হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

সংকটে বিশ্ব আর আমাদের প্রস্তুতি

এ কে এম রেজাউল করিম

ছবি: এআই

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদের গন্ধে ভারী। ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার চলমান উত্তেজনা শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং এটি বিশ্বব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া ১০ দিনের আলটিমেটাম এখন শেষ ৪৮ ঘণ্টায় দাঁড়িয়ে। একদিকে ট্রাম্পের ‘ইরানে নরক নামানোর’ হুমকি, অন্যদিকে রণক্ষেত্রে আমেরিকার গর্বের প্রতীক হিসেবে পরিচিত অত্যাধুনিক বিমান ও হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার খবর—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন ‘এসক্যালেশন ল্যাডার’ বা সংঘাতের চরম শিখরে।

মিথ্যার বেসাতি ও রণক্ষেত্রের বাস্তবতা

আমেরিকা দাবি করেছিল ইরানের আকাশে তাদের ‘কমপ্লিট ডমিনেন্স’ বা পূর্ণ আধিপত্য রয়েছে। কিন্তু একদিনে একাধিক বিমান ও হেলিকপ্টার ধ্বংস হওয়ার ঘটনা সেই দাবিকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক মারিনা যেমনটা উল্লেখ করেছেন, ইরান সম্ভবত ইনফ্রারেড প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে আমেরিকার আকাশপথের শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। আর এ কারণেই ক্ষিপ্ত হয়ে আমেরিকা ও ইসরাইল ইরানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আঘাত হানছে। এটি শুধু সামরিক হামলা নয়, বরং একটি জাতির মেধা ও ভবিষ্যৎ সক্ষমতাকে ধ্বংস করার অপচেষ্টা।

মাও সে তুংয়ের যুদ্ধতত্ত্ব ও ইরানের কৌশল

জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখন মাও সে তুংয়ের ‘প্রোটেক্টেড ওয়ার ডকট্রিন’ বা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধতত্ত্ব অনুসরণ করছে। কৌশলগত প্রতিরক্ষা থেকে শুরু করে হরমুজ প্রণালি বন্ধের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি করা এবং এরপর কৌশলগত পাল্টা আক্রমণ—ইরান প্রতিটি ধাপে অত্যন্ত সতর্ক। এর ফলে আমেরিকা এখন এক জটিল ফাঁদে আটকা পড়েছে। যুদ্ধের প্রভাবে খোদ আমেরিকায় জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তলানিতে এবং তার নিজের প্রশাসনের ভেতরেই (ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সের সঙ্গে) ফাটল দেখা দিয়েছে।

পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক মেরূকরণ

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো আমেরিকার দীর্ঘদিনের মিত্রদের অবস্থান পরিবর্তন। ওমান ও কাতারের মতো দেশগুলো এখন ইরান ও ওমানের ‘হরমুজ প্রণালি ফি’ আদায়ের চুক্তিতে মৌন বা সরাসরি সমর্থন দিচ্ছে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি ফ্রান্স ও ইতালির মতো ইউরোপীয় দেশগুলোও আমেরিকার এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে। পোপ লিওর বক্তব্য এবং জাতিসংঘে ফ্রান্সের অবস্থান প্রমাণ করে যে, বিশ্ব এখন আর একক মার্কিন আধিপত্য মানতে নারাজ।

বাংলাদেশের ওপর প্রভাব : একটি অশনিসংকেত

এই যুদ্ধের সরাসরি এবং পরোক্ষ প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়তে শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত আমাদের প্রবাসী শ্রমিকরা চাকরি হারাচ্ছেন, যা আমাদের রেমিট্যান্সের মূল স্তম্ভে আঘাত হানছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে বা সেখানে ফি নির্ধারণ করা হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়বে। এর ফলে সার থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের দাম এবং কৃষি উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হবে।

আমাদের করণীয় কী

১. সতর্কতা ও স্বচ্ছতা : সরকারের উচিত বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জনগণকে অন্ধকারে না রেখে প্রকৃত সত্য জানানো। যুদ্ধের প্রভাব যে আমাদের ওপর পড়বে, তা স্বীকার করে নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।

২. জ্বালানি নিরাপত্তা : বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির পথ খোঁজা এবং দেশে জ্বালানি সাশ্রয়ে কঠোর নীতি গ্রহণ করতে হবে।

৩. কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা : আগামী এক-দুই বছর সার ও খাদ্য আমদানিতে সংকট দেখা দিতে পারে। তাই আপৎকালীন খাদ্য মজুত এবং স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে।

৪. ব্যক্তিগত মিতব্যয়িতা : সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের বিলাসিতা কমিয়ে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য খাদ্যসংকট বা মন্দা মোকাবিলায় মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই, ট্রাম্পের আলটিমেটাম বা আমেরিকার কৌশল যে পথেই যাক না কেন—হয়তো তারা যুদ্ধ বন্ধ করে চলে যাবে অথবা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়াবে—উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের জন্য কোনো সুসংবাদ নেই। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির এই খেলায় আমরা যাতে পিষ্ট না হই, সে জন্য এখন থেকেই রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা সময়ের দাবি।

লেখক : কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র

ক্ষমতা বনাম জনগণ : ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

সিফফিনের প্রশ্ন—জুলাইয়ের উত্তর : পথের দ্বন্দ্ব

বিশ্বজুড়ে স্লোগান উঠুক ‘নো কিংস’

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন : সরকারের দায় ও বাস্তবতা

মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ও করণীয়

কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবনভিত্তিক শিক্ষা মডেল

১৯৭৩-২০২৬ : তেল অস্ত্র এখনো কার্যকর

সরকার ও বিরোধী দলে যুদ্ধ কেন

পাঠ্যবইয়ে যেভাবে ফিরলেন শহীদ জিয়াউর রহমান

সিভিল সোসাইটি ও আমলাতন্ত্রের দ্বন্দ্ব