হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ এবং মিডিয়ার নৈতিক সংকট

আলী ওসমান শেফায়েত

বর্তমান বিশ্ব এক ভয়াবহ ও জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে জায়নবাদী সাম্রাজ্যবাদ ও আঞ্চলিক আধিপত্যবাদের নগ্ন আস্ফালন, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে পরিকল্পিত ‘ইসলামোফোবিয়া’ বা ইসলামভীতি ছড়িয়ে দেওয়ার সুগভীর ষড়যন্ত্র। এই দ্বিমুখী সংকটের মধ্যে সবচেয়ে শোচনীয় ও কলঙ্কিত ভূমিকা পালন করছে একশ্রেণির করপোরেট ও মেরুদণ্ডহীন মিডিয়া। তারা সত্যের চেয়ে ক্ষমতার দালালি এবং আদর্শের চেয়ে তৈলমর্দনকে সাংবাদিকতার মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই চিত্রটি আরো ভয়াবহ, যেখানে গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ নিজেদের মান-মর্যাদা ও অস্তিত্ব বিকিয়ে দিয়ে ক্ষমতাসীনদের পদলেহন ও ইসলামবিদ্বেষী বয়ান তৈরিতে ব্যস্ত।

জায়নবাদী সাম্রাজ্যবাদ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট : জায়নবাদ আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে নৃশংস ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিতে এক অবৈধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যে অশান্তির বীজ বপন করা হয়েছিল, আজ তা বিশ্ব অশান্তির জন্য মহিরুহে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমা শক্তিগুলোর, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্ধ ও অকুণ্ঠ সমর্থনে জায়নবাদীরা শুধু ভূখণ্ড দখলই করছে না, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, রাজনীতি ও তথ্যপ্রবাহকে সুকৌশলে নিয়ন্ত্রণ করছে।

তাদের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন শুধু যুদ্ধের ময়দানে বা কামানের গোলায় সীমাবদ্ধ নয়। তারা বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে চায়। গাজা থেকে বৈরুত—সর্বত্রই আজ মুসলিমদের রক্তের দাগ। অথচ এই অমানবিকতাকে বিশ্ব মিডিয়া ‘আত্মরক্ষা’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার নির্লজ্জ চেষ্টা করে। এটি শুধু সাম্রাজ্যবাদ নয়, বরং মানবতার বিরুদ্ধে এক সংগঠিত অপরাধ। জায়নবাদী এই আধিপত্য বিশ্বজুড়ে একটি একমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থা কায়েম করতে চায়, যেখানে ইসলামি মূল্যবোধ ও স্বাতন্ত্র্যবোধকে প্রধান শত্রু হিসেবে গণ্য করা হয়।

আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব : বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতীয় আধিপত্যবাদ এক অস্তিত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জ। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমমর্যাদার সম্পর্ক থাকার কথা থাকলেও, ভারতের নীতি প্রায়ই ‘দাদাগিরি’ বা নগ্ন হস্তক্ষেপে রূপ নেয়। বাংলাদেশের নদ-নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করা, সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক পাখির মতো নিরীহ বাংলাদেশি হত্যা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দিল্লির নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ—এসবই আধিপত্যবাদের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের মাধ্যমে বাংলাদেশের নিজস্ব ঐতিহ্য ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে প্রতিনিয়ত আঘাত করা হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে ভারতের যে অন্ধ সমর্থন, তা এ দেশের সার্বভৌমত্বকে বারবার হুমকির মুখে ফেলেছে। একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে বাংলাদেশের জনগণ যে নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ও ধর্মীয় সত্তা লালন করে, তাকে দাবিয়ে রাখার জন্য দিল্লির ‘হেজেমনি’ বা আধিপত্যবাদী কৌশলের কোনো কমতি নেই। এই আধিপত্যবাদ শুধু রাজনীতিতে নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতিকেও পঙ্গু করে দিতে চাইছে।

বৈশ্বিক ও স্থানীয় ইসলামোফোবিয়া : নাইন-ইলেভেনের পর থেকে বিশ্বজুড়ে ‘ইসলামোফোবিয়া’ বা ইসলামভীতিকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ইসলামকে সন্ত্রাসের সমার্থক হিসেবে দাঁড় করানোর এক নোংরা খেলা চলছে আন্তর্জাতিক মহলে। পশ্চিমা চলচ্চিত্র, সংবাদমাধ্যম এবং একাডেমিক ডিসকোর্সে পরিকল্পিতভাবে মুসলিমদের খলনায়ক হিসেবে চিত্রায়িত করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে এই ইসলামোফোবিয়া আরো সূক্ষ্ম ও বিষাক্ত। এখানে তথাকথিত ‘প্রগতিশীলতা’ বা ‘সেক্যুলারিজম’-এর মোড়কে সরাসরি ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের ওপর আঘাত হানা হয়। দাড়ি, টুপি বা পর্দার মতো ধর্মীয় নিদর্শনগুলো উপহাস করা এবং মাদরাসাশিক্ষাকে ‘জঙ্গিবাদের সূতিকাগার’ হিসেবে প্রমাণের নিরন্তর চেষ্টা করা এ দেশের একশ্রেণির মিডিয়ার নিত্যনৈমিত্তিক কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মিডিয়াগুলো এমন এক বয়ান তৈরি করতে চায়, যেখানে একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিমকে ‘অপ্রগতিশীল’ বা ‘সন্দেহভাজন’ হিসেবে দেখা হবে। এটি শুধু ধর্মীয় বিদ্বেষ নয়, বরং এ দেশের মানুষের মূল শিকড় থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করার এক গভীর ষড়যন্ত্র।

বাংলাদেশি মিডিয়ার নৈতিক স্খলন : বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ইতিহাসে সাম্প্রতিক বছরগুলো এক কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। একটি স্বাধীন দেশের মিডিয়ার কাজ হওয়ার কথা ছিল সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া, দুর্নীতি উন্মোচন করা এবং সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা বলা। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখছি? অধিকাংশ পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেল এখন ক্ষমতাসীনদের ‘জনসংযোগ বিভাগ’ হিসেবে কাজ করছে।

তৈলমর্দনের সংস্কৃতি : ক্ষমতাসীনদের তোষণ বা ‘চাটুকারিতা’ এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সাংবাদিকতার ন্যূনতম মানদণ্ডও আজ বিলুপ্তপ্রায়। জনদুর্ভোগ, মেগা প্রজেক্টের নামে মেগা লুটপাট আর মানুষের ভোটাধিকার হরণের খবরগুলো এই মিডিয়াগুলো সুকৌশলে চেপে যায়। পরিবর্তে তারা ব্যস্ত থাকে ক্ষমতার স্তুতি গাইতে। তারা সত্যকে মিথ্যার চাদরে ঢেকে দেয় আর সরকারের অন্যায়কে ‘উন্নয়ন’ হিসেবে মহিমান্বিত করে। এই মেরুদণ্ডহীন ও পদলেহী সাংবাদিকতা জাতিকে এক ভয়াবহ অন্ধত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তারা শাসকের মনোরঞ্জনের জন্য নিজেদের বিবেককে বন্ধক রেখেছে।

স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরক্ষা : আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি দেশ শুধু মানচিত্র বা সীমানা দিয়ে স্বাধীন থাকে না। তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজন শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। যখন একটি দেশের মিডিয়া সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের কাছে নতজানু হয়, তখন সেই দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন হয়ে পড়ে। ইসলামোফোবিয়া ছড়িয়ে দিয়ে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐক্য নষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে জাতিকে সহজেই বিভাজিত ও শাসন করা যায়।

আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তি চায় বাংলাদেশ যেন তাদের একটি ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ বা অনুগত রাষ্ট্র হয়ে থাকে। আর এ কাজে সবচেয়ে বড় বাধা হলো এ দেশের মানুষের ইসলামি মূল্যবোধ এবং দেশপ্রেম। তাই মিডিয়াকে ব্যবহার করে এই দুটি জায়গাতেই আঘাত হানা হচ্ছে। এই গভীর ষড়যন্ত্র বুঝতে পারা এবং তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

আমাদের করণীয় ও উত্তরণের পথ : এই জটিল ও বহুমুখী সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একটি সামগ্রিক গণজাগরণ প্রয়োজন। জনগণকে চিনতে হবে, কারা তাদের প্রকৃত বন্ধু আর কারা তাদের বিশ্বাস ও অস্তিত্বের শত্রু।

১. বিকল্প ও দেশপ্রেমিক মিডিয়াকে শক্তিশালী করা : করপোরেট মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা রুখতে ‘বাংলাদেশপন্থি দেশপ্রেমিক, আদর্শিক ও সাহসী গণমাধ্যমকে নৈতিক এবং আর্থিকভাবে সমর্থন করতে হবে। সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার টিকে থাকা আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের জন্যই প্রয়োজন।

২. আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা : ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং জায়নবাদী আগ্রাসনের সূক্ষ্ম ধরনগুলো সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করতে হবে। ইতিহাসের সঠিক পাঠ এবং বর্তমান ভূরাজনীতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে হবে।

৩. ইসলামি মূল্যবোধের সুরক্ষা : ইসলামোফোবিয়া রুখতে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ওপর গর্ব করতে হবে। হীনম্মন্যতা ত্যাগ করে বুদ্ধিবৃত্তিক ও গঠনমূলকভাবে ইসলামের সঠিক রূপ তুলে ধরতে হবে।

৪. চাটুকারদের বর্জন : যে মিডিয়া হাউসগুলো শুধু ক্ষমতার দালালি করে এবং মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়, তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। তাদের সংবাদের সত্যতা নিয়ে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন তুলতে হবে।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ এবং ইসলামোফোবিয়া—এই তিন দানব আজ হাত মিলিয়ে মানবতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। আর এই অশুভ আঁতাতের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে একশ্রেণির পদলেহী দালাল মিডিয়া। এ অবস্থায় আমাদের দরকার দেশ ও মানুষের স্বার্থে, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপসহীন গণমাধ্যম। এ ক্ষেত্রে দেশপ্রেমিকদের এগিয়ে আসতে হবে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার এই লড়াইয়ে কলমই হোক আমাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। সত্যের বিজয় অবশ্যম্ভাবী; চাটুকারিতা, তৈলমর্দন ও আধিপত্যবাদ শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েই নিক্ষিপ্ত হবে। আমরা সেদিনের অপেক্ষায় আছি, যখন বাংলাদেশের আকাশ থেকে আধিপত্যবাদের মেঘ সরে যাবে এবং সত্য ও ন্যায়ের সূর্য উদিত হবে।

লেখক : শিক্ষক

জুলাই সনদ : সমাধান সংসদে, নাকি আন্দোলনে

শক্তির রূপান্তর এবং সম্ভাব্য নতুন বিশ্বব্যবস্থা

ভেঙে পড়ছে ইসরাইলের জীবন-সমাজ

মোদির হুংকার ও ইতিহাসের বাস্তবতা

ধর্ম তেল ও ইরানযুদ্ধ

সরকারের মধুচন্দ্রিমা কাল ও অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবণতা

জিয়াউর রহমানের সাফল্যের রহস্য

ইরান যুদ্ধ কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে

জুলাই বিপ্লব : রাষ্ট্র পুনর্গঠনের অঙ্গীকার

ইরানের অনমনীয় নেতৃত্ব ও আরব দেশগুলোর বিভ্রমের মৃত্যু