বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অদ্ভুত পুনরাবৃত্তি চলছে। মুখ বদলেছে, ভাষা বদলেছে, কিন্তু আচরণ বদলায়নি। ক্ষমতার কেন্দ্রে যারা, তাদের ঘিরে আবার জমছে সুযোগসন্ধানীদের ভিড়। আর যারা সংগ্রাম করেছেন, নির্যাতন সহ্য করেছেন, তারা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছেন প্রান্তে। হয়ে যাচ্ছেন ব্রাত্য।
একসময় টকশোতে এক তরুণ বুদ্ধিজীবীর কথা শুনতাম। তিনি বলতেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়তে হলে নেতাদের পকেটে শেখ হাসিনার ছবি রাখতে হবে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সেই ছবির দিকে তাকাতে হবে। তারপর ভাবতে হবে—হাসিনা যা করেছেন, তার উল্টোটা করতে হবে। কথাটি ছিল প্রতীকী। অর্থ ছিল—অন্যায়ের বিপরীতে ন্যায়, দমননীতির বিপরীতে গণতন্ত্র। কিন্তু আজ সেই একই ধারা উল্টোভাবে ফিরে আসছে। যারা একসময় স্বৈরাচারের সমালোচনা করতেন, তাদের অনেকের ভাষা আজ একই ধরনের শোনায়। ভিন্ন পতাকা, কিন্তু একই ভঙ্গি। ভিন্ন দল, কিন্তু একই মানসিকতা। অবাক করার বিষয় হলো ওই তরুণও বদলে গেছেন। আরাফাতরা যে ভাষায় কথা বলতেন, তিনিও এখন সেই ভাষায় কথা বলেন।
গত দেড় দশকে আমরা দেখেছি, বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়ার বড় অংশ একদলীয় প্রভাবের মধ্যে ছিল। মতপ্রকাশ সংকুচিত হয়েছিল। সমালোচনা মানেই ছিল শত্রুতা। এখন ক্ষমতার পালাবদলের পর দৃশ্যপট বদলানোর কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে—শুধু আনুগত্যের দিক পরিবর্তন হয়েছে, চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি।
আজ দেখা যাচ্ছে, বহু তথাকথিত বিশ্লেষক, যারা একসময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতেন, তারাই এখন প্রশংসায় পঞ্চমুখ। যারা সজীব ওয়াজেদ জয়কে অতিরিক্ত মহিমান্বিত করতেন, তারাই এখন বিপরীত সুরে কথা বলছেন। এই দ্রুত রূপান্তর আদর্শের নয়, স্বার্থের। রাজনীতিতে এটি নতুন কিছু নয়। কিন্তু বিপজ্জনক হলো—এই প্রবণতাকে এখন প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। সরকার নিজেই এই ব্যক্তিদের কাছে টানছে। ফোন করছেন। চিঠি দিচ্ছেন। সম্মান দিচ্ছেন। ফলে বার্তা যাচ্ছে—আদর্শ নয়, আনুগত্যই মূল পুঁজি।
এখানেই শুরু হচ্ছে সংকট। কারণ, যারা সত্যিকার অর্থে আন্দোলন করেছে, যারা মাঠে ছিল, যারা নির্যাতন সহ্য করেছে—তারা এখন সাইডলাইনে। তাদের অভিজ্ঞতা, ত্যাগ, সংগ্রাম—সবকিছু যেন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে। এই অবহেলা শুধু অন্যায় নয়, রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী। রাজনীতির তত্ত্ববিদরা বলেন, ‘দলের শক্তি তার শিকড়ে।’ হার্ভার্ডের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বহুবার দেখিয়েছেন, যখন কোনো দল তার তৃণমূলকর্মীদের অবমূল্যায়ন করে, তখন সেই দল দ্রুত জনভিত্তি হারায়। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির গবেষকরা এটিকে বলেন ‘এলিট ক্যাপচার’—যেখানে ক্ষমতা দখল করে নেয় সুবিধাভোগী একটি শ্রেণি।
বাংলাদেশে এখন সেই চিত্র স্পষ্ট। সংসদে স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) সংশোধন বিল, ২০২৬ পাসের সময় যে বিতর্ক হয়েছে, তা এই সংকটকে আরো উন্মোচিত করেছে। এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদের প্রশ্ন ছিল সরল কিন্তু তীক্ষ্ণ—‘শেখ হাসিনা খারাপ, কিন্তু তার নীতি ভালো কীভাবে?’ এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
কারণ, যদি নীতিই অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে পরিবর্তন কোথায়? শুধু ব্যক্তি পরিবর্তন কি যথেষ্ট? রাজনৈতিক দার্শনিক হান্নাহ আরেন্ট বলেছিলেন, ‘ক্ষমতা তখনই বিপজ্জনক হয়, যখন তা নিজেকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে মনে করে।’ আজ সেই প্রশ্নই সামনে—নতুন সরকার কি নিজেকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে ভাবছে?
আরো একটি বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—সমালোচনার প্রতি অসহিষ্ণুতা। একসময় আওয়ামী লীগের সমালোচনা করলেই বিএনপি-জামায়াত ট্যাগ দেওয়া হতো। এখন একই সংস্কৃতি অন্যভাবে ফিরে এসেছে। সরকারের সমালোচনা করলেই তাকে জামায়াত বা এনসিপি বলা হচ্ছে। এমনকি বিএনপির ভেতরেও যারা সৎ এবং স্বাধীনভাবে কথা বলেন, তাদের বিরুদ্ধে ‘গুপ্ত শিবির’ গুপ্ত জামায়াত তকমা লাগানোর চেষ্টা চলছে। এটি গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। কারণ, গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো ভিন্নমত। সমালোচনা না থাকলে ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ থাকে না। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট ডাল গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত হিসেবে ‘পাবলিক কনটেস্টেশন’—অর্থাৎ মুক্ত বিতর্কের ওপর জোর দিয়েছেন। সেই জায়গাটিই সংকুচিত হচ্ছে।
এখন আসা যাক নৈতিকতার প্রশ্নে। কৃতজ্ঞতা, অকৃতজ্ঞতা এবং কৃতঘ্নতা—এই তিনটি শব্দের পার্থক্য শুধু ভাষাগত নয়, রাজনৈতিকও। অকৃতজ্ঞ ব্যক্তি উপকার স্বীকার করে না। কিন্তু কৃতঘ্ন ব্যক্তি উপকারীর ক্ষতি করে। আজ যদি দেখা যায়, যারা জুলাইয়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তাহলে সেটি শুধু অকৃতজ্ঞতা নয়—কৃতঘ্নতা। এটি দীর্ঘ মেয়াদে ভয়াবহ ফল বয়ে আনবে। কারণ, ইতিহাসে দেখা গেছে, বিপ্লবের শক্তিকে দমন করার চেষ্টা করলে সেই শক্তি আরো তীব্র হয়ে ফিরে আসে। ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে আরব বসন্ত—সব জায়গায় এই বাস্তবতা প্রমাণিত। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম হবে না।
এখন প্রশ্ন—কেন এমন হচ্ছে? প্রথমত, ক্ষমতার কেন্দ্র সবসময় নিরাপত্তা খোঁজে। তারা এমন লোকদের কাছে টানে, যারা সমালোচনা করবে না। দ্বিতীয়ত, সুযোগসন্ধানীরা দ্রুত পরিবেশ বুঝে নিজেদের মানিয়ে নেয়। তৃতীয়ত, আদর্শগত চর্চার অভাব দলকে দুর্বল করে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে রাজনৈতিক দর্শন তৈরি করেছিলেন, সেটি ছিল জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং আত্মনির্ভরতার ওপর ভিত্তি করে। খালেদা জিয়া সেই ধারাকে রাজনৈতিক সংগ্রামের মাধ্যমে শক্তিশালী করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, সেই আদর্শিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। এটি শুধু একটি দলের সমস্যা নয়। এটি পুরো রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংকট।
এখন সরকারের জন্য কিছু স্পষ্ট পরামর্শ। প্রথমত, দল ও সরকারকে আলাদা রাখতে হবে। যারা শুধু সুবিধার জন্য এসেছে, তাদের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। দ্বিতীয়ত, ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মীদের মূল্যায়ন করতে হবে। তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে। তৃতীয়ত, সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। বরং সমালোচনাকে নীতিনির্ধারণের অংশ করতে হবে। চতুর্থত, আইনপ্রণয়নের ক্ষেত্রে অতীতের বিতর্কিত নীতিগুলো পুনর্বিবেচনা করতে হবে। শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আইন পাস করা গণতন্ত্র নয়। পঞ্চমত, তরুণদের সঙ্গে সংঘাত নয়, সংলাপ করতে হবে। তাদের শক্তিকে দমন নয়, কাজে লাগাতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বিশ্বাস পুনর্গঠন। জনগণ এখন আর শুধু কথায় বিশ্বাস করে না। তারা আচরণ দেখে। তারা ধারাবাহিকতা দেখে। তারা দেখে—আপনি যা বলছেন, তা করছেন কি না। যদি বর্তমান সরকার এই বাস্তবতা বুঝতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ইতিহাস তাদেরও একইভাবে বিচার করবে, যেভাবে অতীতকে করেছে।
শেষ কথা সরল। রাজনীতি যদি আদর্শ হারায়, তাহলে তা শুধু ক্ষমতার খেলায় পরিণত হয়। আর ক্ষমতার এই খেলা কখনো স্থায়ী হয় না। জুলাইয়ের জনআকাঙ্ক্ষা ছিল পরিবর্তনের। সেই পরিবর্তন যদি আচরণে না আসে, তাহলে সেটি শুধু একটি স্লোগান হয়ে থাকবে। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। আপনি কি সত্যিই ভিন্ন হতে চান, নাকি একই পথের নতুন যাত্রী হতে চান?
লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন