হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

গণভোট বাতিলের পরিণতি

মো. হারুন-অর-রশিদ

প্রতীকী ছবি

ক্ষমতায় গিয়ে সুর পাল্টানো, ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য আইনের ফাঁকফোকর খোঁজা, দুর্নীতি লুটপাট অব্যাহত রাখার অভিপ্রায়ে ভিত্তিহীন অজুহাত এনে সংস্কার এড়িয়ে যাওয়া কিংবা জনগণের রায়কে অবজ্ঞা করে নিজস্ব মতামত চাপানোর চেষ্টা-এসবই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে পুরোনো ফ্যাসিবাদী আমলকে। জুলাই বিপ্লব, দেশপ্রেমী গণমানুষের আন্দোলন, অনেক আত্মাহুতি, পঙ্গুত্ব অন্ধত্ববরণের মূল উদ্দেশ্যই ছিল নতুন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা, নতুনভাবে পথচলা। দেশের আইন-আদালত-সংবিধান-সবকিছুর ঊর্ধ্বে জনগণ। জনগণের কল্যাণের জন্যই এসব আয়োজন। সংবিধানের যে ধারাগুলোর সঙ্গে দলীয় স্বার্থ জড়িত, সেগুলো মানা আর যেগুলো দলীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে যাচ্ছে, সেসব বাস্তবায়নে বিরোধিতা করা বিপজ্জনক বার্তা দিচ্ছে। এই দ্বিচারিতা দেশকে আবার এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অর্থনীতির বেহাল দশা থেকে দেশকে রক্ষায় আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ঐক্য। গণভোটসহ বিভিন্ন সংস্কার বিষয়ে বর্তমান সরকারের অবস্থান সে ঐক্যে বিরাট ফাটল ধরিয়েছে। যে সংসদের টু থার্ড মেজরিটি নিয়ে বিএনপি আজ গণভোট আর ৬৯ শতাংশ মানুষের রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে সেই সংসদ নির্বাচনটাই তো সংবিধান মেনে হয়নি। একই দিনে একই তফসিলে দুটো নির্বাচন হলো, একটি অবৈধ হলে আর একটি বৈধ হয় কী করে? জুলাই সনদের বিভিন্ন ইস্যুতে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট ছিল একটি দলের, জনগণের নয়। জনগণ সর্বসম্মতিক্রমে গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে ভোট দিলে একটি দল কি তাকে উপেক্ষা করতে পারে? বিশেষ করে, যখন হ্যাঁ ভোট দেওয়া জনগণের সংখ্যা দলের প্রাপ্ত ভোটের চেয়ে অনেক বেশি হয়?

বিভেদ আর বিতর্ক শুধু গণভোট আর মৌলিক কিছু সংস্কারে সীমাবদ্ধ নয়। সংসদের বাইরেও সরকারের বেশ কিছু কর্মকাণ্ড বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিতর্কের শুরু বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ নিয়ে । আমাদের মতো হতো দরিদ্র, ঋণে জর্জরিত, বিশাল জনগোষ্ঠীর এই দেশে এই পদে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক মানের কোনো ব্যক্তিত্ব কি বাংলাদেশে ছিল না?

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়য়ে ভিসি নিয়োগ, সিটি করপোরেশনগুলোয় দলীয় প্রশাসক নিয়োগ, ক্রিকেট বোর্ডে প্রভাবশালীদের পরিবারের সদস্যদের নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে জনমনে গভীর শঙ্কা তৈরি করেছে।

ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে-‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’, যার অর্থ হলো-‘সকালই বলে দে দিনটা কেমন যাবে’। শুরুই যদি হয় এত বিতর্কিত কর্মকাণ্ড দিয়ে, তাহলে সরকারের দেশ পরিচালনার উদ্দেশ্য নিয়ে জনমনে সন্দেহ দানা বাঁধাই স্বাভাবিক। দলীয় সরকার দলীয় লোকদের নিয়োগ দেবে, সেটা স্বাভাবিক কিন্তু অস্বাভাবিক যখন দলেরও যোগ্যদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদের গুরুত্বপূর্ণ সব পদে বসানো হয়।

২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারকে গদিছাড়া করার পর দেশের মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিল। নতুন নতুন আশা নিয়ে বুক বাঁধতে শুরু করেছিল। এবার রাষ্ট্রকাঠামোয় সত্যিকারের পরিবর্তন আসবে। জনদরদি এক সরকার এসে ব্যক্তি আর দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ আর মানুষের জীবনমান উন্নয়নে আটঘাট বেঁধে নামবে। উন্নয়নের জোয়ার বইবে। দেশ শুধু পোশাক রপ্তানির ওপর আর নির্ভরশীল থাকবে না। শিল্পায়ন হবে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। আমাদের তরুণদের বেকারত্বের কষ্ট নিয়ে বছরের পর বছর দিন গুনতে হবে না। জীবিকার খোঁজে ঝোপজঙ্গল মাড়িয়ে কিংবা সাগর পাড়ি দিয়ে বিদেশ যেতে গিয়ে লাশ হতে হবে না। বিদেশ যেতে দালালের খপ্পরে পড়ে জমিজমা বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হতে হবে না। দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। বিচারের জন্য আদালতের দরজায় বছরের পর বছর আর ধরনা দিতে হবে না। অবিকল স্বপ্নপুরী না হলেও এমন এক দেশ হবে, যেখানে আমরা মানমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকব। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে এক বিন্দু ছাড় না দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশটাকে এগিয়ে নেব।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক আলোচনা সভায় বলেছিলেন, ‘১৯৭১-এ আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি আর ২০২৪-এ পেলাম সার্বভৌমত্ব ।’ গণঅভ্যুত্থানের পর তারেক রহমান প্রায়ই নেতাকর্মীদের সঙ্গে অনলাইন মিটিং করতেন। কর্মীদের সুসংহত করা, জনগণের সঙ্গে মিশে গিয়ে সুসম্পর্ক স্থাপন করা, একটা জনবান্ধব সমাজ, জনবান্ধব দেশ কেমন হবে, তার জন্য নেতাকর্মীদের ত্যাগ-তিতিক্ষা কেমন হবে এসবের ধারণা দিতেন, নানা দিকনির্দেশনা দিতেন। তিনি দেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী এটা আমলে নিয়ে দেশবাসীও তার সেসব কথাবার্তা খুব আগ্রহ নিয়ে শুনতেন। মনে হতো তিনি দেশ ও জনগণের স্বার্থে এক বিন্দু ছাড় দেবেন না। ঋণখেলাপি, চাঁদাবাজ, দলবাজদের দিন শেষ হয়ে যাবে। অনেকে আশা করেছিল তার নেতৃত্বে তারা নতুন এক স্বপ্নের বাংলাদেশ পাবে। কিন্তু সে স্বপ্ন এখন যেন দিবাস্বপ্নে পরিণত হতে চলছে।

রাজনীতির মাঠে একটা কথা খুব প্রচলিত ‘দ্য পিপল হ্যাভ স্পোকেন’-এটাকে অন্যভাবে বললে বলা যায় যে ‘ডিসিশন ইজ অলরেডি মেড’ । গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত করে জনগণ যে পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে, তাকে অস্বীকার করার ফল ভালো হবে না। নতুন প্রজন্ন আবার তাকে সামনে আনবে । তখন তাদের আত্মত্যাগ হয়তো ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের চেয়ে অনেক বেশি হবে।

লেখক : প্রবাসী

আমেরিকার সমাজে বন্দুক সহিংসতা

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ : ধ্বংসস্তূপে মানবতার আর্তনাদ

সংসদে মধুরালাপ রাজপথে কিরিচের কোপ

মার্কিন বাহিনীতে ভর্তির বয়স কেন ৪২ করা হচ্ছে

সফল নেতৃত্বের যোগ্যতা ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

ওয়াজেদ আলী খান পন্নী : জাতীয় মুক্তির সিপাহসালার

লুটপাটের মেগা প্রকল্প যখন জনগণের গলার কাঁটা

চিত্তরঞ্জন সুতারের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে শিক্ষা

ন্যায়ের শাসন না ‘মগের মুল্লুক’

নেতানিয়াহু কোত্থেকে পেলেন গণহত্যার লাইসেন্স