হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

নির্বাচন : নৈতিক সিদ্ধান্তের মুহূর্ত

ব্রি জে (অব.) এইচ আর এম রোকন উদ্দিন

মানুষ আজ গভীরভাবে ক্ষুব্ধ ও হতাশ। সমাজের সর্বস্তরে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—সৎভাবে বেঁচে থাকার মূল্য কি সত্যিই আর আছে? ঋণখেলাপি, অপরাধী এবং দ্বৈত নাগরিকত্বধারীদের যখন আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়, তখন সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ শুধু জন্ম নেয় না, তা জমে ওঠে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অপমানের অনুভূতিতে। যারা দিনরাত পরিশ্রম করে, কর দেয়, ঋণ শোধ করে, আইন মেনে চলে—তাদের কাছে এটি সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতার মতো মনে হয়। মনে হয়, এই রাষ্ট্র যেন সৎ মানুষের নয়, বরং সুযোগসন্ধানী ও শক্তিধরদের জন্যই তৈরি।

বিশেষ করে, ঋণখেলাপিদের বিষয়টি মানুষের হৃদয়ে গভীর আঘাত করে। এটি শুধু ব্যাংকের হিসাবের একটি সংখ্যা নয়। এটি শ্রমিকের ঘাম, কৃষকের ফসল, প্রবাসীর কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স, ছোট ব্যবসায়ীর সঞ্চয়। যখন কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এই অর্থ ফেরত না দিয়ে বরং ক্ষমতার আসনে বসার সুযোগ পায়, তখন মানুষ অতীতের তিক্ত স্মৃতিতে ফিরে যায়।

তারা মনে করে—কীভাবে একসময় বিশ্বাস ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, কীভাবে ক্ষমতা সেবার বদলে লুটপাটের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল, কীভাবে রাষ্ট্রের অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে আর তার বোঝা বহন করেছে সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল সেবা ও ভেঙে পড়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এই ভয় অমূলক নয়। যে ব্যক্তি নিজের ঋণ শোধ করেনি, সে কীভাবে রাষ্ট্রের কোষাগার রক্ষা করবে—এই প্রশ্ন আজ আর আবেগ নয়, এটি বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া যুক্তি।

এ কারণেই আসন্ন নির্বাচন শুধু দল বা ব্যক্তির লড়াই নয়; এটি একটি নৈতিক সিদ্ধান্তের মুহূর্ত। প্রতিটি ভোটারের কাঁধে আজ ঐতিহাসিক দায়িত্ব। নীরবতা কিংবা অসতর্ক ভোট মানে একই দুর্নীতি, একই দায়মুক্তি, একই অবিচারের চক্রকে মেনে নেওয়া। ভোট এখন আর শুধু একটি সাংবিধানিক অধিকার নয়—এটি বিবেকের পরীক্ষা। কাকে ভোট দেব, তার পাশাপাশি কাকে দেব না—এই সিদ্ধান্তও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে গণভোট একটি বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে। এটি সম্মিলিতভাবে বলার সুযোগ যে দেশকে অবশ্যই ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও সংস্কারের ভিত্তিতে এগোতে হবে। গণভোটে ‘হ্যাঁ; ভোট দেওয়া কোনো ব্যক্তি, দল বা সরকারের প্রতি আনুগত্যের ঘোষণা নয়। এটি একটি স্বপ্নের পক্ষে অবস্থান—এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন, যেখানে আইন সবার জন্য সমান, যেখানে জনসেবা কোনো ব্যবসা নয়; বরং দায়িত্ব, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতাবানদের ঢাল না হয়ে জনগণের আশ্রয় হয়ে উঠবে। ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে আশা। এটি ঘোষণা করে যে আমরা এমন একটি দেশ চাই, যেখানে সৎ মানুষের মর্যাদা থাকবে, যেখানে লুটেরাদের ক্ষমতা দিয়ে পুরস্কৃত করা হবে না, যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভয়ের বাইরে স্বপ্ন দেখতে পারবে। এটি সেই লাখ লাখ সাধারণ মানুষের পক্ষে ভোট, যারা বছরের পর বছর ত্যাগ স্বীকার করেছে অথচ দেখেছে কিছু মানুষ দেশকে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দিয়েছে।

এই আবহের মধ্যেই শেরপুরে একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকে যেভাবে নির্মম ও বর্বরভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের জাতীয় স্মৃতিকে রক্তাক্ত করেছে। এ ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই মনে করিয়ে দেয় ২০০৭ সালের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা, যখন রাজনৈতিক সন্ত্রাস প্রকাশ্য রূপ নিয়েছিল। তখন আমরা দেখেছি, কীভাবে উচ্ছৃঙ্খলকর্মীরা লগি-বইঠা হাতে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, প্রকাশ্যে মানুষ হত্যা করে লাশের ওপর দাঁড়িয়ে উল্লাস ও নৃত্য করেছিল।

সেটি শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সহিংসতা ছিল না; সেটি ছিল মানবতা, সভ্যতা ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক নগ্ন আক্রমণ। এই দিন তো জনগণ চায়নি। জনগণ কখনোই রক্ত, লাশ আর প্রতিশোধের রাজনীতি চায় না। মানুষ চায় নিরাপত্তা, শান্তি, ন্যায়বিচার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। তারা চায় এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে ভিন্নমত মানেই শত্রু নয় আর ক্ষমতার লড়াই মানেই প্রাণনাশ নয়। কিন্তু যখন আবার এমন হত্যাকাণ্ড ঘটে, তখন প্রশ্ন জাগে—আমরা কি আবার সেই অন্ধকার গহ্বরের দিকেই ধাবিত হচ্ছি?

ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে। রাজনৈতিক সহিংসতা কখনোই হঠাৎ জন্ম নেয় না। এটি জন্ম নেয় প্রশ্রয় থেকে, নীরবতা থেকে, অপরাধীদের রক্ষা করার সংস্কৃতি থেকে। যখন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব উচ্ছৃঙ্খলকর্মীদের লাগাম টানে না, যখন অপরাধকে রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে ঢেকে রাখা হয়, তখন সেই সহিংসতা ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়। একসময় তা আর দলের নিয়ন্ত্রণে থাকে না—তা সমাজকে গ্রাস করে, রাষ্ট্রকে দুর্বল করে আর সাধারণ মানুষকে চরম অনিরাপত্তার মধ্যে ঠেলে দেয়। আজ সংযত হওয়া জরুরি। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বুঝতে হবে—উত্তেজিত ভাষণ, হুমকি আর ‘যা খুশি তাই করা যাবে’ ধরনের বার্তা আগুনে ঘি ঢালার শামিল। উচ্ছৃঙ্খলকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করা দুর্বলতা নয়; এটি প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয়। যে দল নিজের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে দল রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক অধিকারও হারায়।

দেশকে ভালোবাসুন—এই আহ্বান আজ আর কোনো স্লোগান নয়; এটি জাতির টিকে থাকার শর্ত। দীর্ঘদিন ধরে আমরা দেখছি, রাজনৈতিক মতভেদের নামে কাদা ছোড়াছুড়ি, ব্যক্তি আক্রমণ, অপমানজনক ভাষা ও অন্ধ পক্ষপাত কীভাবে সমাজকে বিষাক্ত করে তুলছে। এতে কোনো দল জেতে না, দেশও জেতে না—হারি আমরা সবাই। দলের চেয়ে দেশ বড়—এই সত্যটি আজ বারবার উচ্চারণ করতে হচ্ছে, কারণ বাস্তবে উল্টো চর্চাই বেশি দেখা যাচ্ছে। দলীয় স্বার্থকে জাতীয় স্বার্থের ওপরে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, এমনকি ইতিহাসকেও দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। এর পরিণতিতে রাষ্ট্র দুর্বল হয়, প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ে আর সমাজে বিভাজন স্থায়ী রূপ নেয়। অন্ধভাবে কোনো ব্যক্তি বা দলকে পূজা করার দিন সত্যিই শেষ হওয়া উচিত। গণতন্ত্রে নেতা দেবতা নন; তারা জবাবদিহির আওতাভুক্ত কর্মচারী। প্রশ্ন করা, সমালোচনা করা, ভুল ধরিয়ে দেওয়া—এসবই নাগরিক দায়িত্ব। যে সমাজে প্রশ্ন করাকে বিশ্বাসঘাতকতা আর সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হয়, সে সমাজ ধীরে ধীরে স্বৈরতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যায়।

ইচ্ছামতো ট্যাগিংয়ের রাজনীতিও আজ বড় বিপদ। ভিন্নমত মানেই কাউকে দেশদ্রোহী, এজেন্ট বা শত্রু বানিয়ে দেওয়া যুক্তিকে হত্যা করে, ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে। এতে সত্য চাপা পড়ে যায়, মিথ্যা আরো বেপরোয়া হয়। সংযম ও সতর্কতা আজ সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও নাগরিক গুণ। কথা বলার আগে ভাবতে হবে—এই ভাষা কি দেশকে এগিয়ে নেবে, নাকি বিভক্ত করবে? গুজব, অপপ্রচার ও আবেগ উসকে দেওয়া বক্তব্যের ফাঁদে পড়ে আমরা যেন নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি না করি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যখন মানুষ যুক্তির বদলে আবেগে ভাসে, তখন দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

নব্বইয়ের গণআন্দোলনে জামায়াত ও বিএনপি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলন করেছে। সে সময় তারা নির্যাতন সহ্য করেছে, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রেখেছে, এমনকি সরকার গঠনেও অংশীদার হয়েছে। অথচ আজ সেই মিত্রতা শত্রুতায় রূপ নিয়েছে। সাইবার হ্যাকিং, অপপ্রচার, একে অন্যকে ধ্বংস করার প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে রাজনীতির এই অবক্ষয় অনেকের মনে সন্দেহ জাগাচ্ছে, এর পেছনে কি কোনো বিশেষ মহল বা বিদেশি প্রভাব কাজ করছে না? আজ প্রশ্ন হলো—এই দুই দল কেন মুখোমুখি এবং এর মূল্য কে দিচ্ছে? উত্তর একটাইÑদেশ ও জনগণ। রাজনৈতিক দলগুলো যদি একে অন্যকে স্পেস না দেয়, যদি প্রতিযোগিতা সহাবস্থানের বদলে সংঘাতে রূপ নেয়, তাহলে গণতন্ত্র দুর্বল হবেই। রাজনীতি হওয়া উচিত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে—যুক্তি বনাম যুক্তি, পরিকল্পনা বনাম পরিকল্পনা, নীতি বনাম নীতি। লাঠি, আগুন আর ভাঙচুর কোনো সমস্যার সমাধান দেয় না।

আজ সময় এসেছে ব্যক্তি, দল ও গোষ্ঠীর ঊর্ধ্বে উঠে দেশকে ভাবার। কাদা ছোড়াছুড়ি নয়, প্রয়োজন যুক্তি; অপমান নয়, প্রয়োজন সম্মান; অন্ধ আনুগত্য নয়, প্রয়োজন সচেতন নাগরিকত্ব। দেশ বাঁচলে আমরা বাঁচব—এই সহজ সত্যটি যদি আমরা হৃদয়ে ধারণ করতে পারি, তাহলেই আগামীর পথ আলোকিত হবে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, রাজনীতি ও নিরাপত্তাবিশ্লেষক

hrmrokan@hotmail.com

শিক্ষাব্যবস্থার বিপর্যয় ও মানহীন বিশ্ববিদ্যালয়

শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে অস্ট্রেলিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা

অর্থনীতির গতি ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি

ইরানি বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস ও মার্কিন ক্যাম্পাসে কণ্ঠরোধ

‘মৌলবাদী অর্থনীতি’ থেকে ইসলামি ব্যাংকিং

ভবদহ জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান

ইরান যুদ্ধ গুঁড়িয়ে দিয়েছে আমিরাতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা

‘কিচেন ক্যাবিনেট’ সংস্কৃতির গতিপ্রকৃতি

শিক্ষাবিদ ও সংস্কারক প্রফেসর মুহাম্মাদ আব্দুল বারী

দেশ আর ৫ আগস্টের আগে ফিরবে না