হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ভারত-ইসরাইলে পেলেট গানের নৃশংসতা

অনুরাধা ভাসিন

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল চলতি বছরের জুলাই মাসে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া : দ্য সাপ্লাই অব ওয়েপন্স অ্যান্ড মিউনিশন্স টু ইসরাইল’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, গাজায় সামরিক আগ্রাসনের পুরো সময়ে ভারত ইসরাইলে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের যন্ত্রাংশ ও গোলাবারুদের উপাদান পাঠিয়েছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়, এই রপ্তানি ইসরাইলের ‘চলমান গণহত্যা’য় ‘উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি’ তৈরি করছে। আসল বিপদ শুধু এই প্রাণঘাতী প্রযুক্তির রপ্তানি বা আদান-প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর চেয়েও বড় বিপদ হলো, বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে এগুলোর ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির নজির।

পেলেট গান হলো ১২-বোর পাম্প-অ্যাকশন শটগান, যা সাধারণত পাখি শিকারের কাজে ব্যবহৃত হয়। এটি এমন এক কার্তুজ ছোড়ে, যার ভেতরে শত শত ধাতব পেলেট বা ছররা থাকে। এগুলো একটি একক প্রজেক্টাইল বা বস্তুর মতো না গিয়ে বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিটি কার্তুজে কয়েকশ ছোট ছোট ছররা বা গুলি (পেলেটস) থাকে। গুলি চালানোর সময় এগুলো প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০০-১৫০ মিটার বেগে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই ছড়িয়ে পড়ার বৈশিষ্ট্যের কারণে ভিড়ের মধ্যে একটি গুলিতেই একসঙ্গে একাধিক মানুষ আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে।

সংক্ষেপে, এটি কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু বেছে নেয় না। বরং ওই সীমার মধ্যে থাকা যেকোনো ব্যক্তিই এই ছররা গুলির আঘাতের শিকার হতে পারেন। ভারতীয় কাশ্মীরে ছররা গুলির আঘাতে জানালার পাশে বসে থাকা কোনো কিশোরী কিংবা মায়ের কোলে থাকা শিশুরাও পেলেট গানের এই ছররা গুলির শিকার হয়েছে। তথাকথিত সহিংস বিক্ষোভকারী এবং যারা শুধু ভুল সময়ে ভুল জায়গায় উপস্থিত ছিলেন, তারা উভয়ই এই পেলেট গানের শিকার হয়েছেন।

এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ভারতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে দিল্লিতে শিক্ষার্থীদের সংসদ ভবন অভিমুখে মিছিল ঠেকাতে পুলিশ পেলেট গান ব্যবহার করে। এতে অন্তত ১০ জন আহত হন, যার মধ্যে এক তরুণ দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। ভারতে কাশ্মীর থেকে নয়াদিল্লি পর্যন্ত সর্বত্রই আন্দোলন দমনে পেলেট গানের ব্যবহার মনে করিয়ে দেয় যে, সব যুদ্ধক্ষেত্রই এক ধরনের পরীক্ষাগার। কোনো একটি স্থানে যা বৈধতা পায়, তা সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকে না, দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে অন্যত্রও।

ভারত ২০১০ সালে কাশ্মীরে পেলেট গানের ব্যবহার শুরু করে এবং আন্দোলন দমনে এটিকে ‘প্রাণঘাতী নয়’ বা ‘কম প্রাণঘাতী’ অস্ত্র হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এই অস্ত্রের আঘাতে ২৪ জন নিহত হন। ২০১৬ সালে কাশ্মীরের সংগঠন হিজবুলের কমান্ডার বুরহান ওয়ানি নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত হন। তার মৃত্যুর পর সৃষ্ট সহিংস বিক্ষোভ দমনে ব্যাপকভাবে পেলেট গান ব্যবহার করেছিল নিরাপত্তা বাহিনী। সেখানে ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধাতব পেলেট বা ছররার আঘাতে ১৮ জন নিহত এবং ২,৯৪২ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে ১,৪৫৯ জনের চোখের আঘাত ছিল গুরুতর, যাদের মধ্যে ১৩৯ জন অন্ধ হয়ে গেছেন।

পুরোনো ক্ষত নতুন করে জাগিয়ে তোলা

আঘাতপ্রাপ্ত অধিকাংশ মানুষের জীবন কীভাবে চিরদিনের জন্য ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়, তা না বুঝলে ছররা বন্দুকের ভয়াবহতা বা নিষ্ঠুরতা পুরোপুরি অনুধাবন করা সম্ভব নয়। ‘কম প্রাণঘাতী’ তকমা দেওয়া সত্ত্বেও ছররা গুলি ত্বক ভেদ করে শরীরের ভেতরে গেঁথে থাকার মতো যথেষ্ট ধারালো। কোনো কোনো ঘটনায় এগুলো স্থায়ী অন্ধত্ব ডেকে আনে এবং অনেক সময় আঘাতের ফলে মৃত্যুও হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও, কাশ্মীরে পেলেট গানের ব্যবহারকে যৌক্তিক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

বহু মানুষের মৃত্যু, শত শত মানুষের অন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অনেকের স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যাওয়ার মতো নথিবদ্ধ প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও ভারত ও ইসরাইলসহ অনেক রাষ্ট্র এই অস্ত্রটিকে ‘প্রাণঘাতী নয়’ আখ্যায়িত করে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে। কিন্তু এ নিয়ে কোথাও বড় ধরনের প্রতিবাদ বা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়নি। ভারতে কাশ্মীরকে একটি ‘ব্যতিক্রমী অঞ্চল’ হিসেবে দেখার যে প্রবণতা আছে, তা সেখানকার ভুক্তভোগীদের নিয়ে উপহাস করার শামিল, যার সর্বশেষ উদাহরণ আসন্ন বলিউড চলচ্চিত্র ‘চৌহান’।

সন্ত্রাসবাদ ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো গৎবাঁধা অজুহাত দেখিয়ে কাশ্মীরে পেলেট গান ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ কোনো বিদ্রোহী বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এই অস্ত্র ব্যবহারের কোনো নথিবদ্ধ প্রমাণ নেই। শুধু বেসামরিক বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধেই এটি ব্যবহৃত হয়েছে। বিদ্রোহ দমনের অজুহাতে কোনো অঞ্চলের জন্য তৈরি করা এই নিরাপত্তা-কৌশলটি এখন অন্য দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে।

সহিংসতার ইতিহাস

দিল্লিতে ব্যবহারের আগে ভারতের কৃষক বিক্ষোভ দমনে এবং মণিপুরে পেলেট গান ব্যবহার করা হয়েছে। দিল্লিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে এগুলোর ব্যবহার দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি করলে তখন বলা হয়েছিল—‘তারা শিক্ষার্থী, কোনো সন্ত্রাসী নয়।’ কিন্তু কাশ্মীর, মণিপুর, পাঞ্জাবসহ যেসব জনগোষ্ঠীকে আগে থেকেই সন্ত্রাসীদের সমার্থক হিসেবে দেখা হয়, তাদের ক্ষেত্রে এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রযোজ্য হয় না। ভারতে নির্দোষ হওয়ার ধারণাটি সবার জন্য সমান নয়, এটি নির্ধারিত হয় পরিচয়ের ভিত্তিতে।

এর চেয়েও বড় সমস্যা হলো রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া, যা পেলেট গানের আঘাতে সৃষ্ট জখমসংক্রান্ত প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার পুরোনো পথে হাঁটছে। রাষ্ট্র এখন সরাসরি অস্বীকারের পথে না হেঁটে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দেওয়ার কৌশল নিচ্ছে, কিন্তু কোনো জবাবদিহি নিশ্চিত করছে না। কংগ্রেসের নেতৃত্বে ভারতের বিরোধী নেতারা যখন জানতে চাইছেন, কারা এবং কেন পেলেট গান ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে, তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর জবাব দিতে সংসদে উপস্থিত হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

জবাবদিহির অভাব মানেই হলো পেলেট গান ব্যবহার অব্যাহত থাকা। কাশ্মীরে এমন নথিবদ্ধ ঘটনা রয়েছে, যেখানে ২০১০ সালে টিয়ার গ্যাসের শেল সরাসরি শরীরের ওপরের অংশে নিক্ষেপ করার ফলে তরুণরা নিহত হয়েছেন। এমনকি সুপ্রিম কোর্টও পেলেট গানের ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং বিষয়টি শুধু ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’ (কার্যপদ্ধতির নির্দেশিকা) ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যকার পার্থক্য পর্যালোচনার গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। আন্দোলনকারীদের নিয়ন্ত্রণে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা যায় কি নাÑসেই বিতর্কের কোনো সুরাহা আদালত বা অন্য কেউ করেনি।

এই বিতর্কে এমন সব অস্ত্রের প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন, যেগুলোকে ‘প্রাণঘাতী নয়’ বা ‘কম প্রাণঘাতী’ হিসেবে তুলে ধরা হলেও বাস্তবে সেগুলো মানুষের জীবন কেড়ে নেয়। একই সঙ্গে এ বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার যে, একটি খারাপ নজির কীভাবে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে এবং এমনকি রাষ্ট্রীয় সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

পেলেট গান ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে

পেলেট গান বা ছররা বন্দুকের ব্যবহার এখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। উত্তর আয়ারল্যান্ডের ৩০ বছরের সহিংস সংঘাতের সময় যুক্তরাজ্যই প্রথম রাবার ও প্লাস্টিকের ছররা-যুক্ত শটগান ব্যবহার করেছিল। তাদের দেখেই যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশও ভিড় নিয়ন্ত্রণে একই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার শুরু করে। কোনো ভুল যুক্তি বা অজুহাত যখন বিনা চ্যালেঞ্জে গৃহীত হয়, তখন এটা দিয়ে সাধারণ মানুষকেও যে অনায়াসেই লক্ষ্যবস্তু বানানো যায়, পেলেট গান তার আরেকটি প্রমাণ।

ফিলিস্তিনে অন্যান্য অস্ত্রের পাশাপাশি পেলেট গানও অবাধে ব্যবহার করা হয়েছে, এখনো হচ্ছে। ভারত এই দমন-পীড়নের পদ্ধতি ইসরাইলের কাছ থেকে ধার করেছে কি নাÑতা ভিন্ন প্রসঙ্গ; তবে নিজ দেশের নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করতে এটি ব্যবহার করা দেশের তালিকা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। পেলেট গান ব্যবহারের কারণে ২০১৯ সালে চিলিতে ২৩০ জন মানুষ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে এর ব্যবহারে অনেক আন্দোলনকারী নিহত এবং ৪০০ জন অন্ধ হয়ে গেছেন। ইরানের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সময়ও এর ব্যবহার দেখা গেছে।

কোনো ভুল যুক্তি বা অজুহাত যখন বিনা চ্যালেঞ্জে গৃহীত হয়, তখন সাধারণ মানুষকেও যে অনায়াসেই এর লক্ষ্যবস্তু বানানো যায়, পেলেট গান তার আরেকটি প্রমাণ। রাষ্ট্রগুলো বিরোধীদের দমনে এটাকে দ্রুতই লুফে নেয়। কোনো এক জায়গায় এটা ব্যবহৃত হওয়ার পর অন্য কোনো কর্তৃপক্ষও যখনই একই ধরনের দায়মুক্তির সুরক্ষা চায়, তখন তা সেখানেও গিয়ে পৌঁছায়। এভাবেই পেলেট গানের নৃশংস ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে।

মিডল ইস্ট আই অবলম্বনে মোতালেব জামালী

ভেজাল খাদ্য, দূষিত পানি ও বিষাক্ত বায়ু

শিক্ষক নিয়োগ ও র‌্যাংকিংয়ে অবনতি

ক্ষমতার দম্ভ সুশাসনের অন্তরায়

বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি কেন কমে না

লিথিয়াম ও কোবাল্টের রাজনীতি

হুথিরা কি সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে পড়তে যাচ্ছে

রাজনীতিতে হিরো আর ভিলেনের মাপকাঠি

কিশোর আইন যখন অপরাধের ঢালে

ব্যাংক খাত: লুটপাট ও উত্তরণের উপায়

গ্যাস বিপর্যয়ের নেপথ্যে কী