উইলিয়াম বি মাইলাম
বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের এককালের রাষ্ট্রদূত মি. উইলিয়াম বি মাইলাম ২০২৬-এর ১৭ ফেব্রুয়ারি মারা গেছেন। কয়েক মাস ধরেই তার স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছিল। আমরা জানতাম তার সময় ঘনিয়ে আসছে। কিন্তু এ রকম একটা বিশাল মানুষকে বিদায় জানানোর জন্য আমরা ঠিক প্রস্তুত ছিলাম না। এই মানুষটার জীবনের প্রায় ৯ দশক কেটেছে মানুষের সেবায়, জ্ঞানচর্চায় এবং ন্যায়সংগত লড়াইয়ে। সারা বিশ্বে আমাদের মতো বহু মানুষের বন্ধু ছিলেন তিনি। তার প্রস্থান আমাদের জীবনে গভীর শূন্যতা তৈরি করে গেছে।
রাষ্ট্রদূত মাইলামের ছেলে উইলিয়াম ব্রায়ান্ট মাইলাম এই দুঃখজনক খবরটা ‘রাইট টু ফ্রিডম’-এর সদস্যদের ইমেইলের মাধ্যমে জানিয়েছেন। তার বাবার বহু বছরের কূটনৈতিক সেবা শুধু নয়, বরং একজন নাগরিক-স্কলার হিসেবে এবং সারা বিশ্বে গণতান্ত্রিক নীতির পক্ষে তিনি যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব তৈরি করেছিলেন, সেটাও স্মরণ করার কথা মনে করিয়ে দেন তার ছেলে। জীবনের শেষ বছরগুলোতে তিনি বাংলাদেশের অগ্রগতি নিয়ে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন। ২০২৪-এর আগস্টের রাজনৈতিক সংকটের পর বাংলাদেশের মানুষ কতখানি গণতান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধা পাবে, সেটা নিয়েও উদ্বেগ ছিল তার।
১২ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক নির্বাচনের পর তারেক রহমান যেদিন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন, ঠিক সেদিনই পৃথিবী ছেড়ে গেলেন মি. মাইলাম। এই কাকতালীয় যোগাযোগ তার শেষ সময়ের জন্য একটা প্রতীকী তাৎপর্য যুক্ত করেছে। খুব কম বিদেশি কূটনীতিক বিল মাইলামের মতো এত গভীরভাবে ও সার্বক্ষণিক বাংলাদেশের কথা ভেবেছেন। জীবনের শেষবেলা পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের উন্নয়নের ওপর নজর রেখেছিলেন। তার মধ্যে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য নাগরিকদের যে ত্যাগ, সেটা নিশ্চয়ই ব্যর্থ হবে না।
রাইট টু ফ্রিডমের সঙ্গে যুক্ত হওয়াটা ছিল আমার জন্য মর্যাদার। রাষ্ট্রদূত মাইলাম, তার বন্ধু ও সহকর্মী রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী এবং সাবেক কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ মিলে এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাধীনতা, দায়বদ্ধতা এবং দায়িত্বশীলতাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য এই আরটিএফ গঠন করেছিলেন মাইলাম। বাংলাদেশের দিকে বিশেষ মনোযোগ ছিল এই সংস্থার। নিজের দেশে যাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, তাদের সহায়তায় আরটিএফের মিশন অনন্য পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন বিল। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অবনতির বিষয়টি নিয়ে তিনি ওয়াশিংটনে সচেতনতা তৈরি করেছেন। বিলের প্রচেষ্টায় অসন্তুষ্ট রাজনীতিবিদরা যখন তার সমালোচনা করেছে অথবা তাকে নিয়ে মিথ্যা গল্প রটিয়েছে, সেগুলো তিনি গায়ে মাখেননি। সেগুলো তাকে নীরব করতে পারেনি। বিল ছিলেন সত্যনিষ্ঠ একজন মানুষ, যিনি সবসময় বিবেক থেকে কথা বলতেন। সেটা ব্যক্তিগত আলোচনায় যেমন সত্যি, তেমনি সত্যি প্রকাশ্য বক্তৃতা বা লেখাতেও। যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা অন্য যেখানেই হোক, বিল তার কলামগুলোতে মানুষের অধিকার, প্রতিষ্ঠান এবং গণতন্ত্রের কথা বলতেন। কারণ বিল জানতেন সঠিকভাবে কূটনীতি করার অর্থ হলো মানুষের জন্য কথা বলা।
আমি বিলকে শুধু একজন পৃষ্ঠপোষক নয়, বরং বন্ধুও মনে করি। সামুদ্রিক জগৎ, একাডেমিক ও প্রকাশনার সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশি আমেরিকান হিসেবে, যখনই বাংলাদেশের কোনো গুরুত্বপূর্ণ খবর আসত, আমি বারবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করতাম। ওয়াশিংটনে গেলে তার সঙ্গে মাঝেমধ্যেই দেখা করতাম। কখনো শুধু এক কাফ কফি আর স্যান্ডউইচ খেতে খেতে কথা বলতাম। তিনি ভালো লেখাপড়া জানা মানুষ ছিলেন। কিন্তু আমি যা পড়েছি, তা নিয়ে আমার মতামত শুনতে পছন্দ করতেন তিনি। অনেক বছর ধরে তিনি সাউথ এশিয়া জার্নালের জন্য অনেকগুলো নিবন্ধ পাঠিয়েছেন। এই লেখাগুলোতেও তিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্র আর মানবাধিকারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
বাংলাদেশে ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ নিয়ে সাউথ এশিয়া জার্নালের জন্য একটি বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজনে সাহায্য করেছিলেন বিল। ওয়াশিংটন ডিসির উইলসন সেন্টারে অনুষ্ঠিত সেই আয়োজনে বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে আলোচনার জন্য বিল বাংলাদেশে নিযুক্ত বেশ কয়েকজন সাবেক রাষ্ট্রদূত, দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ, থিংক ট্যাংক বিশেষজ্ঞ ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়ে এসেছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেছিলেন বিল। সবাইকে মূল আলোচনায় ধরে রাখতে এবং আলোচনার ধারাবাহিকতা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করেছিলেন। বক্তাদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ, মাইকেল কুগেলম্যান এবং বাংলাদেশ ও এই অঞ্চলবিষয়ক আরো কয়েকজন বিশেষজ্ঞ। এটা ছিল একটা সময়োপযোগী আলোচনা। কোনো রাখঢাক সেখানে রাখা হয়নি। বিলের কাছে এটা ছিল শিক্ষা ও সুচিন্তিত প্রচারের মাধ্যমে অন্যদের ক্ষমতায়ন করা।
জন ড্যানিলোভিচ বিলের একজন সহকর্মী এবং ফরেন সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা। বিলকে তিনি কয়েক দশক ধরে চেনেন। বিল সম্পর্কে লিখতে গিয়ে তিনি সুন্দরভাবে বলেছেন-
‘কোনো কথাবার্তা বা লেখায় যখন বাংলাদেশ প্রসঙ্গ আসত, বিল কখনোই সেটাকে পররাষ্ট্রনীতির চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখতেন না বা বাংলাদেশের সাহসী নেতাদের ভূরাজনৈতিক খেলার চরিত্র হিসেবে দেখতেন না। তিনি বাংলাদেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে কথা বলতেন। তাদের স্বপ্ন ও সংকল্পের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কথা বলতেন। আমার কাছে তিনি ছিলেন একজন রাষ্ট্রনায়কের মতো। আমাদের অনেকের কাছেই তিনি ছিলেন একজন বন্ধু।’
১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ঢাকায় রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বে ছিলেন মাইলাম। গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য সময়টা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সবসময় অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। সেই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক রীতিনীতি জোরদারের পক্ষে ছিলেন। এরশাদ আমলের শেষদিকে বাংলাদেশে এসেছিলেন বিল। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও পরবর্তী অনেক চড়াই-উতরাই চোখে দেখেছেন তিনি। বাংলাদেশের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বাস্তবমুখী। আর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি ছিলেন আশাবাদী। বিগত বছরগুলোতে তার অনেকগুলো প্রকাশিত লেখা পড়ার এবং অনেকগুলো বক্তৃতা শোনার সুযোগ হয়েছিল আমার।
সরকার ছেড়ে দেওয়ার পরও বাংলাদেশের বিষয়ে সক্রিয় ছিলেন বিল। গত বছর বাংলাদেশ সফর করেছিলেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের অনেকের সঙ্গে দেখা করতে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনের পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে আবার যোগাযোগ গড়ে তোলার জন্য এ দেশে এসেছিলেন তিনি। বাংলাদেশের রাজনীতি আর নেতাদের ভেতর-বাহির সম্পর্কে যদি কেউ ভালোভাবে জানতেন, সেটা ছিলেন বিল। বাংলাদেশের ব্যাপারে তিনি সবসময়ই সতর্ক আশাবাদী ছিলেন।
বিল ছিলেন সেই বিরল ফরেন সার্ভিস কর্মকর্তাদের একজন, যারা দয়া ও নৈতিক অবস্থান ধরে রেখে অত্যন্ত দক্ষতা আর পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বিল ছিলেন বাংলাদেশের আমেরিকান বন্ধু। আর বাংলাদেশ ছিল বিলের বন্ধু। আমরা যারা অনেকেই তাকে মেন্টর হিসেবে শ্রদ্ধা করতাম, তার অভাবটা আমাদের নাড়া দেবে।
তার চলে যাওয়ার মাধ্যমে একটি যুগের অবসান ঘটল। কিন্তু তার যে উত্তরাধিকার, তা টিকে থাকবে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে, যেগুলো তিনি শক্তিশালী করেছিলেন; সেই ধারণাগুলোর মধ্যে, যেগুলো তিনি সমর্থন করতেন; এবং বিভিন্ন মহাদেশে যেসব বন্ধু তিনি গড়ে তুলেছিলেন, তাদের মাধ্যমে তার উত্তরাধিকার বেঁচে থাকবে।
লেখক: যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সাউথ এশিয়া জার্নালের প্রকাশক