অনেকে জুলাইকে ব্যর্থ বলতে চান, তাদের বলি। জুলাই হয়েছিল বলেই নৃশংসতায় নিহত শিশু রামিসার বাসায় গেলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘ভুয়া’ বলা সম্ভব হয়েছে মানুষের জন্য। বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, এটা যদি ফ্যাসিস্ট রেজিমের কামালকে বলা হতো, তাহলে সেখানে রীতিমতো নরক নেমে আসত কি না? সেই রেজিমে রামিসা হত্যাকাণ্ড ঘটলে গণভবনে রামিসার পরিবারকে ডেকে নিয়ে কুম্ভীরাশ্রু প্রদর্শনের মহড়া চলত। হাতে ধরিয়ে দেওয়া হতো সাহায্যের নামে ব্যাংক চেক। তারপর নটে গাছটি মুড়াত। তাই তো? কিন্তু জুলাই পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী উল্টো রামিসার বাসায় গিয়েছেন। কোনো বাড়তি কিছু ছিল না, কুম্ভীরাশ্রু ছিল না চোখে, তবে প্রধানমন্ত্রীর কথায় ছিল বিচার নিশ্চিতের আশ্বাস এবং সেই আশ্বাসের মধ্যে কোনো ভণিতা ছিল না।
হ্যাঁ, বলতে পারেন অনেক কিছুই হয়নি, হচ্ছে না। কিন্তু অনেক কিছুই তো হচ্ছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন যেটা, আমরা কথা বলতে পারছি। মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তো বলছেই, গণমাধ্যমেও বাদ যাচ্ছে না। এই কথা বলা, এই প্রতিবাদই হলো জবাবদিহির ক্ষেত্র তৈরি করা। এর ফলেই প্রতিনিয়ত সরকারকে মুখোমুখি হতে হচ্ছে মানুষের। সরকার অনেক ক্ষেত্রে জবাব না দিলেও, তারা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে এবং তা সম্ভব হচ্ছে জুলাইয়ের জন্যই। জুলাই বিপ্লবের জন্য।
এই প্রতিবাদকে কেউ কেউ মব বলছেন। হ্যাঁ, অনেক ক্ষেত্রেই মব হচ্ছে। এই মবের দুটো দৃশ্যমানতা রয়েছে। প্রথমত, মব জাস্টিসের কথা বলি। চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় একটি শিশু ধর্ষণকে কেন্দ্র করে যা হলো, তা হলো মব জাস্টিসের চেষ্টা। কীভাবে বলি, আপনাদের কি সিরিয়াল রেপিস্ট রসু খাঁর কথা মনে আছে? যে ২১টা রেপ করার পর ধরা পড়েছিল। যার লক্ষ্য ছিল ১০১টা রেপ করা। তার কিন্তু বিচারে ফাঁসি হয়েছে এবং তাও ২০০৯ সালে। ১৭ বছরেও তার সেই ফাঁসির রায় কার্যকর হয়নি। অর্থাৎ অনেকটা জাস্টিস ডিলেইড মানে জাস্টিস ডিনায়েডের মতো ব্যাপার। আছিয়া থেকে রামিসা, মানুষের মনে গেঁথে গিয়েছে রেপ নামক নৃশংসতার কোনো বিচার হয় না। সেই না হওয়া বিচার থেকেই মানুষের তাৎক্ষণিক বিচার পাওয়ার চেষ্টাই হলো মব জাস্টিস। ব্রাইট স্কুলের ঘটনাও তাই। শিক্ষার্থীদের ওপর ধারাবাহিক নির্যাতন এবং প্রভাবের কারণে বিচার না হওয়াতেই ওই স্কুলে মব সৃষ্টি হয়েছে। এই মব জাস্টিস না পাওয়ার প্রতিক্রিয়া। না মবকে উৎসাহিত করছি না, মহিমান্বিতও নয়। কিন্তু আমাদের তো স্বীকার করতে হবে আমরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। জুলাই সেই সুযোগ দিয়েছে, আমাদের আশাবাদী করেছে। আশা করছি, জুলাই-পরবর্তী সরকার আমাদের নিরাশ করবে না। কিন্তু এই আশাবাদের সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নও থেকে যায়, যখন দেখি ২০১৬ সালে রামিসার মতো আরেক শিশু পূজার গোপনাঙ্গ ব্লেড দিয়ে চিরে ধর্ষণ করা সাইফুল জামিনে মুক্ত হয় এবং বীরদর্পে কারাগার থেকে বেরিয়ে যায়।
এখন মব ভায়োলেন্সের কথা বলি। দীপু চন্দ্র দাসকে হত্যা মব ভায়োলেন্স। তখন ইন্টেরিম সরকার। একটু চিন্তা করুন, দীপু চন্দ্র দাস হত্যায় আখেরে লাভ হয়েছে কার। লাভের মধ্যে হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির গেরুয়া পতাকায় বাতাস লেগেছে। লোকসান তথা কথা শুনতে হয়েছে কার, ড. ইউনূসের। পতিত পলাতকরা লেগেই আছে ড. ইউনূসের পেছনে। অর্থাৎ ড. ইউনূস কলঙ্কিত হলে জুলাই কলঙ্কিত হবে। জুলাই কলঙ্কিত হলে জুলাইয়ের সরকার—অর্থাৎ তারেক রহমানের সরকার তার লেজিটিমেসি হারাবে। কি, কেউ আপত্তি জানাবেন যে, বিএনপি সরকার জুলাই প্রসূত নয়? খুব সহজ কথায় বললাম, উদাহরণ ব্যাখ্যা আরো অনেক দেওয়া যেত, দরকার নেই। আক্কেলমান্দকা লিয়ে ইশারা কাফি।
মব জাস্টিসকে পতিত-পলাতকরা মব ভায়োলেন্সের সঙ্গে গুটিয়ে দিয়েছেন। মূলত গুটিয়ে দেওয়ার জন্যই মব ভায়োলেন্স সৃষ্টি করা হচ্ছে। দীপু চন্দ্র দাসকে পুড়িয়ে মারার পেছনে উসকানিদাতাদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করা গেলেই আসল রহস্য উদঘাটিত হতো। মুশকিল হলো ঘটনা ঘটানোর আগেই সেটাকে কীভাবে ফ্রেমিং করা হবে, তা নিশ্চিত করা হয়। সেই ফ্রেমিংয়ের কারণেই উসকানিদাতাদের চিহ্নিত করার বিষয়টি হাওয়া হয়ে যায়। ফ্রেমিং এসে পড়ে কিছু মগজহীন কাটমোল্লা। এই মগজহীন ছাগলগুলো সেই ফ্রেমিংটা না বুঝেই যোগ দেয় তৈরি ভায়োলেন্সের মহাযজ্ঞে। লাভ হয় কার পতিত-পলাতকদের আর তাদের সাউথব্লকের অভিভাবকদের। লোকসান হয় জুলাইয়ের পক্ষশক্তির।
বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার কাজ করতে চাইছেন। ইন্টেরিম যেমন সীমান্তে শক্ত অবস্থান নিয়েছিল, এখনো সেই ধারাবাহিকতা বিদ্যমান। সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফের আগ্রাসনের জবাব দিয়েছেন আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জওয়ানরা। প্রধানমন্ত্রী তথা সরকারের শক্ত সমর্থন না থাকলে এটা সম্ভব হতো না। আগে যেমন হাসিমুখে শুধু বাংলাদেশিদের লাশ গ্রহণ করত বিএসএফের কাছ থেকে, এখন উল্টো গুলি চালায় বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা। অর্থাৎ বিজিবি আবার বিডিআর রূপে ফিরতে চাইছে। পদুয়া-বড়াইমারি যার উদাহরণ। আর এই ফিরে আসাকে, সত্যিকার স্বাধীন বাংলাদেশের দৃশ্যমানতা রুখতেই সোকল্ড মব ভায়োলেন্সের ঘটনা ঘটছে। বিচারিক ব্যর্থতায় সৃষ্টি হওয়া জনক্ষোভকে সেই ভায়োলেন্সের সঙ্গে এক করে দিতে চাইছে একটা শ্রেণি। মানুষের ক্ষোভ আর পরিকল্পিত ভায়োলেন্স আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে পারলেই, সেই শ্রেণিটাকেও চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। আর এই চিহ্নিত করাটা দেশের স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি। জুলাই প্রসূত এই সরকারকে স্থিতিশীলতার স্বার্থে এই কাজটি করতে হবে। জানি বাধা আসবে, ভেতর এবং বাইরে থেকে, সেই বাধা পার হওয়ার মধ্যেই রয়েছে সরকারের সফলতা।
লেখক : সাংবাদিক