হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ভারতে ‘জেনজি’র লক্ষ্য গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার

আশুতোষ ভার্শ্নেয়

ভারতে কংগ্রেস জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে বর্তমান ‘জেনজি’র আন্দোলনকে শুধু স্বল্পমেয়াদি রাজনীতির আলোয় দেখা হবে একধরনের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। এই তরুণ প্রজন্ম যা করছে, তা ভারত ও বিশ্ব উভয়ের জন্যই তাৎপর্যপূর্ণ। তাদের এই লড়াই মূলত ভারতের ক্রমাবনতিশীল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য। দেশটির গণতন্ত্রের ওপর ১৯৭৫-৭৭ সালের জরুরি অবস্থার পর বর্তমান নরেন্দ্র মোদি সরকারের আমলেই সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে। এই আঘাতটিকে উল্টে দেওয়ার চেষ্টা করছে ‘জেনজি’। বিষয়টিকে এই দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। একে শুধু সিজেপি নেতা অভিজিৎ দীপকে ও তার পটভূমি কিংবা প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধীর পছন্দ-অপছন্দের গণ্ডিতে আটকে রাখা ঠিক হবে না।

বর্তমানের এই রাজনৈতিক মুহূর্তটি কি স্থায়ী হবে এবং বড় কোনো পরিবর্তন আনবে, নাকি মোদি সরকার আরো কঠোর দমন-পীড়নের মাধ্যমে পাল্টা আঘাত হানবে, তা নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা কঠিন। তবে কোনো কোনো কলামিস্ট নিশ্চিত যে, সরকারের দমন-পীড়ন আরো বাড়বে। আমি অবশ্য এতটা নিশ্চিত নই। উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সুনির্দিষ্ট কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব নয় বলেই আমি মনে করি। সংকটপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে ভবিষ্যৎ প্রায়ই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

আমার মতে, মোদি সরকারের যে ক্রমবর্ধমান আধিপত্যের কথা একসময় বলা হতো, তার যে নেতিবাচক অধোগতি শুরু হয়েছে, তা তারা কীভাবে সামাল দেবে, তা কল্পনা করা কঠিন। বিশেষ করে রামমন্দির নির্মাণ এবং পশ্চিমবঙ্গে বিশাল নির্বাচনি জয়ের পরও মোদি সরকারের জনসমর্থন নিচের দিকেই নামছে। এই পরিস্থিতি থেকে তারা কি সত্যিই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে? যদি পারে, তবে কীভাবে, তা আমরা জানি না। তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে ধারণাগতভাবে প্রাসঙ্গিক উপায়ে বিশ্লেষণ করা সম্ভব। এ ধরনের বিশ্লেষণ শুধু তাত্ত্বিক কোনো বিষয় নয়, এমন সময়ও আসে যখন তত্ত্বের বিশাল অভিজ্ঞতালব্ধ গুরুত্ব থাকতে পারে।

গণতন্ত্রের তাত্ত্বিকরা দীর্ঘদিন ধরেই স্বীকার করে এসেছেন, ভারতের গণতন্ত্র ঐতিহাসিকভাবেই ব্যতিক্রমী ছিল। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল আয় ও শিল্পায়ন। সাধারণত ধনী ও শিল্পোন্নত দেশগুলোতেই শুধু দীর্ঘস্থায়ী গণতন্ত্র থাকার প্রবণতা দেখা যায়। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো বাদে গণতন্ত্র মূলত একধরনের ‘ধনী দেশগুলোর খেলা’ হয়েই থেকেছে। তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর বাইরে সিঙ্গাপুরই একমাত্র দেশ, যেখানে গণতন্ত্র নেই, অথচ মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে দেশটি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও ধনী।

স্বাধীনতার পরবর্তী কয়েক দশক ভারত ছিল দরিদ্র এবং নামমাত্র শিল্পায়িত, তবু সেখানে গণতন্ত্র টিকে ছিল। ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পথে প্রতিকূলতা ছিল অত্যন্ত প্রবল। আর ঠিক এ কারণেই গণতন্ত্র নিয়ে গবেষণাকারীদের কাছে এর গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯৬৬ সালে ‘সোশ্যাল অরিজিন্স অব ডিক্টেটরশিপ অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ গ্রন্থের রচয়িতা ব্যারিংটন মুর জুনিয়র লিখেছিলেন—‘...রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে ভারত আধুনিক বিশ্বেরই অংশ। ১৯৬৪ সালে নেহরুর মৃত্যুর সময় সেখানে রাজনৈতিক গণতন্ত্রের বয়স ছিল ১৭ বছর। ব্যবস্থাটি হয়তো নিখুঁত ছিল না, কিন্তু তা কোনোভাবেই নিছক লোকদেখানো বিষয় ছিল না।... এশীয় প্রেক্ষাপট এবং শিল্পবিপ্লবহীন কোনো সমাজে রাজনৈতিক গণতন্ত্রের অস্তিত্ব কিছুটা অদ্ভুত মনে হতে পারে।’

এরপর ১৯৮৯ সালে আধুনিক গণতান্ত্রিক তত্ত্বের অন্যতম প্রবক্তা রবার্ট ডাল লিখেছিলেন, গণতান্ত্রিক তত্ত্বের বিচারে ভারত ছিল ‘সমসাময়িক এক প্রধান ব্যতিক্রম’। সবশেষে, ২০০১ সালে গত কয়েক দশকের মধ্যে পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণে সবচেয়ে দক্ষ গণতন্ত্র-তাত্ত্বিক অ্যাডাম প্রজেওর্স্কি লিখেছিলেন—‘ভারতে গণতন্ত্র টিকে থাকার পথে প্রতিকূলতা ছিল অত্যন্ত বেশি।’

তবে এই বক্তব্যটি মূলত ‘নির্বাচনভিত্তিক গণতন্ত্র’ হিসেবে ভারতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ‘উদারনৈতিক গণতন্ত্র’ হিসেবে ভারতের কার্যকারিতা ততটা সন্তোষজনক ছিল না। উদারনৈতিক গণতন্ত্র ও নির্বাচনভিত্তিক গণতন্ত্র—এ দুটি ভিন্ন ধারণার মধ্যে দ্বিতীয়টি অধিকতর ব্যাপক। কারণ শুধু নির্বাচনের মাধ্যমেই গণতন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ রূপ বা বিষয়বস্তু সংজ্ঞায়িত বা নির্ধারিত হয় না।

অবাধ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন এবং সর্বজনীন ভোটাধিকার ছাড়া কোনো আধুনিক গণতন্ত্র সম্ভব নয়। এটি গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য শর্ত। কিন্তু নির্বাচনই গণতন্ত্রের একমাত্র বিষয় নয়। ধারণা হিসেবে উদারনৈতিক গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনের বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করে না, বরং নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকার কী ধরনের আচরণ করছে, সেটাও বিবেচনায় নেয়। একটি উদারনৈতিক গণতন্ত্র সর্বদা নাগরিক স্বাধীনতা—বিশেষ করে বাক্‌স্বাধীনতা ও সংঘবদ্ধ হওয়ার স্বাধীনতা—সুরক্ষিত রাখে। বর্তমান সময়ে যাকে ‘সুশীল সমাজ’ (সিভিল সোসাইটি) হিসেবে অভিহিত করা হয়।

সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি উদারনৈতিক গণতন্ত্র সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করে। যুক্তিটি হলো—সংখ্যাগুরুরা তাদের সংখ্যার জোরে নিজেদের রক্ষা করতে পারে, কিন্তু সংখ্যালঘুদের সেই সংখ্যাগত শক্তি থাকে না। তাই সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার ব্যবস্থা না থাকলে গণতন্ত্র শুধু সংখ্যাগুরুর একচ্ছত্র ও দমনমূলক শাসনে পরিণত হতে পারে। আবার, বাক্‌স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের স্বাধীনভাবে বেসরকারি সংগঠন গড়ে তোলার অধিকার সুরক্ষিত না থাকলে নির্বাচনী স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও একটি নির্বাচনি গণতন্ত্র দমনমূলক স্বৈরাচারী ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে।

নির্বাচনি প্রক্রিয়ার অবক্ষয়

ভারতে ২০১৪ সালের পর গণতন্ত্রের নির্বাচনি ও উদারনৈতিক—এ দুই দিকের মধ্যে গভীর সংঘাত তৈরি হয়। সামগ্রিকভাবে ভারতের নির্বাচনি গণতন্ত্র বেশ প্রাণবন্তই ছিল। কিন্তু দেশটির শাসনব্যবস্থার উদারনৈতিক চরিত্রটি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হতে থাকে। কারণ বাক্‌স্বাধীনতা, সুশীল সমাজ এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার আক্রমণের মুখে পড়ে। অর্থাৎ, প্রথমেই উদারনৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় শুরু হয়েছিল।

২০২৪ সালের নির্বাচনের পর নির্বাচনি প্রক্রিয়ারও অবক্ষয় শুরু হয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি হলো ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) বা ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ প্রক্রিয়া, যা কার্যত নাগরিকদের ভোটাধিকারের ওপরই একধরনের আঘাত। এসআইআরের ক্ষেত্রে দুটি মূল ধারণা কাজ করছে। এগুলো হচ্ছে—(ক) ভোট দেওয়ার যোগ্যতার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্রের পর্যাপ্ততা-সংক্রান্ত ধারণা এবং (খ) ভোটার হিসেবে নাম নিবন্ধনের দায়ভার নাগরিকদের ওপর ন্যস্ত করা বা চাপিয়ে দেওয়া। অথচ প্রথাগতভাবে এটি সরকারেরই দায়িত্ব ছিল।

ভারতের প্রতিষ্ঠাতাদের ধারণা ছিল, দরিদ্র নাগরিকদের ভোট দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসা ও নাম নথিভুক্ত করার মতো প্রয়োজনীয় সাক্ষরতা বা সক্ষমতা হয়তো থাকবে না। তাই সরকারের উচিত দরিদ্রদের কাছে পৌঁছানো এবং তাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা। আর সরকার তা করেছিলও। কিন্তু বর্তমানে নির্বাচন কমিশন পর্যাপ্ত নথিপত্র দাবি করছে, যা নাগরিকদের অবশ্যই জমা দিতে হবে। বিপুলসংখ্যক নাগরিকের, বিশেষ করে দরিদ্রদের, কাছে যোগ্যতা বা নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র থাকার সম্ভাবনা কম। বিত্তবানরাও এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ঠিকই, কিন্তু তারা এমনভাবে সমস্যার সমাধান করতে পারবেন, যা দরিদ্রদের জন্য কঠিন হবে। কেননা, পরিস্থিতি তাদের প্রতিকূলে।

ভোটদানের যোগ্যতার জন্য নথিপত্রের পর্যাপ্ততার ধারণাটির জন্ম হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে এসআইআরের মতো ব্যবস্থার পেছনের ধারণাটিকে নীতিগতভাবে ‘ভোটার দমন’ হিসেবেই অভিহিত করা হতো। ঐতিহাসিকভাবে কৃষ্ণাঙ্গ এবং বর্তমানে দরিদ্র হিস্পানিক ভোটাররাই মূলত এ ধরনের শর্তের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ‘ভি-ডেম’ যুক্তরাষ্ট্রকে এমন একটি দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যেখানে গণতান্ত্রিক পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটছে।

গণতন্ত্রের জন্য ‘জেনজি’র লড়াই

ভারতে গণতন্ত্রের ওপর নেমে আসা আঘাত ঠেকাতে দেশে পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাই চালাচ্ছে ‘জেনজি’। এটি শুধু সিজেপিÑঅর্থাৎ কংগ্রেস জনতা পার্টি বা বিরোধী দলগুলোর সুবিধা পাওয়ার বিষয় নয়, এটি ভোটার হিসেবে নাগরিকদের অধিকারের নীতির বিষয়। নির্বাচন কমিশন এই নীতিকেই একধরনের অস্ত্রে পরিণত করেছে, যার ফলে কার্যত লাখ লাখ মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। কাব্যিক উপমায় বলতে গেলে, ‘জেনজি’ এমন কিছুর সন্ধান করছে, যাকে কবি সাহির লুধিয়ানভি ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে বলেছিলেন ‘ওহ সুবাহ কভি তো আয়েগি’ (সেই সকাল নিশ্চয়ই কোনো একদিন আসবে)।

সাহির লুধিয়ানভি চেয়েছিলেন এক বামপন্থি আদর্শ সমাজ বা ‘ইউটোপিয়া’। আর ‘জেনজি’ চায় গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার। সাহিরের চলচ্চিত্রের চরিত্ররা আশা করত ও প্রার্থনা করত। কিন্তু ভারতের ‘জেনজি’ প্রার্থনা করছে না, তারা লড়াই করছে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এই লড়াইটা তারা করছে নির্ভয়ে, নির্ভীক চিত্তে।

দ্য প্রিন্ট অবলম্বনে মোতালেব জামালী

বাংলাদেশে এআইনির্ভর অর্থনীতি

বুয়েটিয়ানরা কেন দেশ ছাড়ে, পেশা ছাড়ে

সুন্দর শরতে অসহ্য ডেঙ্গু

বিমানবন্দর, জবাবদিহিতা ও রাষ্ট্রের নৈতিকতা

ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি: স্থানীয় পর্যায়ে দায়িত্ব আছে, সম্পদ নেই

প্রধানমন্ত্রীর অ্যাকশন ও বিমানবন্দর ইস্যুতে গ্রেপ্তার

বাংলাদেশপন্থা: একটি নতুন রাষ্ট্রদর্শন

দেশ কি আরেক এক-এগারোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে

কুষ্টিয়ায় আওয়ামী পান্ডাদের অনুসরণ করছে ক্ষমতাসীনরা

আমাদের কিশোর সমাজ ও শিক্ষা কার্যক্রম