বাংলাদেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা
সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক। এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই যে, অধিকাংশ অংশীজনই মনে করেন—সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের বিস্তৃত পরিসরে স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার থাকা উচিত। বিষয়টি তাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিক—উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাস্তবতার নিরিখে, বিশেষ করে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে, এই স্বাধীনতা নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়।
প্রথাগতভাবে সংবাদপত্রের নীতিনির্ধারণ অনেকাংশেই নির্ভর করে প্রকাশক ও মালিক পক্ষের মতাদর্শ এবং তাদের ব্যবস্থাপনার ওপর। এর সঙ্গে প্রায়ই যুক্ত হয় রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ। ফলে, তাত্ত্বিকভাবে স্বাধীনতার অধিকার থাকা সত্ত্বেও, বাস্তবে বিভিন্ন স্বার্থের সংঘাতে একটি সত্যিকার অর্থে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যমের কাঠামো অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাহত হয়। গণমাধ্যম অর্থনীতিবিষয়ক গবেষণায় দেখা যায়, মালিকানার কেন্দ্রীভবন যত বাড়ে, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা তত সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
প্রতিবছরের মতো এ বছরও ৩ মে বিশ্বমুড়ে পালিত হবে ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে। এমন একসময়ে এই দিবসটি পালিত হচ্ছে, যখন বিভিন্ন তথ্যমতে ২০২৪ সালে বিশ্বে অন্তত ১২৪ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রায় এক-চতুর্থাংশ দেশে প্রেস ফ্রিডমের অবনতি ঘটেছে। এই দিবস আমাদের প্রতিবছরই মনে করিয়ে দেয়—গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের (আরএসএফ) সূচক অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ‘মিডিয়া ক্যাপচার’ বা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এখন একটি বড় উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য—‘শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গঠন : মানবাধিকার, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রসার’—বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশে প্রেস ফ্রিডম সূচকে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু পরিসংখ্যানগত উন্নতি লক্ষ করা যায়। গত বছর ১৮০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪২তম, যেখানে ২০২৪ সালে তা ছিল ১৬৫তম। এই অগ্রগতির একটি কারণ হিসেবে ডিজিটাল মাধ্যমে তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ বৃদ্ধিকে বিবেচনা করা হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু র্যাংকিং উন্নতি প্রকৃত স্বাধীনতার প্রতিফলন নয়; বরং কাঠামোগত পরিবর্তনই এখানে মুখ্য।
একটি দায়িত্বশীল ও স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া টেকসই গণতন্ত্র, শান্তি ও উন্নয়ন কল্পনা করা যায় না—এ কথা সর্বজনস্বীকৃত। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে গণমাধ্যমের বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রিন্ট মিডিয়ার পাশাপাশি টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যম দ্রুত সম্প্রাসারিত হয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিকাশ তথ্যপ্রবাহকে করেছে সহজ ও দ্রুততর। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা কয়েক কোটি ছাড়িয়েছে, যা তথ্যপ্রবাহের গতিশীলতা বহুগুণ বাড়িয়েছে। এই অগ্রগতি গণমাধ্যমকে উন্নয়ন-অভিযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে একই সঙ্গে বেড়েছে চ্যালেঞ্জও, যা অনেক ক্ষেত্রে এই খাতকে সীমাবদ্ধতা, চাপ ও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এখনো একটি জটিল বাস্তবতার মধ্যে অবস্থান করছে। সাম্প্রতিক কিছু আন্তর্জাতিক সূচকে উন্নতির আভাস মিললেও তা কাঠামোগত সমস্যার সমাধান নির্দেশ করে না। রাজনৈতিক মেরূকরণ, আইনি সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তাহীনতা—সব মিলিয়ে একটি বহুমাত্রিক সংকট তৈরি হয়েছে।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু পত্রিকা অফিস ও মিডিয়া হাউসে হামলার ঘটনা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে, অনেক সাংবাদিকই পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় শারীরিক হামলা, মামলা, হুমকি বা হয়রানির আশঙ্কায় থাকেন। বিশেষ করে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বা ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে এমন প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরো বেশি। কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টসের (সিপিজে) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে দায়মুক্তির সংস্কৃতি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে আরো উৎসাহিত করে। নারী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হয় লিঙ্গভিত্তিক হয়রানির আশঙ্কা, যা তাদের কাজের পরিবেশকে আরো অনিরাপদ করে তোলে।
আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা অনেক ক্ষেত্রেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে। বিশেষ করে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে কঠোর আইনপ্রয়োগ সাংবাদিকদের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে জনগুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় জনসমক্ষে আসতে বাধাগ্রস্ত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপতথ্য ও ভ্রান্ত তথ্যের বিস্তার, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। ডিজিটাল যুগে ‘ডিসইনফরমেশন’ ও ‘মিসইনফরমেশন’ এখন গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নির্দিষ্ট মত বা তথ্য প্রতিষ্ঠার জন্য পরিচালিত প্রচার গণতান্ত্রিক জবাবদিহিকে দুর্বল করে দেয়।
অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাও স্বাধীন গণমাধ্যমের একটি বড় অন্তরায়। মালিকানার কাঠামো, বাণিজ্যিক প্রভাব এবং বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীলতা সংবাদ পরিবেশনের নিরপেক্ষতাকে প্রভাবিত করে। অনেক ক্ষেত্রে সংবাদ নির্বাচন ও উপস্থাপনায় মালিক পক্ষ বা বাণিজ্যিক স্বার্থ প্রাধান্য পায়, যা গণমাধ্যমের মূল দায়িত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমের আয়ের বড় অংশ এখন ডিজিটাল বিজ্ঞাপননির্ভর, যেখানে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে।
প্রযুক্তিগত অগ্রগতি গণমাধ্যমের চেহারায় বড় পরিবর্তন এনেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়িয়েছে, তবে একই সঙ্গে সৃষ্টি করেছে নতুন চ্যালেঞ্জ। ‘সিটিজেন জার্নালিজম’ এবং ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’-এর উত্থান তথ্যপ্রবাহকে বহুমাত্রিক করেছে, কিন্তু এদের অনেকেই প্রচলিত সাংবাদিকতার নীতি ও দায়বদ্ধতার বাইরে কাজ করেন। ফলে তথ্যের সত্যতা যাচাই করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভ্রান্ত তথ্য সত্য তথ্যের তুলনায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি তথ্যপ্রবাহকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি বাড়িয়েছে বিভ্রান্তির ঝুঁকিও। তথ্য উপস্থাপনের নিপুণতার কারণে সাধারণ মানুষের জন্য সত্য ও অপতথ্যের পার্থক্য করা অনেক সময় কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ফলে বর্তমান সময়ে তথ্য যাচাই একটি জটিল ও দুরূহ প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। ডিপফেক প্রযুক্তির বিস্তার এই ঝুঁকিকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে গণমাধ্যমের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা, সংবেদনশীলতা এবং পেশাদারিত্বের কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি প্রয়োজন গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি। বর্তমান ‘ভাইরাল সংস্কৃতি’ এবং লাইভ সম্প্রচারের প্রবণতা তথ্যপ্রবাহকে দ্রুততর করলেও অনেক ক্ষেত্রে ভুল তথ্যের বিস্তার বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রতিযোগিতার এই পরিবেশে যাচাই-বাছাইয়ের অভাব গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। প্রথমত, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে এবং এর অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আইনি কাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন, যাতে সাংবাদিকরা ভয়মুক্তভাবে কাজ করতে পারেন। তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ বৃদ্ধি এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নারী সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ ও সহায়ক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা এবং দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বাধীন গণমাধ্যমের জন্য অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অপরিহার্য। মালিকানার স্বচ্ছতা এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি গণমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক মডেল, পাঠক-অর্থায়ন এবং অলাভজনক সাংবাদিকতার মডেল এখন বিশ্বজুড়ে বিকল্প হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।
প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। সরকার ও গণমাধ্যমকে যৌথভাবে প্রযুক্তি-সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করতে হবে। এআইয়ের যুগে টিকে থাকতে হলে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি মিডিয়া লিটারেসি বৃদ্ধির মাধ্যমে নাগরিকদের তথ্য ও অপতথ্যের পার্থক্য বোঝার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। শিক্ষাব্যবস্থায় মিডিয়া লিটারেসি অন্তর্ভুক্ত করা হলে দীর্ঘ মেয়াদে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
অনেকে মনে করতে পারেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু সাংবাদিক বা সংবাদপত্রের বিষয়। কিন্তু বাস্তবে এটি সমাজের সামগ্রিক স্বার্থের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে স্বাধীন গণমাধ্যম অপরিহার্য।
গণতন্ত্রের সুস্থ বিকাশ এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের জন্য স্বাধীন গণমাধ্যমের কোনো বিকল্প নেই। নিজেদের উন্নত ও সচেতন জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। কারণ একটি স্বাধীন গণমাধ্যমই শেষ পর্যন্ত নাগরিকের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করে এবং রাষ্ট্রকে জবাবদিহিমূলক রাখে।
লেখক : সরকারি কর্মকর্তা ও কলামিস্ট