হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের মে ২০২৬ সংখ্যায় আরাকান আর্মির হাতে নিহত ১৭০ রোহিঙ্গা মুসলিম হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে তারা সংখ্যাটি ১৭০-এর চেয়ে অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা করলেও প্রমাণের অভাবে তারা আসল সংখ্যাটি প্রকাশ করতে পারেনি। তারা এই হত্যাকাণ্ডে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পেয়েছে। প্রতিবেদনটি ২০২৪ সালের ২ মে সকালে ঘটে যাওয়া এক নারকীয় বর্বরতার তথ্য-প্রমাণ হাজির করেছে যেখানে, উত্তরাঞ্চলের বুথিডং শহরের নিকটবর্তী হোয়ার সিরি গ্রামের পলায়নরত পুরুষ-নারী-শিশু-বৃদ্ধনির্বিশেষে রোহিঙ্গা মুসলমানদের আরাকান আর্মি ঠান্ডা মাথায় হত্যা করে। ঘটনার প্রতিবেদনে আরো লেখা হয়, এই বর্বরতা প্রকাশ্যে আসতে এক বছর সময় লাগে, যেহেতু আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা ‘দি ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান’ সাক্ষীদের হুমকি দেওয়ার মাধ্যমে সত্য ঘটনা আড়াল করতে সচেষ্ট ছিল এবং তারা ঘটনার অনেক প্রত্যক্ষ সাক্ষীকে বিদেশি সংবাদমাধ্যমে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করে।
ঘটনার বিবরণে আরো জানা যায়, নির্বিচার এই হত্যাকাণ্ডের শিকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের মিয়ানমার সেনাবাহিনী জোর করে রিক্রুট করত এবং এর ফলে আরাকান আর্মির সঙ্গে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সাম্প্রদায়িক সংঘাতের সৃষ্টি হয়। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের এক মাস আগে হোয়ার সিরি গ্রামের নিকটস্থ মিয়ানমার আর্মির সেনাক্যাম্পে কর্মরত একজন ক্যাপ্টেন আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য ২০ রোহিঙ্গা সদস্য পাঠাতে বলেন। গ্রামের নেতৃস্থানীয়রা তাতে রাজি হননি । ফলে তাদের ভয়ভীতি দেখানো হয়, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। আর তাদের কথামতো রোহিঙ্গা পাঠালে আরাকান আর্মির আক্রমণ থেকে সম্পূর্ণ নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া হয়।
কিন্তু প্রকৃত ঘটনা ছিল ভিন্ন ধরনের। আরাকান আর্মির ক্রমবর্ধমান সাফল্যের মধ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বার্মান বা বামার অফিসার এবং রাখাইন সৈনিকদের মধ্যে গোষ্ঠীগত সম্পর্কের অবনতি ঘটে। তারা ব্যাপকহারে সেনাবাহিনীর পক্ষ ত্যাগ করে আরাকান আর্মিতে যোগ দিলে সেনাবাহিনীতে জনবল সংকট দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে একান্ত বাধ্য হয়ে ১২ রোহিঙ্গা মুসলমান নিকটস্থ মিয়ানমার সেনাক্যাম্পে যোগ দেয়। শুধু নিরীহ রোহিঙ্গা মুসলমানদের দলে ভেড়ানোর মধ্যেই তারা তাদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ রাখেনি, মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন সামরিক শাখার সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে তোলে, যাদের মধ্যে আরাকান রোহিঙ্গা স্যাল্ভেশন আর্মি বা আরসা অন্যতম। একটি নাগরিকত্বহীন, দেশহীন, ভূমিহীন জনগোষ্ঠীর জন্য বাধ্য হয়ে এত কিছু করার মূল কারণ ছিল প্রতিশ্রুত নিরাপত্তা। তাই বুথিডং শহরাঞ্চলে আক্রান্ত মুসলমান রোহিঙ্গারা অধিকতর নিরাপদ ভেবে হোয়ার সিরি গ্রামে আশ্রয় নেয়। কারণ হোয়ার সিরি গ্রামটি মায়ু নদীর নিকটবর্তী বুথিডং-রাথেডং সড়কের পাশে, উত্তরে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ১৫ মিলিটারি অপারেশন কমান্ড এবং দক্ষিণ-পূর্বে, ৫৫১ লাইট ইনফেন্ট্রি ব্যাটালিয়নের মধ্যবর্তী অবস্থানে অবস্থিত।
সেদিনের পৈশাচিক এই হত্যাকাণ্ডে বেঁচে যাওয়া এবং লুকিয়ে থাকা ৪১ প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, ভূ-উপগ্রহের ছবি, মোবাইলে ধারণ করা কিছু ভিডিও এবং ছবি থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ হয়, সেদিন রোহিঙ্গাদের ওপর যখন নরক নেমে আসে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী নিরীহ রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাঁচানোর কোনো চেষ্টা করেনি। উপরন্তু তাদের হাতেও রোহিঙ্গাদের রক্তের দাগ লেগে আছে। যদিও আরাকান আর্মি সব অভিযোগ শুধু অস্বীকার করেনি, তারা এই প্রতিবেদনকে মিথ্যা প্রমাণ করতে সাজানো সাক্ষী হাজির করতেও পিছপা হয়নি। তারা শুধু মিথ্যাচার করেই থেমে থাকেনি, হিউমেন রাইটস ওয়াচের করা একাধিক প্রশ্নের উত্তরে তারা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যুদ্ধকালীন সময়ে জেনেভা কনভেনশনে উল্লিখিত আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ব্যবহার করার কথা জানিয়ে যেকোনো আইনভঙ্গের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। হোয়ার সিরি গ্রামে ঘটে যাওয়া ঘটনায় তারা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ‘অভিযান পূর্ব সতর্কীকরণ, সামঞ্জস্য এবং স্পষ্টতা’ বজায় রাখার দাবি করে। তারা আরো দাবি করে, মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে মিলে তারা অভিযানের আগে গ্রামটি যৌথভাবে খালি করে’। অথচ হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন মোতাবেক এই দাবিগুলোর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি, বরং এটি ছিল রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি পদ্ধতিগত জনগোষ্ঠী নির্মূলীকরণ অভিযান, যেখানে আরাকান আর্মির মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর আচরণের কোনো পার্থক্য ছিল না। ২০১৭ সালে মিয়ানমার আর্মি যেমন রোহিঙ্গা নিধন করেছে, পরে বিদ্রোহী আরাকান আর্মিও ঠিক একইভাবে অনেক দিন ধরে রোহিঙ্গা নিধন করে আসছে।
রোহিঙ্গারা কি আসলেই বহিরাগত-ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ওপরে বর্ণিত ঘটনা প্রমাণ করে, বাস্তুচ্যুত ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর অঙ্কটা অত্যন্ত জটিল আকার ধারণ করেছে। রোহিঙ্গারা এমনিতেই ১৯৮২ সালের মিয়ানমার নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী, নাগরিকত্ব হারিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্ভাগা জাতিতে পরিণত হয়েছে, যাদের নিজস্ব কোনো রাষ্ট্র নেই। এ ব্যাপারে মিয়ানমার জান্তা সরকার থেকে শুরু করে স্বল্পকালীন ক্ষমতায় থাকা অং সান সু চির তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকারের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রোহিঙ্গা মুসলমান তথা মুসলমান সম্প্রদায়ের, মিয়ানমারে বসবাসের শুরু অষ্টম শতকের দিকে। আরাকান অঞ্চলটি যা এখন রাখাইন নামে সমধিক পরিচিত, বঙ্গোপসাগরের কাছে অবস্থিত হওয়ায় একসময় বাণিজ্য, বসতি স্থাপন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মিলনমেলা হয়ে ওঠে। এখানে আরব, পার্সিয়ান, তুর্কি, মোগল থেকে শুরু করে বাঙালি বণিকদের যাতায়াত ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। এই বহুজাতিক বণিক এবং নাবিকদের সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে মিলিত হয়ে রোহিঙ্গারা এখানে গড়ে তুলে এক সমৃদ্ধ জনপদ। এমনকি মুসলিম সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে, স্থানীয় অনেক রাখাইন বৌদ্ধদেরও বিয়ে হয় এবং তারা কালক্রমে স্থানীয় হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে, ১৫ শতকে আরাকান রাজতন্ত্রের শাসনামলে রোহিঙ্গারা প্রতাপশালী হয়ে ওঠে। তাদের বসতি স্থাপন ১৭ শতকের মোগল আমলে আরো সুসংহত হয়। বাংলার সুলতান আমলে, মুসলমান বসতি স্থাপন এবং সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন আরো বৃদ্ধি পায়, কারণ রোহিঙ্গা রাজতন্ত্রের ওপর বাংলার সুলতানদের প্রভাব ছিল ব্যাপক। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনামলে হঠাৎ করে এই শান্ত পরিবেশের ব্যাপক ছন্দপতন ঘটে। প্রথম ব্রিটিশ-বার্মা যুদ্ধের পর, ১৮২৬ সালে ব্রিটিশরা বার্মার ক্ষমতা দখল করলে, বাংলাদেশ এবং ভারতের বিশেষ কিছু অঞ্চল থেকে আরাকানে কৃষিকাজ এবং ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের জন্য, মুসলিম শ্রমিক এবং কৃষকদের রাখাইনে বসতি স্থাপন উৎসাহিত করে। এই পরিযায়ী সম্প্রদায় রাখাইনে জনসংখ্যার ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলে। পরে ব্রিটিশরা প্রশাসনিক কাজে রাখাইন বৌদ্ধদের চেয়ে অন্যান্য রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে অধিকতর প্রাধান্য দিলে, রাখাইন বৌদ্ধদের সঙ্গে রোহিঙ্গা মুসলমানদের রক্তক্ষয়ী সংকটের প্রেক্ষাপট রচিত হয় । ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটলে, কিছুকাল রোহিঙ্গা মুসলমানরা স্থানীয় হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং বার্মার সংসদেও নির্বাচিত মুসলিম নেতারা নিজেদের স্বতন্ত্র সত্তার প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন ক্ষমতা দখল করলে, অল্প সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ভাগ্যাকাশ দুর্যোগের কালো মেঘে ঢেকে যায়। স্বৈরশাসক নে উইন, বারমান সংস্কৃতি এবং বৌদ্ধ ধর্মকেন্দ্রিক সমগোত্রীয় জাতীয় পরিচয়কে উৎসাহিত করা শুরু করলে, স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি এবং ধর্মচর্চাকারী মুসলিম রোহিঙ্গারা, বার্মার জাতীয় জীবনে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠা শুরু করে। এরপর ১৯৮২ সালে বার্মা সরকারের গৃহীত নাগরিকত্ব আইনে আটটি প্রধান জাতিগোষ্ঠীর অধীন ১৩৫টি নৃগোষ্ঠীকে তালিকাভুক্ত করলেও, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়, শুরু হয় এই মুসলিম জনগোষ্ঠীর মানবেতর জীবন, অনিশ্চিত পথচলা।
যুগে যুগে রোহিঙ্গা নির্মূল অভিযান এবং বাংলাদেশের ওপর অব্যাহত শরণার্থীর চাপ
১৯৭৮ সালে ‘অপারেশন ড্রাগন কিং’-এর মাধ্যমে বার্মার সামরিক সরকার, রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক নিপীড়ন, নির্যাতন শুরু করলে একপর্যায়ে দুই লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে প্রবেশ করে। জিয়াউর রহমানের যুগপৎ বলিষ্ঠ পররাষ্ট্র এবং সামরিক কূটনীতির কারণে দ্রুততম সময় বার্মা তাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। ১৯৮২ সালে বার্মা তার নাগরিকত্ব আইনপ্রণয়ন করলে রোহিঙ্গারা স্থায়ীভাবে নাগরিকত্বহীন হয়ে পড়ে। এরপর ঔপনিবেশিক অতীত মুছে ফেলতে এবং প্রধান জাতিগোষ্ঠী বার্মান বা বামারদের একাধিপত্য নিশ্চিত করতে ১৯৮৯ সালে জান্তা সরকারের চেয়ারম্যান সো মং, বার্মা নাম পরিবর্তন করে মিয়ানমার নামকরণ করার পর, রোহিঙ্গাদের ওপর আরেক দফা ভয়ংকর নির্মূল অভিযানের খড়গ নেমে আসে। ১৯৯১ এবং ১৯৯২ সালে অপারেশন ‘ক্লিন অ্যান্ড বিউটিফুল নেশন’-এর নামে পরিচালিত এক অভিযানের সময় ২ দশমিক ৫ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান আবার প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক সহায়তায়, এবারও মিয়ানমার, নয়াপারা এবং কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের ২৭০০০ রোহিঙ্গা বাদে সবাইকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তৃতীয় অনুপ্রবেশের ঘটনাটি ঘটে বিগত আওয়ামী স্বৈরাচারী সরকার যখন ক্ষমতার মধ্য গগনে এবং সমস্যা সমাধানের জন্য সবচেয়ে প্রভাবশালী দুই দেশ চীন এবং ভারতের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক নিয়ে যখন তারা রীতিমতো উচ্চকিত। কিন্তু ২০১৭-এর আগস্টে মানব ইতিহাসের অন্যতম বড় শরণার্থীর ঢল যখন, দিনে দিনে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর সীমাহীন চাপ সৃষ্টি করেছে, স্থানীয় মানুষ এবং প্রতিবেশের ওপর স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করেছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর অবস্থা দিন দিন অমানবিক হয়ে উঠেছে, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের কাছে নতিস্বীকার করে আওয়ামী লীগ ভাসানচরে নিজস্ব অর্থায়নে, অন্তত এক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে স্থায়ী আবাসন দেওয়ার লক্ষ্যে ভৌত অবকাঠামো গড়ে তুলতে বাধ্য হয়। ২০১৭ সালে ৯ লাখ থেকে ১০ লাখ শরণার্থীর সংখ্যা এখন বেড়ে ১২ লাখ ছাড়িয়েছে এবং জাতীয় রাজস্ব থেকে এদের জন্য ব্যয় হচ্ছে, বার্ষিক ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বা ১৫ হাজার কোটি টাকা। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, A stich in time saves nine বা সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়। শেখ হাসিনা এই মানবসৃষ্ট মহাদুর্যোগ উপলক্ষ করে নোবেল পুরস্কারের অলীক স্বপ্নে গা ভাসিয়ে না দিয়ে, অঙ্কুরেই এ সমস্যাটি বিনষ্ট করতে চাইলে, হয়তো সমস্যাটি আজ প্রায় অসমাধানযোগ্য হয়ে উঠত না।
নবগঠিত বিএনপি সরকার এবং দায়
বর্তমান বিএনপি সরকারের কাঁধে তাই এখন এ সংকট সমাধানের বিরাট বড় দায়িত্ব এসে পড়েছে। এমনিতেই নবীন সরকার বিগত স্বৈরাচারের লুটপাট-দুর্নীতির, শ্বেতপত্রের হিসাবে ২৪০ বিলিয়ন ডলার বা ৩০ লাখ কোটি টাকা পাচারের এক ভগ্ন অর্থনীতির দেশের উত্তরাধিকারী ব্যাংকগুলো ধুঁকছে তারল্য সংকটে, সঙ্গে যোগ হয়েছে আকাশচুম্বী জনআকাঙ্ক্ষা। এর মধ্যে রোহিঙ্গা সমস্যা হচ্ছে গোদের ওপর বিষফোঁড়া, যার আশু সমাধান না করতে পারলে দেশব্যাপী এই ক্যানসার ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগবে না। প্রশ্ন হচ্ছেÑসমাধান কোন পথে? এ সমস্যার বহুবিধ চরিত্রের কারণে এর একক কোনো সমাধান নেই বা কোনো একপক্ষ এ সমস্যার সুরাহা করতে পারবে না। রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনে যে দেশগুলো সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে, এর মধ্যে চীন এবং ভারত অন্যতম। কিন্তু এই উভয় দেশের সঙ্গে মিয়ানমারের রয়েছে ভূকৌশলগত এবং এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক। তৃতীয় যে দেশটি সমস্যা সমাধানের প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে, সেটি হচ্ছে আমেরিকা। যদিও তারা আপাতদৃষ্টিতে মিয়ানমারের কিছু সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিলেও শেষ বিচারে লক্ষ্য অর্জনের মতো দৃশ্যমান কোনো চাপ প্রয়োগ করেনি। এর মূলে রয়েছে নিজ নিজ স্বার্থসংশ্লিষ্ট মূল্যায়ন। সে বিষয়ে সম্যক আলোকপাত করার আগে আমাদের জানা দরকার, রোহিঙ্গাদের সাম্প্রতিক সময়ে বাস্তুচ্যুত করতে যে সামরিক জান্তা সরকারের প্রধান সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে, সেই জেনারেল ইউ মিন অং হ্লাং ভারত সরকারের নিমন্ত্রণে চলতি মাসেই ভারত সফর করেছে। দুই দেশের সরকারপ্রধানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক রাজনীতির জন্য যে বার্তা দিয়েছে, তা রোহিঙ্গাসংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপে থাকা মিয়ানমার সরকারের জন্য একটি কূটনৈতিক অর্জন। শোনা যাচ্ছে, মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট শিগগিরই চীন সফরেও যাবেন। তার এই সফরগুলোর রাজনৈতিক তাৎপর্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিষয়টি মাথায় রাখা দরকার।
মিয়ানমারের খনিজসম্পদ এবং বিদেশিদের বাণিজ্যিক হিসাবনিকাশ
সিঙ্গাপুরের পর চীন মিয়ানমারে দ্বিতীয় স্বর্বোচ্চ অর্থ বিনিয়োগকারী দেশ। ৫৯০টি প্রকল্পে যার পরিমাণ ২২ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। এর মধ্যে কিয়াউকফিউ স্পেশাল ইকোনকিম জোনে, কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্র বন্দর এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে বিনিয়োগের পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলার। এই বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের মাধ্যমে চীন তার জ্বালানি সংকটের অনেকটাই সমাধান করেছে, কিয়াউকফিউ বন্দরের কাছে অবস্থিত মাদায় দ্বীপের অপরিশোধিত তেল পাইপলাইন এবং সিউ অফশোর গ্যাসক্ষেত্র থেকে সংযুক্ত হওয়া প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে। একদিকে মিয়ানমার, চীনের কুনমিং পর্যন্ত প্রায় ৭৭১ কিলোমিটার লম্বা তেল পাইপলাইনটির মাধ্যমে আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনের আমদানি করা ১২ মিলিয়ন টন তেল সরবরাহ করে এবং অন্যদিকে, চীনের গভীরে ইউনান পর্যন্ত ২৮০৬ কিলোমিটার লম্বা গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে মিয়ানমার, নিজস্ব উৎস থেকে বছরে ১২ বিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস সরবরাহ করে। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের তানিনথারি অফশোরে ৯৫ ট্রিলিয়ন গ্যাসপ্রাপ্তির খবরটি, অন্যদের মতো চীনকেও নিশ্চয়ই বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রভাবিত করবে।
একইভাবে ভারতও মিয়ানমারে ৩৯টি প্রকল্পে ৭৮২ মিলিয়নের বেশি বিনিয়োগ করে বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ১১তম স্থানে অবস্থান করছে। তাদের আন্তঃদেশীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ভারত ইতোমধ্যে ৪৮২ মিলিয়ন ডলারের কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্প নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছে। এই প্রকল্প শেষ হলে ভারতের কলকাতা এবং বিশাখাপট্টম বন্দরকে সমুদ্রপথে মিয়ানমারের সিটওয়ে বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করবে। এরপর সিটওয়ে থেকে কালাদান নদী দিয়ে ভারতীয় পণ্য পৌঁছাবে চীন রাজ্যের পালেতোয়া বন্দর পর্যন্ত। পালেতোয়া থেকে সড়ক পথে পণ্য যাবে মিজোরামের রাজধানী আইজল। এই প্রকল্প শেষ হলে ভারত শিলিগুড়ি করিডোরের সংবেদনশীল অংশ খুব সহজে বাইপাস করতে পারবে, তাতে চীনের দিক থেকে যেমন নিরাপত্তাঝুঁকি কমবে, তেমনি বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে যোগাযোগের এক বিকল্প রাস্তাও খুলে যাবে। ভারতের সিটওয়ে বন্দরে উপস্থিতি রাখাইন প্রদেশে চীনের একচ্ছত্র উপস্থিতির বিরুদ্ধে কিছুটা হলেও ভারসাম্য সৃষ্টি করবে বলেও মনে হয়। তবে আরাকান আর্মির কারণে তাদের এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
চীন এবং ভারতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রও মিয়ানমারের ব্যাপারে বেশ আগ্রহ দেখাচ্ছে। বিশেষ করে, মিয়ানমারের বিরল খনিজ এবং উদীয়মান গ্যাসশিল্পের প্রতিও তাদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, বিশ্বের একমাত্র সুপার পাওয়ার হিসেবে বিশ্বব্যাপী নিজের প্রভাব বজায় রাখতে হলে তাকে যেকোনো মূল্যে চীনের বঙ্গোপসাগর এবং ইন্দো প্যাসিফিক প্রবেশ এবং প্রভাব বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা সীমিত করতে হবে। এর জন্য জান্তা সরকারের প্রেসিডেন্সি গ্রহণের বিরুদ্ধে এবং বার্মা এক্টের পুরোপুরি ব্যবহারের ক্ষেত্রে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এখনো বেশ নমনীয় আচরণ করতে দেখা যাচ্ছে।
আমরা কী করতে পারি
ওপরের বাস্তবতার আলোকে বোঝা যাচ্ছে, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান অতীতের মতো সহজ হবে না । এর জন্য একই সঙ্গে কয়েক ফ্রন্টে কাজ করতে হবে, যেগুলো নিম্নরূপ হতে পারেÑ
১. মিয়ানমার সরকার এবং আরাকান আর্মির সঙ্গে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ যোগাযোগ স্থাপান করা। এজন্য প্রয়োজনে উভয়ের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ট্র্যাক টু ডিপ্লোমেসির দ্বার উন্মোচন করতে হবে। কারণ সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে তিন পক্ষের অবস্থান, সমাধানের জন্যও তাই সর্বপ্রথমে তিন পক্ষের মধ্যে আলোচনা প্রয়োজন হবে।
২. চীন বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের অবদান অপরিসীম। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য আমরা চীনের ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিয়ানমার ইস্যু ছাড়া¬Ñসব ক্ষেত্রে চীন আমাদের ঐকান্তিক সমর্থন দিয়ে গেছে। ওপরের বর্ণনা থেকে মিয়ানমার বিষয়ে চীনের সংবেদনশীলতা আমাদের উপলব্ধি করার কথা। কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যার যথোপযুক্ত সমাধানে চীনের অব্যাহত সমর্থন আমাদের প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক এবং সামরিক সহায়তা প্রদানকারী চীনের মধ্যস্থতা মিয়ানমার এবং আরাকান আর্মির পক্ষে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। আমাদের উচিত চীনের সঙ্গে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান নিয়ে সরাসরি কথা বলা এবং আস্থার সম্পর্ক সৃষ্টি করা। বাংলাদেশের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, তিস্তা প্রকল্প, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, ব্রহ্মপুত্র প্রকল্প এবং বঙ্গোপসাগরে গ্যাস-তেল অনুসন্ধানে চীনা কোম্পানির ন্যায্য অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি, আমাদের অংশীদারভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করবে, যা প্রকারান্তরে রোহিঙ্গা ইস্যুর বর্তমান অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে।
৩. ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী, যারা সবসময় মিয়ানমারের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখে। মিয়ানমারের ওপর চীনের মতো না হলেও তাদেরও কিছুটা প্রভাব আছে। আন্তঃদেশীয় নিরাপত্তা, বিশেষ করে ভারতের জন্য সংবেদনশীল উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোয় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে (অলীক) সন্ত্রাসী অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের প্রতিশ্রুতি, হাল আমলের জমাটবদ্ধ সম্পর্কের বরফ গলাতে সাহায্য করবে, যা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সহায়ক হবে।
৪. অর্থনৈতিক এবং সামরিক কারণে যুক্তরাষ্ট্রের এ অঞ্চলে প্রবেশ করা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। আরাকান অঞ্চল নিয়ে তাদের আগ্রহের কোনো কমতি নেই। তাছাড়া এই দুর্যোগের সময় রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্রগুলো পরিচালনা ব্যয়ের একটা বড় অংশ এসেছে তাদের কাছ থেকে। এমনকি আরাকান অঞ্চলে লজিস্টিক পাঠানোর জন্য তারা কক্সবাজারে শিলখালি করিডোর তৈরি করতে চেয়েছিল। কাজেই রোহিঙ্গা পুনর্বাসনে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য অপরিহার্য।
৫. রোহিঙ্গা মুসলিমদের সমস্যায় ওআইসিকে সংশ্লিষ্ট করার পদক্ষেপ নিতে হবে। যদিও সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, মালয়েশিয়ার মতো ধনাঢ্য মুসলিম দেশগুলো এর আগে রোহিঙ্গাদের জন্য অর্থ এবং সীমিত বসতি স্থাপনের মতো মানবিক উদ্যোগ নিয়েছে; কিন্তু সমস্যার তুলনায় তা ছিল অপ্রতুল। ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধে মধ্যপ্রাচ্য এবং পাকিস্তান ও তুরস্ক, তাদের আন্তরিকতা এবং সাহসিকতার প্রমাণ দেখিয়েছে। বর্তমানে ওআইসি চাইলেই মুসলিম বিশ্বের অনেক প্রলম্বিত সমস্যা সমাধান করতে পারবে, যার মধ্যে রোহিঙ্গা প্রধান। এ ব্যাপারে আশু একটি প্রতিনিধিদল ওআইসি সদর দপ্তর এবং সৌদি আরব, কাতার, এবং তুরস্কে পাঠানো উচিত।
৬. বাংলাদেশ ১৯৭৯ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত ইন্দোচীন শরণার্থীদের জন্য ‘ Comprehensive Plan of Action বা CPA’-এর আদলে আঞ্চলিক আশ্রয় কাঠামো বা ‘Asylum Framework’ গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে অনুরোধ করতে পারে। এর জন্য রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে প্রায় বিস্মিত ASEAN এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
উপসংহার
রোহিঙ্গা সমস্যাকে একটা বৈশ্বিক মানবিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করার কোনো বিকল্প নেই। একটি সমৃদ্ধ জনপদ এবং নৃগোষ্ঠী নীরবে বিশ্বের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাব, তা মেনে নেওয়া হবে অমানবিক। বিষয়টি এখন আর শুধু মানবিক পরিস্থিতিতে সীমাবদ্ধ নেই। বাস্তুহীন এই মানুষগুলোকে অস্ত্র এবং মাদক পাচারকারীরা, তাদের অপরাধ সাম্রাজ্যে বিস্তারের কাজে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশে ইয়াবা এবং আইসের মতো যুবসমাজ ধ্বংসকারী মাদকের ছোবলে সামাজিক যে অবক্ষয় শুরু হয়েছে, তা যে শিগগিরই পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই রোহিঙ্গাদের জন্য সম্মানজনক পুনর্বাসন এখন সময়ের দাবি। এজন্য ১০ থেকে ১৫ জুলাই অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের ৬২তম মানবাধিকার কাউন্সিলে, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য বহুমুখী জোর তদবির করা দরকার। ২০১৮ সালে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক সত্যানুসন্ধানী মিশনের প্রতিবেদন, যেসব সিনিয়র মিয়ানমার জেনারেলকে গণহত্যার জন্য দায়ী করেছি, তাদের অপরাধের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক বিশ্বের সরব হওয়া উচিত। এছাড়া ২০১৯ সালে International Court of Justice-এ গাম্বিয়ার আনা অভিযোগ এবং পরে International Criminal Court কর্তৃক রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার জান্তা সরকারের পরিচালিত মানবিকতার বিরুদ্ধে অপরাধের তদন্তগুলো আজ হিমাগারে চলে গেছে। অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে পরিচালিত এসব জঘন্য অপরাধের প্রমাণপত্রগুলো আবার দেশি-বিদেশি বন্ধুদের সহযোগিতায় বিশ্ব মানবতার সামনে এনে রোহিঙ্গা সমস্যার একটা বাস্তবভিত্তিক সমাধানের পথ রচনা করাই হওয়া উচিত এখন আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্য।
লেখক : চেয়ারম্যান, ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (এফএসডি স)