হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

রোহিঙ্গা ও বিপন্ন উখিয়া-টেকনাফের কথা

মুহাম্মদ রিদুয়ান

মিয়ানমারের সামরিক জান্তার জাতিগত নিধন ও গণহত্যা থেকে রক্ষা পেতে ২০১৭ সালে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে যখন ছুটে আসে, তখন উখিয়া-টেকনাফের সাধারণ মানুষ কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক হিসাবনিকাশ করেনি। নিজেরা হাজারো অভাব-অনটনে থাকা সত্ত্বেও তারা মানবতার সর্বোচ্চ দুয়ার খুলে দিয়েছিল। নিজেদের মাথা গোঁজার ঠাঁই, গোলার ধান, বিশুদ্ধ খাবার পানি, এমনকি পরম যত্নে আগলে রাখা সামাজিক নিরাপত্তাটুকুও বিলিয়ে দিয়েছিল সেই অসহায় মানুষগুলোর জন্য। বিশ্ববাসী অবাক হয়ে দেখেছিল বাংলাদেশের একটি প্রান্তিক জনপদের মানুষের এই অভাবনীয় উদারতা। কিন্তু আজ যখন ৯ বছর পর আমরা পেছনে তাকাই, তখন বুকচিরে একটি করুণ ও আর্তনাদময় প্রশ্ন বেরিয়ে আসে। আর সেটি হলো—মানবিকতার এই মহৎ ও ঐতিহাসিক ত্যাগের বিনিময়ে কী পেল উখিয়া-টেকনাফের জনগোষ্ঠী?

আন্তর্জাতিক বাহবা কুড়ানোর মোহে তৎকালীন মাফিয়া শাসকের অদূরদর্শী একতরফা সিদ্ধান্তের মাশুল এই এলাকার নিরীহ মানুষদের আজও দিতে হচ্ছে। উখিয়া-টেকনাফ আজ অবহেলা, প্রশাসনিক উদাসীনতা আর পরিবেশগত এক মহাবিপর্যয়ের শিকার। আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সংকটের পুরো বোঝা একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর চাপিয়ে দেওয়া শুধু অন্যায়ই নয়; বরং চরম অমানবিকও বটে। উখিয়া-টেকনাফের মানুষ আজ যেন নিজেদের ভিটেমাটিতেই পরবাসীর মতো অসহায়!

​আজ এই এলাকার দিকে তাকালে আগের সেই চিরচেনা রূপ আর কোনোভাবেই খুঁজে পাওয়া যায় না। পাহাড় কেটে, দিগন্তজোড়া বনাঞ্চল উজাড় করে গড়ে ওঠা রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর কারণে এ অঞ্চলের ইকোসিস্টেম আজ পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে। যেখানে একসময় সবুজের সমারোহ ছিল, বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ ছিল, আজ সেখানে শুধুই প্লাস্টিক আর পলিথিনের এক বিশাল কৃত্রিম কবরস্থান। উখিয়ার কুতুপালং গ্রামের প্রায় ২০০ একর উর্বর কৃষিজমি আজ সম্পূর্ণ চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এই উখিয়ার কুতুপালংয়ে গড়ে উঠেছে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থীশিবির। রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে নেমে আসা শত শত টন অপচনশীল প্লাস্টিক বর্জ্য, নোংরা ও রাসায়নিকমিশ্রিত পচা পানি গ্রাস করেছে কৃষকদের একমাত্র জীবিকার সম্বল এই সোনালি মাঠগুলোকে। একসময় যে জমিতে ফলত সোনার ধান আর হরেক রকমের শীতকালীন সবজি, আজ সেখানে শুধু পচা পানির দুর্গন্ধ ও প্লাস্টিকের স্তূপ। জমির মাটি তার চিরাচরিত উর্বরতা হারিয়ে মৃতপ্রায়।

​স্থানীয় খাল-বিল ও নদী-নালাগুলো হারিয়েছে তাদের নাব্য এবং স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য। এলাকার ঐতিহ্যবাহী ‘শাপলা বিল’টি যাও একটু অবশিষ্ট আছে, পরিবেশের এই ভয়াবহ দূষণে আগামী দু-তিন বছরে এর কোনো অস্তিত্ব থাকবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। একসময়ের প্রমত্তা ‘মাছকাইজ্জা ডেফা’র মতো সমৃদ্ধ জলাশয়গুলোয় কি আর কখনো আগের মতো দেশীয় মাছের মেলা বসবে? এই উত্তর আজ কারোর জানা নেই।

​সংকটটি শুধু পরিবেশ বা কৃষির ওপরই আঘাত হানেনি, এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও মারাত্মকভাবে গ্রাস করছে এই জনপদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অসংখ্য এনজিও-আইএনজিওর লোভনীয় বা ক্ষণস্থায়ী চাকরি, ছোটখাটো ব্যবসা আর ডোনেশনের মায়াজালে আটকা পড়ে এই এলাকার তরুণদের একটি বড় অংশ আজ পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে দ্রুত উপার্জনের দিকে ঝুঁকে পড়ার এই আত্মঘাতী প্রবণতা দীর্ঘ মেয়াদে এই এলাকাকে এক চরম মেধাশূন্যতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সাময়িক অর্থনৈতিক চাকচিক্য হয়তো কারো কারো চোখে দৃশ্যমান; কিন্তু যে কৃষিজমি ধ্বংস হয়েছে, যে পাহাড় কাটা হয়েছে, যে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, তা কি কোনো অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব? যে ইকোসিস্টেম ধ্বংস করা হলো, জাতিসংঘ বা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা কি তা কখনো আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারবে?

​উখিয়া-টেকনাফের মানুষ কোনোভাবেই রোহিঙ্গাদের প্রতি বিদ্বেষী নয়। তারা সেদিনও মানবতার পাশে দাঁড়িয়েছিল, আজও আশ্রিত মানুষের মৌলিক অধিকারের পক্ষে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানবতার এই বিপুল ও অন্তহীন বোঝা কেন শুধু এই অবহেলিত জনপদকেই বহন করতে হবে? যে মাটি একসময় উর্বর ও সবুজ ছিল, আজ তা বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হওয়ার শাস্তি কেন এই নিরপরাধ মানুষগুলো পাচ্ছে?

​এই জনপদের মানুষও বাঁচতে চায়, এই জনপদের শিশুরাও সুস্থ পরিবেশে স্বপ্ন দেখতে চায়। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ এবং বর্তমান সরকারের কাছে জোরালো দাবি, উখিয়া-টেকনাফের মানুষের জীবন, কৃষি, ইকোসিস্টেম ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে অবিলম্বে কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করুন। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় কৃষকদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ না দিলে এই জনপদের মুক্তি মিলবে না। মানবতার পিঠে আর কত দিন এই অবহেলার চাবুক চলবে? রোহিঙ্গারা কি আর কোনোদিন নিজের ভিটায় ফিরে যেতে পারবে না? মিয়ানমার জান্তা সরকারের এই অন্যায় বাংলাদেশ সরকার আর কত দিন নীরবে বহন করবে। যত দিন রোহিঙ্গারা এ দেশে থাকবে, এর প্রতিটি মুহূর্ত, দিন, মাস, বছর বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি মিয়ানমার রাষ্ট্রের কাছে অসহায়ত্বের সাক্ষ্য বহন করে চলবে । আমরা এই অপমানের অবসান চাই এবং বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের পূর্ণ স্বাধীনতা সার্বভৌত্বের বাস্তব চিত্র দেখতে চাই।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আ.লীগ ফেরার সম্ভাবনা কতটা, কীভাবে

বাজেট নিয়ে যে জরুরি প্রশ্নটি কেউ করে না

নিষেধাজ্ঞার পরও প্লাস্টিক ব্যাগের বিরুদ্ধে লড়াই

বাংলা ভাগের আড়ালে নৌ-অফিসার

‘পুশইন’ কূটনীতির অনিষ্টেও নির্বিকার?

ডিপ স্টেটের গভীরে বাংলাদেশ

ড. এম উমর চাপরার সতর্কবার্তা ও বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের বাস্তবতা

ভারত-বাংলাদেশ স্বামী-স্ত্রীর যুগ ও অনিচ্ছাকৃত পুশইন

বলকানের মুসলমানদের নিয়ে পশ্চিমা-ইসরাইলি নয়া চক্রান্ত

সাইবার আইন ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষা