হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ভেজাল খাদ্য, দূষিত পানি ও বিষাক্ত বায়ু

আমার দেশ অনলাইন

বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও নির্মল বায়ু—এগুলো নাগরিকের মৌলিক অধিকার। অথচ প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এমন খাদ্য খাচ্ছেন, যার নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়; পান করছেন জীবাণু, আর্সেনিক বা লবণাক্ততায় আক্রান্ত পানি; আর শ্বাস নিচ্ছেন স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ দূষিত বায়ু। সমস্যাগুলো নতুন নয়। কিন্তু আইন, নীতি ও নানা অভিযান থাকা সত্ত্বেও এগুলোর স্থায়ী সমাধান না হওয়া ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতারই পরিচয়।

খাদ্যে ভেজাল: নজরদারির ঘাটতি ও শাস্তিহীনতার সুযোগ

খাদ্যে ভেজাল বলতে শুধু ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো বোঝায় না। উৎপাদন ও সংরক্ষণে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নিষিদ্ধ রঙ বা উপাদান ব্যবহার, কীটনাশক ও ওষুধের অবশিষ্টাংশ, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি এবং ভুল লেবেলও খাদ্যনিরাপত্তার গুরুতর লঙ্ঘন। অনানুষ্ঠানিক বাজারব্যবস্থা, সরবরাহশৃঙ্খলে জবাবদিহির অভাব, অপর্যাপ্ত পরীক্ষাগার ও পরিদর্শক, স্বার্থের সংঘাত এবং অপরাধের তুলনায় দুর্বল বা অনিয়মিত শাস্তি—এই অসাধু ব্যবসায়ীদের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরীক্ষায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরীক্ষিত ১,৭১৩টি নমুনার ৫৭১টিতে—প্রায় ৩৩ শতাংশেÑভেজাল, দূষণ বা পুষ্টিমানসংক্রান্ত সমস্যা পাওয়া গেছে। এটি পরীক্ষিত নমুনার ফল, তাই দেশের সব খাদ্য অনিরাপদ—এমন সিদ্ধান্ত এর ভিত্তিতে দেওয়া যায় না। তবে নমুনায় এত বেশি সমস্যা পাওয়া বাজারে কার্যকর নজরদারির প্রয়োজন স্পষ্ট করে।

দূষিত পানি: উৎস থেকে ঘরের কল পর্যন্ত ঝুঁকি

বাংলাদেশে পানির সংকট শুধু পানির প্রাপ্যতার নয়—নিরাপদ পানিরও। আর্সেনিক, জীবাণু, শিল্পবর্জ্য, কৃষিজ রাসায়নিক, অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য ও উপকূলীয় লবণাক্ততা পানির মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অনেক ক্ষেত্রে উৎসের পানি নিরাপদ হলেও পাইপলাইনের লিকেজ, অপর্যাপ্ত শোধন বা ঘরে অনিরাপদ সংরক্ষণে তা দূষিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ সমস্যাকে আরো বাড়াচ্ছে।

ইউনিসেফের এমআইসিএস ২০২৫-ভিত্তিক তথ্যে নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় থাকা পানীয় জলের আওতা ৩৯ দশমিক ৩ শতাংশ বলা হয়েছে; সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, পানির উৎসের প্রায় ১৫ শতাংশে আর্সেনিক দূষণের সমস্যা রয়েছে। অর্থাৎ শুধু নলকূপ বা পাইপলাইনের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না—পানির গুণমান নিয়মিত পরীক্ষা ও প্রকাশ করতে হবে। নদী ও জলাশয়ে অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য এবং গৃহস্থালি পয়ঃবর্জ্য নিষ্কাশনও দূষণের বড় কারণ।

বায়ুদূষণ: প্রতিদিনের অদৃশ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি

শুষ্ক মৌসুমে ঢাকা ও অন্যান্য শহরের বায়ুদূষণ বিশেষভাবে তীব্র হয়। নির্মাণকাজ এবং রাস্তার ধুলা, ইটভাটার ধোঁয়া, পুরোনো যানবাহন, শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্গমন, বর্জ্য পোড়ানো এবং ঘরে কঠিন জ্বালানি ব্যবহারের ভূমিকা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণেও ইটভাটা ও যানবাহনের পাশাপাশি গৃহস্থালি, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বর্জ্য পোড়ানোকে দূষণের গুরুত্বপূর্ণ উৎস বলা হয়েছে।

এছাড়া, বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে বায়ুদূষণের সঙ্গে ১ লাখ ৫৯ হাজারের বেশি অকালমৃত্যু এবং বিপুল অসুস্থতার সম্পর্ক ছিল; দূষণের স্বাস্থ্যব্যয় জিডিপির আনুমানিক ৮ দশমিক ৩ শতাংশের সমতুল্য। একই সূত্রে ঢাকার বার্ষিক PM2.5 মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকার ১৮ গুণ পর্যন্ত বলা হয়েছে।

অন্য দেশের অভিজ্ঞতা: সমাধান সম্ভব, যদি প্রয়োগ থাকে

ইউরোপীয় ইউনিয়নে খাদ্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও বিতরণের প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করার ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো পণ্যে ঝুঁকি ধরা পড়লে উৎস শনাক্ত করে তা প্রত্যাহার করা যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কাঁচামাল থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত চালান ও উৎসের তথ্য সংরক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য দ্রুত প্রত্যাহার এবং পরীক্ষার ফল প্রকাশের নিয়ম কার্যকর করা যেতে পারে।

সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে উৎস সুরক্ষা, উন্নত শোধন, পুনর্ব্যবহার এবং সরবরাহব্যবস্থার ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ একসঙ্গে দরকার। দেশটির পানি সংস্থা নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে কলের পানি ও পুনঃশোধিত NEWater-এর মান যাচাই করে। চীনের হেবেই অঞ্চলে কঠোর লক্ষ্য, দূষণকারী খাতের ওপর ব্যবস্থা ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে PM2.5 প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছিল বলে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে। এই অভিজ্ঞতা সরাসরি বাংলাদেশে নকল করা যাবে না, তবে নিয়মিত পরিমাপ, বাধ্যতামূলক লক্ষ্য ও জবাবদিহির গুরুত্ব শেখায়।

বাংলাদেশের করণীয় : নতুন আইন নয়, আগে বিদ্যমান আইনের বাস্তব প্রয়োগ

বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩, পানি আইন ২০১৩, বায়ুদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০২২ এবং পরিবেশসংক্রান্ত আইন ও বিধি রয়েছে। ফলে মূল ঘাটতি শুধু আইনের অভাব নয়; ছড়িয়ে থাকা দায়িত্ব, দুর্বল তদারকি, সীমিত পরীক্ষাগার, প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনীহা এবং অপর্যাপ্ত জবাবদিহিও বড় বাধা। নতুন আইন বা সংশোধন প্রয়োজন হলে তা বিদ্যমান ব্যবস্থার ঘাটতি পূরণ করুক—দায়িত্ব আরো ছড়িয়ে না দিক।

অবিলম্বে যে কটি পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি

১. স্বাধীন ও সমন্বিত তদারকি : খাদ্য, পানি ও বায়ু পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত জনবল এবং স্বীকৃত পরীক্ষাগার গড়ে তুলতে হবে। পরিদর্শন হবে ঝুঁকিভিত্তিক, নিয়মিত ও রাজনৈতিক-ব্যবসায়িক প্রভাবমুক্ত।

২. খাদ্যে পূর্ণ অনুসরণযোগ্যতা : উৎপাদক, আমদানিকারক, পাইকার ও বিক্রেতার তথ্য সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। পরীক্ষায় ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য ধরা পড়লে দ্রুত প্রত্যাহার, জনসাধারণকে সতর্ক করা, জরিমানা ও পুনরাবৃত্তিতে লাইসেন্স বাতিল নিশ্চিত করতে হবে।

৩. পানির উৎস ও সরবরাহ সুরক্ষা : প্রতিটি জেলা ও নগরের উৎস, শোধনাগার ও সরবরাহব্যবস্থার পানি নিয়মিত পরীক্ষা করে ফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য পরিশোধনাগার কার্যকর আছে কি নাÑতা আকস্মিকভাবে যাচাই করতে হবে; নদী ও জলাশয়ে অপরিশোধিত বর্জ্য ফেললে ক্ষতিপূরণসহ কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। উপকূল ও আর্সেনিকপ্রবণ এলাকায় নিরাপদ বিকল্প উৎস, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং স্থানীয় বাস্তবতার উপযোগী শোধনব্যবস্থা বাড়াতে হবে।

৪. বায়ুদূষণের উৎসে নিয়ন্ত্রণ : নির্মাণস্থল ঢেকে রাখা, রাস্তার ধুলা নিয়ন্ত্রণ, যানবাহনের নির্গমন পরীক্ষা, দূষণকারী ইটভাটা আধুনিকায়ন বা বন্ধ এবং বর্জ্য পোড়ানো বন্ধে নিয়মিত নজরদারি দরকার। শহরভিত্তিক বায়ুমান ও দূষণকারী উৎসের তথ্য প্রকাশ করতে হবে; দূষণ বেশি হলে স্কুল, হাসপাতাল ও শ্রমজীবীদের সুরক্ষায় জরুরি নির্দেশনা দিতে হবে।

৫. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি : অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা, হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা, অপরাধ ও শাস্তির প্রকাশ্য তালিকা এবং স্বাধীন বার্ষিক প্রতিবেদন চালু করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা বা অবহেলারও তদন্ত ও জবাবদিহি থাকতে হবে।

পরিষ্কার পানি, নিরাপদ খাদ্য ও নির্মল বায়ু কোনো বিলাসিতা নয়; মানুষের জীবন ও মর্যাদার শর্ত। সরকার বদলায়, কিন্তু দূষণ ও অসুস্থতার বোঝা সাধারণ মানুষের ওপরই পড়ে। তাই প্রতিটি সরকারকে ঘোষণার বদলে পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে—সুস্বাস্থ্য জনগণের অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং তা নিশ্চিতকরণ সরকারের অগ্রাধিকার।

আইন আছে; এখন প্রয়োজন নিরপেক্ষ প্রয়োগ, সমন্বিত প্রশাসন এবং অপরাধীর পরিচয় না দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

লেখক: সাবেক সেনা কর্মকর্তা

শিক্ষক নিয়োগ ও র‌্যাংকিংয়ে অবনতি

ভারত-ইসরাইলে পেলেট গানের নৃশংসতা

ক্ষমতার দম্ভ সুশাসনের অন্তরায়

বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি কেন কমে না

লিথিয়াম ও কোবাল্টের রাজনীতি

হুথিরা কি সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে পড়তে যাচ্ছে

রাজনীতিতে হিরো আর ভিলেনের মাপকাঠি

কিশোর আইন যখন অপরাধের ঢালে

ব্যাংক খাত: লুটপাট ও উত্তরণের উপায়

গ্যাস বিপর্যয়ের নেপথ্যে কী