হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

জুলাইয়ের জীবন্ত ইতিহাস

প্রফেসর ড. এসকে আকরাম আলী

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের এক জীবন্ত ইতিহাস, যা অতীতের অন্যান্য ঐতিহাসিক মাইলফলকের মতোই একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজন এবং পাকিস্তানের জন্ম এ অঞ্চলের মুসলমানদের জন্য এক নতুন যাত্রার সূচনা করেছিল। কিন্তু সেই যাত্রা ছিল না মসৃণ; শুরু থেকেই নানা সংকট ও টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে।

পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর ‘বড় ভাইসুলভ’ আচরণ পছন্দ করেনি। দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতের সমর্থনে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে ১৯৭১ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক মহান মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত।

স্বাধীনতার পর ভারত বাংলাদেশের ওপর প্রভাববিস্তারকারী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সময়কাল ব্যতীত শুরু থেকেই এক ধরনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। শেখ হাসিনার আমলে পরিস্থিতি আরো ভঙ্গুর হয়ে ওঠে এবং বাংলাদেশ কার্যত ভারতের একটি ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রে পরিণত হয়। গত ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসন জনগণকে ক্ষুব্ধ করে তোলে এবং তারা রাজনৈতিক পরিবর্তনের অপেক্ষায় ছিল।

বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের মতো প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো শেখ হাসিনার শাসনামলে সর্বাত্মক চেষ্টা চালালেও শাসন পরিবর্তনে দৃশ্যমান অগ্রগতি আনতে পারেনি। তাদের নেতা-কর্মীরা অকথ্য নির্যাতনের শিকার হন এবং গণতান্ত্রিক উপায়ে পরিবর্তনের আশা প্রায় ত্যাগ করতে বসেন।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের জুলাই মাসের শুরুতে শিক্ষার্থীরা চাকরিতে কোটা প্রথা বাতিলের দাবিতে রাজধানীর রাজপথে নেমে আসে। রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হলে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলন গণআন্দোলনে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের পতন ঘটে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন।

পরবর্তী সময়ে নোবেলবিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়, যার এজেন্ডা ছিল সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। ড. ইউনূস ও তার উপদেষ্টামণ্ডলী আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) মাধ্যমে অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শক্রমে একটি সনদ প্রণয়ন করা হয়, যা ‘জুলাই সনদ’ নামে পরিচিত এবং দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এতে স্বাক্ষর করে। অবশেষে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা বাস্তবায়িত হয়।

নির্বাচনে বিএনপি বিপুল বিজয় অর্জন করে এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়ে সংসদে বিরোধী দলে পরিণত হয়। এটি জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার উদ্যমের সঙ্গে দায়িত্ব পালন শুরু করে।

নতুন সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে পারে, তবে প্রজ্ঞা ও পরিপক্বতার সঙ্গে এগোতে পারলে সেগুলো অতিক্রম করা সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে ব্যক্তিগত আচরণের মাধ্যমে কিছু উদাহরণ স্থাপন করেছেন, যেমন অপ্রয়োজনীয় ট্রাফিক প্রটোকল এড়িয়ে চলা, ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার এবং নিজ খরচে জ্বালানি বহন করা। এগুলো প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত। যুক্তরাজ্যের সংসদীয় গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতা তার দৃষ্টিভঙ্গিকে সমৃদ্ধ করেছে।

তবে তার মন্ত্রিসভার কিছু জ্যেষ্ঠ সদস্য জুলাই সনদ ও জুলাই বিপ্লবের চেতনা নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়ে অপ্রয়োজনীয় আলোচনা সৃষ্টি করছেন। জুলাই বিপ্লবের ভূমিকা এত দ্রুত ভুলে যাওয়া কি উচিত? জনগণের মনে এ প্রশ্ন উঠেছে। বাস্তবতা হলো—জুলাই বিপ্লব না হলে বিএনপি সরকারের আবির্ভাব হতো না। জুলাইয়ের চেতনাকে উপেক্ষা করা প্রজ্ঞার পরিচায়ক নয়।

দেশের মানুষ জুলাই সনদের দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চায়। তা না হলে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে, যা সাধারণ মানুষ মোটেও প্রত্যাশা করে না। বাংলাদেশের মানুষ সহজ-সরল হলেও আবেগপ্রবণ; প্রয়োজনে তারা যেকোনো সময় কণ্ঠ উঁচু করতে পারে। তাই সরকারের উচিত কথার চেয়ে কাজে বিশ্বাস স্থাপন করা।

বর্তমান সরকার যদি জনগণের মানসিকতার পরিবর্তন অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়, তবে তারা ভুল করবে এবং জুলাইয়ের চেতনার সমর্থকদের প্রতিরোধের মুখে পড়তে পারে। জাতীয় ঐক্য ছাড়া টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়—নতুন প্রধানমন্ত্রীও বারবার এ কথা বলেছেন। গত ৫৫ বছরে একটি রাজনৈতিক দল নিজেদের স্বার্থে বিভাজনের রাজনীতি করেছে, যা জাতির স্বার্থের পরিপন্থী।

বর্তমান সরকার যদি জুলাই বিপ্লবকে যথাযথ গুরুত্ব না দেয়, তবে সমাজে বিভাজন সৃষ্টি হতে পারে। অনেকেই জুলাই বিপ্লবকে বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় স্বাধীনতা হিসেবে দেখেন; এর সঙ্গে তাদের আবেগ জড়িত। যদি সরকার জুলাইয়ের বীরদের যথাযথ সম্মান না দেয় এবং শহীদ ও ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে সমাজে বিভক্তি তৈরি হতে পারে। এমনকি সমাজে ‘জুলাইপন্থি’ ও ‘জুলাইবিরোধী’—এই দুই শিবিরের উদ্ভবও অসম্ভব নয়। ফলে দেশ আবারও অস্থিরতা ও বিভ্রান্তির দিকে ধাবিত হতে পারে এবং শান্তি সুদূরপরাহত হতে পারে।

কেউই এমন পরিস্থিতি প্রত্যাশা করে না, যা তথাকথিত গণতন্ত্র ও বহিরাগত আধিপত্যের পুরোনো সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনে। কোনো রাজনৈতিক দলেরই সাম্প্রতিক পরিবর্তনকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে যে পরিবর্তন এসেছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এগোতে হবে। ইতিহাস সৃষ্টি করা যায়, কিন্তু তা মুছে ফেলা যায় না।

লেখক : সম্পাদক, মিলিটারি হিস্ট্রি জার্নাল

নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ

বঙ্গোপসাগরে আমাদের কৌশলগত ভবিষ্যৎ

ভারত ভাগ নাটক : শেষ অঙ্কের শেষ দৃশ্য

রাজনীতিতে জবানের অপব্যবহার

জোটের রাজনীতিতে ভোটের হিসাব

শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

বিভেদের পাহাড় যেন মূল শত্রুকে আড়াল করে না ফেলে

একটি ভোট ও সিঁড়ির গোড়ায় থমকে যাওয়া গণতন্ত্র

হাদি হত্যায় ভারত এবং গোয়েন্দা স্লিপার সেল

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা