হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

তেহরানের হুলের জ্বালায় যুক্তরাষ্ট্র

সৈয়দ মূসা রেজা

ছোটবেলার ছড়াটা মনে আছে? ‘আমড়া গাছের ঝোপের ভিতর মৌমাছিদের বাসা, মাঝখানে এক প্রকাণ্ড চাক রয়েছে খাসা! তাই না দেখে শিয়াল মশাই মধু খাওয়ার তরে, সেই পথেতে সকাল-বিকাল আনাগোনা করে। রাতের বেলা মৌমাছি সব ঘুমিয়ে আছে জানা, একদিন তাই শিয়াল মামা মৌচাকে দেয় হানা। এই না দেখে মৌমাছি সব বেজায় রকম তেড়ে, উঠলো বলে—রাত দুপুরে ঘরের ভিতর কে রে? চুরি করে মধু খাওয়ার ফলটা দেখাই তবে, এই না ভেবে চোর বেচারার পড়ল ঘাড়ে সবে!’

‘বড়বেলায় এসে’ দেখছি, ঠিক এই শিয়াল মামার দশা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের। গত ফেব্রুয়ারিতে তারা ভেবেছিল ইরান নামের প্রকাণ্ড মৌচাকে হানা দিয়ে মধু সাবাড় করবে, কিন্তু এখন বিষাক্ত হুলের জ্বালায় প্রাণ ওষ্ঠাগত। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আরটি আরো জানিয়েছে, এই ব্যর্থ হামলা এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

ভালদাই ক্লাবের চোখে নতুন মেরূকরণ

রাশিয়ার অত্যন্ত প্রভাবশালী থিংক ট্যাংক ‘ভালদাই ডিসকাশন ক্লাব’-এর প্রোগ্রাম ডিরেক্টর তিমোফে বোরদাচেভ এক সুদীর্ঘ বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, কীভাবে এই সংঘাত প্রতিটি বড় শক্তির কৌশলগত সমীকরণ ওলটপালট করে দিয়েছে। পাঠকদের সুবিধার্থে জানিয়ে রাখা ভালো, ভালদাই ক্লাব কোনো সাধারণ বুদ্ধিজীবী সংগঠন নয়; এটি এমন এক শক্তিশালী নীতিনির্ধারণী ফোরাম, যেখানে খোদ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্রতিবছর উপস্থিত হয়ে বৈশ্বিক রাজনীতির গতিপথ নিয়ে আলোচনা করেন। বোরদাচেভের মতে, এই সংকট রাজনৈতিক সংলাপের এমন এক নতুন জানালা খুলে দিয়েছে, যা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে পুরো আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য মঙ্গলজনক হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য সবসময়ই বিশ্বের অন্যতম অস্থির অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এখানকার শত্রুতা কখনো মরে যায় না, বরং তা সময়ের সঙ্গে নতুন রূপ নেয়। যে রাষ্ট্রগুলো এক বছর চরম শত্রু থাকে, পরের বছরই তারা নিজেদের প্রয়োজনে সাময়িকভাবে কৌশলগত হাত মেলায়। কিন্তু এসব সমঝোতা কখনোই স্থায়ী হয় না, বরং এক সংকটের চক্র থেকে আরেক সংকটে আবর্তিত হতে থাকে। কয়েক দশক ধরে এ অঞ্চলের অস্থিরতাকে ‘নিয়ন্ত্রণযোগ্য’ বলে মনে করা হতো। সংঘাতগুলো রক্তক্ষয়ী হলেও তা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার মতো ছিল না। এমনকি স্নায়ুযুদ্ধের তুঙ্গে থাকা অবস্থায়ও এ অঞ্চলটি বড় শক্তিগুলোর কাছে স্রেফ একটা প্রতিযোগিতার ময়দান ছিল, যেখানে তারা নিজেদের অস্তিত্ব বাজি ধরতে রাজি ছিল না।

কেন এই অস্থিরতা ছিল ‘নিরাপদ’

এই অস্থিরতাকে এতদিন বড় শক্তিগুলো কেন ভয় পায়নি, তার পেছনের ঐতিহাসিক কারণগুলো বিশ্লেষণ করা জরুরি। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্য কখনোই বড় শক্তিগুলোর সরাসরি অস্তিত্বের স্বার্থকে স্পর্শ করেনি। দ্বিতীয়ত, এই অঞ্চলের কোনো রাষ্ট্রের এমন সক্ষমতা ছিল না যে তারা সারা বিশ্বের ওপর কোনো বৈপ্লবিক রাজনৈতিক প্রজেক্ট বা প্রকল্প চাপিয়ে দিতে পারে। ফলে এখানকার ক্ষতগুলো যন্ত্রণাদায়ক হলেও তা শেষ পর্যন্ত সামাল দেওয়া সম্ভব হতো। স্নায়ুযুদ্ধের সময় মস্কো বা ওয়াশিংটন কেউই চাইত না এ অঞ্চলের কারণে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হোক।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরান আক্রমণের তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতিতে। তেহরান যখন এর জবাবে পাল্টা ব্যবস্থা নিল, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচল ব্যাহত করল এবং পারস্য উপসাগরে মার্কিন ঘাঁটিগুলোয় একের পর এক হামলা চালাল, তখন পুরো বিশ্ববাজার যেন থমকে গেল। মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ধস নামল। যার আঁচ শুধু পশ্চিমে নয়, বরং চীন ও তার মতো শক্তিশালী অর্থনীতির দেশেও লাগল। সারা বিশ্বে চরম মন্দার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল, যা এত দিন ভাবা পর্যন্ত অসম্ভব ছিল, তা এখন বাস্তবে প্রমাণিত—একটি আঞ্চলিক সংঘাত এখন পুরো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ভিতকে উপড়ে ফেলার ক্ষমতা রাখে।

সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের ‘মিথ’ ও বাস্তবতা

মার্কিন সামরিক শক্তির সেই তথাকথিত ‘অজেয়’ ইমেজে বড় ধরনের ফাটল ধরিয়ে ভিয়েতনাম, ইরাক আর আফগানিস্তানের করুণ ইতিহাস এখন বড় শক্তিগুলোর টেবিলে নতুন করে আলোচিত হচ্ছে। তিমোফে বোরদাচেভ যে সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলছেন, তার গোড়ায় টান দিতে এই তিনটি যুদ্ধের ব্যর্থতা এখন সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ২০ বছর সেখানে লড়াই চালিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি যুক্তরাষ্ট্রের। ‘দ্য ন্যাশনাল আর্কাইভস’ ও ‘পেন্টাগন পেপারস’-এর তথ্য অনুযায়ী, এই দীর্ঘ যুদ্ধে প্রায় ৫৮,০০০ মার্কিন সৈন্য প্রাণ হারান। কিন্তু ভিয়েতনামের ওপর যে ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছিল, তা ছিল ইতিহাসের অন্যতম বর্বরতম। পরিসংখ্যান বলছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যত বোমা ফেলা হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি বোমা আমেরিকা একাই ফেলেছে ভিয়েতনামে। দক্ষিণ ভিয়েতনামে মাথাপিছু প্রায় ৩৫০ কেজি বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছিল, যা সেই সময়কার হিসেবে বিশ্বের যেকোনো যুদ্ধের তুলনায় সর্বোচ্চ। এত রক্তপাত আর বোমাবর্ষণের পরও ১৯৭৫ সালে সায়গন থেকে মার্কিন হেলিকপ্টারে করে অত্যন্ত অপমানজনকভাবে পালিয়ে আসতে হয়েছিল তাদের।

ভিয়েতনামের সেই ক্ষত শুকানোর আগেই ২০০৩ সালে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ খোঁজার খোঁড়া অজুহাতে ইরাকে ঝাঁপিয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রজেক্টের তথ্যমতে, এই যুদ্ধের ফলে সরাসরি সহিংসতায় প্রায় দুই লাখের বেশি ইরাকি বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারান। ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পাশাপাশি কয়েক হাজার বিলিয়ন ডলার খরচ করে দেশটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও শেষ পর্যন্ত সেখানে কোনো স্থিতিশীলতা আনতে পারেনি ওয়াশিংটন। বরং তাদের এই হঠকারী সিদ্ধান্ত ওই অঞ্চলে চরমপন্থি গোষ্ঠীর উত্থানের পথ প্রশস্ত করেছিল।

তবে মার্কিন সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের কফিনে বড় পেরেকটি ঠুকেছে আফগানিস্তান। ২০০১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ২০ বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র খরচ করেছে প্রায় ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। অথচ ২০২১ সালের আগস্টে বিশ্ববাসী কী দেখল? পেন্টাগনের হিসাব মতে, ২ হাজার ৪০০ মার্কিন সেনা নিহতের পর অত্যন্ত হুড়মুড় করে, রাতের অন্ধকারে বাগরাম এয়ারবেস ফেলে পালিয়ে আসতে হয়েছে তাদের। এমনকি কাবুল বিমানবন্দরে বিমানের চাকা ধরে ঝুলে পড়া আফগানদের সেই করুণ দৃশ্য সারা বিশ্বের সামনে মার্কিন সক্ষমতার কঙ্কালটা বের করে দিয়েছে।

কোনো লক্ষ্য অর্জন না করেই যেভাবে কয়েক হাজার কোটি ডলারের অস্ত্রশস্ত্র তালেবানের হাতে ছেড়ে তারা ভেগে এসেছে, তাকে সামরিক ইতিহাসের অন্যতম বড় ‘পলায়ন’ হিসেবে দেখা হয়।

এই যে ২০ বছরের দীর্ঘ লড়াই, ট্রিলিয়ন ডলারের শ্রাদ্ধ আর শেষবেলায় গ্লানিকর প্রস্থান—এসবই প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকলেও একটি সংবদ্ধ আঞ্চলিক শক্তির সামনে মার্কিন তলোয়ার এখন বারবার ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। ভিয়েতনাম থেকে কাবুল—ইতিহাসের এই প্রতিটি অধ্যায় চিৎকার করে বলছে, মৌচাকে হানা দেওয়া সহজ, কিন্তু হুলের জ্বালা সহ্য করার ক্ষমতা ওয়াশিংটনের আর তেমন অবশিষ্ট নেই।

এবারে ইরানের ওপর হামলার পর সেই পরাশক্তির দম্ভে বড় স্থায়ী ধরনের ফাটল ধরেছে। কিংবা তার কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা শুরু হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলার সরকার পতনের ঘটনায় অনেকে ভেবেছিলেন আমেরিকা এখনো যেকোনো রাষ্ট্রকে ইচ্ছামতো ভেঙেচুরে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সেই প্রেক্ষাপট থেকেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল যে প্রচণ্ড সামরিক চাপে ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাও তাসের ঘরের মতো ধসে পড়বে।

কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল তার ঠিক উল্টো। ইরানের শীর্ষ নেতাদের ওপর হামলা এবং আকাশপথে লাগাতার বোমাবর্ষণের পরও তেহরানের শাসনব্যবস্থা টিকে আছে। সেখানে কোনো গণঅভ্যুত্থান ঘটেনি, তাদের সশস্ত্র বাহিনী ভেঙে পড়েনি এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি কাঠামো অত্যন্ত স্থিতিশীলতার পরিচয় দিয়েছে। ওয়াশিংটন আর তেল আবিব, যা আন্দাজ করেছিল, ইরান তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। এর মানে এই নয় যে ইরান যুদ্ধে জিতে গেছে, তবে এর মাধ্যমে এই পুরোনো বিশ্বাস ধুলোয় মিশে গেছে যে মার্কিন সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব মানেই অমোঘ বিজয়। ইরান প্রমাণ করেছে, প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেও একটি সংবদ্ধ রাষ্ট্রকে কবজা করা অজেয় আমেরিকার জন্য আর সহজ কাজ নয়।

ওয়াশিংটনের ভুল ও সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা

কেন এই হিসাবে এমন গড়বড় হলো? কারণটা স্পষ্ট। শিয়াল যেমন মৌমাছির হুলের শক্তি বুঝতে ভুল করেছিল, ওয়াশিংটনও তেমনি ইরানের জাতীয় সংহতিকে তুচ্ছজ্ঞান করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই যুদ্ধটি ছিল স্রেফ একটি শখের লড়াই বা বেছে নেওয়া সংঘাত, কারণ ইরান কখনোই আমেরিকার টিকে থাকার জন্য কোনো অস্তিত্ববাদী হুমকি ছিল না। ইসরাইল হয়তো ইরানকে কৌশলগত বিপদ মনে করে, কিন্তু মার্কিন আর ইসরাইলি স্বার্থ সবসময় অভিন্ন নয়—তাদের মিত্রতা যত গভীরই হোক না কেন। ওয়াশিংটন অনেক তর্জনগর্জন করলেও কেন তারা শেষ পর্যন্ত চরম সামরিক পদক্ষেপে যাওয়ার সাহস পেল না, তার উত্তর এখানেই লুকিয়ে আছে। আমেরিকা নিজেই জানে তাদের ঝুঁকির সীমাবদ্ধতা কতটুকু।

এই ইরানি অধ্যায় ওয়াশিংটনকে এখন নিজেদের সামর্থ্য আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার মধ্যকার বিশাল ব্যবধান নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। তবে এই আত্মসমালোচনা করা তাদের জন্য সহজ হবে না। কারণ মার্কিন রাজনৈতিক শ্রেণি কয়েক দশক ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখে এমন এক সংকীর্ণ বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে, যেখানে তারা বৈশ্বিক রাজনীতিকে স্রেফ নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পছন্দ আর আদর্শের চশমা দিয়ে দেখে। একই সঙ্গে সারা বিশ্বে তারা এমন এক বিশাল প্রতিশ্রুতির জাল বিছিয়ে রেখেছে, তা বজায় রাখতে গিয়েই তারা বারবার এমন ঝুঁকিপূর্ণ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের এই বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতিগুলো এখন গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বেইজিংয়ের সংশয় ও নতুন কৌশল

অন্যদিকে চীনও এখন বড় ধরনের কৌশলগত চ্যালেঞ্জের মুখে। বেইজিং চেষ্টা করেছিল বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে একটি স্থিতিশীল ও বাস্তবমুখী সম্পর্ক বজায় রাখতে। কিন্তু ইরানের ওপর এই হামলাকে পশ্চিমের বাইরে সবাই আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে, যা চীনের জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে স্বাভাবিক পথচলা কঠিন করে দিয়েছে। বেইজিং এখন বুঝতে পারছে যে মধ্যপ্রাচ্যের মতো দূরবর্তী অঞ্চলেও তাদের বিনিয়োগ আর জ্বালানিনির্ভরতা কতটা নড়বড়ে।

ইরানে চীনা সংস্থাগুলোর যে বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে, এই যুদ্ধের ফলে তা বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ফলে এখন চীনের ভেতর বিতর্ক শুরু হয়েছে যে কীভাবে এই সংকটাপন্ন সামুদ্রিক পথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে কৌশলগত স্বনির্ভরতা অর্জন করা যায়। বেইজিংয়ের জন্য এখন মূল প্রশ্ন হলো—তারা কি বিশ্বায়নের পথে হাঁটবে, নাকি নিজের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করবে? এই যুদ্ধ চীনকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে আমেরিকা যেকোনো সময় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পথ বন্ধ করে দিতে পারে।

মস্কোর অবস্থান ও কৌশলগত লাভ-ক্ষতি

রাশিয়ার জন্য এ সংকটের ফল আরো বহুমাত্রিক। স্বল্প মেয়াদে তেলের দাম বাড়ায় মস্কো অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে এবং বিশ্বের নজর পূর্ব ইউরোপ থেকে কিছুটা সরে গেছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন প্রভাবের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি চায়। অদ্ভুত শোনালেও সত্যি যে, একটি সীমিত এবং নিয়ন্ত্রণে থাকা মার্কিন উপস্থিতি বৈশ্বিক রাজনীতির ভারসাম্যের জন্য জরুরি হতে পারে। কারণ এ অঞ্চলে যদি চরম অরাজকতা তৈরি হয় বা সব কূটনৈতিক কাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়, তবে তা রাশিয়ার স্বার্থের অনুকূল হবে না। মস্কো চায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্ব, যেখানে কোনো একক শক্তির দাপট অন্যকে ধ্বংস করে দেবে না। মধ্যপ্রাচ্যে যদি ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়, তবে উগ্রবাদী শক্তির উত্থান রাশিয়ার দক্ষিণ সীমান্তের জন্য বড় হুমকি হতে পারে।

এক নতুন মেরূকরণের পথে বিশ্ব

এই পুরো সংকটের নির্যাস হলো—স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী যে এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তা এখন চূড়ান্ত পতনের মুখে। আমেরিকা তার সামরিক শক্তি দিয়ে যা অর্জন করতে চেয়েছিল, তার ফল হয়েছে বিপরীত। ইরান কোনো সুপারপাওয়ার নয়, কিন্তু তারা বুঝিয়ে দিয়েছে যে আধুনিক যুগে প্রতিরোধ গড়া সম্ভব। এই প্রতিরোধ শুধু যুদ্ধের ময়দানে নয়, বরং কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ময়দানেও। বড় শক্তিগুলো এখন বুঝতে পারছে যে তারা আর এককভাবে বিশ্বের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারবে না।

সব মিলিয়ে ইরান সংকট এখন বিশ্ব রাজনীতির এক বড় আয়না হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি স্রেফ আরেকটি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নয়, বরং এমন এক মুহূর্ত, যা বড় শক্তিগুলোকে সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনশীল কাঠামো নিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ইরানকে আক্রমণ করা হয়েছিল শক্তি প্রদর্শনের জন্য, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চরম অনিশ্চয়তাকেই বিশ্বের সামনে নগ্ন করে দিয়েছে।

এই পরাজয় এবং বিশৃঙ্খলা হয়তো বড় শক্তিগুলোর মধ্যে একটি নতুন বাস্তবসম্মত এবং সংযত আলোচনার সুযোগ তৈরি করবে। বিশ্বের মাতব্বররা যদি এখন বুঝতে পারেন যে গায়ের জোরে সব হয় না, তবেই হয়তো পৃথিবীর মঙ্গল। আর তা না হলে, সেই শিয়াল মামার মতো বারবার ভুল পথে এসে মৌচাকে হানা দেওয়া আর হুলের জ্বালায় ‘ছাড় নারে ভাই ছাড়’ বলে চিৎকার করাই হবে নিয়তি।

‘হুলের জ্বালায় ঝালাপালা, প্রাণটা রাখা ভার! কাতর হয়ে বলে শিয়াল, ছাড় নারে ভাই ছাড়! পথ ভুলে ভাই এসেছিলাম আমড়া গাছের তলে, তা না হলে হেথায় আসে এমন গাধাও আছে?’ শিয়াল মামা যেমন গাধার মতো ভুল করে মৌচাকে হানা দিয়েছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও কি সেই একই পথে হাঁটবে? উত্তরটা সময়ের হাতে, তবে লক্ষণ যা দেখা যাচ্ছে, তাতে তেহরানের হুলের জ্বালা ওয়াশিংটন সহজে ভুলবে না। হুলের ব্যথা আর অপমানের জ্বালা—দুটোই এখন মার্কিন প্রশাসনের গলার কাঁটা।

লেখক : সাংবাদিক

শিক্ষকের মর্যাদা ও লাঞ্ছিত শৈশব

আধুনিক সমাজ বিনির্মাণে ইসলামি অনুশাসন

ফ্যামিলি কার্ড কীভাবে কার্যকর করা যাবে

বিস্মৃতির অন্তরালে ‘বাংলার বাঘ’

ট্রাম্প এবং শি আসলে কী অর্জন করলেন

ঢাকায় অপরাধপ্রবণতা

রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষা ও মনস্তত্ত্ব

রাষ্ট্রপতির চিকিৎসাবিলাস ও বেহাল স্বাস্থ্য খাত

ফারাক্কার প্রভাবে ব্রিজের নিচে নদী নেই!

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ঝড় ও বাংলাদেশ