হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

অর্থনীতির বিপদ ক্ষমতাসীনেরা টের পেতে শুরু করেছেন

মন্তব্য প্রতিবেদন

মাহমুদুর রহমান

মাহমুদুর রহমান

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী এবং উপদেষ্টার কাছ থেকে অর্থনীতি নিয়ে বেশ কিছু আশঙ্কার কথা শুনতে পেয়েছি। ‘পপুলিস্ট’ কথাবার্তা বাদ দিয়ে সরকারের কঠিন বাস্তবতা বুঝতে পারাটা দেশের জন্য শুভলক্ষণ। নির্বাচনের আগে বিএনপির পক্ষ থেকে জনগণকে বোঝানো হয়েছিল যে, নির্বাচন এমন এক মহৌষধ, যার প্রয়োগে বাংলাদেশের তাবৎ সমস্যার একেবারে রাতারাতি সমাধান হয়ে যাবে। জুলাই বিপ্লবের অব্যবহিত পর অনুষ্ঠিত বিএনপির প্রথম জনসভাতেই তিন মাসের মধ্যে নির্বাচনের দাবি তোলা হয়েছিল। প্রফেসর ইউনূস ২০২৯ সাল পর্যন্ত নানা ছলছুতায় ক্ষমতা ধরে রাখবেনÑএমন একটা ধারণা দলটির নীতিনির্ধারকদের মাথায় তখন কে বা কারা যেন ঢুকিয়ে দিয়েছিল।

অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো কাজকারবারেই আমার অবশ্য কখনো এরকমটা মনে হয়নি। কী কারণে জানা নেই আমার দেশ পত্রিকার প্রতি মহা ক্ষিপ্ত নব্য ক্ষমতাশালী বিএনপি গোষ্ঠী এটাও প্রচার করেছিল যে, আমারও নাকি নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি ছিল। আমার মতো এক অতি নগণ্য নাগরিকের জাতীয় নির্বাচনের মতো রাষ্ট্রের অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সম্মতি কিংবা অসম্মতির কানাকড়ি মূল্য না থাকলেও বিএনপির নতুন মালিকরা কী উদ্দেশ্যে এ-জাতীয় প্রচারণা বেশ জোরেশোরে চালিয়েছিলেন, সেটা আমার জানা নেই। অথচ আমি তৎকালীন উপদেষ্টাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হলে তাদের প্রায়ই পরামর্শ দিতাম সফলভাবে সরকার চালাতে না পারলে যত দ্রুত সম্ভব দায়িত্ব ছেড়ে দিতে।

তখনকার ক্ষমতাবানদের মধ্যে খলিলুর রহমান (বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী), আসিফ নজরুল, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং আদিলুর রহমান খানকে এ বিষয়ে সাক্ষী মেনে রাখলাম। এই চারজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ অন্য উপদেষ্টাদের তুলনায় বেশি হতো। উপদেষ্টাদের বাইরে কথা হতো প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব এবং বর্তমানে ‘ওয়াদা’ সম্পাদক শফিকুল আলমের সঙ্গে।

তিনিও উপরোক্ত বিষয়ে আমার অবস্থান জানতেন। এছাড়া আমার লেখার নিয়মিত পাঠকদের হয়তো মনে থাকতে পারে, প্রফেসর ইউনূসকে উদ্দেশ্য করে আমার দেশ পত্রিকায় একাধিকবার ‘Either Rule or Quit’ জাতীয় বার্তা দিয়ে কড়া মন্তব্য প্রতিবেদনও লিখেছিলাম। ড. ইউনূসের রাজত্বকালে তার সঙ্গে ওসমানী মিলনায়তনে একুশে পদকপ্রাপ্তির আনুষ্ঠানিক স্বল্প সময় ছাড়া আমার কখনো দেখা হয়নি।

যাহোক, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফেরার আগে বিএনপির একটি মাত্র অনুষ্ঠানে মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবরের বিশেষ অনুরোধে যোগ দিয়েছিলাম। র‍্যাডিসন হোটেলে আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানে যখন বললাম, প্রফেসর ইউনূসকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে হয় নির্বাচন দিতে হবে নতুবা পদত্যাগ করে চলে যেতে হবে, তখন বিএনপির উপস্থিত সব নীতিনির্ধারক বেজায় অবাক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন। দলের সাইবার সেলের প্রচারণা থেকে পাওয়া ধারণার সঙ্গে আমার সেদিনকার বক্তব্যের কোনো মিল না পেয়ে তারা যে বিস্মিত হয়েছিলেন, সেটা বেশ টের পেয়েছিলাম। একই অনুষ্ঠানে আমার আগে বক্তব্য দিতে গিয়ে কবি ও কলামিস্ট ফরহাদ মজহার রাষ্ট্র সংস্কারের আগে নির্বাচন দেওয়ার বিপক্ষে তার জোরালো অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন। বিএনপির লোকজন ভেবে নিয়েছিলেন, আমিও সম্ভবত ফরহাদ ভাইয়ের লাইনেই কথা বলব। সেই অনুষ্ঠানে আজকের রাষ্ট্রপতি এবং স্পিকার, দুজনই উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সর্বশেষ বক্তব্য দেওয়ার সময় নির্বাচনের বিষয়ে আমার স্পষ্ট ও ইতিবাচক অবস্থানের জন্য সরাসরি ধন্যবাদও জানিয়েছিলেন।

বিএনপি নেতারা অতি দ্রুত ক্ষমতা হাতে পাওয়ার জন্য কতটা ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন, সেটা বোঝানোর জন্যই এসব ঘটনার উল্লেখ করলাম। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনে বিধ্বস্ত অর্থনীতি নিয়ে একটি জনবহুল দেশ চালানো কতটা কঠিন, সেটা ক্ষমতায় এসে এখন হয়তো হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছেন। বর্তমান ক্ষমতাসীনরা বরং নিজেদের এই ভেবে ভাগ্যবান বিবেচনা করতে পারেন যে, ৫ আগস্টের বিপ্লবের পরপরই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে তাদের দায়িত্ব নিতে হয়নি। প্রফেসর ইউনূসের সরকার অন্তত সকল অর্থে একটি ভেঙে পড়া দেশ চালানোর আশু বিপদটা কাটিয়ে দিয়ে গেছে। যাহোক, শিরোনাম পড়েই পাঠক নিশ্চয় বুঝতে পারছেন যে রাজনীতি নয়, মূলত দেশের অর্থনীতি নিয়েই লেখা আমার আজকের মন্তব্য প্রতিবেদন।

পতনের কয়েক বছর আগে থেকেই শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অর্থনীতির বারোটা বাজানো শুরু করে দিয়েছিলেন। মেগা প্রজেক্টের নামে রাষ্ট্রের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অপচয় করা হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় খাতে কোনো ধরনের সমীক্ষা ছাড়া গ্রহণ করা সেসব বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগের ফলে আওয়ামী লুটেরাদের সম্পদের অভাবনীয় বৃদ্ধি ব্যতীত দেশে কোনো প্রকৃত কর্মসংস্থান হয়নি। উপরন্তু, বিগত এক দশকে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো অধিক হারে রেমিট্যান্সপ্রবাহের মাধ্যমে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার যে উল্লেখযোগ্য মজুত গড়ে উঠেছিল, সেটার ওপরও লুটেরা শ্রেণির লোলুপ দৃষ্টি পড়েছিল।

আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় আপত্তি ও সতর্কীকরণ উপেক্ষা করে রাষ্ট্রের রিজার্ভের অর্থ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রদানের নামে নজিরবিহীনভাবে তছরুপ করা হয়েছে। এক রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অপচয় কিংবা ভাগাভাগির পরিমাণ শোনা যায় কয়েক বিলিয়ন ডলার। আশা করি সেখানকার একেকটি মহার্ঘ্য বালিশের দাম পাঠক ভুলে যাননি। এমন লুটপাটের পরিণামে কোভিড-পরবর্তী তিন বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ফ্যাসিস্ট সরকার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ১৫ বিলিয়নে নামিয়ে নিয়ে এসেছিল।

এই পতনের ধারা আর বছর দুয়েক অব্যাহত থাকলে দ্বিপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয় পাওনাদারদের ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে বাংলাদেশকে নিশ্চিতভাবেই এক ঋণখেলাপি, ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতে হতো। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ উড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েক ডজন সরকারি ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে আমানতকারীদের গচ্ছিত হাজার হাজার কোটি টাকা এস আলম, মহীউদ্দীন খান আলমগীর, বেক্সিমকো, নাসা গ্রুপ, ইত্যাদি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের লুট করার ফলে দেশের পুরো ব্যাংকিং খাত দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অর্থনীতির এমন ভঙ্গুর অবস্থায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রফেসর ইউনূস ও তার ‘ইকোনমিক টিম’ প্রশংসনীয় দ্রুততার সঙ্গে আর্থিক খাতে বেশ খানিকটা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন।

এ বছর ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় আমাদের রিজার্ভ মাত্র দেড় বছরের মধ্যে ১৫ বিলিয়ন থেকে বেড়ে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব হয়েছিল। আশ্চর্যজনকভাবে কদিন আগে বর্তমান সরকারের অত্যন্ত প্রভাবশালী এক মন্ত্রী বক্তৃতায় বলেছেন, প্রফেসর ইউনূসের সরকার নাকি শেখ হাসিনার মতোই দেশের সর্বনাশ করে দিয়ে গেছেন। সব দেশেই রাজনীতিবিদরা তাদের পেশার অংশ হিসেবে খানিকটা মিথ্যা কথা বলে থাকেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তো এ ব্যাপারে রীতিমতো বিশ্বরেকর্ড করে ফেলেছেন। রাজনীতিবিদদের মিথ্যাচার মেনে নিয়েও বিএনপির মন্ত্রীর এতখানি অকৃতজ্ঞতা হজম করা কঠিন।

যে অন্তর্বর্তী সরকারের আনুকূল্যে দুই দশক পর এরা গাড়িতে সদম্ভে পতাকা ওড়াচ্ছেন, স্ত্রী-ছেলেমেয়েসহ ক্ষমতা উপভোগ করছেন, বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় পরিবারের কাছের কিংবা কাছাকাছি সদস্যদের বসাচ্ছেন, হাজার হাজার কোটি টাকার সরকারি ব্যবসা পারিবারিক করতে পারছেন, বিগত সেই সরকারটিকে একেবারে ফ্যাসিস্ট হাসিনার কাতারে ফেলাটা উচিত হচ্ছে কি না, সেই বিচারের ভার পাঠকের ওপরই থাকল। পবিত্র কোরআন শরিফের একাধিক সুরায় মহান আল্লাহতায়ালা মানবচরিত্রের এই অকৃতজ্ঞতা নিয়ে বিশেষ বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। যাহোক, নির্বাচনি ম্যানিফেস্টোতে বিএনপি অর্থনীতি সম্পর্কে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেটা এবার একটু পরীক্ষা করা যাক।

বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের তৃতীয় অধ্যায়ের শিরোনাম, ‘ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার’। আজকের লেখাটি নিয়ে ল্যাপটপের সামনে বসার আগে আমি সরকারি দলের ইশতেহারের উপরোক্ত অধ্যায়টি একাধিকবার পড়েছি। আমার সীমিত অর্থনীতি-সংক্রান্ত জ্ঞানে মনে হয়েছে সরকার বাংলাদেশের জিডিপিকে ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করাকেই প্রধান অর্থনৈতিক লক্ষ্য স্থির করেছে। ইশতেহার অনুযায়ী, সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে জিডিপি ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে চায়। বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপি ৫০০ বিলিয়ন ডলারের সামান্য উপরে।

অর্থাৎ, লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে আগামী ৮ বছরের মধ্যে আমাদের জিডিপি দ্বিগুণ করতে হবে। সেটা সম্ভব কি না বোঝার জন্য গত দশ বছরের জিডিপি বৃদ্ধির পরিসংখ্যানটা দেখা দরকার। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট জিডিপি ২৬৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪৫৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। তার অর্থ হলো গড়ে প্রতিবছর জিডিপি বেড়েছে ১৯ বিলিয়ন ডলার। ২০৩৪ সালে যদি আমাদের ট্রিলিয়ন ডলার জিডিপিতে যেতে হয়, তাহলে এখন থেকে প্রতিবছর জিডিপি ১৯ থেকে অন্তত ৬০ বিলিয়ন ডলার করে বাড়তে হবে, যা গত ১০ বছরের গড় বৃদ্ধির তিনগুণ।

ট্রিলিয়ন ডলার জিডিপি লক্ষ্যমাত্রার আরেক অর্থ হলো, ধারাবাহিকভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হবে ১০ শতাংশের ঊর্ধ্বে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ কখনো দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি অর্জন করেনি। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর খুব কম দেশেই দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি অর্জন করা গেছে। এই শতাব্দীতে একমাত্র চীন ১৯৮৪ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত টানা তিন দশক গড়ে প্রতি বছর ৯ দশমিক ৫ থেকে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের রেকর্ড গড়তে পেরেছে। ২০০৭ সালে দেশটি ১৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে পুরো দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। চীন কেমন করে এই অসাধ্য সাধন করতে পেরেছিল, সে সম্পর্কে তেমন কোনো পড়াশোনা না করেই আমাদের দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধির স্বপ্ন দেখা সমীচীন হবে না। অবশ্য এটাও হতে পারে, ক্ষমতার বাইরে থাকা প্রায় দুই দশকে বিএনপির অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা হয়তো এ বিষয়েও বিশদ প্ল্যান করে ফেলেছেন।

তবে, বর্তমানের খবর মোটেও ভালো নয়। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী চলমান অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে যথাক্রমে মাত্র ৩ দশমিক ২, ৩ দশমিক ৪ এবং ৪ শতাংশ। সুতরাং, ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের কল্পনা বর্তমান পরিস্থিতিতে আকাশকুসুমের থেকেও অবাস্তব বলেই মনে হচ্ছে। বরং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির বর্তমান টালমাটাল অবস্থায় ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনই উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে আমাদের মানতে হবে।

শেখ হাসিনার মতো ‘পরিসংখ্যান ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে উচ্চ প্রবৃদ্ধি দেখানো হলে অবশ্য ভিন্ন কথা। দেশের বাস্তবতা হলো, উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের অন্যতম হাতিয়ার, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং শিল্প খাতে অনেক দিন ধরে কোনো সুখবর নেই। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে শিল্প খাতে আমাদের জিডিপি বাড়ার পরিবর্তে বরং সংকুচিত হওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী বিগত তিন মাসে শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির আমদানি এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস পেয়েছে যা বিশ্বব্যাংকের নেতিবাচক প্রতিবেদনকে সমর্থন করছে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষাপটে স্বল্প সময়ের মধ্যে শিল্প খাতে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতির কোনো সম্ভাবনা আমি দেখতে পাচ্ছি না। বাংলাদেশের মতো ভৌগোলিক আয়তনে ক্ষুদ্র, জনবহুল একটি দেশে কৃষিতে কোনো অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনেরও তেমন সুযোগ নেই।

অধিকতর আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো সময়সাপেক্ষ। সেবা খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির সুযোগ থাকলেও তার জন্য সহায়ক বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে যা সহজ নয়। তাছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ এবং বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। সর্বত্র মন্দা যেন এগিয়ে আসছে। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জনগণের আয় কমে যাওয়ার কারণে আগামী ৩ নভেম্বরের কংগ্রেস এবং সিনেটের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানদের ভরাডুবি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি এক অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে পতিত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চরম বর্ণবাদী, ইসলামোফোবিক ও যুদ্ধবাজ নীতি সর্বত্র সংকট আরো বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতি না ফিরলে বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে কেবল অভ্যন্তরীণ ভোগ বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জনের পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত নয়। বরং অনিয়ন্ত্রিত অভ্যন্তরীণ ভোগ হাসিনার আমলের মতো দুর্নীতি বাড়ানোর পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতিকে তুঙ্গে নিয়ে যাবে, যার লক্ষণ ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হচ্ছে। সাধারণ জনগণের ব্যবহার্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে দরিদ্র এবং মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকা ক্রমেই কষ্টকর হয়ে পড়ছে।

উপরোক্ত মন্দা পরিস্থিতিতে সীমিত সম্পদের বণ্টন নিয়ে কিছুটা আলোচনা আবশ্যক। কেন জানি না, আমাদের অর্থনীতিবিদরা যতখানি প্রবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা করেন, সে তুলনায় সম্পদের সুষম বণ্টন প্রসঙ্গে বলতে গেলে প্রায় নীরবই থাকেন। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের দুঃশাসনকালে আমরা দেখেছি মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির কাগুজে গল্পের আড়ালে দেশের সম্পদ লুটেরা শ্রেণির হাতে পুঞ্জীভূত হয়েছে। এক এস আলম ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে দুই লাখ কোটি টাকার অধিক লুট করে নিয়ে গেছে। সেই লুটের কিয়দংশ রাজনীতিবিদ ও আমলাদের পকেটেও গেছে। বাস্তবতা হলো, মাথাপিছু আয়ে ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার গল্প আমাদের শুনতে ভালো লাগলেও রাষ্ট্রের বর্ধিত আয় দেশের দরিদ্র মানুষের হাতে যায়নি। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার তিনভাবে দেশের মানুষকে প্রবঞ্চিত করেছে।

প্রথমত, জাতীয় আয় নিয়ে তারা ভুয়া পরিসংখ্যান বাজারে ছেড়েছে। দ্বিতীয়ত, যতটুকু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে তার প্রায় পুরোটাই শেখ পরিবার এবং তাদের ঘনিষ্ঠ, রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক এবং সামরিক ও বেসামরিক আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতাবানরা মেরে দিয়েছে। তৃতীয়ত, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেল এবং ঢাকার বিআরটি প্রকল্পের মতো তথাকথিত মেগা প্রজেক্ট গ্রহণ করে শুধু দেশের সম্পদই লুট করা হয়নি, সেই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় এবং ব্যবহার-অযোগ্য অবকাঠামো নির্মাণ করে দেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করা হয়েছে। বিআরটি প্রকল্প তৈরি করতে ৪ হাজার কোটি টাকা গচ্চা গেছে। এখন আবার সেই কুৎসিত শ্বেতহস্তী ভেঙে ময়মনসিংহগামী রাস্তা ব্যবহারযোগ্য করতে জনগণের করের কত কোটি টাকা ব্যয় হবে, সেটা আল্লাহই ভালো জানেন। এই প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত সবাইকে বিচার করে যথোপযুক্ত সাজা দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানাই।

বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় আসতে না আসতেই ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল ও মার্কিন যৌথ হামলার পটভূমিতে বিশ্বব্যাপী তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চ মূল্যজনিত লোকসান মেটাতে এবং আইএমএফের চাপে সরকার ইতোমধ্যে কয়েক দফায় দেশে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। ফলে জনগণের কাঁধে মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে। উপরন্তু, আমলাদের সন্তুষ্ট করতে সরকার সম্প্রতি তাদের বেতন-ভাতার বিপুল বৃদ্ধি ঘটিয়েছে। কিন্তু, দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় আমলা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের সংখ্যা একেবারেই কম। সুতরাং, আমলা গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হলেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবন ধারণ আরো কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

বিশ্বব্যাংকের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে দরিদ্র ও হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা বিপজ্জনক হারে বৃদ্ধির আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টাও একই কথা বলেছেন। ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য মোকাবিলা করার জন্য ফ্যামিলি কার্ডের সুফল দ্রুততার সঙ্গে প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি।

এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মন্দ রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় যদি আবার সহায়তাপ্রাপ্তদের তালিকা তৈরি দলীয় বিবেচনা দ্বারা প্রভাবিত হয়, তাহলে একটি ভালো উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কার সঙ্গে সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনার সুযোগ তৈরি হবে। এ দিকটায় সরকারপ্রধানের বিশেষ দৃষ্টি রাখা আবশ্যক। সব সমস্যার পেছনে ‘গুপ্ত’ খুঁজে বেড়ালে একটা সময় এ-জাতীয় প্রচারণা হাসিনার ‘রাজাকারের’ মতো বুমেরাং হয়ে যেতে পারে। আমি মনে করি, সরকারের অপচয়মূলক এবং উচ্চাভিলাষী প্রকল্প বন্ধ করে ক্ষমতাসীনদের অন্তত আগামী এক বছর দারিদ্র্য বিমোচন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সব মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা উচিত।

বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিমান কেনার চুক্তির চাইতে রাষ্ট্রের সম্পদ উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির চাপে গলদঘর্ম সাধারণ জনগণের সহায়তায় যথাসম্ভব ব্যয় করলে সরকার বরং প্রশংসিত হবে। আমাদের পরামর্শ সব সরকারের কাছেই তিক্ত বোধ হলেও দেশ ও জনগণের স্বার্থে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে আজকের লেখায় সমাপ্তি টানছি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিতর্ক কেন

মুসলিম দেশ কসোভোতে অন্য এক দৃষ্টান্ত

দিল্লি থেকে ইউরোপ: জেন-জি আন্দোলনের মডেল বাংলাদেশ

বলিষ্ঠ নেতৃত্বই পারে অনৈক্য দূর করতে

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গভর্নরের বৈঠক, ঢাকায় কার্যালয় খোলার আলোচনা

রাজনীতিতে গোয়েন্দা সংস্থা বিতর্ক

জাহাজ নির্মাণ শিল্প: হাতছাড়া হচ্ছে অপার সম্ভাবনা

ধর্ম যার যার...

যুক্তরাষ্ট্রকে তাড়াতে তেহরানের কৌশল

মাধ্যমিক থেকেই সেমিস্টার পদ্ধতি চালু হোক