২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন, ২০২৩-২৪ সালের সংঘাতে হিজবুল্লাহর পরাজয় এবং ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ইরানে ইসরাইলের ধারাবাহিক সামরিক অভিযান তেল আবিবে এই ধারণা তৈরি করেছে যে, ইরান ও তার ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ বর্তমানে খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ইসরাইলের নেতারা ট্রাম্পকে এটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন, ইরানের দুর্বলতা বাস্তবতার চেয়েও অনেক বেশি। ২০২৪ সাল থেকেই ইসরাইলের নেতারা একমত যে, ইরান অপেক্ষাকৃত দুর্বল থাকার এই সময়ে ইসরাইলি আধিপত্যকে আরো সুসংহত করার এখনই মোক্ষম সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে তুরস্ক মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল এবং তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই পরিস্থিতি এটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরানের দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর ইসরাইলের প্রচেষ্টা সম্ভবত তাকে আঙ্কারার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াবে। এই পরিবর্তনশীল গতিপ্রকৃতি এই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য নির্ধারণে একটি নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসরাইলের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, বাশার আল-আসাদ পরবর্তী সিরিয়ায় একটি প্রভাবশালী বহিরাগত শক্তি হিসেবে তুরস্কের উত্থান। বাশারের ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকে সিরিয়ায় ইরান ও হিজবুল্লাহর প্রভাব হ্রাস পাওয়ায় তেল আবিব ক্ষমতার এই শূন্যতাকে কাজে লাগাতে দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু তারপরও তুরস্ক ‘নতুন’ সিরিয়ায় ইসরাইলি উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ইসরাইলের নীতিনির্ধারকরা এখন এই সিদ্ধান্তে এসেছেন—দ্রুত বা দেরিতে হোক, তুরস্কের মুখোমুখি তাদের হতেই হবে।
সেঞ্চুরি ইন্টারন্যাশনালের নন-রেসিডেন্ট ফেলো অ্যারন লুন্ড সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ আরবকে বলেছেন, ‘সমীকরণ থেকে ইরানকে বাদ দিলে লেভান্ট অঞ্চলে ইসরাইলি প্রভাবের প্রধান প্রতিপক্ষ এখন তুরস্ক। সৌদি আরব, কাতার ও উপসাগরীয় অন্য দেশগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তারা তুরস্কের মতো সরাসরি সেখানে উপস্থিত নেই।’
নতুন প্রতিপক্ষ হিসেবে তুরস্ক
ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট তার দেশের জন্য তুরস্ককে উল্লেখযোগ্য একটি হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, ‘তুরস্কই নতুন ইরান। তুরস্ক কাতারের সঙ্গে মিলে সিরিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছে এবং তারা সমগ্র অঞ্চলেও প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে।’ বেনেট তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ানকে ‘বিপজ্জনক’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, তিনি ইসরাইলকে ঘিরে ফেলতে চান।
সাকারিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ও আঙ্কারা-ভিত্তিক বিশ্লেষক ড. মুস্তাফা কানের দ্য নিউ আরবকে বলেন, ‘ইসরাইলের রাজনীতিকরা তুরস্ককে সেভাবেই চিত্রিত করছেন, যেভাবে তারা একসময় ইরানকে চিত্রিত করতেন। এমন একটি দেশকে সামরিক অভিযানের লক্ষ্যবস্তু করা উচিত বলে তারা মনে করেন। ইরানে চূড়ান্ত হামলার প্রকল্পটি ৪০ বছর আগে শুরু হয়েছিল এবং দেশটির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে জড়াতে তাদের ৪০ বছর লেগেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সম্ভবত তুরস্ক নিয়েও ইসরাইল এখন একই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল তৈরি করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, তুরস্ক কেন? এর উত্তর একটাই, আর তা হলো—ইসরাইল চায় না তার নিজের বলয়ের বাইরে এই অঞ্চলের কোনো রাষ্ট্র স্থিতিশীল ও শক্তিশালী হোক। তার সম্প্রসারণবাদী এজেন্ডার জন্য প্রতিবেশী অঞ্চলে শক্তিশালী কোনো রাষ্ট্র না থাকুক সেটাই তেল আবিবের একমাত্র চাওয়া।’
তেল আবিবের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সীমাবদ্ধতা
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ইরানকে একটি দুর্বল রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য ইসরাইলের নীতিনির্ধারকরা বর্তমান সময়কে তেল আবিবের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এগিয়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট অনুকূল বলে মনে করেছেন। কিন্তু এরপরও ইসরাইলের কর্মকর্তারা ভালোভাবেই জানেন, এই সুযোগ চিরকাল থাকবে না। আর এজন্যই বর্তমান সময়টিকেই নেতানিয়াহুর সরকার একটি বড় সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। এ কারণেই ইসরাইলের লাগামহীন আগ্রাসন শুধু সিরিয়াতেই নয়, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড, লেবানন, ইরান, কাতার ও ইয়েমেনেও সম্প্রসারিত হয়েছে। তুরস্ক ইসরাইলের সামরিক পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক আইনের রীতিনীতির প্রতি অবজ্ঞাকে শুধু তুরস্কের জন্যই নয়, বরং বৃহত্তর অঞ্চলের জন্যই গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে।
এ ব্যাপারে বিশ্লেষক অ্যারন লুন্ড বলেন, ‘ইসরাইলের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেছে, যা এই অঞ্চলের নেতাদের অস্বস্তিতে ফেলেছে। এমনকি যারা ইসরাইলের সঙ্গে সক্রিয় সংঘাতে জড়িত নয়, তাদেরও। তারা নেতানিয়াহুর ইসরাইলকে একটি বেপরোয়া ষাঁড়ের মতো দেখছে, যেটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পরোয়া করে না।’ তার মতে, ‘গত বছর কাতারে হামাস নেতাদের ওপর হামলা এই অঞ্চলের অন্যান্য রাজধানীতেও বিপদ সংকেত দিয়েছে। এর মধ্যে আঙ্কারাও আছে।’
ইসরাইলের হুমকির জবাবে তুরস্কের নানা পদক্ষেপ এটাই ইঙ্গিত দেয়, আঙ্কারা তার প্রচলিত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং ন্যাটোতে তার অবস্থান কাজে লাগিয়ে ইসরাইলকে প্রতিহত করতে বদ্ধপরিকর। তবে দেশটি এই মুহূর্তে তেল আবিবের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত সতর্কতার সঙ্গে এড়িয়ে চলছে। কিন্তু বিশ্লেষক অ্যারন লুন্ড সতর্ক করে বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা বাড়তে পারে, যা সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারে। আর এর সম্ভাব্য ক্ষেত্রটি হবে সিরিয়া অথবা ভূমধ্যসাগরীয় সীমান্তে।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে লেবানন-সিরিয়া সীমান্ত বরাবর ঘটনাবলি নিবিড় পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। কারণ ইসরাইল-তুরস্ক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর এর গভীর প্রভাব রয়েছে। একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো গোলান মালভূমিতে ইসরাইলি সামরিক অভিযান এবং সিরিয়ার গভীরে ব্যাপক সম্প্রসারণবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা।
যুক্তরাষ্ট্র কী করবে
ইসরাইলের সম্প্রসারণবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষার আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ হিসেবে তুরস্কের ভূমিকা সীমিত করার জন্য ওয়াশিংটনের অবস্থানকে অবশ্যই সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র-তুরস্ক এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো আঙ্কারাকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে ইসরাইলের সক্ষমতাকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সহ্য করে আসছে। কিন্তু তুরস্ক ন্যাটোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং এর অর্থনীতি বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এগুলো তুরস্কের আঞ্চলিক প্রভাব কমানোর লক্ষ্যে ইসরাইলি কৌশলে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি করবে।
এ সম্পর্কে ড. কানের বলেন, ‘মার্কিন সমর্থন ছাড়া তুরস্কের সঙ্গে যুদ্ধ করা ইসরাইলের জন্য খুব কঠিন হবে। ন্যাটোর সদস্যপদ এবং মার্কিন জোটের মতো বিষয়গুলো তুরস্কের ওপর যেকোনো ইসরাইলি আক্রমণকে জটিল করে তুলবে। ইসরাইলের ওপর তুরস্কের প্রচলিত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে গুরুতর কোনো প্রশ্ন নেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘এ বিষয়গুলো একদিকে যেমন ইসরাইলের সীমাবদ্ধতাকে প্রকাশ করে, অন্যদিকে তুরস্কের নিজস্ব কৌশলগত আত্মবিশ্বাসকেও শক্তিশালী করে।’
ড. কানেরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তুরস্ককে মোকাবিলা করার দিকে ইসরাইলের মনোযোগ মূলত নির্ভর করবে ইরানের সঙ্গে সংঘাতটি কীভাবে শেষ হয় তার ওপর। তার মূল্যায়নে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়লে তুরস্কে ইসরাইলের হামলার সম্ভাবনা কমবে। এমন পরিস্থিতি ইসরাইলকে ‘কিছু সময়ের জন্য পিছু হটতে’ বাধ্য করবে।
এর বিপরীতে, তেহরানের সঙ্গে সংঘর্ষে ওয়াশিংটন যদি কেবল ‘ন্যূনতম ক্ষতির’ সম্মুখীন হয়, তবে তেল আবিব তুরস্কের দিকে তার মনোযোগ বাড়াতে চাইবে। তবে ডক্টর কানেরের মতে, দুটি প্রধান কারণে তুরস্কের বিরুদ্ধে ইসরাইলি অভিযানে আমেরিকার সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা কম।
‘প্রথমত, এটি ন্যাটো মিত্রের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলবে এবং দ্বিতীয়ত, ইরান যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে যুক্তরাষ্ট্র কিছু সময়ের জন্য নতুন যুদ্ধ থেকে দূরে থাকতে চাইবে। এই অঞ্চলে ইসরাইলের অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ডের প্রতিপক্ষ হিসেবে তুরস্ক-মিশর-সৌদি আরব-পাকিস্তান জোটের উত্থান আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গতিশীলতার প্রতিনিধিত্ব করে, যা তেল আবিব উপেক্ষা করতে পারে না।’
ড. কানের আরো বলেন, ‘আঞ্চলিক জোট গঠনের উদ্যোগগুলো শক্তিশালী হওয়া ইসরাইলের জন্য সবসময়ই খারাপ খবর। কারণ ইসরাইল চায় আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো বিচ্ছিন্ন থাকুক। কেননা, বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রগুলো সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। তুরস্ক-মিসর-সৌদি আরব-পাকিস্তান জোট একই সঙ্গে দুটি ক্ষেত্রে ইসরাইলের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করে। এটি যুদ্ধের সময় একটি নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি হিসেবে কাজ করবে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থায় এটি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখবে।’
আধিপত্যের সীমাবদ্ধতা
ইসরাইল ও তুরস্কের মধ্যে উত্তেজনা লেভান্ত অঞ্চলের ভারসাম্যে নতুন সংকট সৃষ্টি করবে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গতিপ্রকৃতি ইসরাইলের জন্য আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের একটি সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু তুরস্ক এখন ইসরাইলের এ ধরনের উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে। যদিও ইসরাইল সাময়িক কৌশলগত সুবিধা ভোগ করছে, কিন্তু বৃহত্তর আঞ্চলিক ভারসাম্য এখনও ইসরাইলের অনুকূলে নেই। তুরস্কের প্রচলিত সামরিক শক্তি, ন্যাটো সদস্যপদ এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক এর বড় কারণ।
তুরস্কের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে জড়ানোর ইসরাইলি প্রচেষ্টা যেকোনো বিচারেই ঝুঁকিপূর্ণ হবে। এই ঝুঁকির মধ্যে আছে সিরিয়া বা ভূমধ্যসাগরে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত এবং ওয়াশিংটনের দৃষ্টিকোণ থেকে সংঘাতের সম্ভাব্য সুবিধার চেয়ে ক্ষতি বেশি হলে মার্কিন সমর্থন হারানোর আশঙ্কা। অন্যদিকে, তুরস্ক তার ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, নতুন জোট গঠন এবং আঞ্চলিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে নিজের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ যা ইসরাইলের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দ্য নিউ আরব অবলম্বনে মোতালেব জামালী