হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

আমেরিকা কি আরেকটি যুদ্ধে হেরে গেল

হার্লান উলম্যান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে ‘প্রতিরোধমূলক’ অভিযান হিসেবে বর্ণিত যুদ্ধ শুরু করে কিছু উচ্চাভিলাষী এবং গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে যুদ্ধে যেতে উৎসাহিত করেছিলেন যাতে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথ বন্ধ এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা যায়। এটি ছিল এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। কিন্তু তা নিশ্চিত করা অপূর্ণই রয়ে গেছে। একই সঙ্গে ইরান সমর্থিত আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোকে ভেঙে দেওয়ার যে লক্ষ্য ছিল ইসরাইলের, সেটিও পূরণ হয়নি।

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু উভয়েই এমন একটি পরিবেশ তৈরির লক্ষ্য স্থির করেছিলেন, যেখানে ইরানের জনগণ জেগে উঠে দেশটির বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করবে। তবে, ট্রাম্প এই সপ্তাহে স্বীকার করেছেন যে, জনগণের পক্ষে তা করাটা অত্যন্ত বিপজ্জনক ছিল।

মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে এটা ঠিক, কিন্তু দেশটির সরকার উচ্চসমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধরে রেখেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মঙ্গলবার ‘আজ রাতেই একটি গোটা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে’ বলে ইরানকে চূড়ান্ত হুমকি দেওয়ার পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সেদিনই দুই সপ্তাহের অস্ত্রবিরতিতে সম্মত হন। এ সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শান্তি আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছার চেষ্টা করবে। সেই আলোচনা শনিবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শুরু হয়।

কিন্তু দীর্ঘ আলোচনার পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ও আলোচনায় প্রতিনিধি দলের নেতা জে ডি ভ্যান্স রবিবার সকালে ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ২১ ঘণ্টা আলোচনার পরও ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হয়নি যুক্তরাষ্ট্রের। এটি একটি দুঃসংবাদ। অন্যদিকে, ইরানের প্রতিনিধিদলের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাত দিয়ে দেশটির সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ জানিয়েছে, যুদ্ধে পরাজয়ের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের ইমেজের যে ক্ষতি হয়েছে তা পুনরুদ্ধারে তাদের এ আলোচনার প্রয়োজন ছিল। এখন তারা আমাদের ওপর দোষ চাপিয়ে আলোচনার টেবিল থেকে সরে দাঁড়ানোর অজুহাত খুঁজছে।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ১৫ দিনের অস্ত্রবিরতি ও শান্তি আলোচনা নিয়ে যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, তার অবসান ঘটায় আবার ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কা জোরদার হলো। কিন্তু ৪০ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট সামরিক সুবিধা বজায় রাখলেও হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কৌশলগতভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে ইরান। এর মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশটি পেট্রোল ও ডিজেল দাম এবং বৈশ্বিক শেয়ারবাজারের মূল্য সূচকের ওপর তাদের ব্যাপক প্রভাব বজায় রেখেছে। ইরান যুদ্ধের এই গতিপথ অতীতে বিভিন্ন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতারই যে পুনরাবৃত্তি ঘটাবে, তা প্রায় জোর দিয়েই বলা যায়।

১৯৬০-এর দশক এবং ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর পরাজয় শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই ঘটেনি, বরং পরাজয় ঘটেছিল আমেরিকানদের টিভিতে এবং ডাইনিং রুমেও। এই যুদ্ধের প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে আমেরিকান জনগণকে ধোঁকা দিতে দেশটির নেতৃত্বের পক্ষ থেকে একের পর এক মিথ্যাচার করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৫৮,০০০ মার্কিন সৈন্যের লাশের ব্যাগ যখন ভিয়েতনাম থেকে দেশে পৌঁছে, তখন যুদ্ধ নিয়ে নেতাদের এতদিনের মিথ্যাচার দেশবাসীর সামনে উন্মোচিত হয়। মার্কিন জনগণ তখন জানতে পারে যে, ভিয়েতনামে যুদ্ধে তাদের সামরিক বাহিনীর কত সদস্য জীবন দিয়েছেন।

আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেও তা তাদের ‘জয়ের জন্য’ যথেষ্ট ছিল না। দেশটিতে ‘জাতি গঠন’ করতে দুই দশক ধরে শত শত কোটি ডলার ব্যয় করলেও সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং তা শুধু মার্কিনপন্থি দুর্বল প্রতিষ্ঠানই তৈরি করেছিল যা শেষ পর্যন্ত তালেবানের বিজয় ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি।

অন্যদিকে, ২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসনের মাধ্যমে সাদ্দাম হোসেনের সরকারের পতন ঘটাতে সফল হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তা দেশটিকে বিশৃঙ্খলার মধ্যে নিমজ্জিত করে, যা পরবর্তী দুই দশকে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা বাড়িয়ে দিয়েছিল। এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র এবং তার আঞ্চলিক মিত্রদের জন্যও যথেষ্ট ক্ষতিকর ছিল।

এই ব্যর্থতাগুলোর অন্যতম কারণ হলো, পরপর ক্ষমতায় আসা মার্কিন প্রেসিডেন্টরা যুদ্ধ ও শান্তির বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। শক্তি প্রয়োগের শর্ত সম্পর্কে তাদের গভীর জ্ঞান ও উপলব্ধির অভাব, যুদ্ধে যাওয়ার পূর্বানুমানগুলোকে প্রশ্ন করতে ব্যর্থতা, আমেরিকান বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে স্বতঃসিদ্ধ বলে ধরে নেওয়ার ঔদ্ধত্য, গোষ্ঠীচিন্তা এবং যেকোনো যুদ্ধের সব সম্ভাব্য ফল পরীক্ষা না করার আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতায় ভুগেছেন তারা। এসব কিছুই ত্রুটিপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্তের জন্ম দিয়েছে।

এখন মনে হচ্ছে, অতীতের এই ব্যর্থতাগুলো এখন ইরানে যুদ্ধকেও কলুষিত করেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে অনুষ্ঠিত প্রতিটি যুদ্ধ মহড়া ও অনুশীলনের সময় হরমুজ প্রণালি বন্ধ রেখেছিল ইরান। সত্যিকারের যুদ্ধ শুরু হলে ইরান যে হরমুজ প্রণালি আক্ষরিক অর্থেই বন্ধ করে দেবে, সে কথা কি ট্রাম্পকে কেউ জানাননি, নাকি তিনি শোনেননি?

সম্ভাব্য সব পরিণতির কথা বিচার-বিশ্লেষণ না করে কেন তিনি যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, অথবা তার ভাষায় ইরানে একটি ‘অভিযান’ শুরু করলেন? রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কয়েক দিনের মধ্যে ইউক্রেন দখল করে ফেলার বিরাট ভুল ধারণার পুনরাবৃত্তিই বা ইরানে কেন করলেন ট্রাম্প?

এ ব্যাপারে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যাটি এসেছে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর কাছ থেকে। তিনি বলেছেন, ইসরাইল যেহেতু প্রথমে ইরানে হামলা করতে যাচ্ছিল, তাই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সেই হামলায় যোগ দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। পরে অবশ্য তিনি তার সেই বক্তব্য প্রত্যাহার করেন। অনেকের মতে, যুদ্ধ ঘোষণার জন্য আগাম আক্রমণ একটি ভ্রান্ত যুক্তি। যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে হয় ইরানের বিরুদ্ধে একাই যুদ্ধে এগিয়ে যেতে অথবা সংঘাতে জড়ানো থেকে বিরত থাকতে বলতে পারত। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এই দুটোর একটি কাজও করেনি।

ইসরাইল যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিতে ট্রাম্পকে তাড়া দেওয়ার আগেই একদিকে তার ঔদ্ধত্য প্রদর্শন এবং অন্যদিকে তার বোধশক্তির অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। ট্রাম্পের প্রধান আলোচক স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারের পারমাণবিক অস্ত্র সম্পর্কে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব আছে, যা তাদের ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অকার্যকর করে তুলেছিল।

ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র ও উন্নত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত করতে যে সময় লাগবে, তা হোয়াইট হাউস ভুলভাবে অনুমান করেছিল। তাছাড়া, ভেনেজুয়েলায় অভিযানের সাফল্য এবং মার্কিন সামরিক শক্তির অতিরঞ্জিত প্রত্যাশা ট্রাম্পকে অন্ধ করে দিয়েছিল। তিনি ইসরাইলের এই বয়ান সহজেই বিশ্বাস করেছিলেন যে, ইরানের শাসনব্যবস্থা পতনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।

কিন্তু এখন ভিন্ন বাস্তবতা সামনে এসেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে বরাবরই। বৈশ্বিক জ্বালানির ২০ শতাংশ, সারের জন্য প্রয়োজনীয় ফসফেটের বেশির ভাগ এবং চিপ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় হিলিয়াম উপসাগরে দেড় মাস ধরে আটকে থাকায় দীর্ঘস্থায়ী একটি সংঘাতের যে পরিণতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা হলোÑবিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বিপর্যয়।

ইরানের সাফল্যের মাপকাঠি এটা নয় যে, তারা কতগুলো মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে বা কতগুলো মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত করেছে। বরং তা ছিল যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম বৃদ্ধি এবং শেয়ারবাজারের শোচনীয় অবস্থা তৈরি করা। এমনকি ইরানে হামলার শুরুতেই আমেরিকানরা এটা পছন্দ করেননি এবং দেশটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ এই যুদ্ধের বিরোধী ছিল।

পেট্রোলের উচ্চমূল্য এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সামাজিক অসন্তোষ বাড়িয়ে তুলেছে। এখন ট্রাম্প দুটি কঠিন বিকল্পের মুখোমুখি হয়েছেন। হয় তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসনের মতোই যুদ্ধ শেষ করার জন্য ইরানের শর্ত মেনে নিতে পারেন অথবা সংঘাত আরো বাড়িয়ে একটি ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়তে পারেন।

ইরানে টানা ৩৯ দিন মার্কিন-ইসরাইলি নির্বিচার হামলায় উল্লেখযোগ্য কৌশলগত সাফল্য অর্জন ছাড়াই যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এবং নিজের বিজয় দাবি করেন, তখনো লক্ষ্যমাত্রার কোনোটিই চূড়ান্তভাবে অর্জিত হয়নি।

আপাতত, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের এই ধারণাটিই বেছে নিয়েছেন যে, ‘পুরোপুরি যুদ্ধের চেয়ে আলোচনা শ্রেয়’। ট্রাম্প যে পথেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন না কেন, ইরান যুদ্ধ যে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার নেওয়া সবচেয়ে বিপর্যয়কর সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রমাণিত হবে, তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই কারো। কেননা, ভালো কোনো বিকল্প পথ খোলা রাখা ছাড়াই তিনি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্ররোচনায় নিজেকে ইরান যুদ্ধের ফাঁদে জড়িয়ে ফেলেছেন।

আলজাজিরা অবলম্বনে মোতালেব জামালী

শিক্ষক প্রশিক্ষণ : চাই শ্রেণিকক্ষে বাস্তব পরিবর্তন

পাঁচ জেনারেল ও বাংলার ট্র্যাজেডি

বৈশাখী নববর্ষ, লাল ঝুঁটির মোরগ, কী আনন্দ!

ভূমধ্যসাগরের নীল জলে ডুবছে কেন জেনজিরা

৭১ সালের বিজয় ও ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের ঐকতান

সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন ও বিরোধী নেতার দুঃখ

নতুন সময়সূচি ও অর্থনীতিতে প্রভাব

নাতিশীতোষ্ণতার সন্ধানে

জ্বালানিনির্ভরতা ও জাতীয় নিরাপত্তা সংকট

ইরান যুদ্ধ পেট্রোডলারের জন্যও বড় পরীক্ষা