‘যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ-বাংলা প্রবাদটির প্রচলন ঠিক কবে থেকে হয়েছিল, জানা নেই। তবে এর ব্যবহার ও কার্যকারিতা কিন্তু সবকালে, সর্বযুগে দৃশ্যমান। প্রবাদটির অর্থ-ক্ষমতার দম্ভ বা লোভের বশবর্তী হলে যে কেউ তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও নৈতিক দৃঢ়তা হারিয়ে রাবণ বা রাক্ষসসম হয়ে পড়ে। ক্ষমতার অপব্যবহারের ক্ষেত্রেই প্রবাদটি অধিক ব্যবহার হয়ে থাকে। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে (লঙ্কা) পৌঁছালে মানুষ অন্ধ হয়ে যায়, ন্যায়নীতি ভুলে যায়। রাবণ যেমন লঙ্কার দম্ভে অন্ধ হয়ে সীতাকে হরণ করেছিল, তেমনি ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিও অহংকারী ও অনৈতিকভাবে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে যখনই কোনো নতুন দল বা ব্যক্তি ক্ষমতায় যায়, তারা আগের শাসকদের মতোই অন্যায় করতে শুরু করে, নির্বাচকদের আবেগ-অনুভূতিকে উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করে। তেমন প্রেক্ষিতে এই প্রবচনটি ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।
রাবণ নিয়ে গবেষণা প্রবন্ধ রচনা উদ্দেশ্য নয়। এই যে দেশে দেশে রাবণের জন্ম ও উত্থান হয়, তাদের আসল নাম-পরিচয় জানতে খুব বেশি কষ্ট করতে হয় না, চরিত্রেই ফুটে ওঠে। নতুন যুগের রাবণেরাও নায়কের বেশ ধরে খলনায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তৃতীয় বিশ্বে এই প্রবণতা সমধিক। মানুষজনকে তারা বোকা ভাবে। আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজে নাগরিকরা যে অতটা বোক নয়, সেটা বুঝতে কেন জানি তারা অক্ষম।
এই নিবন্ধের বিষয়বস্তুর সঙ্গে ‘লঙ্কা’ বা ‘রাবণ’র সম্পর্ক খোঁজা ঠিক হবে কি না-সেটি পাঠক বিবেচনা করবেন। তবে জাতি হিসেবে বোধহয় আমাদের জন্মই হয়েছে প্রতারিত ও প্রবঞ্চিত হওয়ার জন্য। এটাই হয়তো নিয়তি। তা না হলে একটি রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের কুড়ি মাস না যেতেই হতাশার কালোছায়া কেন আমাদের পিছু নেবে? তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও আরাধনার ফল একটি নির্বাচিত সরকার এবং জাতীয় সংসদ। সেই সরকার জনতুষ্টিমূলক অনেক পদক্ষেপ নিয়ে এরই মধ্যে প্রশংসাও কুড়িয়েছে। সরকারপ্রধান তারেক রহমানকে ভালো কিছু করার চেষ্টা করতে দেখা যাচ্ছে। প্রতিদিন ছুটছেন দিন-রাত একাকার করে। কিন্তু অপ্রিয় বাস্তবতা হচ্ছে, সাময়িক জনতুষ্টিমূলক পদক্ষেপই মানুষকে পুরোপুরি স্বস্তি দেয় না, তুষ্টও করে না। তার প্রমাণ অতীতে দেখা গেছে। টেকসই গণতন্ত্র ও সুশাসনের জন্যই এ দেশের মানুষ বারবার রক্ত দেয়। কিন্তু তা অধরা থেকে গেলে হতাশা ঘিরে ধরে। ক্ষোভ দানা বাঁধে। একসময় সুযোগ বুঝে বিস্ফোরণ ঘটে।
দেড় সহস্রাধিক জীবন ও অপরিমেয় রক্তের বিনিময়ে প্রায় দু-দশক পর যে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায়, সে সরকার জনপ্রত্যাশার সংস্কার ইস্যুতে যেন তালগোল পাকিয়ে ফেলছে। বৃহস্পতিবার সংসদে যে অবস্থান সরকার জানান দিয়েছে, তা খুবই হতাশাজনক। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ও স্বতন্ত্র সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশকে যাচাই-বাছাইয়ের নামে স্থগিতের সুপারিশ ভালো বার্তা দেয়নি। সার্বিকভাবে মানবাধিকার পরিস্থিতি, ন্যায়বিচার, মানুষের সমান অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাধীনভাবে বিচারক নিয়োগ, স্বাধীন বিচার সচিবালয় খুব গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া গণভোট অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ক্ষমতা বাড়িয়ে করা অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধে করা অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশসহ ১৬টি অধ্যাদেশ এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। এগুলোর ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে যাচাই-বাছাই করে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করেছে কমিটি। সুপারিশ সংসদে গৃহীত হলে এ অধ্যাদেশগুলো আপাতত বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। সপ্তাহান্তে ১০ এপ্রিলের পর এগুলো কার্যকারিতা হারাবে। সব মিলিয়ে ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাচ্ছে। এর মধ্যে অধিকাংশ অধ্যাদেশে গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার প্রত্যাশিত রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিফলন ছিল।
বাকি ১১৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দিয়ে করা জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশসহ ৯৮টি অনুমোদনের জন্য হুবহু বিল আকারে সংসদে উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। আর সন্ত্রাসবিরোধী আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশসহ ১৫টি সংশোধিত আকারে বিল উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করেছে বিশেষ কমিটি। ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু বিল হিসেবে পাস করার উদ্যোগ নেওয়ায় সরকার সাধুবাদ পেতে পারে। যদিও বিশ্লেষকদের মতে এই অধ্যাদেশগুলোর বেশির ভাগেই মূলত সরকারের ক্ষমতা সংহত বা বৃদ্ধি করার নানা উপাদান রয়েছে। আর বাতিল বা রহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া অধ্যাদেশগুলোতে ক্ষমতার ভারসাম্য, জবাবদিহি, সুশাসন, আইনের শাসন গুরুত্ব পেয়েছে।
সুপারিশ অনুযায়ী যে ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাতে যাচ্ছে, তাতে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগের শুধু হোঁচটই খাবে না, গুম-খুন, মানবাধিকার হরণ, লাগামহীন দুর্নীতির পথ সুগমসহ শেখ হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তির সুযোগ তৈরি করবে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন বুনছিল মানুষ, তা ফিকে হয়ে যাবে।
এরই মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে। সরকারি দলের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ বলে কিছু তারা মানেন না। জুলাই সনদ আদেশকে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল হিসেবে বর্ণনা করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের মাধ্যমে দ্রুত রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কারের দাবি নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, জুলাই সনদ যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো প্রথাগতভাবে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারের এ অবস্থানকে কেন্দ্র করে সামনের দিনে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠেছে। ১১-দলীয় বিরোধী জোট ইতোমধ্যে রাজপথের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। গতকাল শনিবার ঢাকায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
সরকার কেন গুরুত্বপূর্ণ চারটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ এবং আরো ১৬টির ভাগ্য ঝুলিয়ে দেওয়ার পথে হাঁটছে, তা নিয়েও জোর আলোচনা-পর্যালোচনা চলছে। সংবিধানে বিচারক নিয়োগে আইন করার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন এটা হয়নি। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ জারি করে। তাতে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাই করবে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে স্বতন্ত্র এই কাউন্সিল যোগ্য ব্যক্তির নাম রাষ্ট্রপতি বরাবর সুপারিশ করবে। এতে সরকারের আপত্তির কারণ দুর্বোধ্য।
অন্যদিকে অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধান এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ করা হয়। এ অধ্যাদেশ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা হলে অধস্তন আদালত ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের তত্ত্বাবধান এবং নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত সব প্রশাসনিক ও সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবে এই সচিবালয়। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বিচারকাজে নিয়োজিত বিচারকদের পদায়ন, পদোন্নতি, বদলি, শৃঙ্খলা ও ছুটিবিষয়ক সব সিদ্ধান্ত এবং অন্য আনুষঙ্গিক বিষয় এই সচিবালয়ের হাতে থাকবে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রধান বিচারপতির ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং সচিবালয়ের সচিব প্রশাসনিক প্রধান হবেন।
সরকারি দল যে কারণ দেখিয়ে অধ্যাদেশটি বাতিলের প্রস্তাব করেছে, তা ধোপে টেকে না। বলা হয়েছে, এই অধ্যাদেশে গঠিত কাউন্সিলের ফলে প্রধান বিচারপতির পরামর্শ দেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। এ যুক্তি হাস্যকর। কারণ অধ্যাদেশ অনুযায়ী মূল ক্ষমতাই প্রধান বিচারপতির। বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচির নবম দফায় বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের লক্ষ্যে সংবিধানের ৯৫(গ) অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা ও মানদণ্ড-সংবলিত ‘বিচারপতি নিয়োগ আইন’ প্রণয়ন করা হবে। অধ্যাদেশের সঙ্গে বিএনপির সংস্কার প্রস্তাবের তেমন বৈপরীত্য না থাকলেও শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের মতো দলবাজ ক্যাডারদের শুধু অন্ধ আনুগত্যের বিবেচনায় বিচারপতি নিয়োগের পুরোনো বন্দোবস্তে ফেরা কতটা সমীচীন হচ্ছে, তা আরেকবার ভেবে দেখা উচিত।
সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলের ক্ষেত্রেও একই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটেছে। জুলাই সনদে সুপ্রিম কোর্টে স্বাধীন সচিবালয় গঠনের প্রস্তাব দলগুলোর সর্বসম্মতিক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বিএনপি সেখানে কোনো আপত্তি বা নোট অব ডিসেন্টও দেয়নি। মুখে বিএনপি বলছে-জুলাই সনদের যেসব বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট নেই, সেগুলো দাঁড়ি-কমা, সেমিকোলনসহ বাস্তবায়ন করা হবে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলের পথে হেঁটে স্ববিরোধী অবস্থানই তুলে ধরেছে।
বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফায় বলা হয়েছে, ‘অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের কর্তৃত্ব সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত হবে। বিচার বিভাগের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি পৃথক সচিবালয় থাকবে।’ এখন অধ্যাদেশ বাতিলের যুক্তি হিসেবে বলছে, ‘অধ্যাদেশ-অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি নিম্ন আদালতের বিচারকদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের অধিকারী হবেন। সরকারের সঙ্গে কাজের কোনো সমন্বয় থাকবে না। একজন ব্যক্তির একক নিয়ন্ত্রণ বিচারকদের ক্ষতির কারণ হতে পারে।’ অর্থাৎ সরকার চাচ্ছে-অধস্তন আদালত আগের মতোই সরকারের ইশারা-ইঙ্গিতে চালবে। নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকায় বিরোধী দলে থাকাকালে সীমাহীন নিপীড়নের মুখে পড়েছে বিএনপি। মেয়াদান্তে বিএনপি যদি ফের বিরোধী দলে যায়, তখন একই পরিস্থিতির মুখে যে পড়বে না, সে নিশ্চয়তা কীভাবে পাচ্ছে দলটি, তা জানি না। অধ্যাদেশটি বাতিলের মাধ্যমে সরকার বস্তুত জুলাই সনদ, দলীয় অঙ্গীকার ও বিচারাঙ্গনে অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগ-সবকিছুই প্রত্যাখ্যান করে পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরছে, যা দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত।
এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করে পরবর্তী সময়ে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে ১৬টি অধ্যাদেশের বিষয়ে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০২৪ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ সালের রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, গণভোট অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬ সালের গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ এবং তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশে অনুমোদন না দেওয়ায় আমার বিস্ময়ের ঘোর কাটছে না। বহুল আলোচিত গুম প্রতিরোধে প্রথমবারের মতো ২০২৫ সালে অধ্যাদেশ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। গুম থেকে সব ব্যক্তিকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক কনভেনশনের বিধানাবলি বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য এ অধ্যাদেশ করা হয়। এতে গুমকে ‘চলমান অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এর সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয় মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। পরে সংশোধনী এনে বলা হয়, কোনো ব্যক্তি অন্তত পাঁচ বছর ধরে গুম থাকলে ট্রাইব্যুনাল তার সম্পত্তি বৈধ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনযোগ্য ঘোষণা করতে পারবে।
হাসিনার নিষ্ঠুর শাসনে বিএনপি নেতাকর্মীরা সবচেয়ে গুমের শিকার হয়েছেন। জামায়াতসহ অন্যান্য দল ও নির্দলীয় মানুষও আক্রোশের শিকার হয়ে গুম হয়েছেন। ইলিয়াস আলীর গুম ও তাকে হত্যা করে লাশ টুকরো টুকরো করে ধলেশ্বরী নদীতে ফেলার চাঞ্চল্যকর তথ্য দিচ্ছে রিমান্ডে থাকা ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক জেনারেল (অব.) মামুন খালেদ। ঠিক সে সময়ে গুম প্রতিকারের অধ্যাদেশ অনুমোদনে সরকারের অনীহা চরম দুর্ভাগ্যজনকই বটে। যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য আটককে গুম বলা যাবে না’ এবং ‘সরকারের পূর্ব অনুমতি ছাড়া সরকারি ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের তদন্ত করা যাবে না’। এর অর্থ কী দাঁড়াল? শেয়ালের অনুমতি নিয়ে মুরগির খোয়াড়ের দরজা লাগাতে হবে? ঠিক একই ধরনের যুক্তি দেওয়া হতো আওয়ামী লীগের জংগলি শাসনে। গুম করে জাতীয় নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দোহাই দিত।
মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে কমিশনকে স্বপ্রণোদিত হয়ে গুম, সরকারি বাহিনী ও সংস্থার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সদস্যদের নিয়োগ সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে সার্চ কমিটির বিধান করে অন্তর্বর্তী সরকার। সরকার চাইলেই যাতে কমিশন চেয়ারম্যান বা সদস্যদের সরিয়ে দিতে না পারে, সে জন্য সুপ্রিম সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের আদলে বিধান করা হয়েছিল। কিছু অগ্রহণযোগ্য যুক্তি দিয়ে মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করার সুপারিশ করা হয়েছে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, মানবাধিকার সুরক্ষায় জারি করা অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে এমন খোঁড়া যুক্তিও দাঁড় করানো যায়!
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। অথচ দুদকের ক্ষমতা বৃদ্ধি, চেয়ারম্যান-কমিশনার নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠনের অধ্যাদেশও বাতিল হচ্ছে। এই অধ্যাদেশ দুর্নীতি দমন কার্যক্রমকে আরো কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। সরাসরি এজাহার দায়েরের বিধান, বিদেশে সংঘটিত অপরাধসহ গুরুতর আর্থিক অপরাধকে আইনের আওতায় আনা, কমিশনের সদস্য বাড়ানোর বিধানে সমস্যা কোথায়?
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন থেকে ফিরে বিপুল সংবর্ধনা আর অগণন মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। বিশাল জনসমুদ্রে বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি’। তিনি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা, জবাবদিহির শাসন, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, ফ্যামিলি কার্ড, প্রবাসী কার্ড, কৃষি কার্ড, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, কর্মসংস্থান, রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলেছেন। নির্বাচনের আগে সারা দেশ ঘুরে তিনি মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়গুলো ধারণ করে স্বপ্ন দেখিয়েছেন। মানুষ বিশ্বাস করেছে। ভোট দিয়েছে।
দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ইতিহাসে নিজ দলের রেকর্ডসংখ্যক আসন নিয়ে প্রথমবারের মতো সংসদ নেতার আসনে বসেছেন তারেক রহমান। এখন তার দায়িত্ব অনেক বেশি। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ মুখের স্লোগানে সীমাবদ্ধ দেখতে চায় না মানুষ। রাষ্ট্র পরিচালনার সব ক্ষেত্রে এর প্রতিফলন চায়। গণঅভ্যুত্থানে জীবন দেওয়া ছাত্র-জনতার পরিবারগুলো স্বজন হারানোর নিদারুণ যন্ত্রণা নিয়ে তার দিকে চেয়ে আছে। দৃষ্টিশক্তি হারানো, অঙ্গ হারানো হাজারো তরুণ-চোখ ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন দেখতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
আমলাতন্ত্র কিংবা মতলববাজদের ভুল চালে পথ হারালে তা হবে হবে গভীর পরিতাপের। মূল্যটা কিন্তু একাই চুকাতে হবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে। কারো প্ররোচনায় ‘রাবণ’ হলে নন্দিত থেকে নিন্দিত হতে সময় লাগবে না। এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি। সংসদে বাতিলের প্রস্তাব করা অধ্যাদেশগুলো পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ আছে। যেগুলো ঝুলিয়ে দিয়ে ‘অধিকতর শক্তিশালী করে উপস্থাপন’র কথা বলা হয়েছে, সেগুলো নিয়েও ছলচাতুরী করা ঠিক হবে না। সংস্কার ইস্যু সংসদ থেকে রাজপথে ঠেলে দিলে সরকারের স্থিতিশীলতা হুমকিতে পড়ার শঙ্কাই বেশি।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও যুগ্ম সম্পাদক, আমার দেশ