আওয়ামী লীগের দুঃশাসনে বড় আকারের একটি আন্দোলন হয়েছিল ২০১৮ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে। স্কুলশিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে এই আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। শিশু-কিশোরদের এই আন্দোলন দমনে ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দিয়েছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এই শিক্ষার্থীরা তখন রাস্তায় ট্রাফিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল। তাদের অনেকের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল—‘রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলছে’।
প্রশ্ন হলো-এই শিশু-কিশোররা কেন তখন রাষ্ট্র মেরামতের প্রয়োজন উপলব্ধি করেছিল? কারণ, শিক্ষার্থীরা তখন হাসিনার আমলে গুম, খুন, ব্যাংক ডাকাতি, ডেসটিনি-হলমার্কের নামে ঋণ জালিয়াতি, রানা প্লাজা ধস এবং চেতনার রাজনীতির নামে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে মানুষ হত্যার বীভৎসতা দেখে ফেলেছিল।
এই শিশু-কিশোরদের একটি অংশ পরের বছরগুলোয় কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। আসলে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের বীজ এই আন্দোলনের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল। শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলন কোটাবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু হলেও, রাষ্ট্র মেরামতের আকাঙ্ক্ষা ছাত্রদের মধ্যে আগে থেকেই ছিল। ফলে, হাসিনা কোটা তুলে নেওয়ার দাবি মেনে নেওয়ার পরও আন্দোলন থেমে থাকেনি।
এই গণঅভ্যুত্থান শুধু নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের কোনো আন্দোলন ছিল না। সেটি হলে বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বে ১৮ দলের জোটের দেড় দশকের আন্দোলনে সফল হতো। অচেনা ছাত্রদের নেতৃত্বে আন্দোলনের দরকার হতো না।
গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব গ্রহণের পর রাষ্ট্র মেরামত বা সংস্কারের কথা বহুবার বলেছেন। এ কারণে রাষ্ট্র মেরামতের অংশ হিসেবে অনেকগুলো আদেশ ও অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। যেগুলো নিয়ে ঐকমত্য কমিশনে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা হয়েছে। এখন সংসদ গঠিত হওয়ার পর এই অধ্যাদেশগুলো যখন আইনে পরিণত করার প্রশ্ন উঠছে, তখন রাজনৈতিক শাসকশ্রেণি সেই পুরোনো রূপে ফিরে এসেছে। স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন, পুলিশ কমিশন, গুম প্রতিরোধ আইন, বিচারক নিয়োগ এবং বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা—এসব বিষয়ে তারা আগের নিপীড়নমূলক সময়ের আইনে ফিরে গেছে। কোনো ধরনের সংস্কার বা রাষ্ট্র কাঠামোর মেরামতে তারা আর আগ্রহী নয়।
একই সঙ্গে লুটপাটের অর্থনীতির ধারা সচল রাখতে ক্ষমতাসীনরা তৎপর। এর প্রমাণ পাওয়া যায় অন্তর্বর্তী সরকারের করা ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ সংশোধন করে সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে। এই আইনে একীভূত ব্যাংক আগের মালিকদের কাছে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একীভূত ব্যাংক পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার এ পর্যন্ত যে অর্থ দিয়েছে, তার সাড়ে ৭ শতাংশ পরিশোধ করে আগের মালিকরা এর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের অভ্যন্তরীণ বৈঠকে এমন ধারা সংযোজনের বিপক্ষে মত দিয়েছিল। বিরোধী দলও সংসদে এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিল । কিন্তু সেই ১৮(ক) ধারা সংযুক্ত করেই সংসদে বিলটি পাস হয়।
ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫-এর আলোকে গত বছর শরিয়াহভিত্তিক এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। আন্তর্জাতিক ফার্ম দিয়ে অডিটসহ বিভিন্ন পর্যায় শেষে এ সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একীভূত হওয়ার আগে এক্সিম ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ছিল নাসা গ্রুপের কর্ণধার নজরুল ইসলাম মজুমদারের হাতে। তিনি এখন জেলে আছেন। বাকি চারটি ব্যাংক ছিল এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। এই এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম মাসুদকে ব্যাংক ডাকাতির মূল মাস্টারমাইন্ড হিসেবে মনে করা হয়, যিনি ছিলেন হাসিনার চোরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র। এস আলম গ্রুপ হাসিনার নিয়ন্ত্রণাধীন সেনা গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে দেশের বৃহত্তম ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক দখল করেছিল। ব্যাংকের পরিচালকদের তুলে নিয়ে শেয়ার ট্রান্সফারের কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল। এখন এস আলম গ্রুপ আবার চারটি ব্যাংকের মালিকানা নিশ্চিতভাবে ফেরত পেতে যাচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকার যখন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করে, তখন বাংলাদেশ ব্যাংক ৩৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছিল। এখন এই টাকা দিয়েই তারা ব্যাংক পরিচালনা করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, নতুন আইনের মাধ্যমে শুধু সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক একীভূত ব্যাংককে যে পরিমাণ অর্থ দিয়েছে, তার সাড়ে ৭ শতাংশ অর্থের পে-অর্ডার দিয়ে ব্যাংকের মালিকানায় ফেরা যাবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এভাবে একবার কেউ মালিকানা পেলে তাকে বাদ দেওয়া সহজ হবে না। (সমকাল ১২ এপ্রিল ২০২৬)
এই ব্যাংকগুলো ফেরত পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে অপমানজনকভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন ছেড়ে যাওয়ার আগে সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিস্বার্থের বিষয় নয়; বরং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, একটি ‘কুচক্রী মহল’ সীমিতসংখ্যক কর্মকর্তাকে ব্যবহার করে সরকারি নীতিগত সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে। তারা চায় ব্যাংকগুলো আবার আগের মালিকদের কাছে ফিরে যাক, যাতে তারা লুটপাট চালাতে পারে এবং সরকারের দেওয়া অর্থ নিজেদের পকেটে ভরতে পারে।
আহসান এইচ মনসুরের কথা এখন সত্য প্রমাণিত হলো। মজার ব্যাপার হলো, এই আইন নিয়ে যখন বিরোধী দল সংসদে আপত্তি উত্থাপন করে, তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেছিলেন—বাংলাদেশ ব্যাংক নাকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দখল করা হয়েছিল। অথচ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার পর তৎকালীন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারও পালিয়ে যান। পলাতক থাকা অবস্থাতেই তিনি ১০ আগস্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র পাঠান। বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারই একমাত্র গভর্নর, যিনি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পালিয়ে গিয়েছিলেন। এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব নিয়েছিলেন আহসান এইচ মনসুর।
ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ সংশোধন আইন পাসের মাধ্যমে আগামী দিনে লুটেরা শ্রেণিকে আগের মতো দেশের ব্যাংকব্যবস্থা ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের লাইসেন্স দেওয়া হলো।
লুটেরা শ্রেণির পাশাপাশি সরকারের সঙ্গে যে গভীর সংযোগ গড়ে ওঠে, তার পেছনে থাকে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি। নেপাল ও ইন্দোনেশিয়ায় সম্প্রতি যে গণবিক্ষোভ হয়েছে, তার মূলে ছিল প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সন্তানদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ। তাদের বলা হতো ‘নেপো কিড’ (Nepo Kid)।
‘নেপো কিড’ শব্দটির উৎপত্তি মূলত ‘নেপোটিজম’ (Nepotism) বা স্বজনপ্রীতি থেকে। সহজ কথায়, কোনো প্রভাবশালী বা বিখ্যাত ব্যক্তির সন্তান যখন তাদের পরিবারের পরিচিতি, অর্থ বা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে কর্মজীবনে দ্রুত সফল হয়, তখন তাদের ‘নেপো কিড’ বলা হয়।
একজন সাধারণ প্রতিভাবান ব্যক্তি যে সুযোগ পেতে বছরের পর বছর সংগ্রাম করেন, একজন নেপো কিড সেই সুযোগটি অনায়াসেই পেয়ে যায়। শুধু পারিবারিক পরিচয়ের কারণে তারা বড় বড় প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পেয়ে যায়। এ ধরনের ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব সমাজের ওপর পড়ে।
সম্প্রতি আমাদের ক্রিকেট বোর্ডে যে পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাতে ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রীদের সন্তান ও স্ত্রীদের অ্যাডহক কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে। যদিও তাদের সঙ্গে ক্রিকেটের কোনো সম্পর্ক নেই। এ কথা স্বীকার করতে হবে, রাজনৈতিক সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, তখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাদের পছন্দের লোকদের নিয়োগ দেওয়া একটি স্বাভাবিক বিষয়। এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু সেই নিয়োগ হতে হবে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। ক্ষমতাসীন দলের সন্তানদের প্রমাণ করতে হবে যে তাদের নিয়োগ স্বচ্ছতার সঙ্গে হয়েছে এবং তারা ওই পদের জন্য যোগ্য।
ক্ষমতাসীন দলের কৌশলবিদ ও প্রচারবিদরা এতদিন বলে আসছিলেন যে দেশ মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তারা মনে হয় তা ভুলে গেছেন। দেশের মানুষ, বিশেষ করে তরুণরা, সরকারের এসব সিদ্ধান্তের দিকে নজর রাখছে কঠোর । তাদের উচিত এই তরুণরা কীভাবে এসব ঘটনার প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া।
২০২৪ সালের বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দক্ষিণ এশিয়ায় বড় একটি আন্দোলন হয়েছিল নেপালে। সে সময় রাজনৈতিক নেতাদের সন্তানদের বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং সরকারি নিয়োগে তাদের বিশেষ সুবিধার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
তরুণ প্রজন্ম (Gen-Z) দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসে। সরকারের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করার চেষ্টা করা হলে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এই আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি (KP Sharma Oli) পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং দেশটিতে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
গত ৫ মার্চ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র ও জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী বালেন্দ্র শাহ। সম্প্রতি তিনি তার এক মন্ত্রীকে স্বজনপ্রীতির অভিযোগে বরখাস্ত করেছেন বলে জানা যায়। নেপালের শ্রম, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তামন্ত্রী দীপক কুমার শাহর বিরুদ্ধে তার স্ত্রী জুনু শ্রেষ্ঠাকে স্বাস্থ্যবীমা বোর্ডের সদস্য হিসেবে নিয়োগে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই পদটি দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় ছিল। এ ঘটনায় দলের নীতি, আদর্শ ও ভাবমূর্তি গুরুতরভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে মনে করে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক মহল। ক্ষমতাসীন দল আরএসপি তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানানো হয় যে দলের সুপারিশ অনুযায়ী দীপক কুমার শাহকে মন্ত্রিত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
নেপালের মতো বাংলাদেশেও তরুণরা কেপি শর্মা ওলির চেয়ে বহুগুণ বেশি নিপীড়নমূলক একটি সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল। আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীরা ঢাকার দেয়ালে দেয়ালে তাদের আকাঙ্ক্ষার কথা লিখেছিল। সেই আকাঙ্ক্ষা ছিল দেশকে পরিবর্তন করার। যদি সেই দেয়ালের লিখন ক্ষমতাসীনরা পড়তে ও বুঝতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সময়ের ব্যবধানে ছাত্ররা আবার রাস্তায় নেমে আসতে পারে। এমন পরিস্থিতি কারো জন্যই শুভ হবে না।
লেখক : সহযোগী সম্পাদক, আমার দেশ
alfaz@dailyamardesh.com