উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য ছোট দেশগুলোর পরিণতি থেকে নিজেকে আলাদা রাখতে সংযুক্ত আরব আমিরাত দুই দশক ধরে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। এজন্য দেশটি বিভিন্ন ধরনের নেটওয়ার্কে নিজেকে যুক্ত করার পাশাপাশি বন্দর নির্মাণ, প্রভাব অর্জন, প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশে মিলিশিয়া বাহিনী গড়ে তোলা, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সুসম্পর্ক এবং মস্কো ও বেইজিংয়ের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার মতো কৌশল অবলম্বন করেছে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে আমিরাত সরকার দুই দশকে দেশটির এমন একটি ইমেজ তুলে ধরার চেষ্টা করেছে যে, এটি একটি চটপটে, ধনী এবং অত্যন্ত দরকারি একটি দেশ এবং তাকে ভৌগোলিকভাবে কোণঠাসা করা যাবে না। এভাবেই আমিরাত নিজেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের ‘লিটল স্পার্টা’ বা ‘ছোট অজেয় সামরিক শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।
‘লিটল স্পার্টা’ অভিধাটি ডাকনামের চেয়ে একটি মতবাদের মতোই বেশি শোনায়। একটি ছোট ফেডারেশন হিসেবে আমিরাতের রয়েছে মধ্যম শক্তির উচ্চাকাঙ্ক্ষা, তুলনামূলক সামরিক উৎকর্ষ এবং নিজস্ব শর্তে কৌশলগত পরিবেশকে রূপ দেওয়ার মতো যথেষ্ট নেটওয়ার্কগত প্রভাব। কিন্তু ইরান যুদ্ধ শুরুর পর গত তিন মাসে আবুধাবির উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে যে কতটা ফারাক, তা খুব ভালোভাবেই সামনে এসেছে। আমিরাতসহ উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য অবকাঠামোয় ইরানের হামলা আবুধাবির নিজেকে একটি মধ্যম শক্তির দেশ হিসেবে দেখার ধারণার সঙ্গে তার কাঠামোগত দুর্বলতার যে তফাত, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সম্প্রতি তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট এক্স-এ (সাবেক টুইটার) পোস্ট করে প্রতিবেশী ও অংশীদারদের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘বন্ধুরা অবিচল মিত্র ও সমর্থক না হয়ে মধ্যস্থতাকারীতে পরিণত হয়েছে।’ তার এই পোস্ট ইরানের বিরুদ্ধে আরো আক্রমণাত্মক অবস্থান গ্রহণ করার জন্য প্রতিবেশী ও অংশীদারদের ঐক্যবদ্ধ করতে নিজেদের প্রভাব ব্যবহারের অক্ষমতা নিয়ে আবুধাবির হতাশাকেই তুলে ধরেছে।
গত মাসে একটি প্রবন্ধে আমিরাতের ভাষ্যকার তারেক আল-ওতাইবা ইরানের আগ্রাসনকে সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করতে না পারার জন্য আরব দেশগুলোর নিন্দা করেন। এর এক মাস আগে তার বড় ভাই এবং ওয়াশিংটনে নিযুক্ত আমিরাতের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ আল-ওতাইবা একটি মতামত কলামে হরমুজ প্রণালি আবার খোলার জন্য একটি ‘আন্তর্জাতিক উদ্যোগে’ যোগ দেওয়ার জন্য আবুধাবির প্রস্তুতির কথা ঘোষণা করে আমিরাত এর পরিচালনগত ব্যয় ভাগ করে নিতে প্রস্তুত বলে উল্লেখ করেছিলেন। আমিরাতের প্রতিরোধের এই বার্তাগুলোয় যে কঠিন সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে, তা হলো—ইরানের প্রবল সামরিক শক্তির মুখে আমিরাতের অর্জিত প্রভাবের উৎসগুলো আসলে বাস্তবে কোনো কাজ করছে না।
প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের অধীনে আমিরাত সামরিক শক্তি অর্জনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপরিচালনাকে নিখুঁত করে তুলেছিল। নিজেদের প্রভাব বিস্তারে ইয়েমেন থেকে সুদান পর্যন্ত আমিরাত তার পক্ষের সশস্ত্র শক্তি বা প্রক্সিকে সমরাস্ত্র ও রসদ সরবরাহ করার করিডোর এবং কেন্দ্র তৈরি করেছে। পাশাপাশি সার্বভৌম সম্পদ তহবিল গড়ে তোলা, তথ্য ও গণমাধ্যম নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা, বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসা করা, বেসরকারি সামরিক ও নিরাপত্তা সংস্থা প্রতিষ্ঠা আমিরাতকে তার আকারের তুলনায় অনেক বেশি সক্ষমতা এনে দিয়েছিল।
আমিরাতের এই মডেলটি সংঘাত এবং কূটনৈতিক দর-কষাকষিতে যুক্ত করার সুযোগ করে দিয়েছিল দেশটিকে। কিন্তু ইরান যুদ্ধ আমিরাতকে বাস্তব পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছে। আমিরাতে ইরানের হামলার মাধ্যমে এটা স্পষ্ট হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অর্জিত ক্ষমতা ফল নির্ধারণে কার্যকর শক্তিতে রূপান্তরিত হয় না। ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) যখন পরিস্থিতি আরো গুরুতর করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন আমিরাতের নানামুখী সক্ষমতা ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে কোনো ভূমিকাই রাখতে পারেনি।
আমিরাত রুশ অর্থ ও দেশটির অলিগার্কদের নিজেদের সক্ষমতার প্রতি আকৃষ্ট করা সত্ত্বেও মস্কো ইরানের বিরুদ্ধে আবুধাবির সমর্থনে এগিয়ে আসেনি। বেইজিং শুধু বিবৃতি দিয়ে তার উদ্বেগ প্রকাশ ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চিরাচরিত ভাষা ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন আমিরাতের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিলেও কার্যকর প্রতিরোধে সামান্যই এগিয়ে এসেছে। আমিরাতের যে কাঠামোটি আরব বিশ্বে দেশটিকে অপরিহার্য করে তুলেছিল, সেটিই এখন তার সীমাবদ্ধতাকেও প্রকাশ করে দিয়েছে। বৈশ্বিক পুঁজির কেন্দ্র, বিশ্ববাণিজ্যের রসদ সরবরাহ কেন্দ্র এবং বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর অংশীদার হওয়াই সংযুক্ত আমিরাতকে আইআরজিসির প্রধান টার্গেটে পরিণত করেছে। কৌশলগতভাবে আমিরাতকে দুর্বল করার জন্য ইরানের শুধু এটুকুই করা দরকার যে, বিনিয়োগকারী, বীমাকারী, জাহাজ কোম্পানি এবং প্রবাসীদের এটা মনে করিয়ে দেওয়া যে, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তাহীনতার ক্ষেত্রে আমিরাত কোনো ব্যতিক্রম নয়। এ কারণেই আমিরাতের বর্তমান বাগাড়ম্বর এত ভঙ্গুর শোনাচ্ছে।
আমিরাত তার ‘লিটল স্পার্টা’ বা অপরাজেয় সামরিক শক্তির ইমেজ বজায় রাখতে চায়। দেশটি দেখাতে চায় যে, তারা সুশৃঙ্খল, প্রতিবেশীদের চেয়ে বেশি সক্ষম এবং অবশ্যই উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য ছোট রাষ্ট্রগুলোর মতো অরক্ষিত নয়। কিন্তু ইরান যুদ্ধ দেখিয়েছে, আমিরাতও উপসাগরীয় অন্য ছোট দেশগুলোর মতো একই ধরনের আঞ্চলিক চাপের সম্মুখীন। নিজেরা সুরক্ষিত- আমিরাতের এই আস্ফালন মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় ইরানের হামলার প্রতিশোধ নিতে ইরানে পাল্টা হামলা আইআরজিসির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে সামান্যই ভূমিকা রাখবে। কারণ উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোর তুলনায় আইআরজিসির সামরিক সক্ষমতা অনেক বেশি।
ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযানে যোগ দেওয়ার জন্য প্রতিবেশীদের আকৃষ্ট করার আমিরাতের চেষ্টার পরই দেশটিতে একাধিক হামলা চালায় ইরান। কিন্তু কোনো দেশই আমিরাতের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। এরপর থেকেই আমিরাত এসব দেশের বিরুদ্ধে আমিরাতের পাশে দৃঢ়ভাবে না দাঁড়ানোর অভিযোগ তুলেছে।
আমিরাত জিসিসিকে একটি প্রয়োজনীয় আঞ্চলিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখার চেয়ে নিজেদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথে বড় বাধা হিসেবেই বেশি বিবেচনা করেছে সবসময়। এখন, চাপের মুখে তারা এটা বুঝতে পারছে যে, যেসব প্রতিবেশীকে তারা একসময় কৌশলে পরাস্ত করেছিল, তাদের সহযোগিতা ছাড়া আমিরাত তার নিজের পরিবেশকেও স্থিতিশীল করতে পারবে না।
আমিরাতের নিরাপত্তার একমাত্র কার্যকর পথ হলো একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকা, যেখানে সৌদি আরব, কাতার, ওমান, কুয়েত, বাহরাইন এবং আরব আমিরাত স্বীকার করবে যে, তাদের নীতি ভিন্ন হলেও দুর্বলতাগুলো অভিন্ন। এমন ভান করার কোনো সুযোগ নেই যে, তাদের মধ্যে একজন নিজেকে সুরক্ষিত করবে আর বাকিরা ঝুঁকি কমাবে, মধ্যস্থতা করবে বা নিজেদের ক্ষতি করবে।
আবুধাবিকে অবশ্যই পাকিস্তান, কাতার বা ওমানের মধ্যস্থতাকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে এবং এটিকে শ্রম বিভাজনের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। তাকে অবশ্যই সৌদি সতর্কতাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে এবং স্বীকার করতে হবে, রিয়াদের কৌশলগত গভীরতা ও জ্বালানি শক্তি এমন সম্পদ, যা আমিরাতের নেতৃত্বাধীন কোনো নিরাপত্তা কাঠামো প্রতিস্থাপন করতে পারে না।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই অঞ্চলে যে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছেন, তাতে আমিরাতের প্রতিরক্ষায় অভিযানিক সহায়তার জন্য ইসরাইলের সুবিধাবাদী মনোভাব, একটি অভিন্ন উপসাগরীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভৌগোলিক নৈকট্যের ক্ষতিপূরণ করতে পারে না।
আবুধাবি তার ভাগ্য নিজেই গড়তে পারে শুধু তখনই, যখন সে স্বীকার করবে যে, সে একা তা গড়তে পারে না। একটি মধ্যম শক্তি হিসেবে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা কোনো সমস্যা নয়, সমস্যাটি হলো এই বিশ্বাস যে, মধ্যম শক্তির সক্রিয়তা ছোট রাষ্ট্রগুলোর দুর্বলতা মুছে ফেলতে পারে। আমিরাতের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা শ্রেষ্ঠত্বের জোরালো বয়ান দিয়ে সুরক্ষিত হবে না, কিংবা এই অলীক কল্পনা দিয়েও নয় যে ‘লিটল স্পার্টা’ উপসাগরীয় অঞ্চলের সম্মিলিত ভাগ্য থেকে নিজেকে আলাদা রাখতে পারে। এর নিরাপত্তা যদি আদৌ সুরক্ষিত হয়, তবে তা হবে এই বাস্তবসম্মত উপলব্ধির মাধ্যমে যে, উপসাগরীয় অঞ্চলের সব দেশ একই ছায়ার নিচে বাস করে, যদিও তাদের ছায়াগুলো ভিন্ন ভিন্ন হয়।
মিডল ইস্ট আই থেকে ভাষান্তর: মেতালেব জামালী