হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

রামিসা-লামিয়াদের জন্য শোকগাথা

আমীর খসরু

একটি সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং তার কাঠামো জনবান্ধব আর সাধারণ মানুষের জন্য কতটা নিরাপদ, তার বড় ব্যারোমিটার বা মাপকাঠি হচ্ছে, শিশুরা কতটা নিরাপদ, তাদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত— ওই ব্যবস্থায়, তার ওপর। কারণ আমরা সবাই জানি, যেকোনো দুর্যোগ-দৈব-দুর্বিপাক বা রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামোর ওপর আঘাত এলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন শিশু এবং নারী।

সেই মানদণ্ডে আমাদের বিদ্যমান সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থায় শিশু আদৌ নিরাপদ নয়। আর ওই ব্যারোমিটারে আপনারা বিচার বিশ্লেষণ করুন, নিরাপত্তা ও নিরাপদ পরিবেশ তাদের জন্য আদৌ বিদ্যমান রয়েছে কি না? শিশুরা যদি নিরাপদ না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ পরিবেশের মধ্যে আছে?

বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যাসহ নানা বাধাবিঘ্ন, বৈরী পরিস্থিতি এবং বিপত্তিতে রয়েছে শিশুরা। হামের প্রাদুর্ভাবে ১৫ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত ৫৮৩ শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এটা হাসপাতালগুলোর তথ্যের ভিত্তিতেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব। ঘরে বসে চিকিৎসা নেওয়া শিশুদের কতজন প্রাণ হারিয়েছে, তার তথ্য এই হিসাবের মধ্যে নেই।

এই ধর্ষণের পর হত্যা কিংবা টিকার অভাবে হামের মহামারিকে কি আমরা স্বাভাবিক মৃত্যু বলব? উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় এই অস্বাভাবিক মৃত্যুকে কাঠামোগত শিশুহত্যা হিসেবেই গণ্য করা হতো নিঃসন্দেহে। এখন টিকা না থাকার জন্য দায়ী কে, তা নিয়ে তত্ত্ব, তথ্য আর বাহাস চালানো হচ্ছে; কিন্তু শিশুদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় কোনো তাড়াহুড়ো নেই।

রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রস্থলে আদ্ব-দীন হাসপাতালে গ্যাস নিঃসরণ বা এসির জটিলতায় যে ছয় শিশু জীবন দিয়েছে, এগুলো কি হত্যাকাণ্ড নয়? অথচ এই শিশুদের হত্যাকাণ্ডের বিচার হলো নামকাওয়াস্তের তদন্ত কমিটি, হাসপাতালটির দায়সারা দুঃখ প্রকাশ। পরে একটি মামলা। রাষ্ট্র এবং এর সরকার জনবান্ধব, শিশুদের প্রতি মমত্ববোধসম্পন্ন হলে ওই হাসপাতাল তাৎক্ষণিক বন্ধ করে দিয়ে দায়ীদের আইনের আওতায় এনে জরুরি বিধানে কঠিন-কঠোর ব্যবস্থা নিত। কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ শুধু একেকটি সংখ্যা মাত্র— ন্যায় ও ন্যায্যতার ভিত্তির সমাজের প্রকৃত মানুষ নয়।

শিশু ধর্ষণ এবং হত্যা

ঢাকার মিরপুরের পল্লবীর সাত বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করার পরে সাধারণ মানুষ যখন রাজপথে নেমে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন, তখনই সরকারের টনক নড়ে ওঠে। পরিস্থিতি যখন এমন অবস্থায় দাঁড়ায় যে, রামিসার হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদের ঝড় তাদের জন্য বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে, ঠিক তখনই প্রধানমন্ত্রীকে স্বয়ং রামিসার বাসায় যেতে হয়। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ তিনি নিজে গেছেন। অন্য সরকার হলে ডেকে পাঠানো হতো। যদি আন্দোলন বা মানুষ রাজপথে না নামতেন, তাহলে হয়তো রামিসা হত্যাকাণ্ড ঠাকুরগাঁওয়ে ধর্ষণের পর চার বছর বয়সি শিশু লামিয়া, সিলেটের চার বছর বয়সি ফাইমা, মুন্সীগঞ্জের ১০ বছর বয়সি শিশুসহ চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায়, রাজশাহীর দুর্গাপুর, ঢাকার বনশ্রীর শিশুসহ অসংখ্য শিশুর ভিড়ে এই শিশুরাও পর্দার আড়ালে হারিয়ে যেত, যেভাবে অহরহ হারায়।

এ কারণেই রামিসার বাবা বারবার কেঁদে কেঁদে চোখের পানিতে বলছিলেন, ‘আমি বিচার চাই না, কারণ আমি জানি, বিচার পাব না।’ শিশুদের কাছে সাধারণ মানুষের সন্তান রামিসা শ্রেণিভেদের সমাজের যেমন একটি প্রতীকী চরিত্র, তেমনি রামিসার বাবার ক্ষোভের উচ্চারণ ‘আমি বিচার চাই না, কারণ জানি বিচার পাব না’— তেমনি এক কঠিন বাস্তবতার সম্মিলিত প্রতিধ্বনি। রামিসার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং আশ্বাস এবং নিশ্চয়তা দেওয়ার পরও মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলেন, ‘আমরা মধ্যযুগে নেই, আধুনিক যুগে বসবাস করছি।’ নিয়মকানুনের দোহাই দেওয়া মাত্র।

স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে রামিসা হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে বলে আশা করা যায়। কিন্তু লামিয়া, ফাহিমা ও ফাতেমাদের বিচার? ওরা কি চোখের আড়ালে চলে যাবে? খোদ রাজধানীর কেন্দ্রে থাকা আদ্ব-দীন হাসপাতালের ছয় শিশু হত্যার ঘটনা কি ওই তদন্ত কমিটি আর একটি মামলায়ই শেষ।

মানবাধিকার সংগঠন আইন সালিশ কেন্দ্রসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে জানা গেল, পাঁচ মাসে কমপক্ষে ১১৮টি কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং এর মধ্যে ১৭ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ২২ মে’র আগ পর্যন্ত অন্তত শুধু ১০ দিনেই ছয়টি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হবে বলে সহজেই ধারণা করা যায়। কারণ অনেক ঘটনাই সংবাদমাধ্যমে আসে না এবং বিচার না পাওয়ার কারণে অনেকে মামলাও করেন না। ধর্ষিত শিশু যদি বেঁচে যায়, তবে সামাজিক চাপে আর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অনেকে পুরো ঘটনাকেই ধামাচাপার পথে চলে যেতে বাধ্য হন। এই ধামাচাপা দেওয়ার সংস্কৃতি সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার কুৎসিত এবং নগ্ন দিকটাকেই তুলে ধরে মাত্র।

মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ এক রিপোর্টে বলেছে, গত ১০ বছরে প্রায় ছয় হাজার কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২৩৬টি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে ৪৪ শিশু। সংস্থাটি বলছে, এ সংখ্যা সম্ভবত প্রকৃত ঘটনার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। কারণ ধর্ষকের পক্ষ থেকে প্রতিশোধের ভয়, বিচারিক কার্যক্রমের হয়রানির কারণে অনেক ঘটনাই অগোচরে থেকে যায়। জাতিসংঘের সংস্থাগুলোসহ মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, বিচারব্যবস্থার গুরুতর দুর্বলতা, শিশু সহায়ক তদন্ত পদ্ধতির অভাব, অভিযুক্তের সহজে জামিন এবং বিচারহীনতা বা দায়মুক্তির সংস্কৃতি স্থায়ী হওয়ার কারণেই এই নির্মম ঘটনাগুলো বারবার ঘটছে এবং ভবিষ্যতেও ঘটবে, যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান ছাড়া শিশু ধর্ষণের মহামারি শেষ হবে না।

অথচ নির্বাচনের আগে কত প্রতিশ্রুতিই না রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে দেওয়া হয়? কিন্তু তারা এখন নিশ্চুপ।

হামের মহামারি আর কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড

বাংলাদেশে হাম রোগের মহামারিতে এ বছরেরই ১৫ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত ৫৮৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে। এই মন্ত্রণালয় বলছে, এ সময়ে ৬৭ হাজার ৯০৫ শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে এবং এর মধ্যে ৫৩ হাজার ৪৬৩ শিশুর ঠাঁই হাসপাতালে হয়েছে। হাসপাতালে পর্যাপ্ত রোগীর চিকিৎসাব্যবস্থা না থাকায়, ভুক্তভোগীর স্বজনরা হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছোটাছুটি করেছেন, এমন মর্মান্তিক তথ্য ও চিত্র সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আক্রান্তদের ৮০ শতাংশই অনূর্ধ্ব পাঁচ বছর বয়সি শিশু। এমনকি ৯ মাসের কম বয়সি এবং নবজাতকরাও এই রোগের মহামারির বাইরে ছিল না। দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায়ই রোগ ছড়িয়ে পড়ে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আক্রান্ত শিশুদের যে তথ্য দিয়েছে, বাস্তব পরিস্থিতিÑঅর্থাৎ মৃত্যু এবং আক্রান্তদের সংখ্যা আরো বেশি হবে বলে ধারণা করা যায়। কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশির ভাগ শিশুই হামের টিকা থেকে বঞ্চিত বা আংশিক টিকার শিকার। অপুষ্টিও একটি বড় কারণ।

পরিস্থিতি এমন এক ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছে যায়, যাতে ইউনিসেফের বাংলাদেশপ্রধান রানা ফ্লাওয়ার্স এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘মনে হচ্ছে এক চরম সংকটময় পরিস্থিতি।’ ইউনিসেফ বলেছে, মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনের সময় তাদের দেখা হাসপাতালগুলোয় রোগীর ভিড়ে উপচে পড়েছিল। সরকারি প্রতিষ্ঠান রোগ তত্ত্ব, নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (IEDCR) প্রাক্তন প্রধান সায়েন্টিফিক কর্মকর্তা ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, ‘গরিব মানুষ সাধারণত শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে যান না, ওষুধ এবং পরীক্ষার খরচ নিজেদেরই দিতে হয় বলে।’

পরিস্থিতি এমন জটিল হলে সাধারণত স্বাস্থ্যবিষয়ক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এটি না করে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর ভূমিকা ছিল পরিস্থিতিকে ‘ধামাচাপা’ দেওয়ার সমতুল্য। সরকারি হাসপাতালের ওষুধ এবং পরীক্ষার খরচ মওকুফ ঘোষণাসহ নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেত এবং উচিতও ছিল। কিন্তু শিশুদের—অর্থাৎ আমাদের সাধারণ মানুষের দুর্ভাগ্য যে, এর কোনোটিই করা হয়নি। ঘটনার ভয়াবহতার মধ্যেও উল্টো টিকা আমদানি না করায় কোন ব্যক্তি বা সরকার দায়ী, তার দোষারোপের কুৎসিত নোংরা খেলায় মেতে রইলেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বাংলাদেশে হামের মহামারিকে উচ্চঝুঁকির মাত্রার পরিস্থিতি বলে উল্লেখ করেছে। সেইভ দ্য চিলড্রেনও এই হামের মহামারিকে এই দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহতম বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

অবশেষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফ নিজেদের উদ্যোগেই জরুরি বেশ কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। সরকারের নাম ওই সংস্থা রাখলেও কার্যত সরকারি কার্যকর উদ্যোগ ছিল নামমাত্র। কাজেই টিকার অভাবে ৬ শতাধিক শিশুর মৃত্যুকে কি আর মৃত্যু বলা যায়। অবহেলা, তাৎক্ষণিক ও জরুরি উদ্যোগের অভাব এবং অতি জরুরি (Emergency) বিবেচনা না করায় এটা কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড (Structural Killing) হিসেবে গণ্য করা কি ভুল হবে? না হবে না। কারণ কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড হচ্ছে যখন রাষ্ট্রীয়Ñঅর্থাৎ সরকারি কাঠামোর ত্রুটির কারণে মানুষের মৃত্যু ঘটে থাকে। হাম নিয়ে কি তাই হয়নি? অন্তর্বর্তী সরকারও কি এর দায় এড়াতে পারবে? এর বিচারের ভার জনগণের হাতেই ছেড়ে দিলাম।

কেন এই পরিস্থিতি

যেখানে শিশুরা নিরাপদ নয়, এটি কোনো বক্তৃতা, বিবৃতি নয়, এটি একটি বাস্তবতার চিত্র। এই ধারণাটি এসেছে ন্যায়, ন্যায্যতা এবং নাগরিকের অধিকার কতটা আছে কী নেই, সেই প্রেক্ষাপটে। এটা এমন একটি বাস্তবতা, যা পৃথিবীতে নতুন জীবন আনার নৈতিকতা এবং পরিস্থিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। করে এই কারণে যে, যে সমাজ ও রাষ্ট্র তার সবচেয়ে দুর্বলদের রক্ষা করতে ব্যর্থ। এ প্রসঙ্গে প্রবাদপ্রতীম নেলসন ম্যান্ডেলার একটি বিখ্যাত উক্তিই যথেষ্ট। তিনি বলেছিলেন, ‘নিরাপত্তা এমনি এমনি আসে না, এগুলো সম্মিলিত ঐকমত্য এবং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের ফল। আমাদের সমাজের সবচেয়ে দুর্বল নাগরিক, আমাদের সন্তানদের সহিংসতা এবং ভয়ভীতিমুক্ত একটি জীবন দেওয়া আমাদের কর্তব্য। (Safety and security donot just happen, they are result of collective consenensus and public investment. We owe our children, the most valnerable citizens in our socitey, a life free of violence and fear.)

এ বিষয়গুলো নিয়ে ৫৫ বছর বয়সি রাষ্ট্র, সরকারগুলো, সমাজ, রাজনৈতিক দলগুলো, কথিত সুশীলসমাজসহ সংশ্লিষ্টরা গভীরভাবে কখনোই ভেবে দেখেছেন অথবা সেই তাগিদ সাধারণ মানুষের চোখে পড়েছে বলে মনে হয় না।

মনে রাখতে হবে, দুর্বল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের কাঠামোগত ‘সংকট’ (Structural Crisis of the State) স্বয়ংক্রিয়ভাবে বা অটোমেটিক তৈরি হবেই। আর রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংকট মূলত দুটো বিষয়কে দৃশ্যমান করে—১. নাগরিকদের মৌলিক চাহিদার ঘাটতি, বিশেষত নাগরিকদের সহিংসতা থেকে রক্ষায় সংকট, ২. সক্ষমতাÑঅর্থাৎ অপরিহার্য জনসেবা প্রদানের দুর্বলতা। এটিই মনে রাখা প্রয়োজন যে, এমন পরিস্থিতি একদিনে বা দু-এক মাসে সৃষ্টি হয়েছে, তা নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি অবহেলার পুঞ্জীভূত রূপ আর ফল। বিশেষ করে, উপনিবেশ-উত্তর ব্যবস্থায় ঔপনিবেশিক কাঠামো বিদ্যমান রেখে শুধু শাসক বদল হয় মাত্র। এমনটাই ঘটেছে ব্রিটিশ উপনিবেশ-উত্তর ১৯৪৭-এ পাওয়া পাকিস্তান এবং এ থেকে মুক্তির প্রচেষ্টা হয়েছিল ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। এরই ধারাবাহিকতায় ২৪-এর জুলাই বিপ্লব, যা কৌশলে ব্যর্থ করে দেওয়া হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে প্রখ্যাত ফরাসি দার্শনিক ফ্রাঁঙ্ক ফানোর (Frantz Fanon) তত্ত্ব হচ্ছে, উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রে ও সমাজে রাজনৈতিক মুক্তির নামে ঔপনিবেশিক শাসকরা চলে যায় কিন্তু প্রকৃত মুক্তি অর্জন তো হয়ই না, বরং পুরোনো কাঠামো অটুট রেখে প্রভু বা শাসক বদল হয় মাত্র। আর ওই যে কাঠামোগত সংকটের শুরু, তা আজও বিদ্যমান আমলাতন্ত্রে, আইনি ব্যবস্থাসহ সর্বত্র। এ নিয়ে আর আলোচনার প্রয়োজন নেই। কারণ পাঠক নিশ্চয়ই অনুধাবন করতে পেরেছেন, প্রকৃত সংকটটি কোথায়?

এই কাঠামোগত সংকট অব্যাহত থাকলে শিশু ধর্ষণসহ নানা পথ আর পদ্ধতিতে শিশুদের জন্য অনিরাপদ এবং নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ আরো সংকটাপন্ন আর জটিল হতেই থাকবে।

শিশুদের ওপর নির্যাতন দমনে ২০০০ সালে একটি আইন করেছিল তৎকালীন সরকার এবং ২০২০ সালে তার সামান্য কিছু সংশোধন করা হয়। কিন্তু ওই আইনে অপরাধের তদন্ত, আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার ও ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক জবানবন্দি গ্রহণ, রক্ত এবং ডিএনএ টেস্টসহ এমন এক জটিল আইনি কাঠামোগত ব্যবস্থা রয়েছে, যাতে ধর্ষণের বিচারকাজ ত্বরিত, দ্রুত এবং তৎক্ষণাৎ করা অসম্ভব। কাজেই এ ক্ষেত্রে নতুন আইনি বিধান করা জরুরি। কিন্তু এর জন্য শুধু আশ্বাস নয়, দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচার দেখতে চায় জনগণ।

আর রাষ্ট্র ও সমাজের— অর্থাৎ সব ক্ষেত্রেই এমনটা করার জন্য প্রয়োজন ন্যায়, ন্যায্যতা, নাগরিকের সমতা ও সাম্যের রাষ্ট্রীয় কাঠামো। যে কাঠামো বদলের জন্য জনমানুষের সম্মিলিত সংগ্রাম, আন্দোলন আর বিপ্লবকে বারবার ব্যর্থ করে দেওয়া হয় এবং হচ্ছে। কিন্তু জনতার সম্মিলিত ইচ্ছার নয়া জনবান্ধব কাঠামো যতক্ষণ না প্রতিষ্ঠিত হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের সম্মিলিতভাবে লিখতে হবে, বলতে হবে রামিসা, লামিয়া, ফাহিমাসহ শত শিশু হত্যার শোকগাথা। লেখাটি শেষ করতে চাই ভিয়েতনামের প্রতিষ্ঠাতা, কিংবদন্তি বিপ্লবী নেতা হো চি মিন-এর বিখ্যাত একটি উক্তি উল্লেখ করে। তিনি বলেছিলেন, ‘দশ বছরের মধ্যেই লাভের জন্য গাছ লাগান, আর শত বছরের স্থায়ী, টেকসই লাভের জন্য জনগণের উন্নতি এবং সঠিক মনোযোগ বিনিয়োগ করুন।’

লেখক : গবেষক

শিক্ষাবিদ ও সংস্কারক প্রফেসর মুহাম্মাদ আব্দুল বারী

দেশ আর ৫ আগস্টের আগে ফিরবে না

বাংলাদেশে অবৈধ ভারতীয়দের শনাক্ত করুন

নিঃসঙ্গ ইসরাইল

আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় ন্যায্যতার প্রশ্ন

শহীদ জিয়ার আদর্শ : ইসলামি দৃষ্টিকোণ

হাসিনাকে নিয়ে দিল্লির পুতুলখেলা

শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় অমর জিয়া

জিয়াউর রহমানকে যে কারণে দক্ষিণ এশিয়া মনে রাখে

লে. কর্নেল (অব.) হামিদের স্মৃতিচারণে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান