একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অস্তিত্বের রক্ষাকবচ এবং সমৃদ্ধির চাবিকাঠি হলো তার দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে এমন কিছু কৌশলগত সিদ্ধান্ত রয়েছে, যেগুলোর গুরুত্ব কোনো নির্দিষ্ট সময়কাল, দলীয় সংকীর্ণতা কিংবা সরকারের শাসনকালের সীমা অতিক্রম করে কালজয়ী ‘রাষ্ট্রীয় দর্শনে’ পরিণত হয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি (Look East Policy) বা ‘লুক ইস্ট’ কৌশল তেমনই একটি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাষ্ট্রীয় দর্শন, যার গভীর ও কাঠামোগত প্রভাব আজও বাংলাদেশের কূটনৈতিক গতিপ্রকৃতিতে সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। অর্ধশতাব্দী আগে স্নায়ুযুদ্ধের চরম উত্তেজনার পটভূমিতে যে কৌশলগত চিন্তার বীজ বপন করা হয়েছিল, বর্তমান সময়ে নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরের মধ্য দিয়ে সেই দর্শনেরই একটি আধুনিক, সময়োপযোগী এবং বাস্তবমুখী প্রতিফলন আমরা দেখতে পাচ্ছি। আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিশীলতা এবং ভূ-অর্থনৈতিক উপযোগিতার নিরিখে এই সফর শুধু একটি কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে এক যুগান্তকারী মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর সাধারণত একটি গভীর প্রতীকী, মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত বার্তা বহন করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তি মালয়েশিয়া এবং বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক মহাপ্রতিবেশী চীনকে বেছে নেওয়া কোনো আকস্মিক ঘটনা বা নিছক ঘটনাচক্র নয়। বরং এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে একমুখী নির্ভরতার বৃত্ত থেকে বের করে এনে একটি সুপরিকল্পিত, বহুমাত্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ দিকে ধাবিত করার সুদূরপ্রসারী ইঙ্গিত। এই সফর স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, ঢাকা তার জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক অক্ষের অন্ধ অনুসারী হবে না, বরং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন (Strategic Autonomy) বজায় রাখবে।
১৯৭৫ সালের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হাল ধরা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গভীর প্রজ্ঞা দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন যে, দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে দেশকে বহুমাত্রিক ও বহুমুখী কূটনৈতিক পরিসরে নিয়ে যেতে হবে। তার কাছে পররাষ্ট্রনীতি কোনো আবেগনির্ভর ভাবাবেগ কিংবা অন্ধ আদর্শিক আনুগত্যের বিষয় ছিল না। তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে দেখেছিলেন জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং কৌশলগত নিরাপত্তার একটি পরম বাস্তববাদী হাতিয়ার হিসেবে। এই বাস্তবতাবোধ থেকে চালিত হয়ে তিনি একদিকে যেমন মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে চিরবিচ্ছেদের অবসান ঘটিয়ে সম্পর্ক জোরদার করেন, অন্যদিকে তেমনি চীন, জাপান এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব বৃদ্ধির ঐতিহাসিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মালয়েশিয়া সফর এবং পরবর্তীকালে আসিয়ান (ASEAN)-ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সুনিপুণ যোগাযোগ বৃদ্ধি ছিল তার সেই বৃহত্তর দূরমুখী কূটনৈতিক কৌশলেরই অংশ। আজ থেকে পাঁচ দশক আগেই তিনি দূরদর্শিতার সঙ্গে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, আটলান্টিক থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ক্রমান্বয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে স্থানান্তরিত হচ্ছে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। তিনি স্পষ্ট বুঝেছিলেন, এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু আনুষ্ঠানিক ও প্রটোকল-সর্বস্ব কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং একে বাণিজ্য ও সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) বৃদ্ধি, বিকল্প শ্রমবাজারের সম্প্রসারণ এবং কারিগরি সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বিস্তৃত করতে হবে। আজ বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বা লাইফলাইন হলো যে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স, তার ভিত্তি মূলত রচিত হয়েছিল রাষ্ট্রপতি জিয়ার সময়কার দূরদর্শী কূটনৈতিক তৎপরতার হাত ধরেই। মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের মর্যাদাপূর্ণ প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল সেই সময়ের ‘লুক ইস্ট’ নীতির সরাসরি ফসল হিসেবে, যা আজ আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে টিকিয়ে রেখেছে।
একইভাবে, গণচীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক নতুন এবং বৈপ্লবিক অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন। ১৯৭৭ সালে তার ঐতিহাসিক চীন সফর ছিল বাংলাদেশের সামগ্রিক পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরের জটিল ও বৈরী আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা মোটেও সহজসাধ্য কাজ ছিল না। কিন্তু জিয়াউর রহমান আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথের নিখুঁত সমীকরণ মেলাতে পেরেছিলেন।
সমকালীন বাংলাদেশে চীন আমাদের বৃহত্তম একক বাণিজ্যিক অংশীদার এবং দেশের মেগা অবকাঠামো উন্নয়নের প্রধান কারিগরি ও আর্থিক সহযোগী। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল (বঙ্গবন্ধু টানেল), পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং বিভিন্ন মহাসড়ক উন্নয়নে চীনের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ল্যান্ডস্কেপকে আমূল বদলে দিয়েছে।
তবে রাষ্ট্রপতি জিয়ার পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে কালজয়ী ও অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল কৌশলগত ভারসাম্য । তিনি কখনোই কোনো একটি নির্দিষ্ট শক্তিকেন্দ্রের ওপর অতিনির্ভরশীলতা বা ‘হেজেমনি’-এর পক্ষে ছিলেন না। তার প্রবর্তিত কূটনৈতিক দর্শন ছিল—সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়; তবে তা হতে হবে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে বাস্তববাদী সম্পর্কের নিরিখে। তিনি ছোট রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে বহুপক্ষীয়তাবাদের ওপর জোর দিয়েছিলেন। এই দর্শনেরই সবচেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্ক (SAARC) প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক উদ্যোগে। এর মাধ্যমে তিনি শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন দিগন্তই উন্মোচন করেননি, বরং বৈশ্বিক মানচিত্রে বাংলাদেশকে একটি নিষ্ক্রিয় গ্রহীতা রাষ্ট্রের কাতার থেকে তুলে এনে একটি উদ্যোগী, দূরদর্শী ও নেতৃত্বদানকারী রাষ্ট্র (Proactive State) হিসেবে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদতের পর, তার দেখানো পথ ধরেই পরবর্তীকালে দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারও একই দূরদর্শী কূটনৈতিক ধারা অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে অনুসরণ করে। বিশেষ করে, ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকার ‘লুক ইস্ট’ নীতিকে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে ঘোষণা করে এবং এর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করে। এ সময়কালে বাংলাদেশ চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক দিক থেকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক দেড় দশকের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইতিহাসে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সবচেয়ে বড় জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে ভারতকে কেন্দ্র করে। ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা ভূরাজনৈতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণেই বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য এবং অনস্বীকার্য। তিন দিক থেকে ভারতবেষ্টিত বাংলাদেশের জন্য সীমান্ত নিরাপত্তা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, কানেকটিভিটি, অববাহিকার অভিন্ন নদীর পানি এবং জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রে ভারতের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু সুসম্পর্ক এবং একপক্ষীয় কৌশলগত নির্ভরতা বা সমর্পণ কখনোই এক বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে পারস্পরিক সমতা ও সার্বভৌম সমতার (Sovereign Equality) নীতি লঙ্ঘিত হলে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বিঘ্নিত হয়। বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে অতিমাত্রায় ‘ভারত-কেন্দ্রিকতা’ এবং জাতীয় স্বার্থের বিনিময়ে একপক্ষীয় ছাড় দেওয়ার নীতি নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশকেও তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তির কোনো অগ্রগতি না হওয়া, সীমান্তে প্রতিনিয়ত নিরপরাধ বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা অব্যাহত থাকা, বিশাল দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৈষম্য দূরীকরণে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব এবং ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা দেশের মানুষের ক্ষোভকে উসকে দিয়েছে। এর ফলে দেশের একটি সিংহভাগ জনগণ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা জোরালোভাবে মনে করেন, বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিসরকে আবার বহুমাত্রিক, গতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ করা রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের স্বার্থেই অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতাকে সংকীর্ণ করে ফেলেছিল, যা থেকে উত্তরণ জরুরি ছিল।
এই জটিল ও সংবেদনশীল ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া এবং চীন সফর বাংলাদেশের রাজনীতি ও কূটনীতিতে এক বিশেষ তাৎপর্য এবং গভীর বার্তা বহন করে। এই সফরগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বার্তা দিচ্ছে, বাংলাদেশ কোনো একক দেশ বা নির্দিষ্ট আঞ্চলিক ব্লকের ভূরাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে নিজেকে বন্দি রাখতে চায় না। ঢাকা তার কৌশলগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করতে বদ্ধপরিকর।
মালয়েশিয়া সফরের আলোচ্যসূচি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি সম্পূর্ণরূপে ‘অর্থনৈতিক কূটনীতি’র আধুনিক রূপ। দেশের ফ্রিজিং শ্রমবাজারকে আবার সচল করা, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীদের আইনি বৈধতা নিশ্চিতকরণ, উচ্চ প্রযুক্তির সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে (Semiconductor Industry) যৌথ সহযোগিতা, বিলিয়ন ডলারের হালাল অর্থনীতির (Halal Economy) বাজার ধরা এবং শিক্ষা ও পর্যটন খাতের সম্প্রসারণ—সবকিছুই দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে চাঙা করার যুগোপযোগী প্রয়াস। বিশ্ব অর্থনীতি আজ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের (4IR) হাত ধরে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, মাইক্রোচিপ ও সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন এবং প্রযুক্তিভিত্তিক হেভি-ম্যানুফ্যাকচারিংই হলো ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। মালয়েশিয়া বর্তমানে গ্লোবাল সেমিকন্ডাক্টর চেইনের অন্যতম প্রধান হাব বা কেন্দ্র। ফলে দেশটির সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গভীর করা বাংলাদেশের নিজস্ব শিল্প রূপান্তর ও মেধা পাচার রোধের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ভূ-অর্থনৈতিক ও কৌশলগত রূপান্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত। উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের জীবনরেখাখ্যাত তিস্তা মহাপরিকল্পনা (Teesta Mega Plan) বাস্তবায়ন, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, উন্নত প্রযুক্তি হস্তান্তর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) খাতে যৌথ গবেষণা, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা শিল্প পার্ক প্রতিষ্ঠা এবং সরাসরি চীনা বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণ—সব মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক কাঠামোগত পরিবর্তনের এক মহাসুযোগ এনে দিয়েছে। তবে এই সফরের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো ক্ষমতার ভারসাম্য। মালয়েশিয়া ও চীন সফর একই সঙ্গে মুসলিম বিশ্ব, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে যে, বাংলাদেশ তার স্বকীয়তা নিয়ে বৈশ্বিক মণ্ডলে আবির্ভূত হচ্ছে।
সমকালীন বিশ্বব্যবস্থায় এবং বহুমেরুকেন্দ্রিক (Multipolar) আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সফল ও উদীয়মান রাষ্ট্রগুলো কখনোই কোনো একক পরাশক্তি বা আঞ্চলিক শক্তির ওপর নিজেদের ভাগ্য সমর্পণ করে না। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক বাঘ যেমন—ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়া—তাদের কূটনীতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তারা একই সঙ্গে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং প্রতিবেশী আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে সুসম্পর্ক ও ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে। তারা ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বে কোনো পক্ষ না নিয়ে নিজেদের জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থকে (National Economic Interest) সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। এই তাত্ত্বিক কৌশলকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় ‘হেজিং’ (Hedging) বলা হয়। বাংলাদেশের জন্যও এই মুহূর্তে সবচেয়ে কার্যকর, নিরাপদ ও টেকসই পথ হলো সেই বহুমাত্রিক এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বা ‘হেজিং স্ট্র্যাটেজি’। কারণ ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশ অত্যন্ত কৌশলগতভাবে দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে (Crossroads) অবস্থিত। বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধির এই নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশ যদি নিজের মেরুদণ্ড সোজা রেখে দূরদর্শী কূটনীতি পরিচালনা করতে পারে, তবে এ অঞ্চলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, কানেকটিভিটি এবং সমুদ্র অর্থনীতির (Blue Economy) অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার বিপুল সম্ভাবনা আমাদের রয়েছে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বহু বছর আগেই বাংলাদেশের এই ভৌগোলিক ও কৌশলগত অমিত সম্ভাবনা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তিনি ‘পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি’র মজবুত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। আজ প্রায় পাঁচ দশক পরে, বিশ্ব রাজনীতি যখন এক নতুন শীতল যুদ্ধ এবং বহুমেরুকেন্দ্রিকতার দিকে ধাবিত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্য সেই জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত কৌশল নতুন আঙ্গিকে এবং আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর সেই ঐতিহাসিক বাস্তবতারই এক আধুনিক ও গতিশীল রূপ। এই নীতি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক দিগন্তকে সম্প্রসারিত করার সার্বভৌম প্রয়াস। জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষা, টেকসই অর্থনৈতিক মুক্তি এবং ভূরাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নে এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘পূর্বমুখী কূটনীতির উত্তরাধিকার’কে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুনভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও উজ্জীবিত করার এক সাহসী এবং সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ। পররাষ্ট্রনীতির চূড়ান্ত সাফল্য ও সার্থকতা নির্ভর করে একটি রাষ্ট্র কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিজের সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে এর ওপর। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উন্নত প্রযুক্তি, অবাধ বাণিজ্য, কৌশলগত নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে সেই জাতীয় স্বার্থের অবিচল বাস্তবায়ন। বাংলাদেশের পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতির উত্তরাধিকার আমাদের আজ সেই পরম শিক্ষাই দেয়—এটি শুধু অতীতের কোনো গৌরবময় স্মৃতি নয়, বরং এটি আমাদের অনাগত ভবিষ্যতের এক অবিকল্প পথনির্দেশনা। আর বর্তমান সময়ের বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় সেই পথনির্দেশনা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি অর্থবহ এবং অনিবার্য।
লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়