হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

‘মুখের ভাষা’ কেড়ে নেওয়ার আধুনিক মানচিত্র

রাকিবুল ইসলাম

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি এলেই আমাদের কানে বাজে সেই অবিনাশী সুর—‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়।’ ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন ঢাকার রাজপথে রক্ত ঝরেছিল, তখন একুশের অমর গানের সেই পঙ্‌ক্তি ছিল একটি নির্দিষ্ট ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিবাদ। কিন্তু ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করছি, তখন এই পঙ্‌ক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ নেই। এটি আজ বিশ্বের হাজারো বিপন্ন ভাষা-সম্প্রদায়ের এক বৈশ্বিক আর্তনাদে পরিণত হয়েছে। আধুনিক সভ্যতার চাকচিক্যের আড়ালে প্রতিদিন একটি করে ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ নীরবে ঘটে যাচ্ছে আমাজন থেকে আর্কটিক, কিংবা অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী পাড়াগুলোয়।

ইউনেস্কোর পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বে প্রচলিত প্রায় সাত হাজার ভাষার মধ্যে অন্তত ৪০ শতাংশ আজ বিলুপ্তির মুখে। প্রতি দুই সপ্তাহে পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে একটি ভাষা। এই হারানো মানে কতগুলো ধ্বনি বা বর্ণের মৃত্যু নয়; এটি একটি পুরো বিশ্বদর্শন, প্রথাগত পরিবেশগত জ্ঞান এবং একটি জাতির শিকড়ের বিনাশ। যখন একটি ভাষা মরে যায়, তখন তার সঙ্গে হারিয়ে যায় হাজার বছরের ঔষধি গাছের নাম, বৃষ্টির পূর্বাভাস জানার কৌশল কিংবা পূর্বপুরুষের মুখ থেকে শোনা অনন্য সব সৃষ্টিতত্ত্ব।

ইতিহাসের পাতায় এই ‘ভাষা কেড়ে নেওয়া’র অধ্যায়গুলো অত্যন্ত পদ্ধতিগত ও নিষ্ঠুর। উত্তর আমেরিকার ‘ইন্ডিয়ান বোর্ডিং স্কুল’ থেকে শুরু করে কানাডার ‘রেসিডেন্সিয়াল স্কুল’ সবখানেই লক্ষ্য ছিল এক—শিশুদের থেকে তাদের মাতৃভাষা কেড়ে নিয়ে একটি ‘আধিপত্যশীল’ সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের ২০৫টি ভাষার প্রায় সবই আজ মৃতপ্রায় কেবল কলোনিয়াল পলিসির কারণে। শুধু রাষ্ট্রীয় নীতি নয়, বর্তমান সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনও ভাষার যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর্কটিকের বরফ গলে যাওয়ায় ইনুইট (Inuit) সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা বদলে যাচ্ছে, ফলে তাদের ভাষার শব্দভান্ডারও দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। আফ্রিকার মাসাই (Maasai) সম্প্রদায়ের ‘মা’ (Maa) ভাষা আজ নগরায়ণের চাপে পিষ্ট।

এশিয়ায় আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও প্রায় ২০০টি ভাষা বিপন্ন তালিকায় রয়েছে, যার মধ্যে ওড়িশার ‘গাদাবা’ বা আন্দামানি ভাষাগুলো প্রায় হারিয়েই গেছে। জাপানের হোক্কাইদো অঞ্চলের ‘আইনু’ (Ainu) ভাষা একসময় নিষিদ্ধ ছিল, যা এখন কেবল হাতেগোনা কয়েকজন বৃদ্ধের স্মৃতিতে বেঁচে আছে। একইভাবে ইউরোপের আয়ারল্যান্ডে ‘আইরিশ গ্যালিক’ ভাষা ইংরেজির দাপটে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। লাতিন আমেরিকায় কেচুয়া (Quechua) বা আইমারা (Aymara) ভাষাগুলো স্প্যানিশ ও পর্তুগিজের আধিপত্যে সংকুচিত হচ্ছে।

এই ভাষিক বিপর্যয়ের মূলে রয়েছে ‘ফোর্সড অ্যাসিমিলেশন’ বা জোরপূর্বক একীভূতকরণ নীতি। রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থায় আধিপত্যশীল ভাষা চাপিয়ে দেওয়া, আদিবাসীদের ভূমি দখল এবং বিশ্বজুড়ে ইংরেজি, ম্যান্ডারিন বা স্প্যানিশের মতো গ্লোবাল মিডিয়ার একচেটিয়া প্রভাব শিশুদের তাদের মায়ের ভাষা থেকে বিচ্যুত করছে।

এশিয়ায় আমাদের অতি কাছে থাকা আন্দামানের ‘বো’ (Bo) ভাষা বা জাপানের ‘আইনু’ (Ainu) ভাষা আজ কেবল ইতিহাসের পাতায় বন্দি। এমনকি আয়ারল্যান্ডের মতো উন্নত দেশেও ইংরেজি ভাষার প্রবল চাপে ‘আইরিশ গ্যালিক’ আজ টিকে থাকার লড়াই করছে। লাতিন আমেরিকায় স্প্যানিশের দাপটে কেচুয়া (Quechua) ভাষাভাষীরা নিজেদের ভাষা বলতে এখন লজ্জিত বোধ করে। এই ‘ভাষিক লজ্জা’ বা ‘Linguistic Shame’ তৈরির মাধ্যমেই আধুনিক বিশ্বায়ন মূলত আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নিচ্ছে। গ্লোবাল মিডিয়ার চাপে ইংরেজি, ম্যান্ডারিন বা হিন্দির মতো গুটিকতক ভাষা এখন পৃথিবীকে শাসন করছে, আর হারিয়ে যাচ্ছে বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য।

তবে পরিবর্তনের হাওয়া যে একদম নেই, তা নয়। নিউজিল্যান্ডে মাওরি (Maori) ভাষার পুনর্জাগরণ কিংবা মরক্কোয় তামাজাইট (Tamazight) ভাষাকে দাপ্তরিক স্বীকৃতি দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো আমাদের আশার আলো দেখায়। ওয়েলশ (Welsh) ভাষা যেভাবে প্রযুক্তি ও শিক্ষার মাধ্যমে ফিরে এসেছে, তা থেকে শিক্ষা নিতে পারে বিশ্ব। জাতিসংঘ ঘোষিত ‘আদিবাসী ভাষা দশক (২০২২-২০৩২)’। এই দশক একটি সুযোগ তৈরি করেছে সত্য, কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কেবল দিবস পালন করে ভাষাকে বাঁচানো সম্ভব নয়।

একুশের এই মাসে আমাদের প্রশ্ন তোলা উচিত, আমরা কি কেবল নিজের ভাষা রক্ষা করেই দায়িত্ব শেষ করব? ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’—এই ‘ওরা’ কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা গোষ্ঠী নয়। এটি একটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা যা সংখ্যাগরিষ্ঠের দাপটে সংখ্যালঘুর অস্তিত্ব গিলে খায়। যদি আমরা আজ বৈশ্বিক এই ভাষিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা না বলি, তবে একদিন পৃথিবীবাসী হয়তো মাত্র গুটিকতক ভাষায় কথা বলবে। সেদিন মানবজাতির চিন্তার বৈচিত্র্য ও জ্ঞানের ভান্ডার চরমভাবে সংকুচিত হয়ে পড়বে।

আমাদের বোঝা উচিত, ভাষা কেড়ে নেওয়া মানে একটি মানুষের আত্মাকে পঙ্গু করে দেওয়া। একুশের এই মাসে আমাদের প্রতিজ্ঞা কেবল ফুল দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকুক। আমরা যেন বিশ্বের প্রতিটি কোনায় ‘মুখের ভাষা’ কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হই। কারণ বৈচিত্র্যহীন একভাষী পৃথিবী হবে একটি ধূসর মরুভূমির মতো। পৃথিবীর প্রতিটি ভাষা যেন তার নিজস্ব মহিমায় বেঁচে থাকতে পারে, কারণ ভাষা বেঁচে থাকলেই মানুষ তার আপন পরিচয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।

ভাষা আমাদের অস্তিত্বের প্রমাণ। একটি ভাষাকে মেরে ফেলা মানে একটি জনগোষ্ঠীর আত্মাকে হত্যা করা। তাই একুশের এই লগ্নে আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক আমরা বিশ্বের প্রতিটি বিপন্ন ভাষার পাশে দাঁড়াব। কারণ যতদিন ভাষা বেঁচে থাকে, ততদিন মানুষের বৈচিত্র্যময় পরিচয় বেঁচে থাকে।

লেখক : শিক্ষার্থী, রসায়ন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

হারিয়ে যাওয়া একুশে ফেব্রুয়ারি

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও অবরুদ্ধ স্বকীয়তা

পশ্চিম তীরে ভূমি অধিগ্রহণ জর্ডানের জন্য সরাসরি হুমকি

গোলাপের সৌন্দর্য খুশবুতে শাসকের সৌন্দর্য সুশাসনে

গণতান্ত্রিক যাত্রায় প্রয়োজন ছায়া মন্ত্রিসভা

‘কেনু উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গে ইসলামপন্থিরা ভোট পেল; ছ্যা ছ্যা ছ্যা’

চাই ইনসাফের বাংলাদেশ

ক্ষমতার ভাষা যখন রাজনীতিকে গ্রাস করে

মৃত্যুর দ্বার থেকে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী

টিআইবির রিপোর্ট এবং আমাদের নতুন পথচলা