হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

আলেমদের বঞ্চনা

মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন

বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। এ দেশের সামাজিক, ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনে আলেম-ওলামাদের প্রভাব সুদীর্ঘকাল ধরে বিদ্যমান। আলেমরা মসজিদ, মাদরাসা, খানকাহ, ওয়াজ-মাহফিল এবং বিভিন্ন ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মানুষের ধর্মীয় চেতনাকে জাগ্রত করা, নৈতিক মূল্যবোধ রক্ষা করা, ইসলামি জ্ঞান বিস্তার করা এবং সমাজকে সঠিক পথে পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে আসছেন। সাধারণ মানুষের কাছে আলেম সমাজ শুধু ধর্মীয় শিক্ষক নন, তারা নৈতিক দিকনির্দেশকও। মসজিদের সম্মানিত ইমামরা সমাজের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। একজন ইমাম কেবল নামাজের নেতৃত্বই দেন না, বরং একজন আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক ও সামাজিক নেতা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মুসলিম সমাজে তাদের অবস্থান অত্যন্ত সম্মান ও শ্রদ্ধার। তবে বাস্তবতা হলো, এই সম্মানের আড়ালে লুকিয়ে আছে চরম অবহেলা ও বঞ্চনার করুণ চিত্র। আলেম সমাজ দীর্ঘদিন যাবৎ অবহেলিত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে কোনো সরকারই সরকারি কোষাগার থেকে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য কোনো বেতন-ভাতা দেওয়ার কার্যক্রম গ্রহণ করেনি। ইসলামের আবির্ভাবের পর মুসলিম খেলাফতের অধীন যতগুলো মসজিদ ছিল, সব মসজিদের ইমামদের বায়তুল মাল বা সরকারি কোষাগার থেকে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ বেতন-ভাতা দেওয়ার প্রচলন ছিল।

এমনকি মুসলমান কর্তৃক ভারত শাসনকালের সময়ও এই ধারা অব্যাহত ছিল। কয়েক যুগ ধরে আমাদের দেশে ইসলামের সেই রেওয়াজ একেবারেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অধিকাংশ মসজিদের ইমামের নির্দিষ্ট কোনো বেতনকাঠামো নেই। মসজিদ কমিটির মর্জির ওপর ভিত্তি করে তাদের অতিসামান্য সম্মানি দেওয়া হয়, যা দিয়ে বর্তমান বাজারে সম্মান বাঁচিয়ে জীবনধারণ করা প্রায় অসম্ভব। তারেক জিয়া তার একান্ত প্রচেষ্টায় দেরিতে হলেও ইসলামের সেই চিরাচরিত নিয়ম আবার চালু করেছেন। তিনি আলেম-ওলামাদের জীবনজীবিকা নির্বাহ করার জন্য প্রত্যেক আলেম-ওলামা এবং অন্যান্য ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ বেতন-ভাতা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আলেমদের বেতন-ভাতার ব্যাপারে বিগত সরকার আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কোনো সরকারই তাদের জন্য কার্যত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

শিক্ষকতাকে মহান পেশা হিসেবে অভিহিত করা হলেও মান-মর্যাদার দিক দিয়ে একেবারেই পিছিয়ে রয়েছেন এ দেশের মাদরাসা শিক্ষকরা। দেশের সর্ব পর্যায়ের মাদরাসা শিক্ষকই বেতন-ভাতায় সন্তুষ্ট নন। দেশে হাজার হাজার স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি, ফাজিল ও কওমি মাদরাসার শিক্ষক রয়েছেন, যারা সরকারিভাবে কোনো বেতন-ভাতা পান না। দীর্ঘদিন ধরে তারা মাদরাসাগুলোকে এমপিওভুক্তির দাবি জানিয়ে আসছেন। শিক্ষকরা যদি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী না হন, তাহলে তারা পাঠদানে কীভাবে মনোযোগী হবেন?

ফলে আমাদের দেশে শিক্ষাদানের চেয়ে বছর জুড়েই চলতে থাকে শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন। দেশের মাদরাসা শিক্ষকরা থাকবেন সব পেশার ঊর্ধ্বে; অথচ আমাদের দেশের মাদরাসা শিক্ষকরা বেতন-ভাতায় পিছিয়ে। স্কুল থেকে যে বেতন পান, তা দিয়ে তাদের সংসার চালানো কষ্টকর। এর ফলে মাদরাসা শিক্ষকদের অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে হয়। এ দেশে জেনারেল শিক্ষিত লোকজন যেকোনো চাকরিতে প্রবেশ করার অধিকার অর্জন করলেও সরকারিভাবে ইমাম ও আলেমদের চাকরিতে প্রবেশের অধিকার বা নিশ্চয়তা নেই। আলেমরা সরকারি চাকরিতে সহজেই যেকোনো সময় প্রবেশ করতে পারেন না। অন্যদিকে মসজিদ কমিটির সদস্যদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের কারণে যেকোনো মুহূর্তে একজন ইমামকে চাকরিচ্যুত করা হয়। পেনশন ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের মতো সুযোগ-সুবিধা তাদের জন্য রীতিমতো স্বপ্নের মতো অধরা। আমরা এমন একটা দেশে বসবাস করি, যে দেশে ইসলামি স্কলার, বক্তা, লেখক ও আলেম-ওলামাদের কোনো মূল্যায়ন নেই। মুসলিমপ্রধান দেশের সর্বোচ্চ পদে আলেম সমাজের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা থাকলেও তাদের মসজিদ, মাদরাসা ও খানকায় পড়ে থাকতে হয়েছে। মাদরাসা শিক্ষায়ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা তুলনামূলকভাবে কম। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম থেকে ইসলামি কাব্যগ্রন্থ ধারার সাহিত্যিকরা রাষ্ট্রীয় সম্মান ও মর্যাদা থেকে অবহেলিত। প্রতি বছর জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রত্যেক বছর বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য এই পুরস্কার দেওয়া হলেও ধর্মীয় ক্ষেত্রে অবদানের ক্ষেত্রে কোনো আলেম-ওলামাকে পুরস্কার প্রদান করা হয় না। আমাদের দেশে অসংখ্য কোরআনের হাফেজ, তাফসিরকারক ও হাদিস বিশারদ রয়েছেন, যারা হেদায়েতের বাণী প্রচারের মাধ্যমে দেশ ও সমাজ পরিবর্তনে নিরলস ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। কিন্তু তাদের এই অবদানকে জাতীয়ভাবে কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হয় না, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

এ দেশে বুদ্ধিজীবী নামে কতগুলো দলীয় লেজুড়বৃত্তিকারী মানুষকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়। তাদের জাতীয় পুরস্কার ও একুশে পদক দেওয়া হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, সমাজ পরিবর্তনের স্বীকৃতিস্বরূপ কোনো ইসলামি লেখক, বিশারদ, স্কলার, বক্তা ও আলেম সমাজকে এ-জাতীয় সম্মানে ভূষিত করা হয় না। কী বলব, আমাদের সমাজে এমন একটা বিদ্বেষমূলক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে যে, সাধারণ লোকজনও তাদের অবজ্ঞার চোখে দেখে। এ দেশে সরকারিভাবে অনেক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। কিন্তু ৯১ শতাংশ মুসলমানের দেশ হওয়া সত্ত্বেও সরকারিভাবে কোরআনের কোনো প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় না। এটাই কি তাহলে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ? সমাজের হাজার হাজার আলেম, যারা দেশ গঠনে কাজ করে যাচ্ছেন, যারা ইসলামের বাণী প্রচারের মাধ্যমে মানুষকে হেদায়েতের রাস্তায় নিয়ে যাচ্ছেন, দেশের সম্পদ তরুণসমাজকে অন্যায় ও অসত্যের রাস্তা হতে সঠিক পথে পরিচালিত করছেন, মাদক নির্মূল, সামাজিক অবক্ষয় রোধ ও কুসংস্কার পরিহার করে সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা পালন করছেন—সেই আলেমদের দীর্ঘদিন ধরে অবজ্ঞা ও অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। তাদের এই অবমূল্যায়নের ফল কোনো জাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

দেশের ইমেজের জন্য অশনিসংকেত

নৈতিক সংকটে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজ

বেদনাদায়ক ইতিহাসের পটভূমিতে ত্রয়োদশ সংসদের যাত্রা শুরু

মুক্তিযুদ্ধোত্তর হতাশা আর বেসামরিক আমলাতন্ত্র

পঞ্চান্নয় পা বাংলাদেশের, নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই

রণাঙ্গনের জিয়া : ‘ফ্রিডম ফাইটারদের ভয় করলে চলে না’

স্বাধীনতা অর্জনে আত্মত্যাগ আর যুদ্ধে অংশগ্রহণ এক প্রশ্নহীন ইতিহাস

অগ্নিঝরা ২৩ মার্চ: পাকিস্তান দিবসে প্রতিরোধ

ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবরা ও ভবিষ্যতের শঙ্কা

নব্যদের পাহারাদারিতে জাতীয়তাবাদী দলের সংস্কৃতি-চেতনা