বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য গণতন্ত্রের অবাধ চর্চা ও সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করার পথ উন্মুক্ত করা হলেও গণতন্ত্রের এই যাত্রা বরাবরই ব্যাহত হয়েছে। গণতন্ত্র বারবার বাধাগ্রস্ত হওয়ার পেছনে যে কেবল এ দেশের ইতিহাসের বেশ কয়েকটি স্বৈরাচারী শাসনকাল দায়ী তা নয়, গণতান্ত্রিক দলগুলোর আচরণও এখানে বড় একটি ভূমিকা পালন করেছে। কোনো দেশে কার্যকরভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কাজ করতে হলে সরকারি ও বিরোধী দল উভয়কেই শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হয়। এই ক্ষেত্রে সরকারি দলকে যেমন বিরোধী দলগুলোর কার্যক্রমের জন্য স্বাধীন ও মুক্ত পরিবেশ, সেইসঙ্গে মতপ্রকাশ ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হয়, তেমনি বিরোধী দলগুলোকেও সংসদে ও সংসদের বাইরে সরকারের নীতি ও কার্যক্রমগুলোর গঠনমূলক সমালোচনা জারি রাখতে হয়। অথচ দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম কেবল ক্ষমতাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। কোনো দল ক্ষমতায় যেতে পারলে ক্ষমতার পথ কণ্টকমুক্ত রাখার জন্য বিরোধী দলগুলোর ওপর দমন-নিপীড়ন চালিয়েছে এবং ক্ষমতা ধরে রাখার বিভিন্ন রকমের কারসাজি ও টালবাহানা করেছে। আর বিরোধী দলে গেলে রাজনৈতিক দলগুলোর রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রথমেই কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করা, এরপর বিভিন্ন ছুতায় সংসদ বর্জন এবং সরকার পতনের জন্য রাস্তায় সহিংস আন্দোলন পরিচালনা করা। এটা এমন এক দুষ্টচক্র, যার ফলে সময় যত গিয়েছে সরকারি দলের ক্ষমতা ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা ও কূটচালও শক্তিশালী হয়েছে, তেমনি বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনও আরো বেশি সহিংস হয়েছে। এরই একটি নজির হচ্ছে আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসন। ‘ডিপ স্টেট’ এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির সাহায্যে ২০০৮ সালের নির্বাচনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল এবং প্রহসনমূলক বিচার কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে জামায়াত নেতাদের ফাঁসি দেওয়ার মাধ্যমে বিরোধী দলগুলোকে নিশ্চিহ্ন করা এবং দেশের স্বার্থ এমনকি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপস করে প্রতিবেশী একটি দেশের একচ্ছত্র সমর্থনে আওয়ামী লীগ এত বছর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে। হাসিনার এই শাসনকাল বাংলাদেশে তো বটেই এই উপমহাদেশেও সবচেয়ে দীর্ঘ স্বৈরশাসনকাল এবং এর অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, গণতান্ত্রিক শাসনকে গণতন্ত্রের মোড়কে রেখেই স্বৈরশাসনে পরিণত করা। জুলাই বিপ্লব যে কেবল হাসিনার এই স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ছিল তা নয়, বরং ভবিষ্যতে যেন এই ধরনের স্বৈরশাসনের উত্থান আর কখনো না হতে পারে, সেটা নিশ্চিত করাও জুলাই বিপ্লবের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল। জনগণ সরকারি দল ও বিরোধী দলের একঘেয়ে ও অর্থহীন দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সেই পুরোনো রাজনৈতিক রেওয়াজ আর দেখতে চায় না। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা জারি রাখার জন্য বিরোধী দলগুলোর শক্তিশালী ভূমিকা রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। বিরোধী দল যদি সংসদে সরকারের নীতি ও কার্যক্রমের গঠনমূলক সমালোচনা করতে পারে এবং সরকারকে যথাযথ জবাবদিহিতার মধ্যে রাখতে পারে, তাহলে সরকারও পরবর্তী মেয়াদে জনগণের সমর্থন ধরে রাখতে বাধ্য হবে এবং সব সমালোচনাকে আমলে নিয়ে দেশ পরিচালনায় সুষ্ঠু নীতি অবলম্বন করবে। ছায়া মন্ত্রিসভা হতে পারে বিরোধী দলের এ ধরনের শক্তিশালী ভূমিকাকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের সর্বোত্তম উপায়।
ছায়া মন্ত্রিসভা ছায়া মন্ত্রিসভা হলো সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি দল, যারা সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের সমান্তরালে দায়িত্ব পালন করে সরকারের নীতিমালা ও কার্যক্রমের পর্যবেক্ষণ, সমালোচনা এবং বিকল্প নীতি উপস্থাপন করে। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, আয়ারল্যান্ড, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণা বিভিন্ন নামে ও রূপে কার্যকর রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ ব্রিটেনের কথা ধরা যাক। সেখানে সবচেয়ে বেশি আসন লাভ করা বিরোধী দল প্রধান বিরোধী দল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা জ্যেষ্ঠ এমপি এবং লর্ডদের নিয়ে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেন। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে ছায়া মন্ত্রণালয়ের সদস্যরা পার্টি দ্বারা নির্বাচিত অথবা প্রধান বিরোধীদলীয় নেতার পছন্দানুসারে উভয় নিয়মেই বাছাই হতে পারে। যুক্তরাজ্যে যেখানে রাজনীতিতে লেবার এবং কনজারভেটিভ এই দুই দলের প্রাধান্য থাকার কারণে ছায়া মন্ত্রিসভা সাধারণত প্রধান বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়েই গঠিত হয়, সেখানে অস্ট্রেলিয়ায় অনেক সময় ছায়া মন্ত্রণালয়ের সদস্যরা বিরোধী জোটভুক্ত একাধিক বিরোধী দল থেকেও বাছাইকৃত হতে পারে। আবার কানাডায় ছায়া মন্ত্রিসভা তুলনামূলকভাবে অনেক কম কাঠামোবদ্ধ। সেখানে ছায়া মন্ত্রীর (shadow minister) বদলে ‘সমালোচক’ (critic) পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয়। এছাড়া মালয়েশিয়ায়ও ছায়া মন্ত্রিসভার চর্চা শুরু হয়েছে বেশি দিন হয়নি। তবে ছায়া মন্ত্রিসভা এখনো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়নি; কেবল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়ে গেছে। এখানে বিরোধী দলগুলো নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একাধিক দল থেকে ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্য বাছাই করে। একই বিষয় জাপানের ক্ষেত্রেও দেখা যায়।
উপরোক্ত উদাহরণ থেকে প্রতীয়মান হয়, বিশ্বের যেসব রাষ্ট্রে ছায়া মন্ত্রিসভা কার্যকর রয়েছে, সেগুলোয় ছায়া মন্ত্রণালয়ের গঠন একই রকম না হলেও বিশ্বের সব ছায়া মন্ত্রণালয়ের কিছু অভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও কার্যক্রম রয়েছে। প্রথমত, ছায়া মন্ত্রণালয়ের সদস্যরা বিরোধীদলীয় নেতার পছন্দ বা দলের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রধান বিরোধী দল থেকেই বাছাইকৃত হন। আর যদি একাধিক বিরোধী দলের জোট থাকে, সে ক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলো আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একাধিক দল থেকেও ছায়া মন্ত্রী নিয়োগ দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, ছায়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি সদস্য সরকারের কোনো না কোনো মন্ত্রণালয়ের সমান্তরালে দায়িত্ব পালন করেন, অর্থাৎ সরকারের সেই মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম ও নীতির দিকে দৃষ্টিনিবদ্ধ করেন এবং সেগুলোর সমালোচনা ও বিকল্প পেশ করেন। তবে এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে, বিশ্বের অনেক দেশে ছায়া মন্ত্রিসভাকে অপেক্ষমাণ সরকার (Government-in-waiting) অথবা পরবর্তী সরকার (next cabinet) হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। এ থেকে একটি বিষয় সুস্পষ্ট যে, ছায়া মন্ত্রণালয়ের একটি কার্যকারিতা এটাও যে, সরকার যদি পরিবর্তিত হয়, তাহলে যেন নতুন সরকারের মন্ত্রী নির্ধারণে বেগ পেতে না হয়। আগের মেয়াদে সরকারের নীতির পর্যালোচনা ও বিকল্প পেশ করতে করতে ছায়া মন্ত্রিসভা ইতোমধ্যে নতুন সরকার পরিচালনায় প্রস্তুত হয়ে থাকে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আবার গণতান্ত্রিক পর্যায়ে উত্তরণ করেছে। ১১-দলীয় বিরোধী জোটের অন্তর্ভুক্ত বৃহত্তম দল জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যতম জোটসঙ্গী এনসিপি ইতোমধ্যে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করার ঘোষণা দিয়েছে। আর সরকারে থাকা বিএনপিও এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে প্রতিটি দল আলাদা আলাদা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করবে, নাকি জোটবদ্ধভাবে একক ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করবে, তা এখনো সুস্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, এই ছায়া মন্ত্রিসভাকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়া ছাড়াই যাত্রা শুরু করতে হবে। সাংবিধানিকভাবে না হলেও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ছায়া মন্ত্রিসভা বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য যুগান্তকারী একটি ব্যাপার। এর ফলে বাংলাদেশের সংসদ আরো প্রাণবন্ত ও কার্যকর হয়ে উঠবে। সংসদের বাইরে অপ্রয়োজনীয় সংঘাতে না গিয়ে বিরোধী দলগুলো সরকারের নীতির সুচারুভাবে পর্যালোচনা ও সমালোচনা এবং বিকল্প তুলে ধরতে সক্ষম হবে। এর ফলে সরকারি দল নিজেও আরো সচেতনভাবে ও সতর্কতার সঙ্গে দেশ পরিচালনায় উদ্বুদ্ধ হবে।
বিরোধী দলগুলোর উচিত হবে, ছায়া মন্ত্রিসভাকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য সংসদ ও সংসদের বাইরে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে জনসচেতনতা তৈরি করে দাবি উত্থাপন করা। একই সঙ্গে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে আলাদা আলাদা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন না করে বিরোধী দলগুলোর একক ছায়া মন্ত্রিসভাই গঠন করা উচিত। এতে যেমন বিরোধী দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা বজায় থাকবে, তেমনি বৃহত্তর পরিসরে জাতীয় ঐক্য ও সৌহার্দ্যও বজায় থাকবে। এছাড়া দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে ক্ষমতায় আসীন হওয়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটকে সংযত রাখতেও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা প্রয়োজন, একক ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন যার জন্য সহায়ক হবে। বাংলাদেশে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’র ধারণাকে যদি যথাযথভাবে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও কার্যকর করা যায়, তাহলে জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে জাতি নতুনভাবে গণতন্ত্রের দিকে যে যাত্রা শুরু করেছিল, তা এক নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকে পৌঁছাবে।
লেখক : এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, CAST