প্রায় ৪০ বছর আগে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংগঠন ‘র’-এর ঘোষিত এজেন্ট কালিদাস বৈদ্য কলকাতায় বসে কলকাতার বাংলা দৈনিক আজকালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের হিন্দুদের বাংলাদেশ সরকার ব্যাপক অত্যাচার চালাক, যাতে তারা দলে দলে সেখান থেকে পালিয়ে আসতে শুরু করে। শরণার্থীদের বোঝা বইতে হবে ভারত সরকারকে। ফলে বাধ্য হয়ে তাদের হস্তক্ষেপ করতে হবে। এজন্য বাংলাদেশে ঢাকাসহ বিভিন্ন বড় বড় শহরে কিছু অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।... বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগুক, ব্যাপক হিন্দু নিধন হোক, যাতে এদেশের (ভারতের) সংখ্যাগুরু হিন্দুদের সেন্টিমেন্টকে খুশি করার জন্য ভারত সরকার হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়।’ কালিদাস বৈদ্যের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দৈনিক আজকাল তার তিন সংখ্যায় ছাপে। (দৈনিক আজকাল, কলকাতা, সাক্ষাৎকার গ্রহণ : রঞ্জিত শুর; ২২, ২৩, ২৪ এপ্রিল ১৯৮৯)
কালিদাস বৈদ্যরা শান্তির দেশ, সহনশীলতার দেশ বাংলাদেশে তাদের চাওয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগাতে পারেনি। কিংবা এমন পরিস্থিতিও সৃষ্টি করতে পারেনি যাতে ব্যাপক হারে হিন্দুদের তারা ভারতে নিয়ে যেতে পারে। ফলে ভারতকে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ করাতে এখনো তারা সমর্থ হয়নি। এর বড় কারণ হলো, পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের চেয়ে বাংলাদেশের হিন্দুরা অনেক সুখে-শান্তিতে আছে। এটা আমার কথা নয়, বাস্তবতা এটাই। পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু এবং বাংলাদেশের হিন্দুদের মাথাপিছু আয় এবং জনসংখ্যা অনুপাতে বাংলাদেশে হিন্দুদের চাকরির খতিয়ান নিলেই তা বোঝা যাবে।
কালিদাস বৈদ্যদের এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর ওই একই লক্ষ্যে বৈদ্য বাবুরা এবং ভারতে তাদের সহযোগীরা নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে এবং সেটা হলো বাংলাদেশিদের ভারতে অনুপ্রবেশের কাহিনি তৈরি করা। এই কৌশলের অংশ হিসেবেই বাংলাদেশ থেকে ভারতে লাখো কোটি সংখ্যায় অনুপ্রবেশের বায়বীয় সংখ্যা দেখানো হচ্ছে। ভারতের হিংস্র সংগঠনগুলোর কোয়ালিশন (যার মধ্যে ক্ষমতাসীন বিজেপিও রয়েছে) সংঘ পরিবার ভারতে বাংলাদেশিদের তথাকথিত অনুপ্রবেশ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে পরস্পরবিরোধী গাঁজাখুরি সব তথ্য দিয়ে থাকে। একটা অনলাইন মিডিয়ায় উদ্ধৃত ২০০১ সালের আদমশুমারির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ভারতে ৩০ লাখ অবৈধ বাংলাদেশি রয়েছে। এর কিছু পরেই ২০০৭ সালে সরকারি এক পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে বলে, ভারতে আসা বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা দুই কোটি। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র স্টেট মিনিস্টার রামচন্দ্র বলেন, গত ডিকেডে (২০০১-২০১১) ১৪ লাখ বাংলাদেশি অবৈধভাবে ভারতে এসেছে। বাংলাদেশ থেকে তথাকথিত অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা নিয়ে সবাইকে টেক্কা দিয়েছে সংঘ পরিবারের বজরং দল। দলটি বলেছে, ভারতে তিন কোটি অবৈধ বাংলাদেশি বসবাস করছে। এদের নাকি ভারতীয় পাসপোর্ট রয়েছে এবং ভোটার হিসেবে এরা নির্বাচনগুলোয় ভোটও দিয়েছে। এই প্রোপাগান্ডায় কেন্দ্রের বিজেপি সরকারসহ কোনো কোনো রাজ্য সরকারেরও (যেমন আসাম) অংশ রয়েছে। ভারতের প্রতিটি নির্বাচনের আগে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ স্লোগানে সেখানকার আকাশ-বাতাস মুখরিত হয় এবং বাংলাদেশের সীমান্ত-সন্নিহিত রাজ্যগুলোয় বিদেশি হওয়ার অজুহাতে লাখ লাখ লোককে ভারতীয় ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। এবারও সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি অর্ধকোটিরও বেশি লোককে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। অথচ অনুপ্রবেশের যে অঙ্ক দেখানো হয়, তা একদমই ভুয়া। একজন ভারতীয় মন্ত্রী লোকসভায় বলেছিলেন, ‘There has been a large scale influx of Bangladeshis nationals into India... do not appear to based on facts and are generally exaggerated.’ অর্থাৎ ‘বিরাট সংখ্যায় বাংলাদেশি মানুষ ভারতে ঢুকছে, এটা তথ্যনির্ভর নয় এবং সাধারণত এটা অতিরঞ্জিত হয়ে থাকে।’
অনেক দিন আগে যখন একসময় বাংলাদেশ থেকে বিরাট সংখ্যায় অনুপ্রবেশ নিয়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল, তখন পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুও এমন কথাই বলেছিলেন। তার কথা ছিল, কাজ কিংবা সাংসারিক অন্য কোনো প্রয়োজনে সীমান্তের এপারে-ওপারে যাতায়াত সব দেশেই আছে, আমাদের দেশেও হয়। কাজ শেষে তারা ফিরে যায়। সংখ্যাটা কিছুটা বড় হলে তাদের ফিরিয়েও দেওয়া হয়। যেমন ১৯৭৪ ও ১৯৭৫ সালে তথাকথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিবরণ দিতে গিয়ে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি মন্ত্রী বিপিন পাল দাস বলেন, ৪১ হাজার ৪৭৬ জনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ১৯৮৩ সালের ২৭ এপ্রিল লোকসভার অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রকাশচন্দ্র শেঠি অনুরূপ আর একটি বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, ‘অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি ২৭ হাজার ৭২৪ জনকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে, ২৪ হাজার ৩৪৭ জনকে ত্রিপুরা থেকে এবং পাঁচ হাজার জনকে আসাম থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।’ পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম দিনাজপুর, মালদহ ও মুর্শিদাবাদ থেকে ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৬ সাল নাগাদ তথাকথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর নামে মোট ৩ হাজার ৪৩৯ জনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।
ওপরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া এবং তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো। এগুলোর সবটাই ভারতীয় বক্তব্য। ফেরত পাঠানো সবাই বাংলাদেশি নয়, বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক বিভিন্ন বক্তব্যে তা প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশ আবার তাদের পুশ ব্যাকও করেছে। দৃষ্টান্তগুলো এখানে নিয়ে এলাম এজন্য যে, ভারতে লাখো কোটি বাংলাদেশি অবৈধভাবে বসবাস করছে, এটা একেবারেই মিথ্যা কথা। দৃষ্টান্তগুলো প্রমাণ করছে, বাংলাদেশি দু-চারজন বা কিছু সংখ্যায় ভারতে অবৈধভাবে গিয়েও থাকে, সেক্ষেত্রেও ভারতীয় বক্তব্য অনুসারেই তাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে। ভারতে বসবাস করার মতো বাংলাদেশি কেউ ভারতে নেই। পশ্চিমবঙ্গের ধর্মভিত্তিক জনসংখ্যা শুমারিও এই কথাই বলছে। শুভনীল চৌধুরী ও শাশ্বত ঘোষ তাদের ‘অনুপ্রবেশের তথ্য আসলে ধাপ্পাবাজি’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলছেন, ‘১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে হিন্দু জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার ছিল ১৪.২ শতাংশ, যা ২০০১ থেকে ২০১১ সালে কমে হয় ১০.৮ শতাংশ, একই সময়ে মুসলমানদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ২৫.৯ শতাংশ থেকে কমে ২১.৮ শতাংশ। অর্থাৎ সম্প্রদায় নির্বিশেষে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এই সময়কালে হ্রাস পেয়েছে—হিন্দুদের ক্ষেত্রে ৩.৪ শতাংশ এবং মুসলমানদের ক্ষেত্রে ৪.১ শতাংশ।’ নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, ‘যারা বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে আসছেন, তাদের মধ্যে যারা দুর্গাপূজা করেন তারা শরণার্থী, আর যারা করেন না তারা অনুপ্রবেশকারী।’ অর্থাৎ অনুপ্রবেশকারী মানে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ। পরিসংখ্যান বলছে, রাজ্যে ধর্মের ভিত্তিতে তৈরি শুমারিতে কোনো তারতম্য ঘটে নেই, বিপুল পরিমাণে অনুপ্রবেশকারী রাজ্যে প্রবেশ করলে যা ঘটত।
কেউ হয়তো বলতে পারেন, বিশেষত সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর ক্ষেত্রে লুকিয়ে আছে অনুপ্রবেশের তত্ত্বের প্রয়োজনীয় তথ্য। শুমারি রিপোর্ট থেকে বিষয়টা পরখ করে দেখা যেতে পারে। নিচে এ বিষয়ে একটা ছক দেওয়া হলো—
পশ্চিমবঙ্গের গড় ধর্মভিত্তিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের সঙ্গে জেলাভিত্তিক হারের তফাত, হিন্দু ও মুসলমানদের ক্ষেত্রে (২০০১-২০১১)
এই ছকের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে শুভনীল চৌধুরী ও শাশ্বত ঘোষ তাদের প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘প্রথমে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর দিকে তাকানো যাক। দেখা যাচ্ছে, সেই জেলাগুলোয় (কোচবিহার, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নদিয়া, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি) জনসংখ্যা বৃদ্ধির কোনো নির্দিষ্ট একটি প্রবণতা নেই। একদিকে যেমন উত্তর দিনাজপুরে মুসলমানদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার রাজ্যের মুসলমানদের গড়ের তুলনায় আট শতাংশ কিছু বেশি, সেখানে নদিয়ায় তা প্রায় চার শতাংশ বিন্দু কম, দক্ষিণ দিনাজপুরে ৭.৫ শতাংশ বিন্দু কম। দ্বিতীয়ত, যে জেলায় মুসলমানদের বৃদ্ধির হার রাজ্য গড়ের তুলনায় বেশি, সেখানে হিন্দুদের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে; যেমন উত্তর দিনাজপুর, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা প্রভৃতি। আবার যেখানে মুসলমানদের বৃদ্ধির হার এই সম্প্রদায়ের রাজ্য গড়ের তুলনায় কম, সেই জেলাগুলোয় হিন্দুদের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। তৃতীয়ত, পুরুলিয়ার মতো জেলাও রয়েছে, যা সীমান্তবর্তী জেলা না হওয়া সত্ত্বেও এই জেলায় মুসলমান ও হিন্দু উভয়েরই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিজ নিজ রাজ্যের রাজ্য গড়ের তুলনায় বেশি। এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে কিছু সিদ্ধান্তে খুব সহজেই পৌঁছানো সম্ভব। প্রথমত, সীমান্তবর্তী জেলাগুলো অনুপ্রবেশকারীতে ভরে গেছে, এই বক্তব্যের কোনো সারবত্তা নেই। কারণ এই জেলাগুলোয় কোনো একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের জনসংখ্যার হ্রাস-বৃদ্ধিকে কোনো নির্দিষ্ট ছকে ফেলা সম্ভব হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, ধার্মিক পরিচয়ের তুলনায় অন্য কয়েকটি সূচক অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন যে জেলাগুলোয় হিন্দু ও মুসলমান উভয়েরই বৃদ্ধির হার রাজ্য গড়ের তুলনায় অনেকটা বেশি, সেই জেলাগুলোয় সাক্ষরতার হার অন্য জেলাগুলোর তুলনায় অনেক কম। স্বাক্ষরতার নিরিখে উত্তর দিনাজপুরের স্থান সবার নিচে। তার ঠিক ওপরেই রয়েছে মালদহ, পুরুলিয়া ও মুর্শিদাবাদ। আবার অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকা জেলা, যেমন কলকাতা, হাওড়া, হুগলি বা উত্তর ২৪ পরগনা উভয় সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার নিজ নিজ রাজ্য গড়ের থেকে কম। সাক্ষরতার নিরিখে এই জেলাগুলোর স্থান অনেক ওপরে। কলকাতায় মুসলমানদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শূন্য এবং কলকাতার জন্মহার ভারতের ৬৪০টি জেলার মধ্যে বর্তমানে সর্বনিম্ন (১.২ সন্তান প্রতি দম্পতি)।
বলা যায়, ধর্মীয় সূচকের চেয়ে সাম্প্রতিককালে মানুষের আর্থিক অবস্থা, সামাজিক পশ্চাৎপদতা প্রভৃতি ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বিষয় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারতে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধির যে প্রশ্ন তোলা হয়, সে প্রশ্ন যদি ধরা যাক যথার্থও হয়, তাহলে এর সঙ্গে ধর্ম পরিচয় বিষয় নয়, মুসলমানদের আর্থিক অবস্থা, সামাজিক পশ্চাৎপদতার প্রশ্নই বেশি জড়িত। ভারতে মুসলমানদের আর্থসামাজিক অবস্থা বলা যায় উদ্বেগজনক। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের মধ্যে ১৭.৩ শতাংশ পরিবার নিরক্ষর এবং আরো ১১.৮ শতাংশ পরিবারের সদস্যরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হতে পারেনি। ৮০ শতাংশ মুসলমানদের জীবিকা নির্বাহ করতে হয় কায়িক শ্রম ও দিনমজুরির মাধ্যমে। মুসলমানদের মাত্র ১৭ শতাংশ মানুষ শহরে বসবাস করেন এবং ডাক্তারি, ওকালতি বা অধ্যাপকের পেশায় আছে মাত্র ০.৪ শতাংশ মুসলমান। এই অবস্থায় অন্য সুবিধাভোগী সম্প্রদায়ের তুলনায় মুসলমান জনসংখ্যার জন্মহার বেশি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের জন্মহার কমেছে (২০০১ থেকে ২০১১)। এই পরিসংখ্যান মুসলমানদের মর্মান্তিক অবস্থার ইঙ্গিত দেয়।
খোদ ভারতীয় মুসলমানদের এই অবস্থার মধ্যে বাংলাদেশের লাখো কোটি মানুষ গিয়ে ভারতে বসতি গাড়বে, এর চেয়ে গাঁজাখুরি চিন্তা আর কিছু হতে পারে না। বিস্ময়ের ব্যাপার—বিজেপি, আরএসএস, বজরং প্রভৃতির মতো ভারতে হিংসার চাষকারী দল নিয়ে যে সংঘ পরিবার গঠিত, তারা বলছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশি যারা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল, তারা অব্যাহতভাবে ভারতে বাস করেই চলছে (Bangladeshis have taken refuge in India, and continue to live here even 43 years after the Bangladesh war)। এটা জঘন্য একটা মিথ্যাচার। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারতে যারা আশ্রয় নিয়েছিল, তারা সবাই ১৯৭২ সালের শুরুতেই বাংলাদেশে ফিরে এসেছে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকেই এটা ঘোষণা করা হয়েছে। ১৯৭২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ভারত সরকারের এক স্টেটমেন্টে বলা হয়, মোট আশ্রয়প্রাপ্তদের সংখ্যা ছিল ৯৮ লাখ ৯৯ হাজার ৩০৫ জন। ওই তারিখের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরে যায় ৮৭ লাখ ৭ হাজার ১৮ জন। অবশিষ্ট থাকে ১১ লাখ ৯২ হাজার ২৮৭ জন। আর এক তথ্যে জানা যায়, ১৯৭২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে ফিরে যাওয়া লোকদের সংখ্যা ৯১ লাখ ৫৭ হাজার ৩৭৩ জন। অবশিষ্ট থাকে ৭ লাখ ৪১ হাজার ৯৩২ জন। ১৯৭২ সালের ২ মার্চ ভারত সরকারের এক প্রেস নোটে জানা যায়, অবশিষ্ট আশ্রয় গ্রহণকারীরাও বাংলাদেশে ফিরে গেছে।
বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক হিন্দুদের ব্যবহার (কলকাতার দৈনিক আজকাল-এ রঞ্জিত শুরের রিপোর্ট) করে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে ব্যর্থ হয়ে ভারতের ‘সংঘ পরিবার’-এর ষড়যন্ত্রকারীরা বিকল্প হিসেবে ভারতের বিশেষ করে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কয়েকটি রাজ্যের মুসলমানদের টার্গেট করেছে। তাদের একটি বড় অংশকে বাংলাদেশের অনুপ্রবেশকারী এবং বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ বসবাসকারী হিসেবে চিহ্নিত করছে।
পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরার লাখো কোটি বাংলাভাষী ও অসমীয়া ভারতীয় নাগরিক মুসলমানদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে, দিচ্ছে। সংঘ পরিবারের বজরং দল বলছে—‘Our organization's agenda does not give any respite to Bangladeshis. As per government statistics, Their around three crore Bangladeshis in India. They must all leave. There is no question of them converting to Hinduism (if they leave India). Because of them, unemployment and crime rates have risen. They indulge in anti-national activities.... They have ration cards and voter IDs. Nothing will legalize their stay in India. They have to go.’ অর্থাৎ, ‘আমাদের সংগঠনের কাজ হলো বাংলাদেশিদের নিঃশ্বাস ফেলার অবসর না দেওয়া। প্রায় তিন কোটি বাংলাদেশি ভারতে আছে। তাদের ভারত ছাড়তে হবে। তারা চলে গেলে তাদের আর হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত করার দরকার হবে না। তারা ভারতে অপরাধ বাড়াচ্ছে, জাতিদ্রোহী কাজে জড়িত আছে তারা। তাদের রেশন কার্ড, তাদের আইডি কার্ড কিছুই তাদেরকে ভারতে বাস করার আইনি অধিকার দেবে না, তাদের চলে যেতেই হবে।’
এসব কথা একেবারেই গাঁজাখুরি; কিন্তু এর পরিষ্কার বার্তা হলো বাংলাভাষী ভারতীয় নাগরিকদের তারা বাংলাদেশি সাজিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দিতে চায়। তারা চায় বাংলাদেশের সঙ্গে বিরোধ বাধাতে এবং বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে। তারা সম্ভব হলে বাংলাদেশকে সিকিম বানাতে চায়।
ভারতের উগ্রবাদী রাজনীতিবিদদের এই লক্ষ্য বলা যায় আমাদের স্বাধীনতার মতোই পুরোনো। যে যে কারণে তারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সাহায্য করেছিল, তার মধ্যে এই মতলবও একটি ছিল। ভারতের প্রাচীন ও দায়িত্বশীল দৈনিক Statesman তার ‘Reunion of India’ প্রবন্ধে সে সময় লিখেছিল—‘Now is the time to work for a united states of India with the merger of the country Bangladesh...’
কলকাতার আনন্দবাজার গ্রুপের ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ তার একটা নিবন্ধের শিরোনাম দিয়েছিল—‘Bangladeshis are voting against Partition with their feet.’ নিবন্ধে বলা হয়েছিল, ‘তারা (বাংলাদেশি মুসলমানরা) ভারতের সঙ্গে পুনর্মিলিত হচ্ছে। কারণ যখন তারা তাদের সন্তানের চোখ দিয়ে অবলোকন করেছে, দেখেছে ধ্বংস এবং জীবনবিনাশী হতাশা, তখন তারা ভালোভাবেই বুঝেছে—পাকিস্তান স্বপ্ন ছিল না, ছিল আগুনবর্ষণকারী দানব। পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান করেছে ১৯৭১ সালে,... দ্বিতীয়বার তারা প্রত্যাখ্যান করেছে দেশ বিভাগকে। পাকিস্তান ছিল প্রথম স্বপ্ন, দ্বিতীয় স্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল বাঙালি মুসলিম জাতীয়তাবাদ, যা রূপ পেয়েছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্রে। এই দ্বিতীয় স্বপ্ন বাংলাদেশকেও তারা আজ প্রত্যাখ্যান করছে।’
ভারতের সংবাদপত্রগুলো যে মানসিকতা থেকে এই কথাগুলো লিখেছে, ভারতের রাজনীতিকরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র সম্পর্কে সেই একই মানসিকতা পোষণ করে। লাখো কোটি বাংলাদেশির ভারতে অনুপ্রবেশ, বসবাস এবং লাখো কোটি বাংলাভাষী ভারতীয়দের বাংলাদেশি সাজানোর মতো ভারতীয় উগ্রবাদী হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকদের ঘৃণ্য তৎপরতার মধ্যে এই মানসিকতারই প্রকাশ দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু তাদের কোনো ষড়যন্ত্র এই পর্যন্ত সফল হয়নি। বাংলাদেশের মানুষ সচেতন, সংগ্রামী এবং সব ষড়যন্ত্র সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে তারা আপসহীন। তাদের ন্যায্য অধিকারের বিরুদ্ধে যারাই দাঁড়াক, তাদের মোকাবিলায় বাংলাদেশিরা এক এবং ঐক্যবদ্ধ। ১৯৪৬, ’৫২, ’৫৪ ও ’৭১-এ তারা এটা দেখিয়েছে। অতি সম্প্রতি তারা তা দেখাল ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে। সবকিছুর মালিক আল্লাহ ছাড়া কারো প্রতি তাদের ভয় ও ভরসা নেই। তাদের এই সংগ্রাম ও সংগ্রামী চেতনার নেই ক্ষয়, নেই কোনো পরাজয়।
লেখক : সম্পাদক, গবেষক