

সীমান্তে প্রতিশ্রুতি ও পরিসংখ্যানের ফারাক

আরেকটি বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বেসামরিক প্রাণহানি এখনো বন্ধ হয়নি। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সীমান্তে অন্তত ২৯৬ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন; এর মধ্যে ২১৩ জন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে।

২০২৬ সালেও ধারাবাহিকতা ভাঙেনি। আগস্ট পর্যন্ত বিএসএফ কর্তৃক ৩৩ বাংলাদেশি নিহতের খবর প্রকাশিত হয়েছে। অথচ দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে বারবার বলা হয়েছে, সীমান্তে বেসামরিক প্রাণহানি উদ্বেগের বিষয় এবং এমন ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে এ ধরনের ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনা যায়। ১০ মার্চ ২০২৬-এর ডিজি-পর্যায়ের বৈঠকে বিএসএফ মহাপরিচালক নীতিন আগরওয়াল অপ্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের কথা বলেন। সেই আশ্বাসের পরও মার্চ থেকে অন্তত ১০ জন গুলিতে নিহত হন। প্রতিশ্রুতি ও পরিসংখ্যানের এই ফারাকই প্রশ্নটিকে তীক্ষ্ণ করে। প্রতিবেশীর দায়িত্ব কি সীমান্তে একজন নিরস্ত্র কৃষক, শ্রমিক বা শিক্ষার্থীর জীবন রক্ষার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য নয়? ভারত চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গেও সীমান্ত ভাগ করে; সেখানে এমন নিয়মিত বেসামরিক প্রাণহানির চিত্র দেখা যায় না।

২০২৬ সালের জুনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একটি আলাদা অভিযোগ নথিবদ্ধ করে। সংস্থাটি বলে, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি বাসিন্দাদের—প্রধানত মুসলমানদের—যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই রাতে কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। তাদের হিসাবে, ১ জুন থেকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ২১টি প্রচেষ্টা ঠেকিয়েছে, যেখানে শিশুসহ ২০০-এর বেশি মানুষকে সীমান্তের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়। পঞ্চগড়ে ৫ জুন ১০ জনকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টায় ৭৫ ঘণ্টার অচলাবস্থা, ঠাকুরগাঁওয়ে গর্ভবতী নারী, শিশুসহ মানুষের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ‘জিরো লাইন’-এ আটকে থাকা—এসব বিবরণ সংস্থাটির বিবৃতিতে আছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উপ-এশিয়া পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, পরিবারগুলোকে নিষ্ঠুরভাবে সীমান্তে ফেলে রাখা হচ্ছে; নাগরিকত্ব যাচাই ও পদ্ধতিগত সুরক্ষা ছাড়া এ ধরনের বহিষ্কার বন্ধ হওয়া উচিত।

এটি বিচ্ছিন্ন অভিযোগ নয়। গত বছরের ৭ মে থেকে এ বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ৩২ জেলার সীমান্ত দিয়ে ২,৪৭৯ জনকে ভারত থেকে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা বিজিবি রেকর্ড করেছে। গুলি ও পুশইন তাই দুই আলাদা ঘটনা নয়; দুটিই সীমান্ত-ব্যবস্থাপনায় একতরফা শক্তির প্রকাশ। যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া মানুষকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দিকে ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের ন্যূনতম মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং বাংলাদেশের সীমান্ত-প্রশাসনের ওপর একতরফা চাপ তৈরি করে।

ডিসেম্বরের আগে নদীর পরীক্ষা

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের আরেকটি কাঠামোগত পরীক্ষা সামনে। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানিচুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ ২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা। বাংলাদেশ এরই মধ্যে জানিয়েছে, সে শুধু পুরোনো চুক্তির নবায়ন চায় না; শুষ্ক মৌসুমে ভাটির দেশ হিসেবে নিশ্চয়তামূলক প্রবাহসহ একটি নতুন চুক্তি চায়। ৫৪টি অভিন্ন নদীর মধ্যে শুধু গঙ্গারই পূর্ণাঙ্গ চুক্তি আছে; তিস্তাসহ অন্য নদীগুলো এখনো অমীমাংসিত। ফারাক্কার পরের তিন দশক বাংলাদেশকে শিখিয়েছে, উজানে সিদ্ধান্ত আর ভাটিতে ক্ষতি একসঙ্গে চলতে পারে না।

সমতার বন্ধুত্ব, কৃতজ্ঞতার বন্ধন নয়

নদীর ন্যায্য হিস্যা, সীমান্তে মানুষের নিরাপত্তা, বাণিজ্যে ভারসাম্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় মানবাধিকার এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অযাচিত প্রভাব—এসবের সমাধান চাপ দিয়ে নয়, সমতার ভিত্তিতে আলোচনায় হতে পারে। বাংলাদেশ ভারতবিরোধী রাষ্ট্র হতে চায় না। বন্ধুত্ব থাকবে, বাণিজ্য থাকবে, যোগাযোগ থাকবে, সাংস্কৃতিক সম্পর্ক থাকবে। কিন্তু তার ভিত্তি হতে হবে পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম সমতা ও ন্যায্য স্বার্থ।

ভারতের উচিত বাংলাদেশের জনগণকে কোনো বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক কল্পনার অংশ হিসেবে নয়, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতির জনগণ হিসেবে দেখা। ‘অখণ্ড ভারত’ ধরনের যেকোনো সম্প্রসারণবাদী বা আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক কল্পনা বাংলাদেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশের নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভূখণ্ড ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতি সম্মানই টেকসই প্রতিবেশী সম্পর্কের ভিত্তি হতে পারে।

ত্রিবেদী বলেছেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ঢাকার কোনো তৃতীয় দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল নয়। কথাটি শুনতে ইতিবাচক। কিন্তু সম্পর্ক যদি সত্যিই স্বতন্ত্র ও প্রতিবেশীসুলভ হয়, তাহলে তার পরীক্ষা হবে প্রত্যর্পণ-আবেদনের স্বচ্ছ আইনি নিষ্পত্তিতে, সীমান্তে প্রাণহানি শূন্যে নামিয়ে আনার বাস্তব পদক্ষেপে, নাগরিকদের যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া ঠেলে দেওয়া বন্ধে এবং ডিসেম্বরের আগে গঙ্গাসহ অভিন্ন নদীর ন্যায্য বণ্টনে। ‘কোনো সময়সীমা দেওয়া যায় না’ বললে আইনি প্রক্রিয়ার নাম থাকে, জবাবদিহি থাকে না।

ভারতের জন্য সময় এসেছে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝার। বাংলাদেশ কোনো অধীনস্থ ভূখণ্ড নয়, কোনো ‘পেছনের উঠান’ নয় এবং কোনো বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় কল্পনার অংশও নয়। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। প্রতিবেশীর দায়িত্বের প্রথম শর্ত হওয়া উচিত বাংলাদেশের জনগণের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত, জাতীয় মর্যাদা, নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভূখণ্ডের প্রতি পূর্ণ সম্মান।

আমরা আধিপত্য চাই না, সংঘাতও চাই না। আমরা চাই সমতার বন্ধুত্ব। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ ‘বড় ভাই-ছোট ভাই’ নয়; দুই সার্বভৌম প্রতিবেশীর সমান মর্যাদার সম্পর্ক।

লেখক : প্রফেসর, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার

কুষ্টিয়ায় আওয়ামী পান্ডাদের অনুসরণ করছে ক্ষমতাসীনরা

আমাদের কিশোর সমাজ ও শিক্ষা কার্যক্রম

উচ্চকক্ষের পুনঃপাঠ

অপারেশন ক্লিন হার্টের ফাঁদে পা না দেওয়াই উত্তম

ভেজাল খাদ্য, দূষিত পানি ও বিষাক্ত বায়ু

শিক্ষক নিয়োগ ও র‌্যাংকিংয়ে অবনতি

ভারত-ইসরাইলে পেলেট গানের নৃশংসতা

ক্ষমতার দম্ভ সুশাসনের অন্তরায়

বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি কেন কমে না

লিথিয়াম ও কোবাল্টের রাজনীতি