আগের এক লেখায় উল্লেখ করেছিলাম তারেক রহমান সরকারের সকালটা আলোকোজ্জ্বল ও আশাজাগানিয়া। ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি নানা ইতিবাচক পদক্ষেপের মাধ্যমে জনমনে আশার সঞ্চার করেছেন। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়নে উদ্যোগী হওয়া ছাড়াও সরকারপ্রধানের দৈনন্দিন কাজ ও জীবনাচারে কিছু গুণগত পরিবর্তন আনার বার্তা দিয়েছেন।
দায়িত্ব নিয়েই মাত্র দুই মাসের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সম্মানী প্রদান, ক্রীড়াবিদদের কার্ড ও ভাতা প্রদান, কৃষক কার্ড বিতরণ, খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পরীক্ষামূলকভাবে সূচনা করেছেন। যদিও পূর্ণাঙ্গভাবে এসব সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন সময় ও বিপুল ব্যয়সাপেক্ষ। ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে জনতুষ্টিমূলক এসব কর্মসূচির প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান বেশ চ্যালেঞ্জিং। সে চ্যালেঞ্জ তিনি গ্রহণ করেছেন। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, দলের এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, প্রধানমন্ত্রী হয়েও প্রটোকল না নিয়ে ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলা, নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিত হওয়া, নিজের কার্যালয়ের পরিবর্তে তদারকি ও কাজের সুবিধার্থে সচিবালয়ে অফিস করা, যানজট ও জ্বালানি অপচয়ের কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরের সংখ্যা ১৪ থেকে কমিয়ে চারটিতে আনা, ঢাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
ই-হেলথ কার্ড বিতরণের প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন। পরিবারের দুই শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস দেওয়ার ঘোষণা এসেছে। জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট ও বৈশ্বিক বাজারে দাম বৃদ্ধির পরও দেশের বাজারে দাম বাড়ানো হয়নি। এসবই নতুন সরকারের দুই মাসে সাফল্যের মুকুটে পালক হিসেবে যুক্ত হয়েছে।
বিপরীতে কিছু নেতিবাচক ঘটনা সরকারের অর্জনগুলোকে অনেকটা ম্লান করেছে। জ্বালানির মূল্য না বাড়িয়ে সরকার যেটুকু প্রশংসা কুড়িয়েছে, সরবরাহ সংকট ও অব্যবস্থাপনায় সীমাহীন ভোগান্তি তার চেয়ে বেশি ক্ষোভ-নিন্দার মুখে ফেলেছে। সংস্কার ইস্যুতে বিচ্যুতি জবাবদিহি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের নির্বাচনপূর্ব অঙ্গীকার এবং সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। অর্থনৈতিক সংস্কারে বিপথগামিতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চাপের মুখে ফেলেছে। আইএমএফ জুনের নির্ধারিত ঋণকিস্তি বাতিল করে সরকারকে কড়া বার্তা দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের অনেকগুলো অধ্যাদেশ সংসদে পাস না করায় রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল সংস্কার-প্রত্যাশী মানুষের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি করেছে। ব্যাংক খাতের অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তরের সময় বিতর্কিত সংশোধনীর মাধ্যমে লুটেরাদের ফেরার ব্যবস্থা সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
এরই মধ্যে প্রশাসনসহ নানা খাতে সমন্বয়হীনতা প্রকট হয়ে উঠেছে। জনপ্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন ও পদায়নের ক্ষেত্রে যোগ্যতা বা দক্ষতার পরিবর্তে অন্ধ দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। প্রশাসনে দ্বন্দ্ব এবং উপদেষ্টা-মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রচেষ্টার বিপরীতে গিয়ে বেয়াড়া ও উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি-দখলবাজির কারণেও সরকারের ইমেজ ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। সহনশীল রাজনীতির যে বার্তা তারেক রহমান দিয়েছেন, তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক অনেক পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে। ফেসবুক পোস্টে সমালোচনার কারণে নারী গ্রেপ্তার হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কটূক্তি করায় একসময়ের জোটসঙ্গী জাগপা নেতা রাশেদ প্রধানের বাসার সামনে শক্তির মহড়া দেওয়া হয়েছে। যদিও রাশেদ প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে যে শব্দচয়ন করেছেন, তা রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত ও নিন্দনীয়। বিএনপি নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে তারচেয়েও জঘন্য শব্দ ব্যবহার করে এবং রাশেদ প্রধানের ব্যঙ্গাত্মক ছবি ছড়িয়ে জবাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাড়িতে গিয়ে ইটপাটকেল ও জুতা নিক্ষেপ আওয়ামী স্টাইলের বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেছে। প্রায় একই সময় ছাত্রমৈত্রীর প্রধান আরও বাজে শব্দ ব্যবহার করে তারেক রহমানের সমালোচনা করলেও সে ব্যাপারে বিএনপি নেতাকর্মীদের প্রতিক্রিয়াহীন থাকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আপত্তিকর পোস্ট ও গুজব ছড়ানোর অভিযোগে ডিবি কর্তৃক কন্টেন্ট ক্রিয়েটর হাসান নাসিমকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ। পতিত ফ্যাসিবাদীদের আমলে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মী ও ভিন্নমতের সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্টদের এভাবেই তুলে নিয়ে যাওয়া হতো। আবারও এসব ঘটনা সে প্রবণতার পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখছে মানুষ।
এদিকে নানা ধরনের সংকট মানুষকে ভোগাচ্ছে। এসব সমাধানে প্রত্যাশা অনুযায়ী পদক্ষেপ দেখছে না ভুক্তভোগী মানুষ। দেশের ইতিহাসে এ মুহূর্তে সর্বোচ্চ পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে বলে দাবি করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম। গত শুক্রবার চট্টগ্রামে তিনি যখন এ বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন রাজধানীসহ সারা দেশের ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষারত যানবাহন মালিক-চালকদের ক্ষোভ বিস্ফোরিত হচ্ছিল। টিভি বুমের সামনে তারা ক্ষোভ ঝাড়ছিলেন, প্রকাশ করছিলেন কষ্টগাথা। অনেকে সরকারের তীব্র সমালোচনা করছিলেন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে তেল নিতে হচ্ছে গাড়িগুলোকে। সেখানেও চাহিদার পুরোটুকু পাওয়া যাচ্ছে না। দূরপাল্লার বাস ও গণপরিবহনে জ্বালানি সরবরাহে রেশনিং ব্যবস্থা সরকার অনেক আগেই তুলে দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই।
রাজধানীর বিভিন্ন বাস কাউন্টার ও টার্মিনাল ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে সংবাদকর্মীরা মিডিয়ায় যে চিত্র তুলে ধরছেন, তাতে চরম ভোগান্তিই ফুটে উঠছে। আগে এক ফিলিং স্টেশন থেকেই পর্যাপ্ত তেল সংগ্রহ করতে পারত প্রতিটি পরিবহন। এখন পাঁচ থেকে ছয়টি পাম্প ঘুরে তা নিতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত সময় নষ্ট হওয়ায় বিলম্বে গাড়ি ছাড়তে হচ্ছে। কোম্পানিগুলো এ অবস্থায় ট্রিপ বা যাত্রাসংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে। অধিকাংশ পেট্রোল পাম্পেই জ্বালানি তেলের সংকট চলছে। কোথাও তেল নেই, আবার কোথাও সীমিত পরিমাণে সরবরাহ থাকায় বাস, মাইক্রোবাস, কাভার্ডভ্যান, প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের যানবাহনের ভিড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও অনেকেই তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। ফলে ক্ষোভে ফুঁসছেন ভুক্তভোগীরা।
এক হিসাবে দেশে রাইড শেয়ারিং খাতে জড়িত অন্তত ১০ লাখ মানুষ। ১০ লাখ মানুষ মানে ১০ লাখ পরিবার। পাঠাও এবং উবার মিলিয়ে এই বিশাল তরুণ সমাজের বড় অংশই এখন জ্বালানি সংকটের ভুক্তভোগী। লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতেই তাদের অর্ধেকের বেশি সময় নষ্ট হয়ে যায়। ফলে উপার্জনও আগের চেয়ে কমে গেছে। নানা ধরনের কার্ডের আওতায় সরকার যে ভাতা দিচ্ছে, তা দিয়ে কি এ ক্ষতি পোষানো বা ক্ষোভ প্রশমন করা যাবে?
এদিকে গ্রীষ্মের দাবদাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশে লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রাজধানীর তুলনায় দেশের মফস্বল ও গ্রামগুলোতে বিদ্যুতের হাহাকার সবচেয়ে বেশি। কোথাও কোথাও দিনে ও রাতে মিলিয়ে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না বলে খবর পাওয়া গেছে। ঢাকার কাছে সাভারের এক বাসিন্দা জানান, কতক্ষণ লোডশেডিং হয়, তা জানতে না চেয়ে বরং জানুন দিনে-রাতে কতক্ষণ বিদ্যুৎ থাকে। ২৪ ঘণ্টায় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টার বেশি বিদ্যুতের দেখা পান না বলে জানান ঢাকার উপকণ্ঠে বসবাসকারী এক গৃহবধূ। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ বা পিজিসিবি এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের গত কয়েক দিনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে সারা দেশে রেকর্ডেড লোডশেডিং প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট। জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটির কারণে সামনের দিনগুলোতে এ পরিস্থিতি আরো অবনতির শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অস্বস্তি দেখা দিয়েছে বাজারেও। জ্বালানি সংকটে বেড়েছে পরিবহন ব্যয়। যার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরো বেড়েছে। সংকট সবচেয়ে বেশি চেপে ধরেছে চাকার ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবনে। অর্থাৎ, পরিবহন-সংশ্লিষ্টদের। আর তার প্রভাব পড়ছে ভোক্তাদের ওপর। খুচরা বাজারে বেশ কিছুদিন ধরে সোনালি মুরগি, সয়াবিন তেল ও সুগন্ধি চালের দাম বাড়তি। এসব পণ্যের সরবরাহ-সংকটও রয়েছে। এর সঙ্গে নতুন করে কয়েক ধরনের সবজি ও ফার্মের মুরগির ডিমের দাম বেড়েছে। খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, সরবরাহ-সংকটের কারণ দেখিয়ে গত এক-দুই মাসে ধাপে ধাপে এসব পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত ব্যবসায়ীরা। কাছাকাছি সময়ে অনেকগুলো পণ্যের দাম বাড়ায় খরচ নিয়ে চাপে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। তিন-চারদিনের ব্যবধানে বাজারে ফার্মের মুরগির ডিমের দাম ডজনে ১০ টাকা বেড়েছে।
জ্বালানি সংকটের আরেক শিকার কৃষক। এর মধ্যে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন বোরো ধান চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত কৃষকরা। তারা বলছেন, ডিজেলের এমন সংকট দ্রুত নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে চলতি মৌসুমে কৃষি উৎপাদনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বছরের এ সময় কৃষকদের জমিতে সেচ দেওয়া, উৎপাদিত ধান কাটা ও ফসল পরিবহনের জন্য ডিজেলের ওপর নির্ভর করতে হয়। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে মুন্সীগঞ্জের এক ফিলিং স্টেশনের মালিক আনোয়ার হোসেনকে উদ্ধৃত করে জানানো হয়, চাহিদা মেটাতে বছরের এ সময় প্রতিদিন ১৬-২০ হাজার লিটার ডিজেলের দরকার হয় তাদের। সেখানে দু-তিনদিন পর মাত্র সাড়ে চার হাজার লিটার ডিজেল বরাদ্দ পাচ্ছেন তারা, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। এতে করে কৃষক চাহিদা অনুসারে তেল পাচ্ছেন না। ফলে সেচের অভাবে ধান গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে, কৃষক হাহাকার করছেন।
এই যে বহুমুখী সংকট সরকারকে ঘিরে ধরেছে, তার মূলে রয়েছে ইসরাইল-মার্কিন আগ্রাসনে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাবে দেশে দেশে অর্থনীতি, আমদানি-রপ্তানি, বাজার ব্যবস্থা ভয়াবহ সংকটকাল অতিক্রম করছে। এ সংকটের দায় সরকারের ওপর কমই বর্তায়। কিন্তু সেটা সরকার জনসাধারণের সামনে খোলাসা করার পরিবর্তে লুকোচাপা করলে দায় এড়ানোর সুযোগ কমে যায়। সংকটের শুরু থেকে জ্বালানি তেল নিয়ে সরকার আশ্বস্ত করে আসছে, পর্যাপ্ত মজুত আছে বলে। কিন্তু সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার মজুত ধরে না রেখে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ কেন বাড়াচ্ছে না? পেট্রোল-অকটেনের মজুত নিয়ে বসে থেকে রাস্তায় মানুষকে ভোগানোর মধ্যে সরকারের অর্জন কী? বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ না করে লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে ডুবিয়ে দেওয়ার হেতু কী? কৃষক ডিজেল না পেলে, তার বোরো ধান পানির অভাবে খরতাপে ঝলসে গেলে সরকারের দাবিকৃত ‘পর্যাপ্ত মজুত’ দিয়ে কী হবে? সে মজুত কার জন্য? নাকি দাবি ও বাস্তবতায় শুভঙ্করের ফাঁক আছে?
একটি সংঘবদ্ধ আওয়ামী ল্যাসপেনসার-চক্র কিছুদিন ধরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ভিলেন বানানোর মিশনে নেমেছে। পরিকল্পনামাফিক তারা টকশো, কনটেন্ট ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ড. ইউনূস শাসনামলকে ‘জগতের নিকৃষ্ট শাসন’ হিসেবে তুলে ধরার অপচেষ্টায় লিপ্ত। সরকার এ ক্ষেত্রে শুধু নির্বিকারই নয়, সরকারঘনিষ্ঠ অনেকে তাদের সঙ্গে মাখামাখি করে প্রকারান্তরে ‘ইউনূস বধ’ মিশনে সায় দিচ্ছেন। ইউনূস শাসনকে ভিলিফাই করে তারা আওয়ামী খুনি-লুটেরাদের বিরুদ্ধে গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে। জুলাই গণহত্যা ও পনের বছরের লুট-নিপীড়নের শাসনকে নরমালাইজ করাই তাদের লক্ষ্য। ভারতের চোখে চোখ রেখে দেশ শাসন করাও ড. ইউনূসের অন্যতম অপরাধ! বাধা-বিপত্তি ডিঙিয়ে শেখ হাসিনা ও তার সাঙ্গপাঙ্গকে বিচারের মুখোমুখি করতে পারায় তার প্রতি এত আক্রোশ! দিল্লি ও আওয়ামী লীগের পৃষ্ঠপোষকতায় অন্তর্বর্তী সরকারকে তারা কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চায়। দেড় দশকের সুবিধাভোগী ও চিহ্নিত আওয়ামী দোসররা অপ্রাসঙ্গিকভাবে ড. ইউনূসের পিন্ডি চটকাচ্ছেন। যে আনু মুহাম্মদ একবারের জন্যও শেখ হাসিনা বা তার সরকারের খুনি-লুটেরাদের বিচার চাননি, তিনি এখন ড. ইউনূস সরকারের বিচারের দাবি তুলছেন। এরাই সময়ের ব্যবধানে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে ফেরানোর মিশনে তারেক রহমানের সরকারের বিরুদ্ধে আদা-জল খেয়ে নামবে—তা নিশ্চিত করে বলতে পারি।
সংকটকালে সরকার দিন দিন বন্ধুহীন হয়ে যাচ্ছে কি-না, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে। বিএনপি ঘরানার হিসেবে পরিচিত বুদ্ধিজীবী, লেখক, কলামিস্ট, টকশো ব্যক্তিত্বদের মধ্যে অনেকেই এখন ভিন্ন সুরে কথা বলছেন বা বলতে বাধ্য হচ্ছেন। তারা বিএনপিকে ওউন করে কথা বলতে দ্বিধা করছেন। ক্ষমতার দুই মাস না যেতেই ড. মাহবুব উল্লাহর মতো মানুষকে কেন সরকারের সমালোচনায় মুখর হতে হচ্ছে! একই কাতারে আরো অনেকেই রয়েছেন। এত দ্রুত বন্ধুহীন হতে শুরু করলে পাঁচ বছর কীভাবে সরকার চালাবে দলটি? বিএনপির বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ পুরোনো। এ দলটি সত্যিকারের বন্ধু আর শত্রু পরখ করতে পারে না। অনুকূল সময়ে মতলববাজ, ধান্ধাবাজদের খপ্পরে পড়ে। সরকারে থাকলে ‘বিশেষ চক্রবন্দি’ হয়ে পড়ে। দুঃসময়ের সতীর্থ, শুভাকাঙ্ক্ষী ও ত্যাগীদের দূরে ঠেলে দেয়। অতঃপর পরিণাম যা হওয়ার, তা-ই হয়।
বিএনপির রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী ও দলটির প্রতি সহানুভূতিশীল বিশিষ্ট নাগরিক এবং পেশাজীবীদের অনেকের কণ্ঠে ইতোমধ্যে হতাশার সুর বেজে উঠেছে। দলটির থিংক ট্যাংক গ্রুপের সদস্য এবং টকশো ও লেখালেখি করে বিএনপির পক্ষে নিরন্তর লড়াই করা অনেকেই এখন অচ্যুত। তাদের নানা ট্যাগিং-ফ্রেমিং করে দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। নব্য জাতীয়তাবাদীদের দাপট ও কনুইয়ের গুঁতোয় তাদের অনেকে নিজ থেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন। আগের মতো সরকার ও বিএনপি নেতৃত্বকে ডিফেন্ড করে কথা বলছেন না বা বলতে উৎসাহ বোধ করছেন না। ডা. শায়ন্ত সাখাওয়াতের মতো নিবেদিতপ্রাণ জাতীয়তাবাদীও সেদিন একটি বক্তব্যে বলছিলেন, আমরা সরকারের পক্ষে কথা বলার মতো যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না। বিএনপির সাবেক জোটসঙ্গী শীর্ষ নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না সংস্কার ইস্যুতে সরকারের অবস্থানে হতাশা প্রকাশ করে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগার কথা জানিয়েছেন। নব্য বিএনপিপ্রেমীরা (আসলে ক্ষমতা ও হালুয়া-রুটিপ্রেমী) সরকারকে নানামুখী চাপ থেকে কতটা প্রোটেক্ট করতে পারে—সেটাই এখন দেখার বিষয়।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক
কলামিস্ট ও যুগ্ম সম্পাদক, আমার দেশ