হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

গোলাপের সৌন্দর্য খুশবুতে শাসকের সৌন্দর্য সুশাসনে

এলাহী নেওয়াজ খান

বহু প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ১২ ফেব্রুয়ারি। অথচ এর আগে কত অনিশ্চয়তা কত ষড়যন্ত্রের গল্প শুনতে শুনতে আমাদের কান ঝালাপালা হয়েছে। প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকেই শুনে আসছিলাম নির্বাচন না হওয়ার নানা কাহিনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ কেউ এমনভাবে মন্তব্য করেছিলেন যে, ১০০ শতাংশ নিশ্চিত থাকুন নির্বাচন হবে না। নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগেও অনেকে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু অবশেষে নির্ধারিত সময়েই এক অসাধারণ নির্বাচন উপহার দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূস ও তার উপদেষ্টা পরিষদ। এজন্য প্রফেসর ইউনূস নিঃসন্দেহে দেশবাসীর অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য।

কেউ কথা রাখে না বলে যে উক্তি আমরা করে থাকি বারবার, তা ভুল প্রমাণ করে প্রফেসর ইউনূস ঠিকই তার কথা রেখেছেন। নিন্দুকেরা যা-ই বলুক না কেন, শপথ নেওয়ার পর থেকে তিনি যা যা বলেছিলেন তার সবই তিনি করেছেন, কিংবা করার চেষ্টা করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, শাসক মানে জনগণকে দেওয়া ওয়াদা পূরণ করা। যদিও তার চলার পথ কুসুমাকীর্ণ ছিল না। তার কার্যকালে প্রতিদিন রাজপথ প্রকম্পিত হয়েছে বিভিন্ন পেশার মানুষের আন্দোলনে। বহুবার তিনি নিজ বাসভবনে ঘেরাও হয়েছেন, যা অতীতে কখনো ঘটেনি। তবুও তিনি অবিচল থেকেছেন এবং শেষ পর্যন্ত সফলভাবে লক্ষ্যে পৌঁছেছেন। নিশ্চয়ই তার এই ঐতিহাসিক ভূমিকা এদেশের মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

এদিকে এই নির্বাচনের ফলাফলের মধ্য দিয়ে জুলাই বিপ্লবের চেতনা কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, তা নিয়ে হয়তো ভবিষ্যতে অনেক মূল্যায়নের অবকাশ রয়েছে। তবে আপাতত এটুকু বলা যায় যে, এ নির্বাচনে বিজয় লাভ করেছে জুলাই বিপ্লবের ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো। বিজয় হয়েছে যেমন বিএনপির, তেমনি বিজয় হয়েছে জামায়াত-এনসিপি জোটের। কারণ উভয় পক্ষই আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের নিষ্ঠুর নিপীড়নের শিকার হয়েছিল। বিনা দোষে আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কারানির্যাতন ভোগ অথবা দলের বহু নেতাকর্মীর গুম-খুনের ঘটনা কিংবা হাজার হাজার নেতাকর্মীর মামলায় নিঃশেষ হওয়া কম স্যাক্রিফাইস নয়। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সব শীর্ষ নেতার ফাঁসিতে আত্মদানকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কিংবা আওয়ামী লীগের কর্মীদের লগি-বৈঠার আঘাতে জামায়াতের যেসব নেতা শহীদ হয়েছেন, তাদের অবদানকে কি অস্বীকার করা যাবে?

শাপলা চত্বর ট্র্যাজেডি কি আমাদের মনে করিয়ে দেয় না কতটা নৃশংস ছিল সেই হত্যাকাণ্ড! তারা ছিল অতিদরিদ্র পরিবার থেকে আসা মাদরাসার নিরস্ত্র অসহায় ছাত্র। যেভাবে তাদের হত্যা করা হয়েছিল, তা জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডকেও হার মানায়। ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছিল। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডায়ারের নেতৃত্বে ব্রিটিশ সৈন্যরা একটা সমাবেশের ওপর নির্বিচার গুলি চালালে ৩৭৯ জন নিরস্ত্র মানুষ নিহত হন। ঠিক একইভাবে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী গুলি করে হত্যা করে ৮৩ জনের মতো নিরীহ মাদরাসার ছাত্রকে এবং এতে আহত হন দুই হাজারের মতো। তাই জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে খুনি শাসকদের ১৫ বছরের নিষ্ঠুর শাসনের অবসান ঘটার পর ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচন আমাদের জাতীয় জীবনে যে আশার আলো জ্বালিয়েছে, তাকে আরো উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করার দায়বদ্ধতা এসে পড়েছে নির্বাচিতদের ওপর।

আল্লামা ইকবাল লিখেছেন, গোলাপের সৌন্দর্য তার খুশবুতে। তেমনি আমরা বলতে চাই, শাসকের সৌন্দর্য ও গৌরব সুশাসন ও জনসম্পৃক্ত উন্নয়নে নিহিত রয়েছে। অন্যদিকে অপশাসন ও কুক্ষিগত উন্নয়ন একজন শাসকের ভাগ্যে ডেকে আনে চরম বিপর্যয়, যা আমরা শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনকালে প্রত্যক্ষ করেছি। সুতরাং নির্বাচনে যারা ২১২ আসন লাভ করে সরকার গঠন করেছে, কিংবা যারা ৭৭ আসন পেয়ে বিরোধী দলে বসেছে, তাদের উভয়েরই দায়বদ্ধতা রয়েছে জুলাই বিপ্লবকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়ার।

কেবল কথার ফুলঝুরি কিংবা বাগাড়ম্বরপূর্ণ ভাষণ দিয়ে জনগণকে মোহিত করার দিন হয়তো শেষ হয়ে গেছে। এই নির্বাচনে যেমন অনেক সমীকরণ কাজ করেছে, তেমনি কোনো কোনো দলের ঐতিহ্যবাহী ভোটারদের পক্ষবদলের দৃষ্টান্তও চোখে পড়েছে। বিশেষ করে জুলাই বিপ্লবের পর নতুন যে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজে পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা প্রথাগত কূপমণ্ডূকতায় আর আবদ্ধ নেই।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সবচেয়ে বড় লক্ষণীয় দিক হচ্ছে দুই নেত্রীর অনুপস্থিতি। একজন অর্থাৎ শেখ হাসিনা জুলাই বিপ্লবের মুখে পালিয়ে ভারতের আশ্রয়ে আছেন। আর দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া নিদারুণ কষ্ট নিয়ে অনন্তকালে চলে গেছেন, আর কখনো কোনোদিন আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন না। আজ যদি বেগম খালেদা জিয়া তার দলের এই অবিস্মরণীয় বিজয় দেখে যেতে পারতেন, তাহলে হয়তো হৃদয়ের প্রশান্তি নিয়ে শেষ বিদায় নিতে পারতেন। আমাদের দেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য বেগম খালেদা জিয়ার অবদানকে যদি বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব গভীরভাবে অনুধাবন করতে সক্ষম হন, তাহলে ইতিবাচক রাজনীতির পথ আরো সুগম হবে। আর যদি হাইব্রিডদের উগ্র বাসনা চরিতার্থ করতে পতিত নিষ্ঠুর শত্রুর সঙ্গে হাত মেলানোর অভিপ্রায় জেগে ওঠে, তাহলে ভবিষ্যতে অন্যরকম এক সংঘাতময় বাংলাদেশ আমরা দেখব, যা বহন করার ক্ষমতা জনগণের থাকবে না। এই পরিস্থিতির দায়-দায়িত্ব শুধু ক্ষমতাসীন দল নয়, বিরোধী দলকেও কাঁধে নিতে হবে।

যদিও চলার এ পথ মসৃণ নয়। ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনকালে প্রতিটা প্রতিষ্ঠানকে ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়েছে। ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে আত্মবিশ্বাসের ভিত। আস্থার জায়গা সংকীর্ণ হয়ে গেছে। ঘৃণা ও বিদ্বেষের ভিত্তিতে সমাজের বিভক্তি আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কাজটি কঠিন হওয়াই স্বাভাবিক। যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মুদ্রার রিজার্ভ, আন্তর্জাতিক দায় পরিশোধ এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিসহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে বেশ ভালো অগ্রগতি রেখে যাচ্ছে। এটার সুবিধা নতুন সরকার কিছুটা পাবে। তবে জাতীয় ঐক্যের দুরূহ কাজটি বিএনপি সরকারকেই করতে হবে। একই সঙ্গে এই ঐক্য প্রতিষ্ঠায় বিরোধী দলের ভূমিকাও কম থাকবে না। সুতরাং সরকারি ও বিরোধী দল উভয়কেই সংলাপের মাধ্যমে সমস্যাগুলোর সমাধান করে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে—এটাই জনগণের প্রত্যাশা। এতে ব্যর্থ হলে প্রতিশোধমূলক আরেকটি সংঘাত বিশ্ববাসী দেখবে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

হারিয়ে যাওয়া একুশে ফেব্রুয়ারি

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও অবরুদ্ধ স্বকীয়তা

‘মুখের ভাষা’ কেড়ে নেওয়ার আধুনিক মানচিত্র

পশ্চিম তীরে ভূমি অধিগ্রহণ জর্ডানের জন্য সরাসরি হুমকি

গণতান্ত্রিক যাত্রায় প্রয়োজন ছায়া মন্ত্রিসভা

‘কেনু উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গে ইসলামপন্থিরা ভোট পেল; ছ্যা ছ্যা ছ্যা’

চাই ইনসাফের বাংলাদেশ

ক্ষমতার ভাষা যখন রাজনীতিকে গ্রাস করে

মৃত্যুর দ্বার থেকে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী

টিআইবির রিপোর্ট এবং আমাদের নতুন পথচলা