হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

মফস্বল সাংবাদিকতার সংকট

মো. নাজমুল ইসলাম পিন্টু

প্রতীকী ছবি

মফস্বল বা তৃণমূল পর্যায়ের সাংবাদিকতা একসময় ছিল সমাজের নির্ভরতার অন্যতম প্রধান জায়গা। গ্রামের ভাঙা রাস্তা, নদীভাঙন, দুর্নীতি, প্রশাসনিক অনিয়ম কিংবা সাধারণ মানুষের নানা ধরনের দুর্ভোগ—এসব বিষয় প্রথম আলোচনায় আসত মফস্বল সাংবাদিকদের হাত ধরেই। স্থানীয় পর্যায়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো দেশের মূলধারার গণমাধ্যমে পৌঁছাতে মফস্বল সাংবাদিকদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই পেশাটি আজ নানা সংকট, বিতর্ক ও নেতিবাচক ধারণার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। ফলে একদিকে যেমন প্রকৃত সাংবাদিকরা বিব্রত হচ্ছেন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মাঝেও সাংবাদিকতা নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে।

বর্তমানে মফস্বল সাংবাদিকতার বড় একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে তথাকথিত কার্ডধারী সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য। হাতে স্মার্টফোন, গলায় বড় অক্ষরে লেখা ‘সাংবাদিক’ পরিচয়পত্র এবং কথাবার্তায় প্রভাবশালী ভাব দেখলে মনে হয় তারা পেশাদার সংবাদকর্মী। কিন্তু বাস্তবে তাদের অনেকেরই নেই ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা, সাংবাদিকতার মৌলিক ধারণা কিংবা পেশাগত নৈতিকতা। অথচ এই পরিচয়পত্রের আড়ালেই একটি শ্রেণি স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। মফস্বলের পাড়া-মহল্লা, বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ, থানা কিংবা সরকারি অফিসে এখন প্রায়ই এমন ভুঁইফোঁড় সাংবাদিকদের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। কোনো জমিবিরোধ, ছোটখাটো অনিয়ম কিংবা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করেও দ্রুত হাজির হয়ে যায় তারা। কখনো সমস্যা সমাধানের নামে, কখনো আবার সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে শুরু হয় দেনদরবার। এর ফলে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তারাও প্রায়ই বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো, কিছু অসাধু ব্যক্তি সাংবাদিকতার মতো মর্যাদাপূর্ণ পেশাকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করে স্থানীয় পর্যায়ে এক ধরনের ভয়ভীতি ও প্রভাবের সংস্কৃতি তৈরি করছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রকৃত সাংবাদিকতার মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা।

এই সমস্যার পেছনে বড় কারণ হলো সাংবাদিক পরিচয়পত্রের সহজলভ্যতা। নামসর্বস্ব অনলাইন পোর্টাল কিংবা অচেনা কিছু তথাকথিত সংবাদমাধ্যম থেকে অল্প টাকার বিনিময়ে আইডি কার্ড সংগ্রহ করা এখন অত্যন্ত সহজ। কয়েকশ বা হাজার টাকার বিনিময়ে রাতারাতি কেউ কেউ ‘সাংবাদিক’ হয়ে যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে সংগঠন গড়ে নিজেরাই পদ-পদবি ব্যবহার করে প্রভাববিস্তারের চেষ্টা করছেন। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে সমাজে সাংবাদিকতা পেশার প্রতি বিরূপ ধারণা তৈরি হচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠা, সততা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করা প্রকৃত সাংবাদিকদের জন্য পরিস্থিতি দিন দিন আরো বিব্রতকর হয়ে উঠছে। সমাজে সাংবাদিকদের প্রতি যে নেতিবাচক ধারণা গড়ে উঠছে, তার বড় অংশের দায় বর্তায় এসব অপেশাদার ও ধান্ধাবাজ চক্রের ওপর। এমনকি প্রকৃত সাংবাদিকরাও অনেক সময় একই চোখে দেখা হচ্ছেন, যা পেশার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

তবে মফস্বল সাংবাদিকতার সংকট শুধু ভুঁইফোঁড় সাংবাদিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে আরো গভীর ও কাঠামোগত সমস্যা। অনেক জাতীয় গণমাধ্যম তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ দিলেও তাদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বেতন কিংবা আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হলেও তাদের ওপর বিজ্ঞাপন সংগ্রহ কিংবা মাসোহারা আনার চাপ প্রয়োগ করা হয়। ফলে জীবিকার তাগিদে অনেকেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও আপস করতে বাধ্য হন। এতে সাংবাদিকতার মূল নীতিমালা ও পেশাগত স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একইসঙ্গে সাংবাদিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের অভাবও একটি বড় সমস্যা। সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি, তথ্য যাচাই, সংবাদ লেখার কাঠামো কিংবা নৈতিক মানদণ্ড সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকায় অনেকেই দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হন। ফলে সংবাদ পরিবেশনে বস্তুনিষ্ঠতা নষ্ট হয়, বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং মানুষের আস্থা কমতে থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, ব্যক্তিগত মতামত বা গুজবকে সংবাদ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা সামগ্রিকভাবে পেশার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে।

মফস্বল সাংবাদিকদের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপত্তাহীনতা। স্থানীয় প্রশাসন কিংবা প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির খবর প্রকাশ করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিক হামলা, মামলা ও হুমকির শিকার হন। অনেক সময় জীবন ও জীবিকার ঝুঁকি মাথায় নিয়েই তাদের কাজ করতে হয়। এই চাপ ও ভয় অনেক সময় সত্য প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে সত্য গোপন করেন, আবার কেউ কেউ প্রভাবশালী মহলের চাপে আপস করেন। এতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

তবুও বাস্তবতা হলো, দেশের বড় বড় দুর্নীতি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ বহু তথ্য প্রথম উঠে আসে মফস্বল সাংবাদিকদের হাত ধরেই। শহর থেকে বহু দূরে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে থেকেও তারা দিনরাত ছুটে বেড়ান তথ্যের সন্ধানে। তাদের পাঠানো তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই জাতীয় গণমাধ্যম অনেক সময় বড় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। কিন্তু এই শ্রম ও অবদান অনেক সময় ঢাকা পড়ে যায় কিছু অসাধু ব্যক্তির কর্মকাণ্ড এবং কাঠামোগত অবহেলার কারণে। ফলে পুরো মফস্বল সাংবাদিক সমাজই এক ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির শিকার হয়, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

মফস্বল সাংবাদিকতার এই সংকট কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন সাংবাদিক নিয়োগে কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণ, নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে সাংবাদিক পরিচয়পত্র প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও যাচাই-বাছাই অপরিহার্য। তথ্য মন্ত্রণালয়, প্রেস কাউন্সিল এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি থাকাও জরুরি। পাশাপাশি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দায়িত্বশীল হতে হবে যেন তারা নামসর্বস্ব প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়ে পেশার মান ক্ষুণ্ণ না করে। কারণ তৃণমূলের এই সংবাদকর্মীরাই দেশের প্রতিটি প্রান্তের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। তাদের পেশাগত মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা গেলে মফস্বল সাংবাদিকতা আবারও হারানো আস্থা ও সম্মান ফিরে পেতে পারে। একই সঙ্গে দেশের গণতন্ত্র, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় আরো শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

লেখক : সাংবাদিক

ন্যাটোতেও ভাঙন ধরাচ্ছে ইরান যুদ্ধ

জেলা পরিষদ উন্নয়ন না পুনর্বাসন

হরমুজ : ভূরাজনীতির অগ্নিপথ

ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়ার ফল

প্রতিরোধের রাজনীতি ও ভাষার বিবর্তন

জুলাই সনদ ও জাতীয় ঐক্য

জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় জনগণের অংশগ্রহণ

দখল ও সংঘাতপ্রিয় একটি রাষ্ট্র

এক-এগারোর দুঃসময় ভোলা যাবে না

শিক্ষা বোর্ড ও বছরভেদে পরীক্ষার ফলে তারতম্য কতটা যৌক্তিক