হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

মুসলিম দেশ কসোভোতে অন্য এক দৃষ্টান্ত

এলাহী নেওয়াজ খান

ছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের ক্ষুদ্র একটি মুসলিম দেশের একটি খবর বেশ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশটির নাম কসোভো। গত ৭ অক্টোবর প্রায় ৯৬ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত দেশটির পার্লামেন্ট একজন ক্যাথলিক খ্রিষ্টান নারীকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা থাকা সত্ত্বেও দেশটির পার্লামেন্টের মুসলিম সদস্যরা একজন খ্রিষ্টানকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে বিশ্ববাসীর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, কীভাবে বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মানুষ সব ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করতে পারে। নবনির্বাচিত এই প্রেসিডেন্টের নাম জাস্টিনা শিরোকা পুলা। তিনি দেশটির তৃতীয় নারী প্রেসিডেন্ট হলেও খ্রিষ্টান হিসেবে প্রথম। এটি ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহনশীলতার এক অনন্য নজির।

উল্লেখ করতে হয়, কসোভোতে খ্রিষ্টানদের মোট সংখ্যা ৫ থেকে ৬ শতাংশ। ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের সংখ্যা ২ থেকে ৩ শতাংশ। এমন একটি পরিসংখ্যানে, অর্থাৎ একেবারে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী থেকে এভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঘটনা খুবই বিরল। যদিও অনেক বছর আগে আরেকটি মুসলিম রাষ্ট্র সেনেগালে এমন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছিল। দেশটি ১৯৬০ সালে স্বাধীন হওয়ার পর কসোভোর মতোই প্রায় ৯৬ শতাংশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে একজন ক্যাথলিক খ্রিষ্টানকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছিল। তার নাম ছিল লিউপোলড সেদার সিংঘর। তিনি ২০ বছর অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে দেশ পরিচালনা করেছিলেন।

কিন্তু বর্তমানে যখন সারা বিশ্বে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা হানাহানিতে লিপ্ত, বিশেষ করে যখন আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার ইসলামসহ অন্য ধর্মাবলম্বীদের ওপর নিষ্ঠুর নিপীড়ন চালাচ্ছে, তখন কসোভোর এ ঘটনা এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে সবাইকে শিক্ষা দিয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে অবস্থিত ক্ষুদ্র এই দেশটির আয়তন মাত্র ১০ হাজার ৮৭৮ বর্গকিলোমিটার। এটি ইউরোপের দশম ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। লোকসংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৯৬ শতাংশ মানুষই মুসলমান। প্রায় ৪ শতাংশ খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। ১৯৯৮-৯৯ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ন্যাটো ও জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সার্বিয়ার সৈন্যদের প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয়। এরপর ৯ বছর জাতিসংঘের প্রশাসনের অধীনে থাকার পর দেশটি চূড়ান্তভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। যদিও জাতিসংঘের সব সদস্যদেশ এই সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রকে এখনো স্বীকৃতি দেয়নি। তবে জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যদেশের মধ্যে ইতোমধ্যে ১১৫টি দেশ কসোভোকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু সার্বিয়া ও রাশিয়া বরাবরই কসোভোর স্বাধীনতার বিরোধিতা করে আসছে।

এদিকে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের এই ছোট্ট দেশটি সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই হয়তো তেমন কোনো ধারণা নেই। তাই সংক্ষেপে হলেও এর একটি বিবরণ থাকা দরকার। কারণ, ৯৬ শতাংশ মুসলমান অধ্যুষিত দেশে কীভাবে একজন ক্যাথলিক খ্রিষ্টানকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হলো, তা ব্যাখ্যা করার জন্য কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা দরকার। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এ দেশের মানুষ ধর্মের চেয়ে জাতীয়তাবাদকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এ দেশের জনগণ জাতিগতভাবে প্রধানত আলবেনীয়। তারা মনে করে, আলবেনীয় পরিচয়ের সঙ্গে আলবেনীয় জাতীয়তাবাদ জড়িত। আর সে কারণেই কসোভো যুদ্ধের সময় সেখানকার মুসলমান ও খ্রিষ্টানরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছেন।

মূলত কসোভো একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। তবে এটি কামাল আতাতুর্কের ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্কের মতো নয়। এখানে সব ধর্মের মানুষকে সমভাবে ধর্মীয় স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। বলা যায়, কসোভোর ধর্মনিরপেক্ষতা হলো ধর্ম ও রাষ্ট্রের পারস্পরিক সহাবস্থান এবং নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ ধর্ম ও রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখা এবং নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। পক্ষান্তরে, কামাল আতাতুর্কের ধর্মনিরপেক্ষতার মডেলে ধর্মের ওপর রাষ্ট্রের কঠোর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।

অন্যদিকে, এমন পরিস্থিতিতে সেখানকার আলেমসমাজ কীভাবে ভূমিকা পালন করে, সেটিও জানার বিষয়। যতটুকু জানা গেছে, তাতে বোঝা যায়, কসোভোর আলেমসমাজ ঐতিহাসিকভাবে বলকান অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী উদারপন্থি হানাফি সুন্নি মতাদর্শ অনুসরণ করে থাকে। তারা ইসলামকে চরমপন্থা ও উগ্রবাদ থেকে মুক্ত রেখে সহনশীল এবং আধুনিক জীবনমুখী ধর্ম হিসেবে প্রচার করে থাকে।

এছাড়া কসোভোতে সুফিবাদেরও প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে। বলকান অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার ঘটেছে মূলত সুফি-সাধকদের মাধ্যমে, যেমনটি ঘটেছে ভারতীয় উপমহাদেশেও। তাই এ উপমহাদেশে যেমন অসংখ্য মানুষ সুফিবাদ অনুসরণ করেন, তেমনি কসোভোয়ও বিপুলসংখ্যক মানুষ সক্রিয়ভাবে বিভিন্ন সুফি তরিকার সঙ্গে যুক্ত আছেন। আমাদের অঞ্চলের মতো সেখানেও মূলধারার সুন্নি আলেমসমাজ ও সুফি দরবেশদের মধ্যে ধর্ম পালনের বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে তা কখনো সংঘাতে রূপ নেয় না।

আমাদের অঞ্চলের মতো কসোভোয়ও সুফিবাদের অনুসারীরা বিভিন্ন তরিকার অনুসারী। সেখানে প্রধানত রিফাই, খালওয়াতি, কাদেরি ও বেকতাশি তরিকার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। সেখানেও খানকা রয়েছে, যাকে দেশটির ভাষায় বলা হয় তেকে। এই তেকে সামাজিক মিলনকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এখানে অভাবী মানুষদের খাবার দেওয়া হয়। আমাদের উপমহাদেশের খানকাগুলোয়ও যেমন অভাবীসহ সব ধরনের মানুষ আহার করেন, সেখানেও তেমন ব্যবস্থা রয়েছে।

এছাড়া কসোভোর সুফিরা, বিশেষ করে রিফাই তরিকার দরবেশরা, প্রতিবছর বসন্তের শুরুতে (২২ মার্চ) হজরত আলী (রা.)-এর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ‘সুলতান নওরোজ’ উৎসব পালন করে থাকেন। এই উৎসবে জিকিরের সময় দরবেশরা একধরনের আধ্যাত্মিক ঘোরের মধ্যে চলে যান এবং নিজেদের গালে ও শরীরে লোহার শিক বা সুচ বিদ্ধ করেন, যা বলকান অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্য।

এ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মূলত সুফি সাধকরাই ইসলাম ধর্ম প্রচার করেছেন। তারা এই শিক্ষা পেয়েছেন সাহাবায়ে কেরাম ও তাবে-তাবেঈনদের কাছ থেকে। এখানে উল্লেখ করতে হয়, সাহাবায়ে কেরাম রাসুল (সা.)-এর বিদায় হজের ভাষণে দেওয়া নির্দেশ অনুসরণ করে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। তাদের অনুসরণ করেছিলেন তাবে-তাবেঈনরা এবং পরবর্তীকালে সুফি সাধকরা। বিদায় হজের ভাষণে রাসুল (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘সাবধান! যারা এখানে উপস্থিত আছো, তারা এই বাণীটি অনুপস্থিতদের কাছে পৌঁছে দেবে। সম্ভবত অনুপস্থিত ব্যক্তি উপস্থিত শ্রোতাদের চেয়ে বেশি ভালোভাবে কথাটি অনুধাবন করতে পারবে।’

মহানবী (সা.)-এর ওই নির্দেশের পর সাহাবায়ে কেরাম পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েন। এখানে উল্লেখ করতে হয়, বিদায় হজের এই সমাবেশে ১ লাখ ১৪ হাজার, মতান্তরে ১ লাখ ২৪ হাজার সাহাবি উপস্থিত ছিলেন। কথিত আছে, এই সাহাবিদের মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১২ হাজার সাহাবির কবর মক্কা ও মদিনায় রয়েছে। বাকি সাহাবিদের কবর পৃথিবীর নানা দেশে রয়েছে। এভাবে সাহাবিদের অনুসরণ করে তাবে-তাবেঈনরাও সারা দুনিয়ায় ইসলাম প্রচারে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। একইভাবে সুফি সাধকরা পৃথিবীর নানা দেশে ইসলাম প্রচার করে গেছেন। আমাদের উপমহাদেশেও এমনটি ঘটেছে। এখানে কোনো শাসক তরবারি উঁচিয়ে ইসলাম প্রচার করেননি; বরং সুফি ও দরবেশরা শান্তির বাণী নিয়ে ইসলাম প্রচার করেছেন।

এই পটভূমিতে এটাই বলা যায়, ইসলাম শান্তির ধর্ম হিসেবে পরিচিত। চরমপন্থা, উগ্রতা বা ফ্যাসাদ সৃষ্টি করা ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং ইসলাম ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদের কঠোরভাবে দমন করার কথা বলেছে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

অর্থনীতির বিপদ ক্ষমতাসীনেরা টের পেতে শুরু করেছেন

তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিতর্ক কেন

দিল্লি থেকে ইউরোপ: জেন-জি আন্দোলনের মডেল বাংলাদেশ

বলিষ্ঠ নেতৃত্বই পারে অনৈক্য দূর করতে

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গভর্নরের বৈঠক, ঢাকায় কার্যালয় খোলার আলোচনা

রাজনীতিতে গোয়েন্দা সংস্থা বিতর্ক

জাহাজ নির্মাণ শিল্প: হাতছাড়া হচ্ছে অপার সম্ভাবনা

ধর্ম যার যার...

যুক্তরাষ্ট্রকে তাড়াতে তেহরানের কৌশল

মাধ্যমিক থেকেই সেমিস্টার পদ্ধতি চালু হোক