হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

রমজানের ট্রিলিয়ন টাকার অর্থনীতি

বিশ্বাস, ভোগ ও বণ্টনের শক্তি

ড. মোহাম্মদ কবির হাসান ও ড. জোবায়ের আহমেদ

বাংলাদেশে রমজান শুধু একটি ধর্মীয় মাস নয়; এটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের এক শক্তিশালী মৌসুমি চক্র। আত্মসংযম, ইবাদত ও সামাজিক সহমর্মিতার এই মাস দেশের বাজার, ভোগব্যয়, পরিবহন, রেমিট্যান্স এবং সম্পদের বণ্টনে এক বিশেষ অর্থনৈতিক গতিশীলতা সৃষ্টি করে। প্রায় ১৭ কোটির দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ যখন রোজা পালন করেন, তখন এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতেই পড়ে।

অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে রমজানকে বলা যায় এক ধরনের ‘মৌসুমি অর্থনৈতিক উদ্দীপনা’, যা অল্প সময়ের মধ্যে ভোগ, বাণিজ্য এবং আর্থিক প্রবাহকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে এই অর্থনৈতিক কার্যক্রম এতটাই ব্যাপক যে অনেক অর্থনীতিবিদ একে ‘ট্রিলিয়ন টাকার রমজান অর্থনীতি’ বলেও উল্লেখ করেন।

ইফতার থেকে ঈদের বাজার : ভোগব্যয়ের বিস্ফোরণ

রমজানের সবচেয়ে দৃশ্যমান অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ে ভোক্তা ব্যয়ের ওপর। এ সময়ে পরিবারের ব্যয় কাঠামোতে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। ইফতার ও সাহরির জন্য খাদ্যপণ্যের চাহিদা যেমন বাড়ে, তেমনি ঈদের নতুন পোশাক কেনাকাটাও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।

ছোলা, চিনি, ভোজ্যতেল, খেজুর, ডাল ও মসলার মতো পণ্যের চাহিদা রমজানে কয়েক গুণ বেড়ে যায়। শুধু রমজান মাসেই দেশে প্রায় তিন লাখ টন ভোজ্যতেল ও তিন লাখ টন চিনির চাহিদা তৈরি হয়। এই অতিরিক্ত চাহিদা সামাল দিতে সরকার প্রায়ই আমদানি নীতিতে কিছুটা শিথিলতা আনে এবং ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে বাজারে পণ্য সরবরাহ বাড়ায়।

রমজানের আরেকটি বড় অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি হলো ঈদের কেনাকাটা। ব্যবসায়ীদের মতে, রমজান ও ঈদ ঘিরে দেশে প্রায় ২ দশমিক ৫ লাখ কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। অনেক পরিবারের মোট মৌসুমি ব্যয়ের ৭০-৮০ শতাংশই পোশাক ও জুতার পেছনে যায়।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, অনেক খুচরা বিক্রেতা তাদের বার্ষিক আয়ের ৬০-৭০ শতাংশ অর্জন করেন ঈদের আগের কয়েক সপ্তাহেই। ফলে এ সময়টিকে ব্যবসায়ীরা প্রায়ই ‘সোনালি মৌসুম’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তবে এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুধু বড় শপিং মল বা শহরের দোকানেই সীমাবদ্ধ নয়। ঈদের পোশাকের চাহিদা টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নরসিংদীর তাঁতশিল্পের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। শহরের ক্রেতাদের কেনাকাটা গ্রামীণ তাঁতিদের জীবিকা টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

একই সঙ্গে ফুটপাতের দোকানদার, অস্থায়ী হাটের বিক্রেতা এবং ছোট উদ্যোক্তাদের জন্যও রমজান বড় আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে।

ঈদের যাত্রা : পরিবহন ও গ্রামীণ অর্থনীতির উত্থান

রমজান শেষে ঈদুল ফিতর কেন্দ্র করে বাংলাদেশের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ঘটনা হলো ঘরমুখো মানুষের ঢল।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর ১০-১৫ মিলিয়ন মানুষ শুধু ঢাকা থেকেই গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন। চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীর মতো শহর থেকেও লাখ লাখ মানুষ নিজ নিজ গ্রামে যান।

এই ব্যাপক যাতায়াত পরিবহন খাতে বিশাল চাহিদা সৃষ্টি করে। বাস, ট্রেন, লঞ্চ ও বিমান—সব ধরনের পরিবহনই তখন প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হয়।

এতে শুধু পরিবহন কোম্পানিগুলোই লাভবান হয় না; বরং এর প্রভাব পড়ে আরো অনেক খাতে, যেমন—

  • হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসা।
  • জ্বালানি বিক্রি।
  • মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস।
  • স্থানীয় বাজার ও খুচরা ব্যবসা।

ঈদের এই যাত্রা শহর থেকে গ্রামে অর্থের প্রবাহ বাড়ায়। শহরে কর্মরত মানুষজন গ্রামে গিয়ে পরিবারের জন্য উপহার, নগদ অর্থ ও বিভিন্ন পণ্য নিয়ে যান। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক ধরনের সাময়িক চাঙাভাব দেখা যায়।

রমজান একই সঙ্গে মৌসুমি কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করে। খুচরা দোকান, খাবারের দোকান, ডেলিভারি সেবা এবং অস্থায়ী বাজারে হাজার হাজার মানুষ অল্প সময়ের জন্য কাজের সুযোগ পান।

রেমিট্যান্স : বৈশ্বিক আয়ের প্রবাহ

রমজান অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি হলো প্রবাসী আয়ের প্রবাহ।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী নিয়মিত দেশে অর্থ পাঠান। ঈদ সামনে রেখে তারা সাধারণত অতিরিক্ত অর্থ পাঠান পরিবারের জন্য।

২০২৫ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশে ৩ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে, যা একটি রেকর্ড। ২০২৬ সালের মার্চ মাসের প্রথম ১০ দিনেই রেমিট্যান্সপ্রবাহে প্রায় ৫১ শতাংশ বৃদ্ধি দেখা গেছে।

এই রেমিট্যান্সপ্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে সাহায্য করে এবং গ্রামীণ এলাকায় ক্রয়ক্ষমতা বাড়ায়।

জাকাত : সম্পদের সামাজিক পুনর্বণ্টন

রমজান মাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক দিক হলো জাকাত ও দানের মাধ্যমে সম্পদের পুনর্বণ্টন।

ইসলামে জাকাত একটি বাধ্যতামূলক দানব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ধনী মানুষ তাদের সম্পদের একটি অংশ দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে জাকাতের সম্ভাব্য পরিমাণ দেশের জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশ হতে পারে।

যদি এই অর্থ যথাযথভাবে সংগঠিত ও ব্যবস্থাপনা করা যায়, তবে এটি দারিদ্র্যবিমোচনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশে ইতোমধ্যে সেন্টার ফর জাকাত ম্যানেজমেন্ট, জাকাত ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন এবং আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে।

তাদের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে—

  • ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা।
  • শিক্ষা বৃত্তি।
  • স্বাস্থ্যসেবা।
  • দরিদ্র পরিবারের পুনর্বাসন।

রমজান মাসে এসব কার্যক্রম আরো ব্যাপক আকার ধারণ করে এবং দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রায় সাময়িক স্বস্তি এনে দেয়।

চ্যালেঞ্জও আছে

রমজানের অর্থনৈতিক চাঙাভাবের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। খাদ্যপণ্যের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় অনেক সময় বাজারে কৃত্রিম সংকট বা মজুতদারির ঘটনা ঘটে।

এছাড়া ভোজ্যতেল, চিনি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন—

  • কার্যকর বাজার তদারকি।
  • কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি।
  • টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে পণ্য সরবরাহ।
  • জাকাত ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ।

বিশ্বাসের অর্থনীতি

বাংলাদেশের রমজান অর্থনীতি দেখায় যে ধর্মীয় অনুশীলন শুধু আধ্যাত্মিক বিষয় নয়; এটি একটি শক্তিশালী সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।

এই মাসে ভোগব্যয় বৃদ্ধি, রেমিট্যান্সপ্রবাহ, জাকাতের মাধ্যমে সম্পদের বণ্টন এবং শহর-গ্রামের অর্থনৈতিক সংযোগ—সব মিলিয়ে রমজান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

যদি নীতিনির্ধারকরা এই সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেন, বিশেষ করে জাকাতব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে, তবে এটি দারিদ্র্য হ্রাস ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।

অতএব, রমজানের এই অর্থনৈতিক প্রবাহ শুধু একটি মৌসুমি ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের সামাজিক সংহতি, অর্থনৈতিক শক্তি এবং মানবিক মূল্যবোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।

লেখক :

ড. মোহাম্মদ কবির হাসান

অধ্যাপক, অর্থনীতি ও অর্থায়ন বিভাগ

ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিন্স, যুক্তরাষ্ট্র

ড. জোবায়ের আহমেদ

সহযোগী অধ্যাপক

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (বিআইজিএম)

এবারের বিমর্ষ ঈদ

সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ এবং মিডিয়ার নৈতিক সংকট

জুলাই সনদ : সমাধান সংসদে, নাকি আন্দোলনে

শক্তির রূপান্তর এবং সম্ভাব্য নতুন বিশ্বব্যবস্থা

ভেঙে পড়ছে ইসরাইলের জীবন-সমাজ

মোদির হুংকার ও ইতিহাসের বাস্তবতা

ধর্ম তেল ও ইরানযুদ্ধ

সরকারের মধুচন্দ্রিমা কাল ও অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবণতা

জিয়াউর রহমানের সাফল্যের রহস্য

ইরান যুদ্ধ কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে