যে দেশ সামুদ্রিক অর্থনীতিতে যত বেশি উন্নতি করতে পেরেছে, সে দেশের অর্থনীতি তত বেশি সমৃদ্ধ হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, বঙ্গোপসাগরের তলদেশে অনেক তেল ও গ্যাস মজুত রয়েছে। ২০১২ ও ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক আদালতের দুই রায়ে মিয়ানমার এবং ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হওয়ায় বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র অঞ্চল, ২০০ নটিক্যাল মাইলের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কর্তৃত্ব পায়। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানে অবস্থিত সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার অধিকার লাভ করে । বাংলাদেশ এখনো সমুদ্রের অফশোর পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্ভাবনা মূল্যায়ন করতে পারেনি। সমুদ্রসম্পদ হিসেবে তেল, গ্যাস, নীলশক্তি, জৈববস্তু, সামুদ্রিক ঔষধি উদ্ভিদ ইত্যাদির ওপর আরো মনোযোগ দেওয়া উচিত। দেরিতে হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্লু ইকোনমি বা সমুদ্র অর্থনীতি একটি নতুন দিগন্ত হিসেবে আবির্ভূত হতে চলেছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার একটি জরিপ গবেষণার প্রতিবেদন গত জানুয়ারিতে সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আমাদের বঙ্গোপসাগরে সেন্টমার্টিনের অদূরে ইয়েলো ফিন টুনা মাছের এক বিশাল মজুত ভান্ডারের সন্ধান মিলেছে, যার বাজারমূল্য ৫৪ মিলিয়ন ডলার। গবেষণা আরো বলছে, বঙ্গোপসাগরের ৪৭৫টি মৎস্য প্রজাতির বাইরে আরো ৬৫ প্রজাতির নতুন মাছের সন্ধান মিলেছে।
দেশের মৎস্য আহরণের ১৯ দশমিক ৪০ শতাংশ আসে সমুদ্র থেকে। গবেষকদের মতে, ইলিশ এবং টুনা ফিশারি জিডিপি ২ শতাংশ বাড়িয়ে দিতে পারে। ইদানীং মৎস্যবিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের জেলিফিশ ও বোল মাছের অফুরন্ত ভান্ডার রয়েছে, যা ওষুধশিল্পের বড় কাঁচামাল।
এরই মধ্যে সরকার পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় মৎস্য, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, মানবসম্পদ, পরিবহন, পর্যটন ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ১২টি উদ্যোগকে চিহ্নিত করেছে। ২০১৮ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশের মালবাহী পরিবহনের ৯০ শতাংশ সমুদ্রবাহী। ভবিষ্যতে এই পরিবহনে অর্থনীতির সম্ভাবনার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, উপকূলীয় শিপিং, যাত্রীসেবা, জাহাজ নির্মাণ ও পণ্য পরিবহন—এ বিষয়গুলোয় আরো মনোযোগ দেওয়া উচিত। প্রধান উপদেষ্টা তার বিদায়ী ভাষণে বলেছেন, সার্কভুক্ত দেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য পরিবহনে আমাদের বন্দরই প্রাণকেন্দ্র। মহেশখালী হতে পারে দ্বিতীয় সিঙ্গাপুর।
এদিকে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিন পর্যটনশিল্পের একটি বড় খাত। নিষেধাজ্ঞা, নিরাপত্তার অভাব, প্রচারণার অভাব ও সমন্বয়হীনতার কারণে ব্যাপক সম্ভাবনার এ খাতটি অনেকটা মুখ থুবড়ে পড়েছে। আমাদের ছোট-বড় ৭৫টি দ্বীপ রয়েছে, যেগুলো স্থানীয় ও বিদেশি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা যেতে পারে। উপকূলীয় পর্যটন বিশ্বব্যাপী জিডিপির ৫ শতাংশ এবং সব ধরনের কর্মসংস্থানের ৭ শতাংশ তৈরি করে। অর্থনীতির সম্ভাবনায় মুখিয়ে আছে আমাদের পর্যটনকেন্দ্রিক বিশাল সামুদ্রিক তট।
বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাস নিশ্চিত করতে এতদিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভর করতে হতো। তাদের দেওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে পূর্বাভাস নিশ্চিত করতে প্রায় ২০ থেকে ৩০ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। প্রয়োজনীয় রেজল্যুশন ছাড়া ম্যাপ তৈরি সম্ভব হয় না। অন্যদিকে, অবজারভেশনাল ওশানোগ্রাফির কোনো সেটআপ না থাকায় সামুদ্রিক গবেষণায় গবেষণা আটকে আছে। এরই মধ্যে উঁকি দিয়েছে আশার আলো। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস নির্ধারণ, সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ, অন্বেষণ ও যথাযথ ব্যবহারে বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশের প্রথম ‘ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন’ নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই গ্রাউন্ড স্টেশনের মাধ্যমে সামুদ্রিক আবহাওয়ার যেকোনো তথ্য ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে সংগ্রহ করা সম্ভব হবে এবং মডেলিং ও ম্যাপ তৈরির সক্ষমতা হবে। ফলে নির্ভরযোগ্য নিজস্ব পূর্বাভাস নিশ্চিত হবে।
ভৌগোলিকভাবে সমুদ্রকেন্দ্রিক এমন বদ্বীপ তথা স্থলদেশ বিশ্বে বিরল। কাজেই একটি কল্যাণরাষ্ট্রের কার্যকর ভূমিকায় আমাদের বঙ্গোপসাগর হয়ে উঠুক অর্থনীতির নতুন দিগন্ত, উন্নয়নের নতুন সোপান।
লেখক : মৎস্যবিদ