হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

আধুনিক সমাজ বিনির্মাণে ইসলামি অনুশাসন

শায়রুল কবির খান

ছবি: সংগৃহীত

মুসলিম জীবনের সার্থকতা কেবল মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণের মধ্য দিয়ে নয়, কিংবা জনসংখ্যা ও সম্পদের বিশাল প্রবৃদ্ধিতেও নয়। বরং পৃথিবীপৃষ্ঠের এই সমাজ ও রাষ্ট্রে কতটা দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হলো, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে সুশাসনের ওপর। মুসলিম উম্মাহর প্রকৃত সাফল্য দৃশ্যমান হয় রাষ্ট্র নির্মাণে ইসলামি রীতিনীতি ও সংস্কৃতির প্রতিফলন দেখে। বাংলাদেশের মতো একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ইসলামি রীতিনীতি অনুযায়ী কল্যাণ রাষ্ট্র বিনির্মাণে কিছুটা ব্যর্থতার ছবি আজ স্পষ্ট। আমাদের দেশে ইসলাম চর্চাকে কেবল নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ও দোয়া-দরুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। অথচ এই চর্চাকে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় সুশাসন নিশ্চিত করার পর্যায়ে উন্নীত করতে পারলেই একটি প্রকৃত কল্যাণ রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব।

জীবনের পথচলায় পবিত্র কোরআন যে রোডম্যাপ দেয়, সেটিই একমাত্র সঠিক পথপ্রদর্শক। দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ মুসলিমরা ইসলামের সঠিক রীতিনীতি ত্যাগ করে স্বার্থবাদ, দলবাদ, ফ্যাসিবাদ ও সেক্যুলারিজমের পথে হাঁটছেন। এই পথগুলো মূলত বিচ্যুতি, বিদ্রোহ ও পাপের পথ। আমরা নবীজিকে (সা.) রাসুল ও পথপ্রদর্শক হিসেবে বিশ্বাস করলেও তার বাণী ও প্রদর্শিত পথের অনুসরণ করছি না সঠিকভাবে। অথচ কল্যাণ রাষ্ট্রে রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় কী করণীয়, সেটিই ছিল নবীজি (সা.)-এর মূল মিশন। তিনি মানবজাতির জন্য এই বিষয়গুলো হাতে-কলমে শিখিয়ে গেছেন। ইবাদতকে তিনি কেবল ব্যক্তিগত উপাসনায় সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং মহান আল্লাহর এজেন্ডা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে পূর্ণ প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। মানব ইতিহাসে এটিই ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্ম এবং তিনি নিজে ১০ বছর সেই রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

মুসলিম জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নিজের ইসলাম পালনের সঙ্গে নবীজি (সা.)-এর ইসলাম পালনকে মিলিয়ে দেখা। একজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি প্রতিক্ষণ বিচার করেন, তিনি কতটুকু রাসুলের অনুসরণ করছেন। ঈমানদার ব্যক্তি এভাবেই নিজের হিসাব নিজে নেন, যাতে মহান আল্লাহর কাছে হিসাব দেওয়া সহজ হয়। নবীজি (সা.) যে পথে চলেছেন, সেটিই বিশুদ্ধ কোরআনের পথ। তার সেই পথে কেবল নামাজ-রোজা ছিল না, সেখানে ছিল আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা, অন্যায়-দুর্বৃত্তির নির্মূল এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ।

কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো আমাদের অজ্ঞতা। অধিকাংশ মুসলিম জানেনই না, ইসলাম পালন মানে কেবল উপাসনা বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ নয়, বরং রাষ্ট্রে সুশাসন নিশ্চিত করাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। সমাজের তথাকথিত কিছু ইসলামি ভাবধারার ব্যক্তি এই অজ্ঞতাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। অনেক সময় রাজনীতিকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নবীজি (সা.) যে রাজনীতিতে অংশ নিলেন, তা নিষিদ্ধ হয় কীভাবে? কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির কারণে রাজনীতি কি বর্জনীয় হতে পারে? শুধু রাজনীতি কেন—প্রশাসন, ব্যবসা, চিকিৎসা, সাংবাদিকতা বা ইমামতির মতো সব পেশাতেই তো দুর্বৃত্ত রয়েছে; তবে কি সব পেশাই বর্জন করতে হবে?

আইনজীবী হতে হলে যেমন আইন জানতে হয়, তেমনি মুসলিম হতে হলে ইসলামকে জানতে হবে। জ্ঞানার্জনে ফাঁকিবাজি থাকলে ইসলাম পালনেও ফাঁকিবাজি থেকে যায়। একজন জাহেল ব্যক্তি নামাজি বা হাজি হতে পারেন, কিন্তু তিনি প্রকৃত ঈমানদার হতে পারেন না; বরং তিনি মোনাফিকে পরিণত হন। ঈমানদার হওয়ার অর্থ কেবল আল্লাহ, রাসুল ও পরকালে বিশ্বাস নয়; বরং এর বাইরেও সৃষ্টিকর্তার এজেন্ডার সঙ্গে পূর্ণ একাত্ম হওয়া। আর যারা এই একাত্মতা পোষণ করেন, তারা সেই এজেন্ডাকে বিজয়ী করতে একনিষ্ঠভাবে সচেষ্ট থাকেন।

প্রকৃত ঈমানদারের মডেল হলেন নবীজি (সা.) ও তার সাহাবারা। তাদের জীবনে কেবল বিশ্বাস ও তাসবিহ পাঠ ছিল না; ছিল অর্থ, শ্রম, মেধা ও প্রাণের কোরবানির মাধ্যমে এক লাগাতার সংগ্রাম। ঈমান, আমল ও সংগ্রামের এই সামগ্রিকতা নিয়েই প্রকৃত ইসলামি অনুশাসন।

প্রতিটি নাগরিক যদি ঐক্যবদ্ধভাবে এই অনুশাসন অনুশীলনে ব্রত হতে পারি, তবে ইনশাআল্লাহ আগামীর বাংলাদেশে অবশ্যই একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে।

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী

শিক্ষকের মর্যাদা ও লাঞ্ছিত শৈশব

ফ্যামিলি কার্ড কীভাবে কার্যকর করা যাবে

তেহরানের হুলের জ্বালায় যুক্তরাষ্ট্র

বিস্মৃতির অন্তরালে ‘বাংলার বাঘ’

ট্রাম্প এবং শি আসলে কী অর্জন করলেন

ঢাকায় অপরাধপ্রবণতা

রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষা ও মনস্তত্ত্ব

রাষ্ট্রপতির চিকিৎসাবিলাস ও বেহাল স্বাস্থ্য খাত

ফারাক্কার প্রভাবে ব্রিজের নিচে নদী নেই!

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ঝড় ও বাংলাদেশ